• ই-পেপার

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

ক্ষমতার জন্য আওয়ামী লীগ কী না করেছে!

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
ক্ষমতার জন্য আওয়ামী লীগ কী না করেছে!

ক্ষমতার রাজনীতিতে সাফল্য লাভের কৌশল নির্ধারণের একটি বিজ্ঞান আছে, যা ‘সায়েন্স অব গ্র্যাটিফিকেশন’ বা ‘তুষ্টিবিজ্ঞান’ নামে পরিচিত। ভোটারদের তাৎক্ষণিক মনস্তাত্ত্বিক অগ্রাধিকার কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সহজ ও স্বচ্ছন্দ করতে তুষ্টিবিজ্ঞানের জুড়ি নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ এই তুষ্টিবিজ্ঞানকে যেভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে, তা অতীত বা বর্তমানের আর কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে সক্ষম হয়নি। বাংলাদেশে ধর্মের চেয়ে শক্তিশালী নাগরিক মনস্তাত্ত্বিক উপাদান আর দ্বিতীয়টি নেই। অতীতেও ছিল না। ধর্মের নামে তাদের তুষ্ট করে ভোট বাগানোর কৌশলও আওয়ামী লীগ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো দলের নেই, এমনকি ইসলামি দলগুলোরও না। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের মুলনীতিগুলোর অন্যতম ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। সাংবিধানিকভাবেও বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম। আওয়ামী লীগপ্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবী মুহাম্মদ (সা.) এর ‘মদিনা সনদ’ অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করছেন বলে বহুবার দাবি করেছেন। তাঁর মতে, ‘বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা অনুপ্রাণিত হয়েছে ‘মদিনা সনদ’ থেকে। কী আছে সাড়ে ১৪০০ বছর আগে ঘোষিত মদিনা সনদে? সহজ অর্থে এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রের সংবিধান, যা মদিনায় মুসলিম, ইহুদি এবং অন্যান্য গোত্র ও গোষ্ঠীর সমন্বয়ে ঐক্যবদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিল।

বাংলাদেশের ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা ইসলামি রাষ্ট্রের কল্যাণ লাভের জন্য ক্ষমতায় গেলে ‘কোরআনের আইন চালু’র অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন, মদিনা সনদ বাস্তবায়নের কথা বলেন, ‘শরিয়াহভিত্তিক শাসন’ কায়েমের কথা বলেন। কিন্তু তাঁদের নিজেদেরই কথা ও কাজে মিল না থাকায় জনগণ ভোট দিয়ে কখনো তাঁদের ক্ষমতায় পাঠায় না। ক্ষমতায় যাওয়ার তেমন গরজ তাঁদের আছে বলেও কখনো মনে হয়নি। এমনকি ইসলামি দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রবল প্রতিযোগী জামায়াতে ইসলামী, যারা প্রায় ৮৫ বছর আগে দলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ‘কোরআনের আইন চাই’, ‘সৎলোকের শাসন চাই’ ‘ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু মানি না,’ ইত্যাদি স্লোগানে আকাশবাতাস মথিত করত, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে যাদের অসংখ্য নেতা-কর্মী শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছেন, সেই দলটিও ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের প্রস্তুতিতে তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে সরকার গঠন করলে তারা ‘শরিয়াহ আইন’ বাস্তবায়ন করবে কি না, এ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করেনি। বরং নির্বাচনে জামায়াতের অনুকূলে ‘ক্ষমতায় চলে আসা’র একধরনের আওয়াজ উঠলে নারীসমাজ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনেকের মধ্যে যখন অজানা শঙ্কা ও আতঙ্কের ফিসফিসানি শুরু হয়, তখন জামায়াত জোরালো ঘোষণা দিয়ে জনগণের দ্বিধাগ্রস্ত অংশকে এই বলে আশ্বস্ত করে যে ‘জামায়াতে ইসলামী দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না।’ এটি হয় জামায়াতের আদর্শচ্যুতি, অথবা নির্বাচনি কৌশল।

কিন্তু ইসলামের আদর্শ সম্পর্কে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থানে কোনো রাখঢাক ছিল না। তাঁর কোনো এক পূর্বপুরুষ মরুর দেশ ইরাক থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন। তিনি কখনো তাঁর এ উত্তরাধিকারের ঐতিহ্য বিস্মৃত হননি বলে সব সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। গভীর রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তেন। ফজর নামাজ শেষে নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করতেন এবং প্রায়ই তিনি তাঁর ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানোর কথায় শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন। তাঁর ধর্মনিষ্ঠায় মুগ্ধ ছিলেন জামায়াতের ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমও। সংসদে জামায়াতের সমর্থন কামনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যাঁকে দূতিয়ালির জন্য পাঠিয়েছিলেন, তাঁর হাতে গোলাম আযমের জন্য উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন জায়নামাজ ও তসবিহ। শেখ হাসিনা জামায়াতের সমর্থন লাভে সফল না হলেও অধ্যাপক গোলাম আযমের কাছে পেয়েছিলেন ‘আবিদা’ (ইবাদতকারী) খ্যাতি। সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারও পিছিয়ে ছিলেন না। ২০২৩ সালে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে মন উজাড় করে দেশবাসীর জন্য দোয়া করেন।’ কওমি মাদ্রাসার ‘দাওরায়ে হাদিস’ মাস্টার্স ডিগ্রির সমমানের স্বীকৃতি দানসহ মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করায় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ ২০১৮ সালে শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করে।

ইসলামকে ব্যক্তিগত জীবনে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শেখ হাসিনার উদ্যোগের সীমা-পরিসীমা ছিল না। যখনই জাতীয় নির্বাচন এসেছে, তিনি তাঁর দলের নির্বাচনি অভিযান শুরু করার আগে প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে সিলেটের হজরত শাহজালালের দরগাহে গিয়ে সাত শ বছর ধরে কবরে শায়িত সুফিসাধকের জন্য ফাতিহা পাঠ ও মনোবাঞ্ছা ব্যক্ত করেছেন এবং অনেক সময় ওমরাহ পালনে গিয়ে মহান আল্লাহর মেহেরবানি কামনা করেছেন। সবার মনে থাকার কথা, ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি ওমরাহ পালন করতে মক্কা গমন করেন এবং মদিনায় মহানবী (সা.)-এর রওজা জিয়ারত শেষে দেশে ফিরে আসেন মাথায় একখণ্ড কালো বস্ত্র ধারণ করে। নির্বাচন চলাকালে এবং প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালেও কিছুদিন পর্যন্ত সেই কালো বস্ত্রখণ্ড তাঁর মাথায় শোভা পেত। তাঁর ইসলাম নিষ্ঠার আরেকটি প্রমাণ তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় রাষ্ট্রের ৯.৪৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৬৪টি মডেল মসজিদ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ। মডেল মসজিদের অধিকাংশ তাঁর বিদায়ের আগেই সম্পন্ন হয়েছে এবং ক্ষমতায় থাকাকালেই তিনি উদ্বোধন করেছেন।

আওয়ামী লীগ অন্তরে কীভাবে ইসলাম ধারণ করে এবং জনতুষ্টির বর্ম হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে লালন করে, তার অকাট্য প্রমাণ হলো, সামরিক শাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ৪৭ বছর আগে ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং আরেক সামরিক শাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনাধীনে ৩৮ বছর আগে ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করাকে সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ ও ধারণ করা। এই দুটি সংশোধনীর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের স্বপ্নের সোনার বাংলার ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পুরোপুরি পাল্টে দেওয়া হলেও ধর্মনিরপেক্ষতার অনুসারী ও এই নীতির অতন্দ্র প্রহরী শেখ হাসিনা ও তাঁর নেতৃত্বাধীন দল ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত চার দফা রাষ্ট্রের ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সংবিধান সংশোধন বা সংবিধানের খোলনলচে পাল্টে ফেলার সুযোগ পেয়েও তাদের একসময়ের আপত্তির ‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ সংবিধান থেকে বাদ দেননি। যদিও ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীতে তারা বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি : জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে এনেছিল। অথচ সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ তাদের সমর্থক দলগুলোকে নিয়ে হরতাল পর্যন্ত করেছিল। আওয়ামী লীগের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে কে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন, তা প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। তারা যখন ক্ষমতার বাইরে থাকে, তখন অক্ষরে অক্ষরে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ দেয়, আর নিজেরা যখন ক্ষমতায় থাকে, তারা আর তাদের সুবিধাজনক অংশটুকু নিতে চায়। বিরোধী দলে থাকলে আওয়ামী লীগ তাদেরই প্রণীত ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের দাবি জানায়, তারা ক্ষমতায় গেলে ওই আইনের প্রয়োগ আরও বৃদ্ধি করে।

আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল, ইসলামকে সফলভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ পারঙ্গমতা। সংখ্যালঘুদেরও তারা নিজেদের দিকে টানতে সবচেয়ে সফল। নির্বাচনি কৌশলের অংশ হিসেবে জনতুষ্টির জন্য ‘ইসলাম’ ধর্মকে ব্যবহার এবং সংখ্যালঘুদের স্থায়ী ভোটব্যাংকে পরিণত করার জাদু আর কোনো দল আয়ত্ত করতে পারেনি। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনলেও আওয়ামী লীগের ধর্মনির্ভরতা ছিল শুরু থেকে। আওয়ামী লীগের জন্মলগ্নে দলটির নামের সঙ্গে ‘মুসলিম’ শব্দটি যুক্ত ছিল। ধর্মনিরপেক্ষ রূপ দেওয়ার জন্য। এটিকে সেক্যুলার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে তারা মুসলিম শব্দ বর্জন করে ১৯৫৫ সালের অক্টোবর মাসে। এরপরও তারা তাদের সভা-সমাবেশ আয়োজনে ইসলামি চেতনামূলক স্লোগানগুলো যে ষাটের দশকের শেষ নাগাদ পর্যন্ত বহাল রেখেছিল তার বহু প্রমাণ রয়েছে। যেমন তারা স্লোগান দিয়েছে ‘নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর’, পাকিস্তান জিন্দাবাদ,’ ‘আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ,’ ‘শেখ মুজিব জিন্দাবাদ ইত্যাদি। এখন ‘জিন্দাবাদ’-এর মধ্যে তারা ‘জিহাদ’, ‘জঙ্গিবাদ’, ‘পাকিস্তান’ খুঁজে পায়।

নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ আওয়ামী লীগের পক্ষে যে তাদের মর্জি অনুযায়ী সবকিছু করা সম্ভব, তার বহু প্রমাণের একটি ২০০৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব আবদুর রব ইউসুফীর স্বাক্ষরিত নির্বাচনি সমঝোতা স্মারক। পাঠকদের উপলব্ধির সুবিধার্থে স্মারকের পুরোটা উপস্থাপন করা হলো :

‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মধ্যে নির্বাচনি সমঝোতা স্মারক’ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এই মর্মে অঙ্গীকারবদ্ধ হচ্ছে যে নিম্নবর্ণিত ৫টি বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করে আসন্ন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সমঝোতার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করবে এবং মহান আল্লাহ তায়ালা বিজয় দান করলে এই বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করবে।

১. পবিত্র কোরআন, সুন্নাহ ও শরিয়তবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না; ২. কওমি মাদ্রাসা সনদের সরকারি স্বীকৃতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে; ৩. নিম্নবর্ণিত বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা হবে : (ক) হজরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী; (খ) সনদপ্রাপ্ত হক্কানি আলেমগণ ফতোয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেন। সনদবিহীন কোনো ব্যক্তি ফতোয়া প্রদান করতে পারবে না; (গ) নবী-রসুল ও সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা ও কুৎসা রটনা করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

‘ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকাধারী আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খানের ঘোষিত ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার’ বা আইনগত কাঠামো আদেশের মূলনীতি অনুযায়ী ইসলামি প্রজাতন্ত্রী পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইসলামি আদর্শ সংরক্ষণ, একজন মুসলিমকে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে রাখা এবং ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী পাকিস্তানের মুসলমানদের জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টি করার মুচলেকা দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৭ সালের ১১ জুন গণপরিষদে দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের কার্যক্রমের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।’ ধর্মের নামে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও তিনি পাকিস্তানকে ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাননি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁরা ক্ষমতায় টিকে থাকার সহজ উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছেন ইসলামকে। পাকিস্তান এখন ধর্মীয় রাষ্ট্রও নয়, ধর্মনিরপেক্ষও নয়। পাশের দেশ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এমন একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চেয়েছিলেন, যা প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের নিরাপত্তা দেবে, অন্যদের ক্ষতি করে কোনো একটি ধর্মকে বিশেষ সুবিধা দেবে না এবং কোনো ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে গ্রহণ করবে না। সেই নেহরুও নেই, নেহরুর ভারতও নেই।  উপমহাদেশের তিনটি দেশেই এখন ধর্ম ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জনতুষ্টির মোক্ষম মাধ্যমে পরিণত হয়েছে এবং ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিদাররাই ধর্মকে অধিক ব্যবহার করছে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক

চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর : অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশ

ড. মো. মিজানুর রহমান
চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর : অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশ
সংগৃহীত ছবি

একবিংশ শতাব্দীতে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ বা জনসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে তার কার্যকর সংযুক্তির ওপর। ইতিহাসে দেখা যায়, যেসব দেশ তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে কাজে লাগাতে পেরেছে, তারাই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই প্রেক্ষাপটে কানেক্টিভিটি আজ উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

প্রস্তাবিত চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর এই বাস্তবতার একটি সম্ভাবনাময় উদাহরণ। এটি বাস্তবায়িত হলে তিন দেশের মধ্যে স্থল ও সমুদ্র যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে এটি চীনের জন্য মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বঙ্গোপসাগরে একটি বিকল্প বাণিজ্য ও সরবরাহ পথ তৈরি করতে পারে।

চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য মূলত সমুদ্রপথনির্ভর, যার বড় অংশ মালাক্কা প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। এই পথ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ‘মালাক্কা ডিলেমা’ চীনের জন্য একটি কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ কারণে বিকল্প যোগাযোগ রুট অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে মায়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত সংযোগ চীনের জন্য তুলনামূলক দ্রুত ও বহুমুখী বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য এই করিডর শুধু চীনের সঙ্গে সংযোগ নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একটি সুযোগ। এতে আমদানি-রপ্তানির ব্যয় ও সময় কমে শিল্প উৎপাদনের খরচ হ্রাস পাবে, ফলে তৈরি পোশাক, চামড়া, হালকা প্রকৌশল ও ওষুধ শিল্প প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ একটি ট্রানজিট ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে বিকশিত হতে পারে, যেখানে বন্দর সেবা, গুদামজাতকরণ ও পরিবহন খাত থেকে নতুন আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও আঞ্চলিক বিনিয়োগও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে ভোক্তানির্ভর কাঠামো থেকে সংযোগ ও লজিস্টিকস কেন্দ্রিক কাঠামোর দিকে রূপান্তরের সুযোগ দেবে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার একটি প্রাকৃতিক সেতুবন্ধে পরিণত করেছে। পশ্চিমে ভারত, পূর্বে মায়ানমার এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর—এই তিনটি ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশকে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সামনে নতুন এক আঞ্চলিক ভূমিকা উন্মোচিত হতে পারে। এই করিডর শুধু চীনের সঙ্গে নয়, বরং মায়ানমারের মাধ্যমে থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং বৃহত্তর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরো সহজ করতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতেও বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে BIMSTEC, BBIN এবং অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোর সদস্য। কিন্তু এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে বাস্তব যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর। নতুন করিডর এই আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকর করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে পণ্য, সেবা, মানুষ ও বিনিয়োগের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সংযোগ আরো সুদৃঢ় হবে। আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা। ইতিহাসে দেখা যায়, যেসব দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়ে, তাদের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হয়। যদিও এটি সব সময় রাজনৈতিক বিরোধ দূর করে না, তবু পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থ সংলাপ ও সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করে।

বাংলাদেশ যদি দক্ষতার সঙ্গে এই করিডরকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দেশটি কেবল একটি ট্রানজিট রাষ্ট্র নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরীয় অর্থনীতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এই অবস্থান বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি করার পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্তও উন্মোচন করতে পারে।

ইতিহাসে দেখা যায়, যেসব দেশ তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে পরিকল্পিত অবকাঠামো ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছে, তারাই সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে—অর্থাৎ অবস্থান নিজে সম্পদ নয়, বরং সঠিক ব্যবস্থাপনায় তা শক্তিতে রূপ নেয়। এর উদাহরণ হিসেবে মিসরের সুয়েজ খাল ও পানামা খাল বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে বিপুল আয় ও কৌশলগত গুরুত্ব তৈরি করেছে। একইভাবে কাজাখস্তান বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মাধ্যমে স্থলবেষ্টিত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ট্রানজিট হাবে পরিণত হয়েছে, তুরস্ক ইউরোপ-এশিয়া সংযোগকে ভিত্তি করে বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে, এবং ভিয়েতনাম উন্নত সংযোগ ও সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে দ্রুত বর্ধনশীল উৎপাদন অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছে। এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে কেবল করিডর তৈরি নয়, বরং সমন্বিত শিল্পনীতি, আধুনিক বন্দর ও লজিস্টিকস, দক্ষ কাস্টমস এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি—যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য।

চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর কেবল একটি অর্থনৈতিক অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে সক্ষম একটি কৌশলগত উদ্যোগ। বর্তমান বিশ্বে বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামো শুধু বাণিজ্যের মাধ্যম নয়, বরং শক্তি প্রতিযোগিতা ও প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে এই করিডরকে ঘিরে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির স্বার্থ ও প্রতিযোগিতা জড়িত থাকা স্বাভাবিক। চীনের জন্য এটি মূলত বঙ্গোপসাগরে বিকল্প প্রবেশাধিকার ও সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি হ্রাসের কৌশল, অন্যদিকে ভারতের জন্য এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সংযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংবেদনশীল বিষয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে মুক্ত সমুদ্রপথ ও স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর গুরুত্ব দেয়, যা এই অঞ্চলের অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোকে আরও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব দেয়। এই জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো ভারসাম্যপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে কেন্দ্রীভূত পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

এই করিডরে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য চীনের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে বাংলাদেশ কেবল ট্রানজিট সুবিধা প্রদানেই সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করার সুযোগ নিতে পারে, বিশেষ করে প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরের মাধ্যমে যাতে স্থানীয় জনশক্তি আধুনিক পরিবহন, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস খাতে সক্ষমতা অর্জন করে।

একই সঙ্গে করিডর ঘিরে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প পার্ক গড়ে তোলা গেলে বিনিয়োগ উৎপাদনমুখী হবে, যা কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বাড়াবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় শিল্প ও শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, পাশাপাশি অর্থায়ন, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত প্রভাবের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। সবশেষে, এটিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগ কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনতে পারে।
চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর যতই সম্ভাবনাময় হোক না কেন, এর সঙ্গে জড়িত ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জগুলো উপেক্ষা করা বাস্তবসম্মত হবে না। বড় ধরনের অবকাঠামো ও ভূ-রাজনৈতিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। 

এই করিডরের ক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো মায়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। দেশটির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, জাতিগত উত্তেজনা এবং সামরিক শাসনের ইতিহাস একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করে। কোনো অংশে অস্থিরতা দেখা দিলে পুরো করিডরের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থলপথে আন্তর্জাতিক করিডর পরিচালনার ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার মতো সমস্যা সব সময়ই বিদ্যমান থাকে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী ও দুর্গম অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনিক ও কৌশলগতভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

আরেকটি বড় বিষয় হলো ঋণ ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা। এই ধরনের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে সাধারণত বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। প্রকল্পের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ফলাফল যদি অর্জিত না হয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রকল্প শুরুর আগে ব্যয়–সুবিধা বিশ্লেষণ, বিকল্প অর্থায়ন কাঠামো এবং আর্থিক টেকসইতা গভীরভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।

এ ছাড়া পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। করিডর নির্মাণের ফলে বনাঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চল এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার, জীবিকা এবং সামাজিক কাঠামোও প্রভাবিত হতে পারে। তাই টেকসই উন্নয়নের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন অপরিহার্য।

ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও এই করিডরকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তির কৌশলগত স্বার্থ এখানে একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা—উভয় ধরনের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে কোনো একক শক্তির অতিরিক্ত প্রভাব দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত না করে।

এই করিডর কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ধারণা, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করার সক্ষমতা রাখে। এটি বাস্তবায়িত হলে চীনের জন্য বিকল্প বাণিজ্য ও সরবরাহ পথ তৈরি হতে পারে, মায়ানমারের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে এবং বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক যুগের সূচনা ঘটতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই করিডরের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো একটি ট্রানজিট ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। এর মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, পর্যটন এবং আঞ্চলিক সংযোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি কৌশলগত সেতুবন্ধনে পরিণত করতে পারে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা—সবকিছুই এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করা।

পরিশেষে বলা যায়, এই করিডর যদি সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত বিচক্ষণতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি নতুন অবস্থানে উন্নীত করতে সক্ষম হতে পারে। তবে সেই সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে তার ওপর।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

জুলাই গণঅভ্যুত্থান

বিএনপির ঋণ, বিপ্লব বিতর্ক এবং রক্তাক্ত ইতিহাস

রাজু আলীম
বিএনপির ঋণ, বিপ্লব বিতর্ক এবং রক্তাক্ত ইতিহাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াই রাজপথে নয়, ইতিহাসের পাতায়। কে এই পরিবর্তনের ভিত্তি নির্মাণ করেছে— এই প্রশ্নে চলছে কৃতিত্বের প্রতিযোগিতা। কিন্তু ইতিহাসের একটি স্বীকৃত সত্য হলো, কোনো গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ জন্ম নেয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিরোধ, রাষ্ট্রের বৈধতার সংকট এবং জনগণের জমে থাকা ক্ষোভ। ২০২৪ সালের জুলাই– আগস্টের গণঅভ্যুত্থানও তার ব্যতিক্রম নয়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন ছিল সেই বিস্ফোরণের তাৎক্ষণিক উপলক্ষ; কিন্তু বিস্ফোরণের উপাদান জমা হয়েছিল বহু বছর ধরে। সেই কারণে আজ প্রশ্নটি কেবল ছাত্র আন্দোলনের নয়; বরং দীর্ঘ বিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রাম, বিশেষ করে বিএনপির ভূমিকা ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবর্তনের ইতিহাস লিখতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— এই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ভিত্তি কোথায় নির্মিত হয়েছিল? কেবল জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনের মধ্যেই কি তার উত্তর নিহিত, নাকি এর পেছনে দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রামেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে?

রাজনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো, কোনো সরকার শুধু একটি আন্দোলনের কারণে ক্ষমতা হারায় না। একটি সরকার তখনই পতনের মুখোমুখি হয়, যখন দীর্ঘদিন ধরে তার রাজনৈতিক বৈধতা ক্ষয় হতে থাকে, জনগণের আস্থায় ফাটল ধরে এবং বিরোধী শক্তি সেই অসন্তোষকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়।

২০০৯ সালের পর থেকে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে দাবি করে এসেছে যে দেশের গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন, যেখানে প্রধান বিরোধী দল অংশ নেয়নি এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক— এই দুটি ঘটনাই বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এ সময়ে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন, সমাবেশ, পদযাত্রা, গণঅবস্থান, যুগপৎ কর্মসূচি এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়, বহু নেতা দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকেন এবং সাংগঠনিকভাবে দলটি ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। কিন্তু দলটি রাজপথ ছাড়েনি।

রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব থাকে। যখন একটি সরকার দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকে এবং বিরোধী দল ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন তোলে, তখন সে বিতর্ক কেবল দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষ করে যখন নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয় এবং একই সময়ে অর্থনৈতিক চাপ, দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে, তখন বিরোধী দলের রাজনৈতিক বক্তব্য সমাজের বৃহত্তর অংশেও গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে। এ দীর্ঘ সময়ে একটি রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে—পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

জুলাই আন্দোলনের দ্রুত বিস্তারের পেছনে এ রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। কারণ, কোটা সংস্কারের মতো একটি নির্দিষ্ট দাবির আন্দোলন কয়েক দিনের মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয় না, যদি না সমাজে আগে থেকেই গভীর অসন্তোষ জমা থাকে।

জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহও সেই বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন নতুন গতি পায়। শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেন এবং দাবি আদায়ের জন্য ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সংঘর্ষ, উত্তেজনা এবং সহিংসতার অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে। আন্দোলন দমনের বিভিন্ন উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানির ঘটনা জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষও বিষয়টিকে নিজেদের আন্দোলন হিসেবে দেখতে শুরু করেন। অভিভাবক, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানান। একটি দাবিভিত্তিক আন্দোলন ধীরে ধীরে জনআন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে।

জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; রাষ্ট্র পরিচালনা, জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং সরকারের বৈধতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে চলে আসে। প্রতিদিন নতুন নতুন কর্মসূচি, সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার এবং হতাহতের খবর রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। এই সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরাও বিভিন্নভাবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন।

বিএনপির নেতাকর্মীদের ভূমিকা এ পর্যায়ে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। দলটির দাবি, তাদের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী আন্দোলনে অংশ নেন এবং সরকারও বিষয়টি অনুধাবন করেছিল বলে বিএনপির বহু সিনিয়র নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিএনপির দৃষ্টিতে এটি ছিল ছাত্র আন্দোলনের সমান্তরালে দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা। তাদের বক্তব্য, তারা ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেনি; বরং একটি গণআন্দোলনের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন ও সাংগঠনিক সহায়তা দিয়েছে।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে, যেখানে আন্দোলন কার্যত সর্বজনীন চরিত্র লাভ করে। দেশের বিভিন্ন জেলায় মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিতে শুরু করে। আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাত তখন আর অস্বীকার করার সুযোগ ছিল না। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা এবং জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী ঘটনাপ্রবাহ একত্রিত হয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে, যার পরিণতি আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটিতে গিয়ে পৌঁছায়।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত রাজনৈতিক মোড় নিতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে জনসমাগম বাড়তে থাকে, সরকারবিরোধী ক্ষোভ আরও তীব্র হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার রাষ্ট্রের প্রচেষ্টা রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে। কিন্তু সেই মুহূর্তে আরেকটি বিতর্ক সামনে আসে—এই বিজয়ের রাজনৈতিক কৃতিত্ব কার?

বাস্তবতা হলো, জুলাইয়ের আন্দোলনের নৈতিক শক্তি এসেছিল শিক্ষার্থীদের সাহস, আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ থেকে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। আন্দোলন কখনোই সম্পূর্ণ শূন্যতার মধ্যে জন্ম নেয় না। যে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিরোধ নেই, বিরোধী দল নিষ্ক্রিয় এবং জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সংগঠিত নয়, সেখানে একটি ছাত্র আন্দোলন যতই শক্তিশালী হোক, তা রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের পর্যায়ে পৌঁছানো কঠিন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ রাজনৈতিক পটভূমি তৈরিতে বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলনের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ খুব কম।

বিএনপির প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মী এই আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন। নেপথ্যে বিএনপির সক্রিয় ভূমিকা সরকারও উপলব্ধি করেছিল বলে আন্দোলনের সময় দলটির বহু সিনিয়র নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অনেক স্থানে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। বিএনপি অবশ্য শুরু থেকে দাবি করে এসেছে, তারা ছাত্রদের আন্দোলনের নেতৃত্ব নিতে চায়নি; বরং জনগণের আন্দোলনের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন এবং সাংগঠনিক সহায়তা দিয়েছে। এ অবস্থান তাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলনের ওপর দলীয় ছাপ পড়লে তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

আন্দোলনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করেছে। কেউ একে একান্ত ছাত্রদের বিজয় বলেছেন, কেউ আবার নিজেদের ভূমিকাকে মুখ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তের উপস্থিতির চেয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গত দেড় দশকে সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক, সংগঠিত এবং দেশব্যাপী আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিএনপি ছিল সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি। অন্য দলগুলো বিভিন্ন সময়ে কর্মসূচি পালন করলেও তাদের সাংগঠনিক বিস্তার, আন্দোলনের স্থায়িত্ব এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা একই মাত্রায় ছিল না। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরির ক্ষেত্রে বিএনপির ভূমিকাকে অস্বীকার করা যেমন বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে, তেমনি ছাত্রদের আত্মত্যাগকে আড়াল করাও সমানভাবে অন্যায় হবে।

এখানে দুটি সত্য পাশাপাশি বিদ্যমান। প্রথমত, ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছাড়া ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হতো না। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক আন্দোলন এবং সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের প্রক্রিয়া না থাকলে সেই ছাত্র আন্দোলন এত দ্রুত সর্বজনীন রাজনৈতিক বিস্ফোরণে পরিণত হওয়ার পরিবেশও তৈরি হতো না। ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ পাঠ এই দুই বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করার মধ্যেই নিহিত।

তবে রাজনৈতিক প্রাপ্তির সঙ্গে রাজনৈতিক দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি যদি মনে করে যে এই পরিবর্তনের পেছনে তাদের দীর্ঘ আন্দোলনের অবদান রয়েছে, তাহলে জনগণও স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করবে—দলটি অতীত থেকে শিক্ষা নেবে। বিরোধী দলে থেকে গণতন্ত্র, অবাধ নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং জবাবদিহির যে প্রতিশ্রুতি তারা দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে এসেছে, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ এলে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায় মানুষ। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তন নতুন নয়; নতুন হওয়া উচিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন।

দেশের মানুষ আর এমন একটি রাজনৈতিক চক্রে ফিরে যেতে চায় না, যেখানে এক দল ক্ষমতায় এসে আরেক দলের বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রতিশোধমূলক রাজনীতি চালাবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য তখনই নিশ্চিত হবে, যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবমুক্ত হবে, নির্বাচন জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং বিরোধী মতকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে নয়, গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কেবল ছাত্রদের নয়, কেবল বিএনপিরও নয়। এটি সাহস, সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ, রাষ্ট্রের দীর্ঘ সংকট এবং বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতার সম্মিলিত ইতিহাস। তবে এই সামগ্রিক ইতিহাসের ভেতরে যদি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রশ্নটি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে বিএনপির ভূমিকা নিঃসন্দেহে কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সেই বাস্তবতা স্বীকার করেই ইতিহাসের মূল্যায়ন করতে হবে।

কারণ ইতিহাস কেবল কে শেষ মুহূর্তে রাজপথে ছিল, তা মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে কে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলানোর জন্য সংগ্রাম করেছে, কে সেই সংগ্রামের মূল্য দিয়েছে এবং কে পরিবর্তনের পর নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের দায়িত্ব পালন করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিএনপির জন্য একটি রাজনৈতিক প্রাপ্তি হতে পারে, কিন্তু সেই প্রাপ্তিকে ইতিহাসে স্থায়ী মর্যাদা দিতে হলে তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো একটি অংশগ্রহণমূলক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখা। প্রকৃত বিচার শেষ পর্যন্ত সেখানেই হবে।

লেখক: কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

জগৎজুড়ে মনুষ্যত্বের সংকট

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
জগৎজুড়ে মনুষ্যত্বের সংকট

রামিসা হত্যার পরে যে প্রতিরোধের মনোভাবটি গড়ে উঠেছিল, সেটি ছিল ব্যাপক; বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কিশোরী ও কিশোরদের সেই সমাবেশটি, যেটিতে তারা বলেছিল, ‘আর না, ধর্ষণ, আর না।’ এই ‘না’ এটা অবশ্য আগেও শোনা গেছে। ধূমপানকে না বলুন, দুর্নীতিকে না বলুন নামে সমাবেশ ও শোভাযাত্রা হয়েছে। কোনো কোনো স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অসদুপায়কে ‘না’ বলার শপথ পর্যন্ত নেওয়ানো হয়েছে, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নেতৃত্বে। কিন্তু তাতে ধূমপান, দুর্নীতি, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন, এসব যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তা নয়। রয়েই গেছে, বরং লকলকিয়ে বেড়ে উঠেছে। এক সেমিনারে সম্প্রতি বলা হয়েছে দেখলাম, অবৈধভাবে সমুদ্রযাত্রাকে ‘না’ বলুন। সে পরামর্শও কার্যকর হবে বলে মনে হয় না। দেশের সম্পদ অনবরত বাইরে পাচার হবে, আর দেশের কর্মসংস্থানবিহীন মানুষ ভাগ্যান্বেষণে বিদেশে যাওয়ার প্রাণ-বাজি-রাখা প্রচেষ্টায় ব্রতী হবে না, এমনটা আশা করাটা অসংগত বৈকি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরোধী গানগুলোর একটি ছিল, ‘আর নয় যুদ্ধ, আর নয় মায়েদের, শিশুদের কান্না।’ কিন্তু তাতে যুদ্ধ থামবার কথা নয়, থামেওনি। যুদ্ধ থেমেছে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে রুশ বাহিনীর হাতে হিটলারের দুর্ধর্ষ বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ে। সমাজতান্ত্রিক শক্তি জয়ী হয়েছে, পুঁজিবাদী নাৎসিদের পরাভূত করে।

আজকের বিশ্বেও বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন ‘না’ গুলোকে সংগঠিত করে একটি বৃহৎ ‘না’তে পরিণত করা চাই। এবং ‘না’ বলতে হবে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দেশকে নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের যে ফ্যাসিবাদী নৃশংসতা চলছে, তাকেই। বাংলাদেশের দুর্গতিও বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত পুঁজিবাদী ব্যাধির কারণেই। ১৮৪৮ সালে রচিত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ ছিল যে বিশ্বে ধনী-দরিদ্রের বিভাজন শতকরা ১০ জন বনাম ৯০ জন। সম্প্রতি নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ দাবি করেছেন যে বিভাজনটি বর্তমানে উন্নীত হয়েছে একজন বনাম নিরানব্বইজনে। এই বৈষম্য কোনো একটি শাসক গোষ্ঠীকে বিদায় করলেই যে বিদায় নেবে তা নয়, কারণ ফ্যাসিবাদের নৃশংসতা সৃষ্টি কোনো বিশেষ দলের ‘কৃতিত্ব’ নয়, পুঁজিবাদের ফ্যাসিবাদী চরিত্রটা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে বিরাজমান মারাত্মক এক ব্যাধির নাম। আর সে ব্যাধিটা হচ্ছে পুঁজিবাদী উন্নয়ন; যে উন্নয়ন মুনাফা ছাড়া অন্য কিছু চেনে না। স্থূল ভোগবাদ ভিন্ন অন্য কিছুকে মানে না। যার কাজটা হচ্ছে শোষণ ও বৈষম্যে সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, এমনকি ব্যক্তির সঙ্গেও তার নিজের বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি করা। যেসব ঘটনার বিবরণ দিতে এবং পড়তে গিয়ে ঘৃণা ভিন্ন অন্য কিছু উৎপন্ন হয় না, সে ঘৃণাকে পরিচালনা করা দরকার গোটা ব্যবস্থা যে ‘উন্নতি’ ঘটাচ্ছে তার বিরুদ্ধে। ‘না’ বলা চাই গোটা ব্যবস্থাটাকে। পুলিশের পোশাক বদলালেই কি পুলিশি ব্যবস্থার চরিত্র বদলায়?

পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে অন্য কোনো নামে চিহ্নিত করাটা বিভ্রান্তিজনক। পুঁজিবাদকে চিনে নিতে হবে পুঁজিবাদ হিসেবেই, যার কেন্দ্রে রয়েছে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা। ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম, সেটা যেমন স্থানীয়, তেমনি আন্তর্জাতিক। তবে লড়াইটা তো করতে হবে নিজেদের ভূমিতে দাঁড়িয়েই। এ লড়াই অবশ্যই রাজনৈতিক, কিন্তু এর জন্য প্রস্তুতিটা হওয়া চাই সাংস্কৃতিক। একাত্তরে আমরা স্বাধীন হয়েছি, কিন্তু স্বাধীনতার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি যে ছিল না, সেটা একটি দুঃখজনক সত্য। ১৯৬৫-এর পাক-ভারত যুদ্ধে বাঙালি সৈন্যরা যেভাবে লড়াই করেছেন এবং প্রাণও দিয়েছেন; তার ভিতরকার জাতীয়তাবাদী অনুপ্রেরণাটা তো ছিল পাকিস্তানকে রক্ষা করার। জনচিত্তেও পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের উদ্দীপনা জেগে উঠেছিল। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই সেই উদ্দীপনাকে হটিয়ে দিয়ে, সম্পূর্ণ বিপরীত যে চেতনাকে লালন করে আমরা একাত্তরে লড়েছি, সে চেতনাটা যে দুর্দমনীয় ছিল তা সত্য। কিন্তু চর্চা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তাকে সত্তার গভীরে নিয়ে যাওয়ার সময়টা তো পাওয়া যায়নি। যার ফলে যে মুক্ত স্বদেশের কথা আমরা ভেবেছি, সেখানে রাষ্ট্র এবং সমাজের চরিত্রটা কী দাঁড়াবে সেই ধারণাটি পরিষ্কার হয়নি। সমাজতন্ত্রের কথা আসে, না বলে উপায় ছিল না বলেই। যুদ্ধটা পরিণত হয়েছিল জনযুদ্ধে এবং যুদ্ধরত মানুষ ঔপনিবেশিক যুগের শোষণমূলক পুরোনো ব্যবস্থার অধীনেই রয়ে যেতে যে কিছুতেই রাজি হবে না, এটা ছিল সুস্পষ্ট। যুদ্ধকালে নেতৃত্ব ছিল যে আওয়ামী লীগারদের হাতে, তাঁরা মোটেই সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। উল্টো ছিলেন সমাজতন্ত্রবিরোধী। কিন্তু সমাজতন্ত্রের কথাটা তাদের বলতে হয়, নির্বাচনের সময়ে ভোট পাওয়ার জন্য। এবং যুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অনুপস্থিত থেকেও নেতৃত্বে বহাল রাখার আত্যন্তিক প্রয়োজনে। ভারতের যে সরকার মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হতে আমাদের সাহায্য করে, তারাও ছিল সমাজতন্ত্রবিরোধীই। এবং তাদের বিশেষ রকমের শত্রুতা ছিল সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গেই। যেজন্য গাত্রে সামান্য বামপন্থি গন্ধ-আছে-এমন সন্দেহভাজনদেরও তারা মুক্তিবাহিনীতে প্রবেশাধিকার দেয়নি।

কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে উপনিবেশবাদী পুরাতন রাষ্ট্রটিকে ভেঙে প্রকৃত অর্থে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং পুরাতন সমাজকে বদলে ফেলে নতুন এক সমাজ প্রতিষ্ঠার। উপলব্ধি ছিল প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন হবে ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানা কায়েমের। সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। দুটি কারণে; প্রথম কারণ পাকিস্তানি বুর্জোয়াদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে শাসনক্ষমতা উঠতি বাঙালি বুর্জোয়াদের দখলে চলে যাওয়া। দ্বিতীয় কারণ, স্বাধীনতার সংগ্রামকে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে পরিণত করার কর্তব্য পালনে সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতা। ব্যর্থতার ওই ইতিহাস করুণ ও হতাশাব্যঞ্জক। জগৎজুড়ে আজ যে সংকট, সেটি সভ্যতার নয়, এমনকি মানবতারও নয়। সরাসরি মনুষ্যত্বের, এবং তার পেছনে ও সামনে রয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। সামাজিক মালিকানার নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলাটাই হচ্ছে মনুষ্যত্বকে রক্ষা করার একমাত্র কার্যকর উপায়। সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন ব্যাপক সাংস্কৃতিক অনুশীলনের। যে কাজটা শুধু সমাজতন্ত্রীরাই করতে পারেন। এই সত্যটা সর্বক্ষণ সামনে থাকা দরকার যে সংস্কার আবশ্যক বটে, তবে সংস্কারে কুলাবে না; প্রয়োজন হবে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের, এবং সে পরিবর্তন সম্ভব করে তোলার জন্য সমাজবিপ্লবের কোনো বিকল্প নেই।

‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাতে কর’। কারাগার ভাঙার সেই সমষ্টিগত আঘাতই এখন প্রয়োজন। নতুন কারাগার তৈরির জন্য নয়, বিশ্বকে পুঁজিবাদের পাষাণ কারাগার থেকে মুক্ত করার প্রয়োজনে।

ব্যক্তিগত মালিকানার বিপরীতে সামাজিক মালিকানা কীভাবে সফল হয়, তার অত্যন্ত ক্ষুদ্র কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক একটি দৃষ্টান্তও পাওয়া গেছে ফরিদপুর অঞ্চলের একটি গ্রামে। সেখানে উদ্যোগী এক ব্যক্তি তাঁর পিতা ও পিতামহের কবরের পাশে তিনটি ফুলের চারা রোপণ করেছিলেন। প্রথমটি কামিনীর, দ্বিতীয়টি হাসনাহেনার, তৃতীয়টি শিউলির। একসময়ে গাছে ফুলও ফুটেছিল। কিন্তু একবার গ্রামে গিয়ে তিনি দেখেন তিনটি গাছের একটি নেই; চুরি হয়ে গেছে। তিনি চিন্তা করলেন পুনরায় গাছ লাগাবেন। কিন্তু তাদের রক্ষা করার কাজটা কঠিন তো বটেই, ব্যয়বহুলও হবে। রাত্রির অন্ধকারে ও দিবালোকে দৈনিক আট ঘণ্টা করে পাহারা দিতে তিনজন পাহারাদার, তাদের বেতন, থাকার জায়গা, তদারকির ব্যবস্থা ইত্যাদি ইত্যাদি ছাড়া চলবে না। এবং রক্ষণের ব্যবস্থাটাকে অনেক দিন ধরে চালু রাখতে হবে। বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি এক কাজ করেন।

গ্রামের পাঁচ শ পরিবারের প্রতিটির জন্য তিনটি করে চারা বরাদ্দ দিয়ে মোট পনেরো শটি চারা বিতরণ করেন। ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গায় বৃক্ষের সামাজিক মালিকানার প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। তাতে তাঁর খরচ কতটা কমল সে হিসাবটা বড় কথা নয়, বৃক্ষ ও ফুলে শোভিত হওয়ার সম্ভাবনায় গ্রামের মানুষ যে খুশি হলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশের যে উপকারটা ঘটল, ফুল ফোটার আগেই তার নিজের এবং গ্রামের যে সুনাম ছড়িয়ে পড়ল, এবং বাপদাদার কবরের পাশে বৃক্ষের শোভা ও সুরভি যে নিশ্চিত হলো, সেসব অর্জন মোটেই সম্ভবপর হতো না যদি পাহারাদার বসিয়ে গ্রামবাসীর ঈর্ষা উৎপাদনের এবং চৌর্যবৃত্তিতে উৎসাহীদের দমনের অনুৎপাদক কাজে নিজের উদ্ভাবনশীল বুদ্ধিমত্তাকে নিয়োজিত করতেন।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়