আমাদের আবাসস্থল পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন। আমরা তার পৃষ্ঠে বসবাস করি, যেখানে ৭১ শতাংশ পানি এবং বাকি ২৯ শতাংশ ভূমি রয়েছে।
আমাদের এই ধরণীটা খুব শান্ত, কোন তর্কে জড়ায় না কিন্তু এটি আপোস করেন না, সময়মতো সতর্ক সংকেত পাঠায় যেমন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভয়াবহ দাবানল, তাপপ্রবাহ, হিমবাহ গলে যাওয়া ইত্যাদি। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, ক্রমাবনতিশীল বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা প্রবাহের ক্রমবর্ধমান পুনরাবৃত্তির প্রেক্ষাপটে, বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে প্রতি বছর ৫ই জুন বিশ্ববাসী বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করছে।
এটি জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং দূষণের মতো ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলার জন্য একটি জরুরি আহ্বান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই প্রেক্ষাপটে প্রথম বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয় ১৯৭৩ সালে, “Only One Earth” থিমে। এরপর থেকে প্রতি বছর ৫ই জুন দিবসটি সারা বিশ্বে একটি নির্দিষ্ট সিম (প্রতিপাদ্য) নিয়ে পালিত হয়ে আসছে।
জাতিসংঘের মতে, বর্তমান পৃথিবী এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যার জন্য অবিলম্বে সমন্বিত জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো “Inspired by Nature. For Climate. For Our Future.” — অর্থ হলো: “প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।”
আজারবাইজান প্রজাতন্ত্র ‘বাকুতে’ মহামান্য রাজকুমারী ক্যামিলা অফ বুর্বন টু সিসিলিস-এর পৃষ্ঠপোষকতায় মূল বিশ্ব পরিবেশ দিবস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক উদযাপনের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে শত শত সহায়ক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে নাগরিক, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসাকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন জনসভা, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং ডিজিটাল কার্যক্রম পরিচালনা করা। বিশ্বের অন্যান্য দেশেরমতো বাংলাদেশেও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর (DOE) বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করছে। এর মধ্যে রয়েছে র্যালি, সেমিনার, বৃক্ষরোপণ ও সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি একটি অত্যন্ত কার্যকরী পদক্ষেপ। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে পদক্ষেপসমূহ:
স্বাস্থ্যকর মাটি
বৃক্ষ জন্মানোর প্রধান ভিত্তি হলো স্বাস্থ্যকর মাটি। স্বাস্থ্যকর মাটি ছোট জীব থেকে শুরু করে মানবগোষ্ঠী পর্যন্ত সকলকে প্রয়োজনীয় উপাদানের যোগান দিয়ে থাকে। ইহা উদ্ভিদকে পুষ্টি সরবরাহ করে, যা আমাদেরকে খাওয়ায়, পানিকে ফিল্টার করে আমাদের পানের যোগ্য করে দেয়, বন্যা থেকে রক্ষা করে, লক্ষ কোটি জীবের বাসস্থান হিসেবে কাজ করে এবং আমাদেরকে এন্টিবায়োটিক সরবরাহ করে।
স্বাস্থ্যকর মাটির মূল উপাদান হলো জৈব পদার্থ পরিমাণ ৩ থেকে ৬ শতাংশ থাকা দরকার কিন্তু বাংলাদেশের অনেক জমিতে তার পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে। বর্তমানে আমাদের প্রায় ৭৫% আবাদি জমি তার উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলেছে, শুধুমাত্র অধিক মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার ও জৈব পদার্থ ঘাটতির কারণে। দেশে প্রায় ৮০% আবাদি জমিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে। মাটিকে সুস্থ বা জীবিত রাখার একমাত্র উপায় হলো বেশি পরিমাণে জৈব পদার্থ যোগ করা এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার যথাসম্ভব কমিয়ে আনা। জৈব পদার্থের প্রধান উৎস হলো শহর-বন্দর ও গ্রামের সব রকমের পচনশীল আবর্জনা এবং পশুর গোবর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের খামার শাখার তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ২ কোটি ৪৮ লাখ ৫৬ হাজার পশু রয়েছে। দৈনিক ১০ কেজি হিসেবে উক্ত পশু সমূহ থেকে বছরে গোবর আসে প্রায় ৯ কোটি ১২.৫ লাখ টন। অন্যদিকে, আমাদের নগরগুলোতে দৈনিক প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তার মধ্যে রয়েছে ১৭ হাজার মেট্রিক টন পচনশীল বর্জ্য (Ahmed, 2019)। দৈনিক উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ পচনশীল বর্জ্য ও গরুর গোবর একটি অত্যাধুনিক স্মার্ট, টেকসই পরিবেশবান্ধব "ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই (Black Soldier Fly- BSF)" এর মাধ্যমে তৈরি করা সম্ভব উন্নত মানের জৈব সার ও বিকল্প প্রাণিখাদ্য (যেমন- মাছ ও পোল্ট্রির খাবার)। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের এই উদ্ভাবনী ব্যবস্থাপনা থেকে যেমন জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে, তেমনি তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও জলাবদ্ধ মুক্ত শহর।
আবাদি জমি
বর্তমানে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা ১% হারে বাড়ছে অন্যদিকে আবাদযোগ্য জমি ১% হারে কমছে। তাছাড়া যেখানে সেখানে নতুন বাড়িঘর তৈরি করে আশেপাশে জমিগুলো ব্যবহারের অযোগ্য করে তুলছে। তার জন্য ভূমি সেটলমেন্ট অ্যাক্ট বাস্তবায়ন করা দরকার।
সিসি ক্যামেরার ব্যবহার
উন্নত দেশগুলোর মতো আসবাবপত্র, খাট, সোফা, বালিশ, তোশক নিজ খরচে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে রাখার নির্দেশ থাকতে হবে। ইচ্ছেমতো যেখানে-সেখানে সব রকমের ময়লা-আবর্জনা ফেলব আর সিটি করপোরেশন প্রতিদিন সব সরিয়ে নেবে এ মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। আমাদের কারণেই সামান্য বৃষ্টিতে শহরগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ ও সতর্কতার জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা যেতে পারে।
ইটের বিকল্প পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার
বাংলাদেশে প্রায় ৮ হাজার ইটভাটা আছে, বছরে তৈরি হয় প্রায় ৩,৫০০ কোটি ইট, তাতে ১৩ কোটি টন মাটি ব্যবহৃত হয়, যা ৬৫ হাজার হেক্টর জমির ওপরের স্তরের মাটির সমান। ইটভাটার কারণে পার্বত্য এলাকার পাহাড়গুলো এখন ঝুঁকিতে রয়েছে। ইটভাটার মালিক ও ব্যবহারকারীদের কাছে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের সুবিধাসমূহ তুলে ধরতে হবে এবং তার উৎপাদন এবং ব্যবহারেও আকৃষ্ট করতে হবে।
প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিতকরণে করণীয়
প্লাস্টিক বর্জ্য মাটিতে ক্ষয় হতে ৪০০ থেকে ৫০০০ বছর লাগে। প্লাস্টিক উদ্ভিদের পুষ্টি, পানি গ্রহণ ও চলাচলে বাধা প্রদান করে। ফলে উদ্ভিদের শেকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সরকারি অফিসের আয়োজনে এবং রাজনৈতিক প্রচারণায় প্লাস্টিক ব্যানারের পরিবর্তে প্রিন্টেড মেটেরিয়াল, মাল্টিমিডিয়া ও অন্যান্য দেশের মতো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে। কোন অনুষ্ঠানে পরিবেশ দিবসে কোন প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহার করে দিবস থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক হবে না, এদিকে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে।
বৃক্ষের চারা ও রোপনের স্থান নির্বাচন
বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ শীর্ষক একটি বৃহৎ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।পরিবেশ রক্ষা ও সবুজায়নের লক্ষ্যে চলমান এই কর্মসূচিতে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ অভিযান চলমান আছে। বিভাগীয় শহরগুলোতে বৃক্ষের চারা ও স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে বনবিভাগের সহায়তা নিলে উক্ত পদক্ষেপের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে, অন্যথায় বিনামূল্যে চারা বিতরণ বা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে চারা সরবরাহ করলে বৃক্ষরোপণের সুফল বয়ে আনবে না, কারণ বৃক্ষ রোপনের জন্য উপযুক্ত জায়গা শহরগুলোতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। অন্যদিকে অন্তবর্তী কালীন সরকার গত ১৫ই মে ২০২৫ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন–১ অধিশাখা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছ দুটির চারা তৈরি, রোপণ ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ করেছেন। তাদের নিষিদ্ধ করার পিছনে বিজ্ঞানসম্মত কোন ব্যাখ্যা ছিল না। বর্তমান সরকারের কাছে বিষয়টি পূণ:বিবেচনা করে গাছ দুইটির চাষাবাদ বন্ধ না করে উপকূলীয় অঞ্চল, অবক্ষয়িত বন, পতিত জমি, রাস্তা–ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি অফিস প্রাঙ্গণ ও জলাভূমির আশেপাশে রোপণের উদ্যোগ নিলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের কাঠের চাহিদা লাঘবে গাছ দুটো ভূমিকা রাখবে। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, গাছ লাগানো একটি 'সাদাকায়ে জারিয়া' বা চলমান দান। যতদিন ওই গাছ থেকে মানুষ, পশুপাখি বা কীটপতঙ্গ উপকৃত হবে (ফল খাবে, ছায়া নেবে), ততদিন গাছ রোপণকারী ব্যক্তি মৃত্যুর পরেও এর সওয়াব বা পুণ্য পেতে থাকবেন। আমাদের স্লোগান হোক 'মাটি বাঁচান গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান'। সর্বোপরি পরিবেশ রক্ষায় মাটি হলো প্রধান ভিত্তি। এটি পৃথিবীর সকলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, উদ্ভিদ ও প্রাণীর বেঁচে থাকা এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে বহুমুখী ভূমিকা পালন করে। আমাদের উচিত প্রকৃতির প্রেরণার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি পরিবেশবান্ধব আবাসভূমি রেখে যাওয়া।
লেখক : অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাসেম।
মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।




