বিশ্ববাজারের অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান এই উৎসে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত গত ১১ মাসে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৩ হাজার ৬৫৬ কোটি ডলারের তুলনায় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কম। এ খাতের প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে কমেছে ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ইউরোপের বেশির ভাগ দেশেই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে। অপ্রচলিত বাজারেও পোশাক রপ্তানি কমছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রধান এবং অপ্রচলিত উভয় বাজারেই দেশের পোশাক রপ্তানি আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ইউরোপের প্রধান বাজারসহ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি সামগ্রিক কিংবা পণ্যভিত্তিক (নিট ও ওভেন) ক্যাটাগরিতে কমেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমা এবং দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ।
আরো পড়ুন
বাজেট বাস্তবায়নে জরুরি স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা
ইপিবির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশের পোশাকের একক বৃহত্তম গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। পুরো পোশাক রপ্তানির ৪৯ দশমিক ১৫ শতাংশই যায় এই অঞ্চলে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে মেয়াদে ইইউ-তে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছরের ১৮ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ কম। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে বেলজিয়াম (৬.১৪%), ক্রোয়েশিয়া (৮২.৩৭%), চেক প্রজাতন্ত্র (৪.০২%), ডেনমার্ক (১২.৫৬%),
ফিনল্যান্ড (২.৩৯%), ফ্রান্স (৯.৯০%), জার্মানি (১২.৭১%), গ্রিস (৪.৪৯%), ইতালি (৮.৫৬%), আয়ারল্যান্ড (১১.২৬%), লুক্সেমবার্গ (১৮.৫০%), মাল্টা (২৫.৮৩%), পর্তুগাল (৪.৩৯%), রোমানিয়া (২৩.৯০%), স্লোভাকিয়া (১৪.৪২%), সুইডেন (২.৮৩%) শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া অপ্রচলিত বাজারের দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া (১০.০৯%), চিলি (৪.৫৪%), ভারত (১১.১৩%), জাপান (৬.৫৮%), দক্ষিণ কোরিয়া (১১.৭২%), মেক্সিকো (১২.৯৪%), নিউজিল্যান্ড (৯.২৮%), রাশিয়া (৩০.৩৬%), তুরস্ক (১৬.৬০%) কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে যুক্তরাজ্যের বাজারেও বাংলাদেশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়েছে। এই বাজারে পোশাক রপ্তানি শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ৪.০১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা গত বছর ছিল ৪.০৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, দ্বিতীয় বৃহত্তম একক বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি প্রায় স্থবির হয়ে আছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে ওভেনের বাজার কিছুটা কমলেও সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধি ০.০৪ শতাংশ কমে প্রায় গত বছরের কাছাকাছি (৭.০২ বিলিয়ন ডলার) রয়েছে।
আরো পড়ুন
আমলাতন্ত্র ও ইউনূসের আবর্জনা বাজেট বাস্তবায়নে যত বাধা
বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) উপদেষ্টা মোহাম্মদ মফিজ উল্লাহ বাবলু বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি, ক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর আগ্রাসি বাজার কৌশল ও সর্বোপরি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ধীরগতির কারণে পোশাক খাত এ সমস্যায় পড়ছে।
তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ যতই বড় হোক, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সম্ভাবনা এখনো শক্তিশালী। শুধু কম দামে উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক এবং নতুন বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন