‘আমার ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন কাউকেই যেন আমার লাশ ছুঁইতে না দেয়। আমার আত্মায় কষ্ট পাইবে। আমি মন থেকে, দিল থেকে তাদেরকে অভিশাপ দেই- আমার মত একদিন যেন তারাও এই জায়গায় (বৃদ্ধাশ্রমে) আসে।’ বাবা দিবসে কেঁদে কেঁদে এই কথাগুলো বলছিলেন একজন বৃদ্ধ বাবা। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রমে টাকা উপার্যন করে যে সন্তানদের নিজের হাতে বড় করেছেন, অভাব বুঝতে দেননি কোনদিন- সেই সন্তানরাই এখন তাকে ফেলে গেছে বৃদ্ধাশ্রমে। ফেলে যাওয়ার পর একদিনও কেউ এসে নেয়নি খোঁজ-খবর।
রবিবার (২১ জুন) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
চারদেয়ালে ঘেরা বৃদ্ধাশ্রমে বসে তিনি বলছিলেন, ‘এদেরকে (সন্তানদের) সোনার চামিচে করে দুধ খাওয়াইছি। আমার ভাবিরা কইতো- এত বেশি ভালোবাইসো না, তোমারে এরা জীবনে বহুত কষ্ট দিব। আজ তাদের সেই কথাটা আমি অক্ষরে অক্ষরে পাইছি।’
‘আচ্ছা বুঝলাম ছেলেরা এমন হইতে পারে না। এইটা মানি নিলাম। কিন্তু মেয়েরা কেমনে এমন হয়? মেয়েরা কেমনে বাপকে এত অস্বীকার করে? আমার জীবনে এমন এই প্রথম দেখলাম।’
তিনি সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনাদের কাছে এবং আইনের কাছে আমি একটা ডায়রি দিয়ে যাব। এই ডায়রিটা আপনারা থানায় পৌঁছাইয়া দিবেন। এই ডায়রিতে আমার সবকিছু লেখা আছে- তারা আমার সঙ্গে কি করছে। আমার শুধু একটাই অনুরোধ থাকবে, আপনারা এই জিনিসটা মানুষে দেখাইবেন। আমার ছবিটা দেখাইবেন। ছেলে-মেয়ে যেন দেখতে পায় যে, তার বাপ কি অবস্থায় আছে।’
‘এই টাকা-পয়সাটাই হলো আমার জীবনের কাল। ওনাদের ঘাড়ের ওপর (বৃদ্ধাশ্রমে) আমারে উঠাই দিয়ে গেছে। আজ পর্যন্ত দেখতে আসে নাই। খোঁজটাও নেয় না- দেখা তো দূরের কথা। এইটা কি ধরনের ছেলে? এরা অশিক্ষিত হইলেও এক কথা। আমার মেয়েও কি অশিক্ষিত- যে মেয়েরে আমি পুতুলের মত রাখছি? আমি কি তাদের কাছে টাকা পয়সা চাইছি? কিচ্ছু চাইনি, একটু ভালোবাসা চাইছি। যাইক, এইটা আমার ভাগ্য আছে।’
নিজে একজন রেমিট্যান্সযোদ্ধা ছিলেন। সেই বর্ণনা দিয়ে বৃদ্ধ বাবা বলেন, ‘আমার জীবনে আমি বহুত বিদেশ করছি, বহুত টাকা কামাইছি, বহুত টাকা খরচও করছি। দুই দেশে ছিলাম। আমি ১৯৯৫ থেকে সৌদি আরবে ছিলাম- ২০১৬ সাল পর্যন্ত। যখন বস্তা ভরি ভরি টাকা দিছিলাম, তখন সব ঠিক আছিল। ছেলে ঠিক আছিল, মেয়ে ঠিক আছিল- সব ঠিক আছিল।’
‘আমার একটা এফডি (ফিক্সড ডিপোজিট) আছিল। আমার ছোট ছেলেটা আমেরিকান এম্বাসিতে চাকরি করে। এ ছিল চোখের মনি। আমি সাদা দিলে- আমার ছেলে আমার টাকা পাইবে না কে পাইবে, এরে করে দিছি। টাকাগুলা উঠাই নিয়ে যে গেছে, আজ পর্যন্ত সে আমার সাথে কোন যোগাযোগ করে না, কোনো যোগাযোগ নাই। আমার মেয়ের কাছে আমার টাকা ছিল- ২০ লাখ টাকা ছিল। এই টাকাটা আমাকে আর দেয়নাই। আজ পর্যন্ত ফেরত দেয়নাই।’
‘এখন আমি আপনাদের কাছে এবং আইনের কাছে একটা ডায়রি দিয়ে যাব। এ ডায়রিটা আপনারা থানায় পৌঁছায় দিবেন। আপনাদের দায়িত্ব এটা। এই ডায়রিতে আমার সবকিছু লেখা আছে- তারা আমার সাথে কি করছে।’
‘যেই কয়দিন বাঁচি থাকি, এই আমি এইখানে (বৃদ্ধাশ্রমে) থাকমু। আমার ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন কাউকেই যেন আমার লাশ ছুঁইতে না দেয়। ছোঁয়ার কারো কোনো অধিকার নেই। একমাত্র এইখানের মানুষেরই আছে- আমার লাশ ছোঁয়ার অধিকার।’
‘আমার সন্তানদেরকে আমি এইটাই বলব যে, আমার সাথে তোমরা যারা যা করছো, এইটার ফল তোমরা পাইবা। আমি দিল থেকে বলি রাখছি- এইটার ফল আল্লাহ তাআলা তোমাগোরে দিবে- একদিন না একদিন দিবে। এইটার ফল তোমরা ভোগ করতে পারবা। আমারে তো উনারা (বৃদ্ধাশ্রম) জায়গা দিছে, চাইট্টা খাবার দিছে, খাকার জায়গা দিছে- এদেরকে (সন্তানদের) আল্লাহ যেন এটাও না দেয়। বিশেষ করে আমার মেয়েকে যেন না দেয়।’




