ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির প্রভাবে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরে দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে প্রায় ১৫০ মিটারের বেশি অংশ ধসে গভীর গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় সেতুসহ রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে।স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
রবিবার (২১ জুন) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির উত্তর-পশ্চিম পাশে নির্মিত প্রায় ৯০০ মিটার দীর্ঘ সেতু রক্ষা বাঁধের বড় একটি অংশ ভেঙে গেছে। পানির তীব্র স্রোতে বাঁধের নিচের মাটি সরে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল গর্ত। এতে প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহারকারী ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষের যাতায়াত নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এদিকে উজানে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ভারি বৃষ্টিপাত এবং দেশের অভ্যন্তরে টানা বর্ষণের কারণে উত্তরাঞ্চলের নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। শনিবার রাত থেকে রবিবারদুপুর পর্যন্ত রংপুরে ১৭ দশমিক ০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত বছরও একই স্থানে প্রায় ১০০ ফুট এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছিল। সে সময় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁশের পাইলিং নির্মাণ করে ভাঙন রোধের চেষ্টা করে। তবে স্থায়ী কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এবার পানির তোড়ে সেই পাইলিং ভেঙে গেছে।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী অভিযোগ করে বলেন, ‘গত বছর ভাঙনের সময় আমরা ব্লক ফেলে স্থায়ীভাবে বাঁধ সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি না করে বাঁশের পাইলিং করা হয়েছিল। এখন সেই পাইলিংও টেকেনি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সেতুর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।’
তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতেও নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নে সেতু রক্ষা বাঁধে ধসের কারণে অন্তত তিনটি গ্রামের এক হাজারের বেশি পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকাল ৯টায় ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার এবং কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টে ২৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে দুপুর নাগাদ পানি আরও বেড়ে বিপৎসীমার মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার নিচে পৌঁছে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটই খুলে রাখা হয়েছে।
ডালিয়া পয়েন্টের পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম বলেন,‘সকাল থেকেই তিস্তার পানি বাড়ছে। দুপুর ১২টায় পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
তিস্তার চরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। মহিপুরের কৃষক মকবুল হোসেন বলেন,‘পানির প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। আমন মৌসুমের জন্য তৈরি করা বীজতলা ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে।’
চর ইচলি এলাকার কৃষক আমজাদ আলী জানান, তার দেড় বিঘা জমির বাদামখেত পানিতে ডুবে গেছে। পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী নুসরাত জাহান জেরিন বলেন, ‘উত্তরের কয়েকটি জেলার নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।’
স্থানীয়দের দাবি, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও কংক্রিট ব্লক ফেলে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে শুধু সেতু নয়, পুরো আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে তিস্তার পানি আরও বৃদ্ধি পেলে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের গেট খুলে দেওয়ায় এবং উজানে ভারি বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি বাড়ছে।ব্যারাজের সব জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। নদী তীরবর্তী মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।’
রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, তিস্তাপাড়ের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে তিস্তাপাড়ে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। তবে অন্যান্য নদীর পরিস্থিতিও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।’




