• ই-পেপার

একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে জনগণ হিমালয়ের মতো প্রতিরোধ গড়ে তুলবে : ডা. শফিকুর রহমান

মহিপুরে তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধে ধস, আতঙ্কে হাজারো পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর
মহিপুরে তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধে ধস, আতঙ্কে হাজারো পরিবার
রবিবার দুপুরে সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে ভাঙ্গন এলাকার চিত্র।

ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির প্রভাবে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরে দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে।

সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে প্রায় ১৫০ মিটারের বেশি অংশ ধসে গভীর গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় সেতুসহ রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে।স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

রবিবার (২১ জুন) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির উত্তর-পশ্চিম পাশে নির্মিত প্রায় ৯০০ মিটার দীর্ঘ সেতু রক্ষা বাঁধের বড় একটি অংশ ভেঙে গেছে। পানির তীব্র স্রোতে বাঁধের নিচের মাটি সরে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল গর্ত। এতে প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহারকারী ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষের যাতায়াত নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।      

এদিকে উজানে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ভারি বৃষ্টিপাত এবং দেশের অভ্যন্তরে টানা বর্ষণের কারণে উত্তরাঞ্চলের নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। শনিবার রাত থেকে রবিবারদুপুর পর্যন্ত রংপুরে ১৭ দশমিক ০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত বছরও একই স্থানে প্রায় ১০০ ফুট এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছিল। সে সময় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁশের পাইলিং নির্মাণ করে ভাঙন রোধের চেষ্টা করে। তবে স্থায়ী কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এবার পানির তোড়ে সেই পাইলিং ভেঙে গেছে।

লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী অভিযোগ করে বলেন, ‘গত বছর ভাঙনের সময় আমরা ব্লক ফেলে স্থায়ীভাবে বাঁধ সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি না করে বাঁশের পাইলিং করা হয়েছিল। এখন সেই পাইলিংও টেকেনি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সেতুর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।’

তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতেও নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নে সেতু রক্ষা বাঁধে ধসের কারণে অন্তত তিনটি গ্রামের এক হাজারের বেশি পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকাল ৯টায় ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার এবং কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টে ২৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে দুপুর নাগাদ পানি আরও বেড়ে বিপৎসীমার মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার নিচে পৌঁছে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটই খুলে রাখা হয়েছে।

ডালিয়া পয়েন্টের পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম বলেন,‘সকাল থেকেই তিস্তার পানি বাড়ছে। দুপুর ১২টায় পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’

তিস্তার চরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। মহিপুরের কৃষক মকবুল হোসেন বলেন,‘পানির প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। আমন মৌসুমের জন্য তৈরি করা বীজতলা ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে।’

চর ইচলি এলাকার কৃষক আমজাদ আলী জানান, তার দেড় বিঘা জমির বাদামখেত পানিতে ডুবে গেছে। পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী নুসরাত জাহান জেরিন বলেন, ‘উত্তরের কয়েকটি জেলার নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।’

স্থানীয়দের দাবি, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও কংক্রিট ব্লক ফেলে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে শুধু সেতু নয়, পুরো আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে তিস্তার পানি আরও বৃদ্ধি পেলে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের গেট খুলে দেওয়ায় এবং উজানে ভারি বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি বাড়ছে।ব্যারাজের সব জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। নদী তীরবর্তী মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।’

রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, তিস্তাপাড়ের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে তিস্তাপাড়ে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। তবে অন্যান্য নদীর পরিস্থিতিও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।’

বাবা দিবসে এক হতভাগ্য বাবা

‘ছেলে-মেয়ে যেন আমার লাশ না ছোঁয়’

অনলাইন ডেস্ক
‘ছেলে-মেয়ে যেন আমার লাশ না ছোঁয়’

‘আমার ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন কাউকেই যেন আমার লাশ ছুঁইতে না দেয়। আমার আত্মায় কষ্ট পাইবে। আমি মন থেকে, দিল থেকে তাদেরকে অভিশাপ দেই- আমার মত একদিন যেন তারাও এই জায়গায় (বৃদ্ধাশ্রমে) আসে।’ বাবা দিবসে কেঁদে কেঁদে এই কথাগুলো বলছিলেন একজন বৃদ্ধ বাবা। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রমে টাকা উপার্যন করে যে সন্তানদের নিজের হাতে বড় করেছেন, অভাব বুঝতে দেননি কোনদিন- সেই সন্তানরাই এখন তাকে ফেলে গেছে বৃদ্ধাশ্রমে। ফেলে যাওয়ার পর একদিনও কেউ এসে নেয়নি খোঁজ-খবর।

রবিবার (২১ জুন) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

চারদেয়ালে ঘেরা বৃদ্ধাশ্রমে বসে তিনি বলছিলেন, ‘এদেরকে (সন্তানদের) সোনার চামিচে করে দুধ খাওয়াইছি। আমার ভাবিরা কইতো- এত বেশি ভালোবাইসো না, তোমারে এরা জীবনে বহুত কষ্ট দিব। আজ তাদের সেই কথাটা আমি অক্ষরে অক্ষরে পাইছি।’

‘আচ্ছা বুঝলাম ছেলেরা এমন হইতে পারে না। এইটা মানি নিলাম। কিন্তু মেয়েরা কেমনে এমন হয়? মেয়েরা কেমনে বাপকে এত অস্বীকার করে? আমার জীবনে এমন এই প্রথম দেখলাম।’

তিনি সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনাদের কাছে এবং আইনের কাছে আমি একটা ডায়রি দিয়ে যাব। এই ডায়রিটা আপনারা থানায় পৌঁছাইয়া দিবেন। এই ডায়রিতে আমার সবকিছু লেখা আছে- তারা আমার সঙ্গে কি করছে। আমার শুধু একটাই অনুরোধ থাকবে, আপনারা এই জিনিসটা মানুষে দেখাইবেন। আমার ছবিটা দেখাইবেন। ছেলে-মেয়ে যেন দেখতে পায় যে, তার বাপ কি অবস্থায় আছে।’

‘এই টাকা-পয়সাটাই হলো আমার জীবনের কাল। ওনাদের ঘাড়ের ওপর (বৃদ্ধাশ্রমে) আমারে উঠাই দিয়ে গেছে। আজ পর্যন্ত দেখতে আসে নাই। খোঁজটাও নেয় না- দেখা তো দূরের কথা। এইটা কি ধরনের ছেলে? এরা অশিক্ষিত হইলেও এক কথা। আমার মেয়েও কি অশিক্ষিত- যে মেয়েরে আমি পুতুলের মত রাখছি? আমি কি তাদের কাছে টাকা পয়সা চাইছি? কিচ্ছু চাইনি, একটু ভালোবাসা চাইছি। যাইক, এইটা আমার ভাগ্য আছে।’

নিজে একজন রেমিট্যান্সযোদ্ধা ছিলেন। সেই বর্ণনা দিয়ে বৃদ্ধ বাবা বলেন, ‘আমার জীবনে আমি বহুত বিদেশ করছি, বহুত টাকা কামাইছি, বহুত টাকা খরচও করছি। দুই দেশে ছিলাম। আমি ১৯৯৫ থেকে সৌদি আরবে ছিলাম- ২০১৬ সাল পর্যন্ত। যখন বস্তা ভরি ভরি টাকা দিছিলাম, তখন সব ঠিক আছিল। ছেলে ঠিক আছিল, মেয়ে ঠিক আছিল- সব ঠিক আছিল।’

‘আমার একটা এফডি (ফিক্সড ডিপোজিট) আছিল। আমার ছোট ছেলেটা আমেরিকান এম্বাসিতে চাকরি করে। এ ছিল চোখের মনি। আমি সাদা দিলে- আমার ছেলে আমার টাকা পাইবে না কে পাইবে, এরে করে দিছি। টাকাগুলা উঠাই নিয়ে যে গেছে, আজ পর্যন্ত সে আমার সাথে কোন যোগাযোগ করে না, কোনো যোগাযোগ নাই। আমার মেয়ের কাছে আমার টাকা ছিল- ২০ লাখ টাকা ছিল। এই টাকাটা আমাকে আর দেয়নাই। আজ পর্যন্ত ফেরত দেয়নাই।’

‘এখন আমি আপনাদের কাছে এবং আইনের কাছে একটা ডায়রি দিয়ে যাব। এ ডায়রিটা আপনারা থানায় পৌঁছায় দিবেন। আপনাদের দায়িত্ব এটা। এই ডায়রিতে আমার সবকিছু লেখা আছে- তারা আমার সাথে কি করছে।’

‘যেই কয়দিন বাঁচি থাকি, এই আমি এইখানে (বৃদ্ধাশ্রমে) থাকমু। আমার ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন কাউকেই যেন আমার লাশ ছুঁইতে না দেয়। ছোঁয়ার কারো কোনো অধিকার নেই। একমাত্র এইখানের মানুষেরই আছে- আমার লাশ ছোঁয়ার অধিকার।’

‘আমার সন্তানদেরকে আমি এইটাই বলব যে, আমার সাথে তোমরা যারা যা করছো, এইটার ফল তোমরা পাইবা। আমি দিল থেকে বলি রাখছি- এইটার ফল আল্লাহ তাআলা তোমাগোরে দিবে- একদিন না একদিন দিবে। এইটার ফল তোমরা ভোগ করতে পারবা। আমারে তো উনারা (বৃদ্ধাশ্রম) জায়গা দিছে, চাইট্টা খাবার দিছে, খাকার জায়গা দিছে- এদেরকে (সন্তানদের) আল্লাহ যেন এটাও না দেয়। বিশেষ করে আমার মেয়েকে যেন না দেয়।’

ফুটবলের বিশ্বকাপ রং ছড়িয়েছে মনোহরপুরে

নয়ন খন্দকার, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
ফুটবলের বিশ্বকাপ রং ছড়িয়েছে মনোহরপুরে
বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নেওয়া দল ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে সেজেছে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে অবস্থিত কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ি। ছবি: কালের কণ্ঠ

বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের মতো বিশ্বকাপ উন্মাদনায় মেতেছে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরাও। তবে এই উন্মাদনার মধ্যেও বতিক্রম ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রাম। সেখানে  বিশ্বকাপ শুধু টেলিভিশনের পর্দায় নয়, যেন নেমে এসেছে মানুষের ঘরে-আঙিনায়। 

সরেজমিন গ্রামটি ঘুরে দেখা যায়, কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ি ঘিরে পুরো মনোহরপুর সেজেছে বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নেওয়া দেশগুলোর পতাকার রঙে। গ্রামজুড়ে উড়ছে পতাকা। রঙিন দেয়ালচিত্র, প্রিয় তারকাদের প্রতিকৃতি আর উৎসবমুখরতা- এসবের মাধ্যমে গ্রামটি এখন এক টুকরো বিশ্বকাপ ফ্যান জোন। 

গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে অন্যরকম এক দৃশ্য। চারদিকে শুধু ফুটবল আর ফুটবল। সড়কের দুই পাশে উড়ছে নানা দেশের পতাকা। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা, ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ সহ নানা দলের পতাকায় রঙিন করে তুলেছে পরিবেশ। 

কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ির মূল ফটক থেকে শুরু করে আঙিনা,কাচারিঘর,বসতঘর,গাছপালা- সবখানেই বিশ্বকাপের আবহ। দেয়াল,গাছ আর বাঁশের খুঁটিতে টানানো হয়েছে লিওনেল মেসি, নেইমার জুনিয়র, কিলিয়ান এমবাপ্পেসহ বিশ্ব ফুটবলের জনপ্রিয় তারকাদের প্রতিকৃতি। কোথাও ফুটবল, কোথাও বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতীক; আবার কোথাও ফুটে উঠেছে ফুটবলপ্রেমীদের আবেগের নানা গল্প। 

প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামটিতে ভিড় করছে দর্শনার্থীরা। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছে,কেউ তুলছে বন্ধুদের নিয়ে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ করছে কিংবা ভিডিও ধারণের পর তা ছড়িয়ে দিচ্ছে, জানিয়ে দিচ্ছে মনোহরপুরের এই ব্যতিক্রম আয়োজনের গল্প।

গ্রামটিতে শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস সবচেয়ে বেশি। প্রিয় তারকার ছবি দেখে ‍উচ্ছ্বসিত তারা। কারো গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি, কেউ আবার ব্রাজিলের পতাকা কাঁধে জড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফুটবলপ্রেমের এই উৎসব মুছে দিয়েছে বয়সের অদৃশ্য সীমারেখা।

স্থানীয়দের মতে, এই আয়োজন এখন শুধু একটি বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি পুরো গ্রামের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। দলভেদে সমর্থন থাকলেও সবাই আনন্দ ভাগাভাগি করছে। সন্ধ্যা নামলেই চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাড়ির উঠোন- সবখানে জমে উঠছে বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা।

গ্রামবাসী বলছে, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে,কিন্তু এই আয়োজনের স্মৃতি দীর্ঘদিন ধরে বেঁচে থাকবে মানুষের মনে। কারণ এটি শুধু ফুটবল নয়, মানুষের ভালোবাসা, ঐক্য আর উৎসবপ্রিয়তারও এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

স্থানীয় বাসিন্দা সিজার জিকরুল বলেন, 'বিশ্বকাপ এলেই আমাদের গ্রামে আলাদা আনন্দ শুরু হয়। কিন্তু এবার যে সাজসজ্জা করা হয়েছে, তা আগের সব আয়োজনকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ আসছে, গ্রামের পরিচিতিও বাড়ছে।'

দর্শনার্থী ফরহাদ হোসেন বলেন, 'ফেসবুকে ছবি দেখে এসেছি। এখানে এসে মনে হচ্ছে কোনো বিদেশি ফ্যান জোনে চলে এসেছি। গ্রামের মধ্যে এমন আয়োজন সত্যিই অসাধারণ।'

স্থানীয় তরুণ শাওন শ্রাবণ বলেন, 'আমরা চাই বিশ্বকাপের আনন্দ  শুধু টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। তাই সবাই মিলে এই আয়োজন করেছি। দর্শনার্থীদের ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।'

মনোহরপুর গ্রামের বাসিন্দা হোসেন বলেন, 'বিশ্বকাপের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার লক্ষ্য থেকেই এই আয়োজন। নিজেদের উদ্যোগে কয়েক সপ্তাহ ধরে বাড়ি ও আশপাশের এলাকা সাজিয়েছি। উদ্দেশ্য ছিল গ্রামে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করা এবং নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি উৎসাহিত করা।'

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে স্পষ্ট রোডম্যাপের দাবি নাগরিক সমাজের

নিজস্ব প্রতিবেদক
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে স্পষ্ট রোডম্যাপের দাবি নাগরিক সমাজের
ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন কক্সবাজারের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় স্থানীয় এনজিওগুলোর অংশীদারি বাড়িয়ে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

রবিবার (২১ জুন) কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে আয়োজিত সেমিনারে এ দাবি জানানো হয়। ‘কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম’ (সিসিএনএফ) এবং ‘কোস্ট ফাউন্ডেশন’ যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. ইকবাল উদ্দিন। তিনি বলেন, কক্সবাজারভিত্তিক এবং স্থানীয় জনগণের নেতৃত্বে পরিচালিত সংগঠনগুলোকে রোহিঙ্গা মানবিক কার্যক্রমে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এর পাশাপাশি তিনি স্থানীয় এনজিওর সংজ্ঞা পুনর্র্নিধারণ এবং জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও আরআরআরসির অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৬ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংকটের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার পরিমাণ ক্রমেই কমে আসছে।

চলতি ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (জেআরপি) আওতায় কক্সবাজার ও ভাসানচরে অবস্থানরত রোহিঙ্গা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু জুনের বর্তমান সময় পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র ৩৬৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার, যা মোট চাহিদার অর্ধেকেরও কম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের অভিবাসনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। শরণার্থী শিবিরের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি এর বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের প্রধান ডেভিড বাগডেন সংকটকালীন মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান। তবে সংকট সমাধানে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভূমিকার ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি।

অন্যদিকে, ইউএনএইচসিআরের স্ট্র্যাটেজিক ওভারসাইট সার্ভিসের প্রধান মার্সেল গ্রোগান নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও শরণার্থীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান।

মুক্ত আলোচনায় বক্তারা শরণার্থী শিবিরের পরিবেশ পুনরুদ্ধার, নিরাপত্তা জোরদার, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানান।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় এনজিওগুলোকে উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বক্তারা। তারা বলেন, জাতিসংঘের ঘোষিত ‘হিউম্যানিটারিয়ান রিসেট’ নীতিতে স্থানীয় নেতৃত্বাধীন মানবিক কার্যক্রম ও সরাসরি তহবিল বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

সংকট উত্তরণে বক্তারা একটি নতুন ‘জয়েন্ট রিপ্যাট্রিয়েশন প্ল্যান (জেআরপি ২.০)’ প্রণয়নের প্রস্তাব দেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, এই নতুন পরিকল্পনাটি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করবে।