পরিবার একটি সমাজের ভিত্তি, আর দাম্পত্য জীবন সেই ভিত্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও আন্তরিকতার ওপরই নির্ভর করে একটি পরিবারের সুখ-শান্তি। আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেক পরিবারে ভুল বোঝাবুঝি, মানসিক দূরত্ব ও সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা যায়। অথচ মহানবী (সা.) প্রায় দেড় হাজার বছর আগেই এমন এক আদর্শ দাম্পত্য জীবনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, যা আজও সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুসরণীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)
এই একটি হাদিসই একজন আদর্শ স্বামীর পরিচয় তুলে ধরতে যথেষ্ট। তারপরও স্ত্রীদের মনরক্ষায় মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো। যদিও নিম্মুক্ত বিষয়গুলোতে বিশেষভাবে স্ত্রীদের কথা বলা হয়েছে। তবে সুখময় দাম্পত্য জীবনে উভয়কেই এসব বিষয়ে যত্নবান হতে হবে।
১. স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করা
অনেকেই মনে করেন, ঘরের কাজ শুধু নারীর দায়িত্ব। কিন্তু মহানবী (সা.) নিজেই এই ধারণার বিপরীত শিক্ষা দিয়েছেন। রাষ্ট্র পরিচালনা, দাওয়াত, বিচার এবং ইবাদতের মতো অসংখ্য দায়িত্ব পালন করেও তিনি পরিবারের কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মহানবী (সা.) ঘরে কী করতেন? তিনি বলেন, ‘তিনি পরিবারের কাজকর্মে সাহায্য করতেন। আর নামাজের সময় হলে নামাজে চলে যেতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৭৬)
এ থেকেই বোঝা যায়, পরিবারের কাজে সহযোগিতা করা নববী সুন্নত।
২. স্ত্রীর প্রশংসা করা
প্রশংসা মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে। মহানবী (সা.) তাঁর স্ত্রীদের গুণাবলির প্রশংসা করতেন এবং তাদের মর্যাদা তুলে ধরতেন। তিনি বলেন, ‘নারীদের মধ্যে মরিয়ম ও ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া পূর্ণতা অর্জন করেছেন। আর সকল নারীর ওপর আয়েশার মর্যাদা এমন, যেমন সব খাবারের ওপর সারীদের মর্যাদা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪১১)
এ শিক্ষা দেয় যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে মজবুত করতে আন্তরিক প্রশংসার বিকল্প নেই।
৩. স্ত্রীকে নিজের হাতে খাবার খাওয়ানো
ইসলামে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। স্ত্রীকে নিজের হাতে খাবার তুলে দেওয়াকে সওয়াবের কাজ বলা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে ব্যয় করবে, তার প্রতিদান পাবে; এমনকি স্ত্রীকে যে এক লোকমা খাবার মুখে তুলে দেবে, তারও সওয়াব পাবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬২৮)
তিনি স্ত্রীদের ব্যবহৃত পাত্র থেকেই পানি পান করতেন, যা ছিল গভীর ভালোবাসার এক অনন্য প্রকাশ।
৪. স্ত্রী ও সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া
দাম্পত্য জীবনে শুধু আর্থিক দায়িত্ব পালন করাই যথেষ্ট নয়; মানসিক উপস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উকবা ইবনে আমির (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি মহানবী (সা.)-কে মুক্তির পথ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘তোমার জিহ্বাকে সংযত রাখো, তোমার ঘর যেন তোমার জন্য প্রশস্ত হয় (অর্থাৎ পরিবারের সঙ্গে বেশি সময় কাটাও) এবং নিজের গুনাহের জন্য কাঁদো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৪০৬)
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে এই শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
৫. ভালোবেসে সুন্দর নামে ডাকা
ভালোবাসার ভাষা কখনো কঠোর হতে পারে না। মহানবী (সা.) স্ত্রীদের আদর করে সুন্দর নামে ডাকতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) আমাকে কখনো ‘হুমাইরা’ (লালিমাময়) বলে সম্বোধন করতেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৭৪)
এতে দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও মানসিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
৬. স্ত্রীর সঙ্গে ভালোবাসা ও রোমান্টিক আচরণ
মহানবী (সা.)-এর দাম্পত্য জীবন ছিল ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সৌন্দর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি যে স্থানে মুখ রেখে পানি পান করতাম, মহানবী (সা.) ঠিক সেই স্থানেই মুখ রেখে পানি পান করতেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০)
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।
৭. স্ত্রীকে নিয়ে ভ্রমণে যাওয়া
দাম্পত্য সম্পর্কে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে একসঙ্গে সময় কাটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘সফরে যাওয়ার সময় মহানবী (সা.) স্ত্রীদের মধ্যে লটারির ব্যবস্থা করতেন; যার নাম উঠত, তাকেই সঙ্গে নিয়ে যেতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৯৩)
এতে বোঝা যায়, স্ত্রীকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া সময়ের অপচয় নয়; বরং সম্পর্ককে গভীর করার একটি সুন্দর মাধ্যম।
৮. ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ
ইসলাম কখনো স্বামী-স্ত্রীর বৈধ ভালোবাসাকে নিরুৎসাহিত করেনি। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘একবার মহানবী (সা.) তাঁর এক স্ত্রীকে চুম্বন করলেন, তারপর নামাজের জন্য বের হলেন; নতুন করে ওজু করলেন না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৫০২)
এ হাদিস প্রমাণ করে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয়।
আজকের পৃথিবীতে পারিবারিক অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ এবং মানসিক দূরত্বের অন্যতম কারণ হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সময় ও ভালোবাসার অভাব। অথচ মহানবী (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়—একজন আদর্শ স্বামী কখনো কর্তৃত্বপরায়ণ হন না; বরং তিনি হন সহযোগী, সহানুভূতিশীল, দয়ালু এবং ভালোবাসাপূর্ণ। তিনি স্ত্রীদের সম্মান দিয়েছেন, তাদের অনুভূতির মূল্য দিয়েছেন, পরিবারের কাজে অংশ নিয়েছেন, প্রশংসা করেছেন, সময় দিয়েছেন এবং ভালোবাসা প্রকাশে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেননি। তাই সুখী, শান্তিময় ও বরকতময় দাম্পত্য জীবন গড়তে চাইলে আমাদের প্রত্যেকের উচিত মহানবী (সা.)-এর এই মহান আদর্শকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। কারণ তাঁর দেখানো পথেই রয়েছে পারিবারিক শান্তি, পারস্পরিক ভালোবাসা এবং দুনিয়া-আখিরাতের প্রকৃত সফলতা।