মহানবী (সা.)-এর সাহাবিদের আল্লাহ শেষ নবীর উত্তরসূরি এবং দ্বিন ও শরিয়তের বাহক ও প্রচারক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁরাও তাঁদের জীবনকে দ্বিন ইসলামের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ঈমান, ইখলাস, সততা ও পরহেজগারির প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করেছেন। তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।’ (সুরা : হুজরা, আয়াত : ৩)
দ্বিনের জন্য ত্যাগ, বিসর্জন ও জীবনদানে নারী সাহাবিরা পুরুষদের থেকে পিছিয়ে ছিলেন না, বরং তাঁরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। যেমন—ইসলামের জন্য প্রথম শাহাদাতবরণ করেন সুমাইয়া (রা.)। নারীদের এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিও দিয়েছে ইসলাম।
সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ নারী সাহাবি
কমপক্ষে ২০ নারী সাহাবি দুনিয়ায় জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছিলেন। যাঁদের ভেতর ১০ জনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো—
১. খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) : তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের মা। নারী-পুরুষ সবার ভেতর তিনিই সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন। যখন সবাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছে তিনি তাঁর জীবন, ভালোবাসা ও সম্পদ দ্বারা পাশে থেকেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, জিবরাইল (আ.) নবী (সা.)-এর কাছে হাজির হয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এই যে খাদিজা, একটি পাত্র হাতে নিয়ে আসছেন। এই পাত্রে তরকারি অথবা খাদ্যদ্রব্য অথবা পানীয় ছিল। যখন তিনি পৌঁছে যাবেন তখন তাঁকে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম জানাবেন আর তাঁকে জান্নাতের এমন একটি ভবনের সুসংবাদ দেবেন, যার অভ্যন্তর ভাগ ফাঁকা-মোতি দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে থাকবে না কোনো প্রকার শোরগোল; কোনো প্রকার দুঃখ-ক্লেশ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৮২০)
২. ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ (রা.) : তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অতি আদরের কন্যা এবং আলী (রা.)-এর স্ত্রী। হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর সম্মানিত মা। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, একবার ফাতিমা (রা.) নবীজি (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হন। নবীজি (সা.) তাঁর কানে কানে কিছু কথা বলেন। এতে তিনি প্রথমে কাঁদেন এবং পরে হাসেন। আয়েশা (রা.) কারণ জানতে চাইলে তিনি রহস্য প্রকাশ করতে অপারগতা পেশ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি সেদিনের হাসি ও কান্নার কারণ জানান। তিনি বলেন, ‘তিনি প্রথমবার আমাকে বলেছিলেন, জিবরাইল (আ.) প্রতিবছর একবার আমার সঙ্গে কোরআন পাঠ করতেন, এই বছর দুইবার পড়ে শুনিয়েছেন। আমার মনে হয় আমার বিদায়ের সময় উপস্থিত এবং অতঃপর আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে। তা শুনে আমি কেঁদে দিলাম। এরপর বলেছিলেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে জান্নাতবাসী নারীদের অথবা মুমিন নারীদের তুমি সরদার হবে? এ কথা শুনে আমি হেসেছিলাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬২৩)
৩. আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.) : তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন। তাঁর পিতা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। নবীজি (সা.) স্ত্রীদের ভেতর তাঁকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন এবং তাঁর ঘরেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল হয়। নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পর নববী জ্ঞানের প্রসারে তিনি অসামান্য অবদান রাখেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নিশ্চয়ই জিবরাইল (আ.) সবুজ রঙের এক টুকরা রেশমি কাপড়ে তাঁর প্রতিচ্ছবি নিয়ে আসেন এবং বলেন, ইনি দুনিয়া ও আখিরাতে আপনার স্ত্রী। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৮০)
এই হাদিসে যদিও আয়েশা (রা.)-কে সরাসরি জান্নাতি বলা হয়নি, কিন্তু জান্নাতি না হলে পরকালে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রী হওয়া সম্ভব নয়।
৪. হাফসা বিনতে উমর (রা.) : তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রী, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কন্যা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ইবাদতগুজার নারী। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে (এক) তালাক দেন। তখন তাঁর কাছে জিবরাইল (আ.) এসে বলেন, হে মুহাম্মদ! আপনি হাফসাকে তালাক দিয়েছেন, অথচ তিনি অধিক পরিমাণে রোজা ও নামাজ আদায়কারী। তিনি জান্নাতে আপনার স্ত্রী। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ফিরিয়ে নেন।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস : ৬৭৯০)
৫. সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত (রা.) : তিনি ছিলেন অগ্রগামী একজন নারী। ইসলাম গ্রহণের কারণে মক্কার মুশরিকরা তাঁকে, তাঁর ছেলে আম্মার (রা.) ও তাঁর স্বামী ইয়াসার (রা.)-এর ওপর অকথ্য নির্যাতন করে। আবু জাহাল তাঁর লজ্জাস্থানে বর্শা নিক্ষেপ করলে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। তিনিই ছিলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। উসমান ইবনে আফফান (রা.) বলেন, আমি আবু আম্মার, উম্মে আম্মার ও আম্মার (রা.)-এর উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘হে ইয়াসার পরিবার! ধৈর্য ধারণ করো। তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান জান্নাত।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস : ৫৬২০)
৬. উম্মে জুফারা (রা.) : এই নারী সাহাবি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। তিনি ছিলেন একজন দীর্ঘদেহী কৃঞ্চাঙ্গ নারী। তিনি মৃগী রোগে আক্রান্ত ছিলেন। আতা ইবনু আবু রাবাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতি নারী দেখাব না? আমি বললাম, অবশ্যই। তখন তিনি বললেন, এই কালো রঙের নারী, সে নবী (সা.)-এর কাছে এসেছিল। সে বলল, আমি মৃগী রোগে আক্রান্ত হই এবং তখন আমার লজ্জাস্থান খুলে যায়। সুতরাং আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। নবী (সা.) বললেন, তুমি যদি চাও ধৈর্যধারণ করতে পারো। তোমার জন্য আছে জান্নাত। আর তুমি যদি চাও, তাহলে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন তোমাকে আরোগ্য করেন। স্ত্রী লোকটি বলল, আমি ধৈর্যধারণ করব। সে বলল, তখন আমার লজ্জাস্থান খুলে যায়, কাজেই আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমার লজ্জাস্থান খুলে না যায়। নবী (সা.) তাঁর জন্য দোয়া করলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৬৫২)
৭. উম্মে সুলাইম রুমাইসা বিনতে মিলহান (রা.) : তিনি ছিলেন আনাস (রা.)-এর মা, তাঁকে গুমাইসাও বলা হতো। আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম। সেখানে কারো চলার শব্দ পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইনি কে? তারা বলল, গুমাইসা বিনতে মিলহান, আনাস বিন মালিকের মা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬০৯৮)
৮. উম্মে হারাম বিন মিলহান (রা.) : তিনি ছিলেন উম্মে সুলাইম (রা.)-এর বোন, আনাস (রা.)-এর খালা এবং উবাদা বিন সামিত (রা.)-এর স্ত্রী। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর শাহাদাতের জন্য দোয়া করেছিলেন এবং বাস্তবেও তিনি জিহাদ থেকে ফেরার সময় শহীদ হন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬২৮২)
আর শহীদের জন্য জান্নাত অবধারিত।
৯. ফাতেমা বিনতে আসাদ (রা.) : তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানিত চাচি ও আলী (রা.)-এর মা। তিনি ইন্তেকাল করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের কাপড় দিয়ে তাঁকে কাফন পরান, জানাজার নামাজের ইমামতি করেন এবং নিজ হাতে কবরে লাশ রাখেন। উমর (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি ছিলেন মায়ের পরে আমার মা। আমি আমার কাপড় দিয়ে তাঁকে কাফন পরিয়েছি, যেন তাঁকে জান্নাতের কাপড় পরিধান করানো হয়। জিবরাইল (আ.) আমার রবের পক্ষ থেকে আমাকে জানিয়েছেন, তিনি জান্নাতি। (আল মুস্তাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস : ৪৬৩১; আল মাফহুমুস সহিহ লিত-তাওয়াসসুল, পৃষ্ঠা : ৪৬)
১০. উম্মে রোমান বিনতে আমের (রা.) : তিনি ছিলেন আয়েশা (রা.)-এর সম্মানিত মা। তিনি ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী সাহাবিদের একজন ছিলেন। তাঁকে যখন কবরে রাখা হয়, তখন নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি একজন জান্নাতি হুর দেখে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন উম্মে রোমানকে দেখে।’ (তাবাকাতুল কুবরা, হাদিস : ১০৭১৩)
আল্লাহ আমাদেরও জান্নাতের অধিবাসী করুন। আমিন।