ইসলাম মানুষের ইবাদতের পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্ককেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই একজন মুসলমান তার উত্তম চরিত্র, সুন্দর আচরণ, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং অন্য মুসলমানের সম্মান রক্ষার মাধ্যমেও মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে অনেক সময় মানুষ না বুঝেই অন্যকে উপহাস করে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, দোষ খুঁজে বেড়ায় কিংবা অপমানজনক নামে ডাকে। অথচ এগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ। পবিত্র কোরআনের সুরা হুজরাতে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতিমালা প্রদান করেছেন।
মুমিনের জন্য পরস্পর উঠাবসায় তিনটি কাজ হারাম
১. অন্যকে উপহাস করা হারাম
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদাররা! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে, তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, উপহাস হলো এমনভাবে কারো দোষ, দুর্বলতা বা ত্রুটি তুলে ধরা, যাতে অন্যরা হাসাহাসি করে এবং তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে। এটি কুরআনের ভাষায় স্পষ্ট হারাম। আজ অনেকেই কারো চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা বা শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে হাসাহাসি করে। অথচ আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা তার তাকওয়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, বাহ্যিক রূপ বা সম্পদের ভিত্তিতে নয়।
২. অন্যের দোষ তালাশ ও দোষারোপ করা হারাম
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)
অর্থাৎ অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো, তাকে অপমান করা বা তার দুর্বলতা প্রকাশ করা একজন মুসলমানের কাজ নয়। তাফসিরে মাআরিফুল কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষ যখন অন্যের দোষ প্রকাশ করে, তখন অপর পক্ষও তার দোষ প্রকাশ করে। কারণ দোষ থেকে কোনো মানুষই সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। তাই মুসলমানের কর্তব্য হলো অন্যের দোষ গোপন রাখা, সংশোধনের চেষ্টা করা এবং নিজের দোষ সংশোধনে ব্যস্ত থাকা।
৩. অপমানজনক নামে ডাকা হারাম
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)
কাউকে খোঁড়া, কানা, অন্ধ, কালা, বোবা কিংবা তার অপছন্দনীয় কোনো নামে সম্বোধন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন গুনাহ দ্বারা লজ্জা দেয়, যা থেকে সে তাওবা করেছে, আল্লাহ তাকে সেই গুনাহে লিপ্ত করে ইহকাল ও পরকালে অপমানিত করবেন।’ (তাফসিরে কুরতুবি)
এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের অতীত গুনাহ বা দুর্বলতা নিয়ে তাকে অপমান করা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ।
আমাদের করণীয় হলো-
১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রতিটি মুসলমানকে সম্মান করা।
২. কাউকে উপহাস না করা।
৩. কারো দোষ খুঁজে বেড়ানোর বদলে নিজের সংশোধনে মনোযোগী হওয়া।
৪. কাউকে কষ্ট দেয় এমন নামে না ডাকা।
৫. গীবত, অপবাদ ও কটু ভাষা বর্জন করা।
৬. মুসলিম ভাই-বোনের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা।
৭. বিপদে-আপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো।
৮. হিংসা ও বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা ও ক্ষমাশীলতার মনোভাব গড়ে তোলা।
আমরা যদি উপহাস, দোষারোপ ও অপমানজনক নামে ডাকা থেকে বিরত থাকি, তবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রত্যেক মুসলমান যদি অপর মুসলমানের সম্মানকে নিজের সম্মানের মতো রক্ষা করে, তবে উম্মাহর ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে এবং আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হবে। ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার, মুসলিম ভাই-বোনদের সম্মান রক্ষা করার এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।




