• ই-পেপার

মৃত্যুর পরও সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে সওয়াব লাভের ১০ উপায়

বিকাশ/রকেট/নগদ-এর মাধ্যমে লেনদেন ও এজেন্ট ব্যবসা কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
বিকাশ/রকেট/নগদ-এর মাধ্যমে লেনদেন ও এজেন্ট ব্যবসা কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে অর্থ লেনদেনের পদ্ধতিতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এক সময় টাকা পাঠানোর জন্য ব্যাংক বা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে হলেও আজ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদির মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টাকা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—এসব মাধ্যমে টাকা লেনদেন করা কি শরীয়তসম্মত? এজেন্ট বা দোকান পরিচালনা করে যে কমিশন পাওয়া যায়, তা কি হালাল? এতে কোনো সুদ বা হারাম উপাদান জড়িত আছে কি না?

ইসলাম মানুষের জীবনকে সহজ ও কল্যাণময় করার জন্য বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুমতি দিয়েছে এবং সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তাই এ বিষয়ে শরীয়তের মূলনীতি জানা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
অতএব, কোনো লেনদেন বৈধ না অবৈধ হবে, তা নির্ভর করে সেখানে সুদ, প্রতারণা বা হারাম কোনো উপাদান আছে কি না তার ওপর।

বিকাশ/নগদ/রকেটে টাকা লেনদেন কি সুদের অন্তর্ভুক্ত?
সাধারণভাবে বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট বা বিল পরিশোধ করা সুদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এখানে মূলত একটি সেবা (Service) প্রদান করা হচ্ছে এবং সেই সেবার বিনিময়ে নির্ধারিত ফি নেওয়া হচ্ছে। যেমন, একজন ব্যক্তি ঢাকায় টাকা জমা দিলেন, আর অন্যজন চট্টগ্রামে সেই টাকা উত্তোলন করলেন। এখানে কোম্পানি একটি অর্থ স্থানান্তর সেবা প্রদান করছে। এটি সুদ নয়; বরং বৈধ সেবামূলক লেনদেন। ইসলামী ফিকহে এ ধরনের লেনদেনকে হাওয়ালা (حوالة) বা অর্থ স্থানান্তরের একটি বৈধ পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

বিখ্যাত ফিকহগ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, ‘এক ব্যক্তি অন্য শহরে অবস্থানরত বন্ধুর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একজন ব্যবসায়ীর কাছে অর্থ প্রদান করে এবং ব্যবসায়ী তা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে সেখানে সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করে। এটি বৈধ।’ (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাওয়ালা, ৮/১৭)
অর্থাৎ নিরাপদে অর্থ স্থানান্তরের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা শরীয়তে স্বীকৃত।

এজেন্ট বা বিকাশের দোকান দিয়ে আয় করা কি জায়েজ?
যদি একজন ব্যক্তি বিকাশ, নগদ বা রকেটের অনুমোদিত এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন এবং কোম্পানির নির্ধারিত কমিশন গ্রহণ করেন, তাহলে সেই আয় বৈধ ও হালাল হবে। কারণ তিনি প্রকৃতপক্ষে একটি বৈধ সেবা প্রদান করছেন। তিনি গ্রাহকের টাকা গ্রহণ করছেন, উত্তোলনের ব্যবস্থা করছেন এবং বিনিময়ে কমিশন পাচ্ছেন। এটি ব্যবসা ও সেবার পারিশ্রমিক, সুদ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে তা বৈধ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

এখানে গ্রাহক ও সেবাদাতার উভয়ের সম্মতিতে সেবা প্রদান করা হচ্ছে, তাই কমিশন গ্রহণ বৈধ।

কখন সতর্ক থাকতে হবে?
যদিও সাধারণ লেনদেন ও এজেন্ট ব্যবসা জায়েজ, তবুও কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন—

১. সুদভিত্তিক স্কিমে অংশ না নেওয়া
যদি কোনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে সুদভিত্তিক সঞ্চয়, ঋণ বা বিনিয়োগ স্কিম যুক্ত থাকে, তাহলে সেগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর সাক্ষীদের ওপর অভিশাপ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৯৮)

২. প্রতারণা ও জালিয়াতি থেকে দূরে থাকা
এজেন্ট ব্যবসায় গ্রাহকের অর্থের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সততা বজায় রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০২)

৩. অবৈধ লেনদেনে সহযোগিতা না করা
যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে কোনো লেনদেন হারাম কাজে ব্যবহৃত হবে, তাহলে তাতে সহযোগিতা করা বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর না।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)

ইসলামের দৃষ্টিতে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা
ডিজিটাল অর্থ লেনদেন মানুষের সময়, শ্রম ও ঝুঁকি কমিয়ে দিয়েছে। নিরাপদে অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধ এবং আর্থিক সেবার সহজলভ্যতা মানুষের জন্য কল্যাণকর। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, ‘লেনদেনের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো বৈধতা, যতক্ষণ না হারাম হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়।’ সুতরাং যেসব ডিজিটাল লেনদেনে সুদ, জুয়া, প্রতারণা বা অন্য কোনো শরীয়তবিরোধী উপাদান নেই, সেগুলো বৈধ বলে গণ্য হবে।

অতএব, বিকাশ, নগদ, রকেটসহ অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে সাধারণ অর্থ লেনদেন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ। কারণ এটি সুদভিত্তিক লেনদেন নয়; বরং অর্থ স্থানান্তর ও আর্থিক সেবার বিনিময়ে ফি গ্রহণের একটি বৈধ ব্যবস্থা। একইভাবে অনুমোদিত এজেন্ট হিসেবে দোকান পরিচালনা করে কমিশনভিত্তিক আয় করাও বৈধ ও হালাল। তবে একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো সবসময় সুদ, প্রতারণা, জালিয়াতি এবং হারাম কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে রাখা। ব্যবসার প্রতিটি ক্ষেত্রে সততা, আমানতদারিতা ও আল্লাহভীতিকে প্রাধান্য দিলে তার উপার্জন হবে বরকতময় এবং আখিরাতেও কল্যাণের কারণ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন, হারাম ও সন্দেহজনক বিষয় থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের রিজিকে বরকত দান করুন। আমিন।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক 

হাদিসের বাণী

মহানবী (সা.) এর সাদাসিধে জীবন-যাপন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মহানবী (সা.) এর সাদাসিধে জীবন-যাপন
সংগৃহীত ছবি

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)- থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মহানবী (সা.) একটি চাটাইয়ের উপর ঘুমিয়েছিলেন। তারপর যখন উঠলেন, তখন দেখা গেল তার শরীরে চাটাইয়ের দাগ পড়ে আছে। আমরা বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার জন্য একটি নরম বিছানার ব্যবস্থা করে দিই? জবাবে মহানবী (সা.) বললেন, দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? দুনিয়াতে আমি তো সেই সাওয়ারি-মুসাফিরের মতো, যে ক্লান্ত হয়ে একটু গাছের ছায়ার নিচে বিশ্রাম নেয়, তারপর গাছ ছেড়ে আবার চলে যায়। (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩৭৭)

হাদিসের শিক্ষা
১. দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আখিরাত চিরস্থায়ী। তাইতো মহানবী (সা.) দুনিয়াকে একটি গাছের ছায়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন একজন পথিক কিছুক্ষণ ছায়ায় বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে, তেমনি মানুষের দুনিয়ার জীবনও খুবই অল্প সময়ের। প্রকৃত আবাস হলো আখিরাত।

২. দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মগ্ন হওয়া উচিত নয়। মহানবী (সা.) চাইলে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সাধারণ জীবন বেছে নিয়েছিলেন। এজন্য দুনিয়ার প্রয়োজনীয় জিনিস গ্রহণ করা বৈধ, তবে ভোগ-বিলাসকে জীবনের লক্ষ্য বানানো উচিত নয়।

৩. সরল ও সাদাসিধে জীবন উত্তম। মহানবী (সা.)-এর শরীরে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গিয়েছিল, তবুও তিনি আরাম-আয়েশের প্রতি আগ্রহ দেখাননি। এটি তাঁর দুনিয়াবিমুখতা ও বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

৪. একজন মুমিন নিজেকে মুসাফির মনে করবে। মহানবী (সা.)-এর ভাষায়, মুমিন এই পৃথিবীতে একজন যাত্রী। তাই তার চিন্তা হবে— আমি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাব এবং সফরের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছি?

৫. আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। যাত্রী যেমন গন্তব্যের জন্য রসদ সংগ্রহ করে, তেমনি একজন মুমিনেরও নেক আমল, তাকওয়া ও ইবাদতের মাধ্যমে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করা উচিত।

৬. মৃত্যু ও আখিরাতকে স্মরণ রাখা উচিত। গাছের ছায়া ছেড়ে যেমন পথিক চলে যায়, তেমনি একদিন মানুষকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাই মৃত্যু ও হিসাব-নিকাশের দিনের কথা স্মরণ করে জীবন পরিচালনা করা উচিত।

আল্লাহর রহমত লাভের বিশেষ দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আল্লাহর রহমত লাভের বিশেষ দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আল্লাহ তাআলার রহমত। কারণ আল্লাহর রহমত ছাড়া কোনো মানুষ দুনিয়ায় প্রকৃত সফলতা লাভ করতে পারে না, আর আখিরাতে নাজাত পাওয়াও সম্ভব নয়। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত আল্লাহর অশেষ রহমত ও অনুগ্রহ লাভ করা। আর হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর রহমত লাভের বিশেষ একটি দোয়া হলো—

اللَّهُمَّ رَحْمَتَكَ أَرْجُو فَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ، وَأَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা রাহমাতাকা আরজু ফালা তাকিলনী ইলা নাফসি তরফাতা আইন, ওয়া আসলিহ লি শানি কুল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লা আনতা।

অর্থ : হে আল্লাহ, তোমার রহমতেরই আশা রাখি। অতএব, তুমি আমাকে পলকের জন্যও আমার নিজের ওপর সোপর্দ করে দিও না এবং আমার সব অবস্থাকে সংশোধিত করে দাও। তুমি ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৯০, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২০৪৩০)

নবী-রাসুলরা সর্বদা আল্লাহর রহমতের জন্য দোয়া করতেন। কোরআনে তাঁদের অনেক দোয়া বর্ণিত হয়েছে, যা আজও মুমিনদের জন্য রহমত, বরকত ও কল্যাণ লাভের উত্তম মাধ্যম। তাই আমাদের উচিত বেশি বেশি আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করা, তাঁর ক্ষমা কামনা করা এবং এমন দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করা, যা কোরআন ও হাদিসে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাই আসুন, আমরা এমন একটি বিশেষ দোয়া সম্পর্কে জানি, যা আল্লাহর রহমত লাভ, গুনাহ মাফ এবং দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ অর্জনের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

ভূমিকম্প সম্পর্কে ইসলামের সতর্কবার্তা

মুফতি ওমর বিন নাছির
ভূমিকম্প সম্পর্কে ইসলামের সতর্কবার্তা
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীতে মানুষের জীবন নানা নিয়ামত ও পরীক্ষার সমন্বয়ে গঠিত। কখনো প্রকৃতি তার সৌন্দর্য দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করে, আবার কখনো তার ভয়ংকর রূপ মানুষের হৃদয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অগ্নিকাণ্ড এবং ভূমিকম্প—এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ভূমিকম্প অন্যতম ভয়াবহ। মুহূর্তের মধ্যে এটি সুদৃঢ় অট্টালিকাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, জনপদকে পরিণত করতে পারে ধ্বংসস্তূপে এবং মানুষের মনে সৃষ্টি করতে পারে অসহায়ত্বের গভীর অনুভূতি।

আধুনিক বিজ্ঞান ভূমিকম্পের ভৌত কারণ হিসেবে ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া ও ভূত্বকের চাপকে চিহ্নিত করে। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিতে প্রতিটি ঘটনার পেছনে আল্লাহ তাআলার হিকমত ও নির্দেশনা রয়েছে। কোরআন ও হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, পৃথিবীর বিভিন্ন বিপর্যয় মানুষের জন্য শিক্ষা, সতর্কবার্তা, পরীক্ষা এবং কখনো কখনো অবাধ্যতার পরিণতির স্মারক। তাই ভূমিকম্পকে শুধু একটি ভূতাত্ত্বিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আত্মসমালোচনা, তাওবা ও আল্লাহমুখী হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা উচিত।

ভূমিকম্প সম্পর্কে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
পবিত্র কোরআনে বহু স্থানে ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানুষের গাফেলতিকে সতর্ক করে বলেন, ‘জনপদের অধিবাসীরা কি এতই নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আমার আজাব রাতারাতি তাদের কাছে এসে পড়বে না, যখন তারা ঘুমিয়ে থাকবে?’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯৭)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল; তবে আল্লাহ অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩০)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের পাপ ও অবাধ্যতা অনেক সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। তবে আল্লাহর রহমত এত ব্যাপক যে তিনি অসংখ্য অপরাধ ক্ষমা করে দেন।

কোরআনে ভূমিকম্পের পরিভাষা
কোরআনে ভূমিকম্প বোঝাতে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘জিলজাল’ এবং ‘দাক্কা’। জিলজাল অর্থ প্রচণ্ড কম্পন বা বারবার কেঁপে ওঠা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন পৃথিবী তার ভয়ংকর কম্পনে প্রকম্পিত হবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ১)

অন্যদিকে দাক্কা অর্থ প্রচণ্ড আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কখনো নয়! যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হবে।’ (সুরা : ফাজর, আয়াত : ২১)

ভূমিকম্প : কিয়ামতের একটি নিদর্শন
কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামত যত ঘনিয়ে আসবে, ভূমিকম্পের সংখ্যা তত বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। নিশ্চয়ই কিয়ামতের ভূকম্পন এক ভয়াবহ বিষয়।’ (সুরা : হাজ্জ, আয়াত : ১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না ভূমিকম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৩৬)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, ঘন ঘন ভূমিকম্প কিয়ামতের নিকটবর্তী হওয়ার অন্যতম আলামত।

পাপাচার ও ভূমিকম্প : হাদিসের সতর্কবার্তা
রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে যখন গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র এবং মদপানের প্রসার ঘটবে, তখন তাদের ওপর ভূমিধস, বিকৃতি এবং পাথর বর্ষণ হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২২১২)
অন্য এক হাদিসে বিভিন্ন সামাজিক অনাচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—আমানতের খিয়ানত, অবৈধ সম্পদ অর্জন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, অযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। (তিরমিজি, হাদিস : ১৪৪৭, অর্থগত বর্ণনা)

তবে মনে রাখতে হবে, নির্দিষ্ট কোনো ভূমিকম্প কোনো পাপের কারণে ঘটেছে—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহই এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত। কিন্তু এসব ঘটনা মানুষের জন্য সতর্কবার্তা ও আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

ইতিহাসে ভূমিকম্পের মাধ্যমে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, অতীতের বহু অবাধ্য জাতি আল্লাহর শাস্তির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষত সামূদ জাতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তাদেরকে ভূকম্পন আঘাত করল, ফলে তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৭৮)

ভূমিকম্পের সময় একজন মুমিনের করণীয়
ভূমিকম্প বা অন্য কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে একজন মুমিনের প্রথম কাজ হলো আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।
১. তাওবা ও ইস্তিগফার করা

বেশি বেশি পড়া—

أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করি।’

২. দোয়া ও জিকির করা
আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা, রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।

৩. সালাত আদায় করা
বিপদের সময় নফল সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা।

৪. আত্মসমালোচনা করা
নিজের গুনাহ, অবহেলা ও দায়িত্ব সম্পর্কে চিন্তা করা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা।

৫. অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ভূমিকম্প পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বৈজ্ঞানিকভাবে এর কারণ ভূগর্ভস্থ প্লেটের নড়াচড়া হলেও একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছুই সংঘটিত হয় না। তাই প্রতিবার পৃথিবী কেঁপে উঠলে আমাদের মনে রাখা উচিত—একদিন এমন এক মহাভূমিকম্প আসবে, যা হবে কিয়ামতের সূচনা। সেদিন কোনো শক্তি, সম্পদ বা ক্ষমতা মানুষকে রক্ষা করতে পারবে না; রক্ষা করবে শুধুমাত্র ঈমান ও নেক আমল। তাই ভূমিকম্পকে শুধু আতঙ্কের কারণ হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর স্মরণে ফিরে যাওয়ার একটি জাগরণী বার্তা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল প্রকার বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত করুন, তাওবার জীবন দান করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ নসিব করুন। আমিন।