• ই-পেপার

হাদিসের বাণী

দান যেভাবে জীবনে প্রশস্ততা বয়ে আনে

ইসলামে হাজিদের অভ্যর্থনা জানানোর বিধান

আতাউর রহমান খসরু
ইসলামে হাজিদের অভ্যর্থনা জানানোর বিধান

নিঃসন্দেহে হজ পরম সৌভাগ্যের বিষয়। প্রতিটি মুসলমান এই সৌভাগ্য অর্জন করতে চায়। মুসলিম সমাজের একটি ঐতিহ্য হলো হাজিরা যখন হজের সৌভাগ্য অর্জন করে মাতৃভূমিতে ফেরে তখন তাঁদেরকে অভ্যর্থনা জানান। এর মাধ্যমে তাঁর অর্জন ও ফিরে আসার আনন্দ প্রকাশ করা হয়।

হাজিদের অভ্যর্থনা জানানোর বিধান

ফকিহরা বলেন, হাজিদের অভ্যর্থনা জানানো মুসলিম রীতির অন্তর্ভুক্ত, এটা ইবাদতের অংশ নয়। এটা এমন একটি রীতি, যা সরাসরি কোরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়, তবে একাধিক হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবীজি (সা.) এই বিষয়ে নিষেধ করেননি, যা বৈধতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

আল্লামা ইবনুল মুনির (রহ.) বলেন, ফিকহের দৃষ্টিতের হজ থেকে আগত মানুষকে অভ্যর্থনা জানানো বৈধ। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষয়টি অস্বীকার করেননি, বরং দুজন শিশুকে তাঁর অভ্যর্থনায় উপস্থিত করায় তিনি খুশি হয়েছেন এবং তাদের সামনে ও পেছনে বসিয়েছেন। (ইরশাদুস সারি : ৩/২৭৮)

ইমাম বুখারি (রহ.) সহিহ বুখারিতে একটি পরিচ্ছেদের শিরোনাম দিয়েছেন ‘হজ থেকে প্রত্যাবর্তনকারীদের স্বাগত জানান’, যা ইমাম বুখারি (রহ.)-এর কাছে বিষয়টি বৈধ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। (সহিহ বুখারি, হজ অধ্যায়)

নবীযুগে হাজিদের অভ্যর্থনা

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে হজ, ওমরাহ, যুদ্ধ বা অন্য কোনো সফর থেকে কোনো কাফেলা ফিরলে তাদের অভ্যর্থনা বা স্বাগত জানানো হতো। আয়েশা (রা.) বলেন, আমরা মক্কা থেকে হজ বা ওমরাহ করে ফিরলাম। আমাদেরকে দুজন আনসার বালক স্বাগত জানাল, তারা নিজ পরিবারের সদস্যরা সফর থেকে ফিরলে তাদের স্বাগত জানাত। (মুস্তাদরিকে হাকিম, হাদিস : ১৭৯৬)

আবদুল্লাহ বিন জাফর (রা.) বলেন, নবী (সা.) যখন সফর থেকে ফিরতেন, তখন তাঁর পরিবারের শিশুদের মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানানো হতো। তিনি এক সফর থেকে ফিরলে আমাকে সামনে এগিয়ে দেওয়া হলো। তিনি আমাকে (বাহনে) তাঁর সামনে বসিয়ে নিলেন। অতঃপর ফাতেমা (রা.)-এর দুই ছেলের কোনো এক ছেলেকে নিয়ে আসা হলো। নবী (সা.) তাঁকে নিজের পেছনে বসিয়ে দিলেন। অতঃপর আমরা তিনজন একটি বাহনে আরোহণ করে মদিনায় প্রবেশ করলাম। (মুসলিম, হাদিস : ২৪২৮)

কেন স্বাগত জানাব

হাজিরা আল্লাহর ঘর ও নিদর্শনগুলো প্রত্যক্ষকারী এবং পবিত্র রওজা জিয়ারতকারী, তাই তারা বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার দাবিদার। অভ্যর্থনা এই সম্মান প্রকাশের একটি মাধ্যম। এ ছাড়া হাজিরা দীর্ঘদিন পরিবার, কর্মস্থল ও মাতৃভূমি থেকে দূরে ছিল, তারা ফিরে আসায় আপনজনরা স্বভাবতই আনন্দিত হয়, তাদের অভ্যর্থনা ও আপ্যায়নের মাধ্যমে এই আনন্দ প্রকাশ পায়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ঘরে অবস্থানকারীরা যদি জানত তাদের ওপর হাজিদের কী অধিকার আছে, তবে হাজিরা আগমন করলে তারা তাদের বাহনগুলোকে চুম্বন করত। কেননা হাজিরা সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর প্রতিনিধিদল। (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ১৮১৫)

যেভাবে অভ্যর্থনা জানানো উচিত

হজ থেকে আসা হাজিদের অভ্যর্থনা ও স্বাগত জানাতে নিম্নোক্ত কাজগুলো করা উচিত।

১. এগিয়ে যাওয়া : হাজিদের অভ্যর্থনা জানাতে নিজ বাড়ি ও মহল্লা থেকে এগিয়ে যাওয়া বা জনপদের প্রবেশপথে অবস্থান করা উত্তম। কেননা নবীজি (সা.) জায়েদ বিন হারিসা (রা.)-কে স্বাগত জানাতে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

২. সালাম দেওয়া : ইমাম শাবি (রহ.) বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি সফর থেকে ফেরে তখন সুন্নত হলো তাঁর আপনজনরা তাঁর দিকে এগিয়ে যাবে এবং তাকে সালাম জানাবে। আর যখন কেউ সফরে বের হবে, তখন ব্যক্তি তাঁর আত্মীয়দের কাছে যাবে. তাদের কাছে দোয়া চাইবে। (বাহজাতুন নাজরি ফি আদাবিস সাফরি, পৃষ্ঠা-১০)

৩. মুসাফা ও মুআনাকা করা : যারা হাজিদের অভ্যর্থনা জানাবে, তারা হাজিদের সঙ্গে মুসাফা ও মুআনাকা করবে। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, নবীজি (সা.)-এর সাহাবিরা যখন পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তাঁরা মুসাফা করতেন আর যখন সফর থেকে ফিরতেন তখন মুআনাকা করতেন। (আল আউসাত লিত-তাবরানি, হাদিস : ৯৭)

৪. দোয়া করা : যখন কোনো ব্যক্তি হজ থেকে ফেরেন তার জন্য দোয়া করা উচিত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রহ.) হজ থেকে ফেরা হাজিদের জন্য দোয়া করতেন, ‘আল্লাহ তোমার ইবাদত কবুল করুন, তোমার প্রতিদান বাড়িয়ে দিন এবং তোমার ব্যয়ের প্রতিবিধান দিন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ১৫৮১৪)

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) একজন হাজির জন্য এভাবে দোয়া করেছিলেন, ‘আল্লাহ তোমার হজ কবুল করুন, তোমার আমলগুলো পবিত্র করুন এবং আমাদেরকে ও তোমাকে পুনরায় তার পবিত্র ঘরে যাওয়ার তাওফিক দিন।’ (শরহু গায়াতিল মুনতাহা : ২/৪৪৪)

৫. দোয়া চাওয়া : পূর্বসূরি আলেমরা হাজিদের কাছে দোয়া চাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ দিতেন। বিশেষ করে তারা পার্থিব কাজকর্মে লিপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তুমি কোনো হাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তাঁকে সালাম দেবে, তাঁর সঙ্গে মুসাফা করবে এবং সে ঘরে প্রবেশের আগে তোমার পাপমুক্তির জন্য দোয়া চাইবে। কেননা তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৬১১২)

হাজিদের করণীয়

হজ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর হাজিদের কয়েকটি করণীয় হলো—

১. আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় : হজ থেকে ফেরার পর হাজিদের করণীয় হলো আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা। কেননা আল্লাহ তাকে হজ করার এবং নিরাপদে ঘরে ফেরার তাওফিক দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো যুদ্ধ, হজ অথবা ওমরাহ থেকে প্রত্যাবর্তন করতেন তখন তিনি প্রত্যেক উঁচু ভূমিতে তিনবার আল্লাহু আকবার বলতেন এবং পরে বলতেন, ‘আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। সর্বময় ক্ষমতা এবং সব প্রশংসা কেবল তাঁরই। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। আমরা প্রত্যাবর্তনকারী ও তাওবাকারী, ইবাদতকারী, আমাদের প্রভুর উদ্দেশে সিজদাকারী ও প্রশংসাকারী। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সব শত্রুদলকে পরাজিত করেছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ১৭৯৭)

২. মসজিদে নামাজ আদায় : মহানবী (সা.)-এর অভ্যাস ছিল তিনি কোনো সফর থেকে ফিরলে প্রথমে মসজিদে যেতেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। অতঃপর সমবেত মানুষকে নিয়ে বসতেন। সুতরাং হজ থেকে আগত ব্যক্তির বাড়ির কাছে মসজিদ থাকলে তারও উচিত প্রথমে মসজিদে যাওয়া এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করে ঘরে ফেরা।

৩. আপ্যায়ন করা : আরব ও মুসলিম সমাজের একটি পুরনো রীতি হলো হাজিদের বাড়িতে সমবেত মানুষের জন্য সাধ্যানুযায়ী আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা। আরবি ভাষায় এই খাবারকে নাকিআ বলা হয়। নাকিআ শব্দ নাকউন থেকে এসেছে, তার অর্থ ধুলাবালি। কেননা মুসাফিরের শরীরে ধুলাবালি লেগে থাকে। বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় ফিরতেন একটি উট বা গরু জবাই করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৩০৮৯)

সুতরাং হাজিরাও সাক্ষাৎ করতে আসা মানুষের জন্য আপ্যায়ন করতে পারে। বিশেষত হজ থেকে আনা খেজুর ও জমজমের পানি দ্বারা।

আল্লাহ সবাইকে সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।

মসজিদে নববীর হাজার বছরের স্থাপত্য-প্রদর্শনী

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মসজিদে নববীর হাজার বছরের স্থাপত্য-প্রদর্শনী
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান মদিনা মুনাওয়ারার গৌরবময় ইতিহাস, স্থাপত্যিক বিবর্তন এবং যুগে যুগে এর সম্প্রসারণের অসাধারণ কাহিনি এখন জীবন্ত হয়ে উঠেছে এক অনন্য প্রদর্শনীতে। মসজিদে নববীর স্থাপত্য প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের জন্য উপহার দিচ্ছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক ব্যতিক্রমধর্মী ইন্টারেক্টিভ অভিজ্ঞতা।

মসজিদে নববীর দক্ষিণ প্রাঙ্গণে অবস্থিত এই প্রদর্শনীতে প্রবেশ করলেই দর্শনার্থীরা যেন ফিরে যান ইসলামের স্বর্ণালি অতীতে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ইন্টারেক্টিভ স্ক্রিনের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন মসজিদে নববীর প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এর দীর্ঘ ইতিহাস, বিভিন্ন খিলাফত ও ইসলামী যুগে সংঘটিত সম্প্রসারণ এবং স্থাপত্যিক উন্নয়নের ধারাবাহিক বিবরণ।

প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ হলো, এর উন্নতমানের ডিজিটাল উপস্থাপনা। এখানে দর্শনার্থীরা স্পর্শনির্ভর পর্দার মাধ্যমে মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য, নকশাগত পরিবর্তন এবং বিভিন্ন যুগে সংযোজিত অংশগুলোর বিস্তারিত তথ্য সহজেই অন্বেষণ করতে পারেন। ফলে ইতিহাস জানার পাশাপাশি তারা এক বাস্তবধর্মী ও প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতার স্বাদ পান।

এ ছাড়া প্রদর্শনীতে সংরক্ষিত রয়েছে বহু মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন, যা মসজিদে নববীর স্থাপত্যিক যাত্রার বিভিন্ন অধ্যায়কে সাক্ষ্য দেয়। বিশেষ প্রদর্শনী হলে রাখা এসব নিদর্শন যুগে যুগে সংঘটিত সংস্কার ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করছে। দর্শনার্থীদের জন্য আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে এখানে স্থাপন করা হয়েছে বিভিন্ন ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল, যেসব মডেলের মাধ্যমে মসজিদের ক্রমবিকাশের চিত্র স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়।

মসজিদে নববীর ৩০৮ ও ৩০৯ নম্বর গেটের নিকটবর্তী দক্ষিণ প্রবেশপথে অবস্থিত এই প্রদর্শনী প্রতিদিন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। দেশ-বিদেশের হাজারো মুসল্লি ও পর্যটক এখানে এসে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যিক সৌন্দর্য সম্পর্কে সমৃদ্ধ জ্ঞানার্জন করছেন। ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রযুক্তির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রদর্শনী শুধু একটি প্রদর্শনী নয়; বরং এটি মসজিদে নববীর গৌরবময় অতীতকে নতুন প্রজন্মের সামনে জীবন্ত করে তোলার এক অনন্য প্রয়াস।
 

সীমিত আয়ে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের রহস্য

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সীমিত আয়ে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের রহস্য
সংগৃহীত ছবি

অনেক মানুষ আছেন, যাদের আয় সীমিত; তবুও তাদের সংসারে প্রশান্তি, তৃপ্তি ও সুখের কমতি নেই। আবার কেউ কেউ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও অশান্তি, উদ্বেগ ও অপূর্ণতায় ভোগেন। এই দুই অবস্থার পার্থক্যের নামই হলো ‘বরকত’। ইসলামের দৃষ্টিতে বরকত শুধু অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, যা অল্পকে অনেক এবং সীমিতকে অর্থবহ করে তোলে। সময়, সম্পদ, জ্ঞান, পরিবার কিংবা স্বাস্থ্যে যখন বরকত আসে, তখন মানুষের জীবন হয়ে ওঠে শান্তিময় ও পরিপূর্ণ। তাই একজন মুমিনের জন্য বরকতের প্রকৃত অর্থ জানা এবং তা অর্জনের পথ অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বরকতের অর্থ- মুসলিম হিসেবে আমরা প্রতিদিনের কথাবার্তা, দোয়া এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ে ‘বরকত’ শব্দটি ব্যবহার করি। সালামের জবাবে বলি, ‘আপনার ওপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।’ ঈদের দিনে বলি ‘ঈদ মোবারক’। নতুন বিবাহিত দম্পতির জন্যও সুন্নত অনুযায়ী বরকতের দোয়া করা হয়। আরবি ভাষা ও ব্যাকরণবিদদের মতে, ‘বরকত’ শব্দের অর্থ স্থায়িত্ব, দৃঢ়তা, বৃদ্ধি, প্রাচুর্য এবং কল্যাণের ধারাবাহিকতা। সহজ ভাষায়, কোনো কাজে যখন আল্লাহর বরকত থাকে, তখন সামান্য প্রচেষ্টা থেকেও আশাতীত ফল লাভ করা যায়।

বরকতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ হলো- কল্যাণের ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ শুধু প্রাপ্তি নয়, সেই প্রাপ্তির স্থায়িত্ব ও উপকারিতাও বরকতের অন্তর্ভুক্ত। সামগ্রিকভাবে বরকত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক বিশেষ অনুগ্রহ, যা মানুষের জীবনকে কল্যাণময়, অর্থবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী সুফলে পরিপূর্ণ করে।

পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে ‘বরকত’ শব্দ ও তার বিভিন্ন রূপ এসেছে। মহান আল্লাহ নিজেই কোরআনকে বরকতময় কিতাব হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটি এমন এক কিতাব, যা আমি নাজিল করেছি; এটি অত্যন্ত বরকতময়।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৯২)

হাদিসে বরকতের প্রকৃত প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, সে একটি নেকি পাবে। আর প্রতিটি নেকি দশ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে...।’ (তিরমিজি , হাদিস নং : ২৯১০)

এই হাদিস প্রমাণ করে, আল্লাহর বরকত থাকলে সামান্য আমলও বহুগুণ ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে। অনেক সময় মানুষ সম্পদ, সুযোগ-সুবিধা ও বাহ্যিক সফলতা অর্জন করেও অন্তরে শান্তি খুঁজে পায় না। আবার সীমিত আয় ও সাধারণ জীবনযাপন করেও কেউ সুখী ও তৃপ্ত থাকেন। এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো বরকতের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি। আর জীবনে বরকত ফিরিয়ে আনার কার্যকর উপায় হলো-

১. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া : বরকত লাভের প্রথম শর্ত হলো কৃতজ্ঞতা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৭)
কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের কথা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে তার সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করাও কৃতজ্ঞতার অংশ। তাই তাঁর যে কোনো নেয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করা উচিত। 

২. দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা : প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু সময় আল্লাহর কাছে দোয়ার জন্য নির্ধারণ করা উচিত। বিশেষভাবে তিনটি বিষয়ে বরকতের জন্য দোয়া করা প্রয়োজন- সময়, সম্পদ এবং সুস্বাস্থ্য। কেননা সময়ের বরকত কর্মদক্ষতা বাড়ায়, সম্পদের বরকত অভাব দূর করে এবং স্বাস্থ্যের বরকত মানুষকে কর্মক্ষম ও স্বাবলম্বী রাখে।

৩. নামাজকেন্দ্রিক জীবন গড়ে তোলা : পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে কেন্দ্র করে দিনের পরিকল্পনা সাজালে জীবনে শৃঙ্খলা ও আত্মিক প্রশান্তি আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)

৪. আত্মীয়তা ও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করা : পরিবার ও সমাজের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বরকতের অন্যতম মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি এবং আয়ুতে বরকত কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫৯৮৬)

এভাবে সুসম্পর্ক, সততা এবং উত্তম আচরণ মানুষের জীবনে আল্লাহর রহমত, বরকত ও নুসরত বয়ে আনে।

অতএব, বরকত এমন একটি নেয়ামত, যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে লাভ করতে হয়। জীবনে বরকত থাকলে অল্প সম্পদেও সুখ থাকে, সীমিত সময়েও কাজ সম্পন্ন হয় এবং সাধারণ জীবনও হয়ে ওঠে প্রশান্তিময়। তাই আমাদের উচিত কৃতজ্ঞতা, নামাজ, দোয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বরকত লাভের চেষ্টা করা। কারণ প্রকৃত সফলতা শুধু বেশি পাওয়া নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া সামান্য নিয়ামতের মধ্যেও অসীম কল্যাণ খুঁজে পাওয়ার নামই বরকত।

হজের পর গুনাহমুক্ত জীবন লাভের সাত উপায়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
হজের পর গুনাহমুক্ত জীবন লাভের সাত উপায়
সংগৃহীত ছবি

হজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় আত্মিক বিপ্লব। লাখো মানুষের সঙ্গে একই পোশাকে, একই ময়দানে দাঁড়িয়ে মানুষ উপলব্ধি করে— একদিন তাকে তার রবের সামনে এভাবেই উপস্থিত হতে হবে। তাই হজের প্রকৃত সফলতা শুধুমাত্র মক্কা-মদিনায় কয়েকটি দিন কাটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং হজ থেকে ফিরে জীবনের প্রতিটি দিনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করার মধ্যেই এর প্রকৃত সার্থকতা। অনেকেই হজ থেকে ফিরে নতুন উদ্দীপনায় জীবন শুরু করেন। কিন্তু প্রকৃত হাজি তিনি, যার চরিত্র, আমল, চিন্তা ও জীবনাচরণে হজের প্রভাব স্থায়ীভাবে প্রতিফলিত হয়। হজের মাধ্যমে অর্জিত পবিত্রতা ও তাকওয়াকে ধরে রাখাই হলো হজ কবুল হওয়ার অন্যতম আলামত।

 হজের প্রতিদান: নবজাতকের মতো পবিত্রতা অর্জন করা। কবুল হজ মানুষের অতীতের গুনাহ মুছে দেয়। ফলে সে হজ থেকে ফিরে আসে এক নবজাতক শিশুর মতো পবিত্র, নির্মল ও গুনাহমুক্ত হয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ পালন করে এবং হজের সময় অশ্লীল কথা, কুকর্ম ও গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকে, সে এমন নিষ্পাপ অবস্থায় ফিরে আসে, যেমন ছিল সেদিন, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৫২১)

এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, হজ একজন মানুষকে গুনাহমুক্ত জীবনের নতুন সূচনা করার সুযোগ দেয়। আর হজের পর তাকওয়াই হজের মূল শিক্ষা।  আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর; আর সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত :  ১৯৭)

হজের প্রতিটি কর্মই তাকওয়ার শিক্ষা দেয়। তাই হজ থেকে ফিরে প্রথম দায়িত্ব হলো আল্লাহভীতিকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা।

হজের পর গুনাহমুক্ত জীবন গড়ার সাত উপায়

১. ফরজ ইবাদতে অবহেলা না করা : হজের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো— পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, জাকাতসহ সব ফরজ বিধান যথাযথভাবে পালন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)

২. অতীতের গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ তওবা করা : যে গুনাহের জন্য হজের আগে অনুতপ্ত ছিলেন, হজের পর যেন আর কখনো সে পথে ফিরে না যান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।’ (সুরা আন-নূর: আয়াত ৩১)

৩. কোরআনের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা : হজের পর প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কোরআনই একজন মুমিনের জীবন পরিচালনার সর্বোত্তম পথনির্দেশ।

৪. নেককারদের সান্নিধ্যে থাকা : মানুষ তার বন্ধু ও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই দ্বীনদার, আল্লাহভীরু মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩৭৮)

৫. মানুষের হক আদায়ে সচেতন হওয়া : হজ কবুল হওয়ার অন্যতম আলামত হলো মানুষের প্রতি আচরণে পরিবর্তন আসা। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের হক যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।

৬. নফল ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা : তাহাজ্জুদ, নফল রোজা, দান-সদকা ও অধিক জিকির বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি।’ (সহিহ বুখারি, আয়াত : ৬৫০২)

৭. হজের স্মৃতি নয়, হজের শিক্ষা ধরে রাখা : অনেকেই হজের স্মৃতি সংরক্ষণ করেন, কিন্তু হজের শিক্ষা ভুলে যান। প্রকৃত সফলতা হলো হজের পরেও বিনয়, তাকওয়া, ধৈর্য ও ইখলাস বজায় রাখা। হজ কবুল হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত।

হজ মানুষের জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক মহান সুযোগ— নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ। হজ শেষে যদি আমরা আগের মতোই গুনাহে নিমজ্জিত হয়ে যাই, তাহলে হজের শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যাবে। কিন্তু যদি আমরা নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, তওবা, নেক আমল ও তাকওয়ার মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করি, তাহলে হজ আমাদের জন্য হবে জান্নাতের পথে এক উজ্জ্বল সূচনা।