• ই-পেপার

গল্প

অবশেষে

  • মঈন শেখ

কবিতার ইশতেহার প্রসঙ্গে

অধির চক্রবর্তী

কবিতার ইশতেহার প্রসঙ্গে

সমসাময়িক বাংলা কবিতায় খুব কম বই-ই আছে, যা একই সঙ্গে কবিতা, দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা ও আত্মসমালোচনা এত গভীরভাবে একসুতায় গেঁথে দিতে পারে। কবিতার ইশতেহার সেই বিরল প্রচেষ্টাগুলোর একটি, যেখানে কবি মিজান মাহমুধ শুধু কবিতা লেখেননি, একটি বিকল্প রাষ্ট্রকাঠামোর নৈতিক নকশা হাজির করেছেন।

কবি এই গ্রন্থের প্রথম অংশে কবিতাসংবিধান-এ মূলত ২১টি ধারার মাধ্যমে এক কল্পিত কিন্তু কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রের চিত্র তুলে ধরেছেন। এখানে রাষ্ট্র কোনো ক্ষমতার যন্ত্র নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক নৈতিক সত্তা। রাষ্ট্র মানে কাঁটাতারে আঁকা কোনো মানচিত্র নয়’—এই উচ্চারণ শুধু একটি পঙক্তি নয়, পুরো বইয়ের দার্শনিক ভিত্তি। প্রতিটি ধারাগণতন্ত্র, বিচার, সাংবাদিকতা, শিক্ষা, শ্রম, নারীর অধিকারসবকিছু কবি এমনভাবে পুনর্নির্মাণ করেছেন, যেন তা পাঠকের বিবেককে সরাসরি প্রশ্ন করে।

দ্বিতীয় অংশ ২৪-এর কবিতা আরো বেশি ব্যক্তিগত, আরো বেশি নির্মম। এখানে কবি নিজেকে, নিজের দেশকে এবং পুরো জাতিকে এক আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছেন। আমরাই বানাই স্বৈরাচার কিংবা নির্মম ইতিহাস’—এই কবিতাগুলো শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এগুলো এক ধরনের সম্মিলিত আত্মস্বীকারোক্তি। কবি এখানে দায় এড়িয়ে যাননি, বরং স্বীকার করেনরাষ্ট্রের ব্যর্থতা যেমন শাসকের, তেমনি নাগরিকেরও।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তবুও তোকে ভালোবাসি কবিতাটি, যেখানে কবি দেশপ্রেমকে অন্ধ গর্ব নয়, লজ্জা ও ভালোবাসার জটিল এক অনুভূতি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। একইভাবে ৩৬ জুলাই কবিতাটি এক প্রতীকী দিন হয়ে ওঠে, যেখানে ইতিহাস, বেদনা ও প্রতিবাদ একসঙ্গে মিশে যায় এক বিমূর্ত অথচ তীব্র বাস্তবতায়।

ভাষার দিক থেকে গ্রন্থটি সহজ, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত ভাবনা অত্যন্ত গভীর। কোথাও স্লোগানধর্মী, কোথাও নিঃশব্দ আর্তনাদএই ওঠানামাই গ্রন্থটিকে জীবন্ত করে তুলেছে। কবি অলংকারের চেয়ে সত্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যা অনেক সময় অস্বস্তিকর, কিন্তু প্রয়োজনীয়।

তবে গ্রন্থটির একটি সীমাবদ্ধতাও আছেকিছু জায়গায় বক্তব্যের তীব্রতা কবিতার নান্দনিকতা ছাপিয়ে গেছে। ফলে পাঠক কখনো কখনো অনুভব করতে পারেন, তিনি কবিতা নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক ভাষ্য পড়ছেন। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাও গ্রন্থটির শক্তির অংশ; কারণ বোঝা যায় এটি কবির ইচ্ছাকৃত, এটি প্রতিবাদের ভাষা।

সব মিলিয়ে কবিতার ইশতেহার কোনো সাধারণ কবিতার বই নয়; এটি এক প্রজন্মের প্রশ্ন, এক কবির দায়বোধ এবং একটি দেশের অসমাপ্ত স্বপ্নের দলিল। যাঁরা শুধু সৌন্দর্যের জন্য কবিতা পড়েন, তাঁদের জন্য এটি হয়তো কঠিন; কিন্তু যাঁরা সত্য খোঁজেন, প্রশ্ন করতে চান এবং নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবতে চানতাঁদের জন্য এই গ্রন্থ একটি জরুরি পাঠ।

কবিতার ইশতেহার : মিজান মাহমুধ। প্রকাশক : ইচ্ছে প্রকাশ। মূল্য : ২০০ টাকা।

বই আলোচনা

নতুনভাবে দেশভাগ চর্চা

নতুনভাবে দেশভাগ চর্চা

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে উপমহাদেশের ৪৭-ট্র্যাজেডি দেশভাগ নিয়ে ভিন্ন আঙ্গিক ও অন্য আলোয় দেখা আরেক স্বাদের প্রবন্ধগ্রন্থ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদের দেশভাগ চর্চা। বিবৃত হয়েছে দেশ বিভাগের ইতিহাস, বর্তমান ও প্রাসঙ্গিকী। এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি আয়োজনে সন্নিবিষ্ট রয়েছেরবীন্দ্রনাথ ও দেশভাগ; দেশভাগের সকাল-বিকাল; দেশভাগ ও উত্তরবঙ্গ; দেশভাগ যশোহর রোড ও ১৯৭১; দেশভাগ পাঞ্জাব ও ট্রমাটিক মান্টো; দেশভাগ ও ইলিয়াসের চশমা; উত্তম-সুচিত্রা দেশভাগ ও চলচ্চিত্র বিষয়ক অধ্যায়গুলোতে।

গ্রন্থের অধ্যায়গুলো লক্ষ করলে বিবিধ বীক্ষণের সহজ একটা ধারণা পাওয়া যায়। আর এই দৃশ্য অবলোকন করতেই শিকড়সম্পৃক্ত পাঠক হাতে তুলে নেবেন এই গ্রন্থ।

দেশভাগের নামে ভারতবর্ষের ইতিহাসে ১৯৪৭ ঘিরে যে ঘূর্ণাবর্ত তছনছ করে দিয়েছে কোটি মানুষের গোছানো জীবন, উজ্জীবন আর বিলুপ্তির অগণন অজ্ঞাত পর্বে যেভাবে উল্টেপাল্টে গেছে, সেই অতীত সময় ও পরম্পরা, ত্রিপার্শ্ব কাচের ভেতর দিয়ে শব্দের ক্যানভাসে দৃশ্যমান করে তুলেছেন সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ তাঁর দেশভাগ চর্চা : ইতিহাস বর্তমান ও প্রাসঙ্গিক পাঠ শিরোনামের এই গ্রন্থটিতে। তাঁর বর্ণনা সাবলীল। আগ্রহী পাঠকদের আশা করি এই গ্রন্থটি ভালো লাগবে। যাঁরা দেশভাগ নিয়ে গবেষণা করবেন, তাঁদেরও উপকারে আসবে গ্রন্থটি।

দেশভাগ চর্চা : ইতিহাস বর্তমান ও প্রাসঙ্গিক পাঠ : সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ। প্রকাশক :  পুণ্ড্র প্রকাশন। প্রচ্ছদ : তৌহিন হাসান। মূল্য : ২৮০ টাকা।

শৈশব ও বাবা

সায়ন্থ সাখাওয়াৎ

শৈশব ও বাবা

শৈশবে বাবার শাসন ছিল একটু কড়া

মনে হতো বাবা মানেই নিষেধের বেড়া

স্বাধীনতার চারপাশে টানা কাঁটাতার।

শৈশব ধরে রাখতে পারিনি মুঠোয়

শুকনো বালির মতো ঝরে গেছে সময়

আঙুলের ফাঁক দিয়ে নিঃশব্দে।

বাবার হাত ধরে হাঁটতে চেয়েছিলাম

রোমাঞ্চকর সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে

কিন্তু তিনি ছিলেন দূরের প্রদীপ

আমাদের আলোকিত করতে ছুটতেন দিন-রাত।

সুখ বলতে তিনি বুঝতেন

রবিবার হাটে নিয়ে যাওয়া

সন্তানের নতুন জামা

পকেটে একটা নতুন নোট।

চাইতাম হাত

দিতেন হাতখরচ।

আমি চেয়েছিলাম একটু একান্ত সময়

একটু হাসি

একটা গল্প

বাবা বাবা গন্ধে ভরপুর একটা হাতের স্পর্শ।

আজ আমিও বাবা

দাঁড়িয়ে আছি সেতুর মাঝখানে

এক প্রান্তে আমার শৈশব

অন্য প্রান্তে সন্তানের চোখ

সন্তান তাকিয়ে থাকে

ঠিক যেমন আমি তাকিয়ে থাকতাম

অপেক্ষার লম্বা ছায়ায় দাঁড়িয়ে।

আমার সন্তানও একদিন বাবা হবে

সেও হয়তো ছুটবে আমার মতো

আমার বাবার মতো

তার বাবার মতো

তার সন্তানও হয়তো শৈশব বিক্রি করে দেবে

দামি দীর্ঘশ্বাসের দামে।

 

শৈশবে আমরা চাই

আমাদের একটা সকাল জমা থাকুক

আমাদের একটা বিকেল আসুক

হাতের ভিতর হাত রেখে হাঁটার

ছোটগল্পটা হয়ে উঠুক সিনেমার চিত্রনাট্য।

অথচ সেই শৈশবকেই আমরা

ঘাটের খেয়া নৌকায় অপেক্ষায় রেখে

উঠে আসি নিয়তির স্টিমারে।

 

শূন্যতার ল্যান্ডস্কেপ

আবদুর রব

শূন্যতার ল্যান্ডস্কেপ

কামুর অস্তিত্ববাদী নির্জনতার স্মরণে

পাহাড় থেকে পাথর নেমে আসে নিঃশব্দে

ঘাসের উপত্যকায়।

 

পৃথিবী জানে না কতটা অচেনা সে।

নিজেই নিজেকে চাপা দিয়ে রাখে,

সময়ের ভারে।

 

প্রতিটি পাথর-নিস্পন্দ হৃদয়,

অর্থহীন দৃশ্যের ভিতরে একাকী হারায়।

 

এক পরিত্যক্ত স্বর্গ,

যেদিকে তাকাও, পাথরের জঙ্গল, এর সৌন্দর্য

শূন্যতার ল্যান্ডস্কেপে টিকে থাকে

মৃত্যুর নীরবতায়।