• ই-পেপার

লজিস্টিকস খরচ ২৫% কমলে রপ্তানি আয় বাড়বে ২০%

  • ডিসিসিআই আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

জ্বালানি নিরাপত্তায় এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
জ্বালানি নিরাপত্তায় এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে
হোসেন জিল্লুর রহমান

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন চিন্তা ও সমন্বিত পরিকল্পনার আহবান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, পুরনো পদ্ধতিতে আর সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন ‘ইনোভেটিভ আইডিয়া’ ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের জ্বালানির ভবিষ্যৎ : নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা’।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি ল্যান্ড-বেইজড এফএসআরইউ স্থাপনের কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর সমাধান হতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিয়ে তিনি  আরো বলেন, সোলার এনার্জি বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা। শিল্প ও আবাসিক খাতে এর ব্যবহার বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এ জন্য একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল দরকার। এটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে পরিচালনা করা যেতে পারে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)। তিনি বলেন, একসময় সস্তা গ্যাস ও জ্বালানির কারণে দেশে শিল্পায়ন বেড়েছিল। এখন সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। তাঁর মতে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১০০ এমএমসিএফ গ্যাস উৎপাদন কমছে। সরকার এলএনজি আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, শিল্প ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকসের লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম। এতে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

জ্বালানি নিরাপত্তায় এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের তাগিদ

 

বিশেষ লেখা

গাছ লাগানোকে করনীতির অংশ করা যায় কি

মো. জাহাঙ্গীর আলম

গাছ লাগানোকে করনীতির অংশ করা যায় কি

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়। আমরা তা প্রতিদিনই দেখছি অস্বাভাবিক গরম, অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা আর হঠাৎ বন্যায়। গ্রামের কৃষক যেমন এই পরিবর্তনের চাপ অনুভব করছেন, তেমনি শহরের মানুষও ছায়াহীন রাস্তা, দাবদাহ ও দূষণের মধ্যে তা বুঝতে পারছে। এই বাস্তবতায় বৃক্ষরোপণ আর শুধু একটি সামাজিক বা নৈতিক কাজ নয়; এটি আমাদের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি জরুরি প্রয়োজন।

তবে শুধু গাছ লাগালেই হবে না। আমাদের বড় সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় উৎসব করে গাছ লাগাই, ছবি তুলি, সংবাদ করি; কিন্তু কয়েক মাস পর সেই গাছগুলোর কতটি বেঁচে আছে, তা আর কেউ খোঁজ নেয় না। তাই এখন প্রয়োজন বৃক্ষরোপণকে এক দিনের কর্মসূচি থেকে বের করে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও নীতিগত সহায়তার মধ্যে নিয়ে আসা।

এই কাজটি একা রাষ্ট্রের পক্ষে করা সম্ভব নয়। আবার শুধু সাধারণ মানুষের আবেগ দিয়েও একটি জাতীয় পর্যায়ের সবুজ আন্দোলন টেকসই করা কঠিন। এখানে দরকার তিনটি শক্তির সমন্বয়—সাধারণ মানুষ, করপোরেট খাত এবং রাষ্ট্রীয় নীতি।

শিক্ষার্থী, তরুণ ও সাধারণ মানুষ যেকোনো সামাজিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। তারা সচেতনতা তৈরি করে, পরিবার ও সমাজকে যুক্ত করে এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিবর্তনের সূচনা করে। কিন্তু এই অংশগ্রহণকে বড় পরিসরে নিতে হলে করপোরেট খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আছে অর্থ, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহার করার সক্ষমতা এবং বহুসংখ্যক কর্মীকে যুক্ত করার সুযোগ।

বাংলাদেশের অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কর্মসূচির আওতায় নানা কাজ করছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের অনেকটাই খণ্ডিত, স্বল্পমেয়াদি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রচারণাকেন্দ্রিক। যদি সিএসআর তহবিলের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও গাছের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যায় বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে তা একটি কার্যকর জাতীয় সবুজ কর্মসূচিতে রূপ নিতে পারে।

গাছ লাগানোর জায়গা, প্রজাতি ও পরিচর্যার প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে-সেখানে গাছ লাগালেই পরিবেশ রক্ষা হয় না। স্থানীয় আবহাওয়া, মাটি, পানি এবং মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে মিল রেখে দেশীয় প্রজাতির গাছ নির্বাচন করতে হবে। স্কুল-কলেজ প্রাঙ্গণ, রাস্তার ধারে খালি জায়গা, খালের পার, নদীর পার, শিল্পাঞ্চলের আশপাশ, সরকারি খাসজমি এবং নগরের ছাদ—এসব জায়গা পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিটি গাছের জন্য অন্তত তিন বছরের পরিচর্যা পরিকল্পনা থাকা দরকার।

করপোরেট খাত চাইলে এই কাজকে আরো স্বচ্ছ ও ফলাফলভিত্তিক করতে পারে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং, জিও-ট্যাগিং, ডেটা বেইস বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিটি গাছের অবস্থান, প্রজাতি, রোপণের তারিখ, বৃদ্ধি ও পরিচর্যার তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে বৃক্ষরোপণ শুধু একটি অনুষ্ঠান থাকবে না; বরং তা পরিমাপযোগ্য ও যাচাইযোগ্য কাজে পরিণত হবে।

কিন্তু শুধু করপোরেট অংশগ্রহণ দিয়ে এই আন্দোলন জাতীয় চরিত্র পাবে না। সাধারণ করদাতাকেও এর সঙ্গে যুক্ত করতে হলে রাষ্ট্রের করনীতিকে ব্যবহার করা যেতে পারে। করনীতি শুধু রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ার নয়; এটি নাগরিক আচরণকে উৎসাহিত করারও একটি কার্যকর মাধ্যম। সরকার যেমন সঞ্চয়, বিনিয়োগ বা কিছু নির্দিষ্ট খাতে কর সুবিধা দিয়ে নাগরিকদের উৎসাহিত করে, তেমনি পরিবেশবান্ধব কাজকেও কর সুবিধার আওতায় আনা যেতে পারে।

এই জায়গায় একটি নীতি প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ উন্নয়নে ব্যয় করা অর্থকে কর রিবেটযোগ্য খাতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। যেমন—ডিপিএস বা সঞ্চয় স্কিমের মতো নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য বৃক্ষরোপণ ব্যয়ের ওপর কর রিবেটের সুযোগ রাখা যেতে পারে। এতে মানুষ শুধু আবেগ থেকে নয়, অর্থনৈতিক প্রণোদনার কারণেও পরিবেশ সংরক্ষণে অংশ নিতে আগ্রহী হবেন।

তবে এ ধরনের সুবিধা চালু করতে হলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কাগজে-কলমে গাছ দেখিয়ে কর সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না। এ জন্য একটি সহজ কিন্তু কার্যকর যাচাই ব্যবস্থা দরকার। যে স্থানে গাছ রোপণ করা হবে, সেই এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ বা স্বীকৃত পরিবেশ সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি জিও-ট্যাগ করা ছবি, রোপণের তারিখ এবং পরবর্তী পরিচর্যার সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনও রাখা যেতে পারে।

এতে দুটি লাভ হবে। প্রথমত, কর সুবিধার অপব্যবহার কমবে। দ্বিতীয়ত, স্কুল, কলেজ ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তব অর্থে পরিবেশ আন্দোলনের অংশীদার হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিদ্যালয়, পাড়া ও গ্রামের গাছের বৃদ্ধি চোখের সামনে দেখতে পারবে।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই সবুজ অর্থনীতির পথে এগোতে চায়, তাহলে বৃক্ষরোপণকে আবেগ, অনুষ্ঠান ও প্রচারণার বাইরে এনে অর্থনীতি, করনীতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। রাষ্ট্র নীতিগত উৎসাহ দেবে, করপোরেট খাত ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি দেবে। সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব নেবে—এই সমন্বয় তৈরি করা গেলে বৃক্ষরোপণ একটি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি থাকবে না; এটি জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি গাছ লাগানোর ছবি থেকে গাছ বাঁচানোর দায়িত্বে যেতে প্রস্তুত?

লেখক : রাজস্ব বিশ্লেষক ও নির্বাহী পরিচালক, গোল্ডেন বাংলাদেশ

 

 

দেশি পেঁয়াজে রমরমা খাতুনগঞ্জ বাজার

সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা—সবাই এখন দেশি পেঁয়াজেই আস্থা রাখছেন ভারতীয় পেঁয়াজের জৌলুস কেড়ে নিয়েছে দেশের পাবনা, রাজশাহী ও ফরিদপুরের পেঁয়াজ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
দেশি পেঁয়াজে রমরমা খাতুনগঞ্জ বাজার

দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে দীর্ঘ কয়েক দশকের চিরাচরিত চিত্র বদলে গেছে। একসময় যেখানে ভারতীয় পেঁয়াজের দাপটে দেশি পেঁয়াজ খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর ছিল, এখন সেখানে একচেটিয়া রাজত্ব চলছে দেশের মাটিতে উৎপন্ন পেঁয়াজের। স্বাদে ও গুণে অনন্য হওয়ায় এবং রান্নায় ঝাঁজ বেশি থাকায় সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা—সবাই এখন দেশি পেঁয়াজেই আস্থা রাখছেন। আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজের সেই জৌলুস কেড়ে নিয়েছে দেশের পাবনা, রাজশাহী ও ফরিদপুরের পেঁয়াজ।

চাষিদের সাফল্যে সয়লাব বাজার গতকাল শনিবার সকালে খাতুনগঞ্জ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আড়তগুলোতে এখন ভারতীয় পেঁয়াজের দেখা মেলাই ভার। ব্যবসায়ীরা জানান, দুই বছর ধরে দেশের চাষিরা পেঁয়াজ উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছেন। বিশেষ করে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ ও চাষিদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে। প্রতিদিন গড়ে ৩০ ট্রাকেরও বেশি নতুন ও পুরনো পেঁয়াজ আসছে খাতুনগঞ্জের লামা বাজার এলাকার আড়তগুলোতে। মূলত ফরিদপুর, পাবনা, কুষ্টিয়া ও রাজশাহী অঞ্চল থেকে নিয়মিত আসছে এই পেঁয়াজ।

স্বাদ ও গুণে এগিয়ে দেশি পণ্য রান্নায় ঝাঁজ ও সুগন্ধ বেশি হওয়ার কারণে ভোক্তাদের প্রথম পছন্দ এখন দেশি পেঁয়াজ। বাজারে এখন হালি পেঁয়াজ, পাতা পেঁয়াজ ও মেহেরপুরী পেঁয়াজের ব্যাপক চাহিদা। আড়তদারদের মতে, আমদানি করা পেঁয়াজের তুলনায় দেশি পেঁয়াজের সংরক্ষণ ক্ষমতা অনেক বেশি। ফলে পচে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকায় খুচরা ব্যবসায়ীরাও এখন দেশি পেঁয়াজ সংগ্রহে বেশি আগ্রহী। একসময় আমদানীকৃত পেঁয়াজ ছাড়া বাজার কল্পনা করা না গেলেও সেই জায়গা এখন পুরোপুরি দেশি পণ্যের দখলে।

দাম এখন সাধারণের নাগালে, সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় পাইকারি বাজারে দামও এখন নিম্নমুখী। খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজ আড়তদার নবী হোসেন জানান, বর্তমানে বাজারে কোনো সংকট নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় দামও গত সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা কমেছে। বাজারে মানভেদে সাধারণ দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৭-২৮ টাকা কেজি দরে। আর একটু ভালো মানের এবং তাজা পেঁয়াজ মিলছে ৩০-৩২ টাকায়, যা কিছুদিন আগেও ৩৫-৩৮ টাকা ছিল।

পাইকারি বাজারে দাম কমায় তার সুফল মিলছে খুচরা বাজারেও। তবে খুচরা পর্যায়ে দামের ব্যবধান কিছুটা বেশি। সাধারণ ভোক্তারা প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় কিনতে পারছেন।

আড়ত ও খুচরা বাজারের দর পরিস্থিতি বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ (৪০ কেজি) দেশি ‘হালি’ প্রজাতির পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকায়। শীতকালীন ‘পাতা পেঁয়াজ’ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৭০০ টাকায়। এ ছাড়া মজুদ করা পুরনো দেশি পেঁয়াজের দামও রয়েছে দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৭০০ টাকার মধ্যে।

খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজ কিনতে আসা খুচরা ব্যবসায়ী রহমান আলী বলেন, ‘আমরা পাইকারি বাজার থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ নিয়ে যাচ্ছি। পরিবহন ও দোকান খরচ মিলিয়ে এটি ৪০-৪২ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব নয়। তবে ভারতীয় পেঁয়াজের চেয়ে দেশি পেঁয়াজের চাহিদা বেশি থাকায় বিক্রি ভালো হচ্ছে।’

স্বাবলম্বী হওয়ার পথে বাংলাদেশ বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশের এই সাফল্য কৃষি খাতের জন্য বড় একটি মাইলফলক। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশি পণ্য দিয়ে বাজার সয়লাব রাখা সম্ভব হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। খাতুনগঞ্জের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। পেঁয়াজ বাজারে ভারতীয় দাপট এখন অতীত, ভবিষ্যৎ শুধুই দেশি পণ্যের।

 

 

দুই প্রজন্মের স্বপ্ন বুনন

বুলবুল টেক্সটাইলের পণ্য যাচ্ছে বিশ্ববাজারে

বাবার গড়া কারখানাকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দিয়ে তিনবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছে এখান থেকে কারখানা চালু রাখার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে তীব্র লোডশেডিং বুলবুল টেক্সটাইলে সরাসরি কাজ করছেন প্রায় ২০০ জন শ্রমিক

মেহদী ইসলাম
বুলবুল টেক্সটাইলের পণ্য যাচ্ছে বিশ্ববাজারে
চাদর, বেডশিট, বেডকভার, লুঙ্গি, গামছা ইত্যাদি পণ্য উৎপাদিত হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুষ্টিয়ার কুমারখালী, বস্ত্রশিল্পের ঐতিহ্যে ঘেরা যে মাটিতে শোনা যায় সুতা আর তাঁতের খটখট শব্দ। এখানকার বেডশিট, গামছা, রুমাল এখন আন্তজার্তিক পরিসরে পরিচিত। আর এই উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে যারা তাদের মধ্যে অন্যতম ‘বুলবুল টেক্সটাইল’।

রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া মহাসড়কের পাশে কুমারখালীর অবস্থান। আনুমানিক ১৯৪০ সাল থেকে এখানে বিভিন্ন সাইজের চাদর, বেডশিট, বেডকভার, লুঙ্গি, গামছা, জায়নামাজ, হাতের রুমাল ইত্যাদি পণ্য উৎপাদিত হয়ে আসছে। কুমারখালীর বেডশিট ও লুঙ্গির সুনাম সমগ্র বাংলাদেশে। ষাটের দশকের শুরুর দিকের কথা। ১৯৬৩-৬৪ সালের দিকে ‘বুলবুল টেক্সটাইল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান ম্যানেজিং ডিরেক্টর আব্দুর রউফের বাবা প্রথম গড়ে তোলেন একটি ছোট কারখানা। সেই সময়কার সীমিত সম্পদে দেখা সেই স্বপ্নের বীজ আজ বিশাল এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বাবার রেখে যাওয়া সেই উত্তরসূরি হিসেবে আব্দুর রউফ ও তাঁর ভাইয়েরা মিলে হাল ধরেছেন এই পারিবারিক শিল্পের। আজ তাঁদের উৎপাদিত লুঙ্গি, বেডশিট, তোয়ালে আর রুমাল কেবল দেশের বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমাদৃত।

আব্দুর রউফ বলেন, ‘পণ্য যদি আধুনিক আর মানসম্মত হয়, তবে বিশ্ববাজার আমাদের জন্য খোলা। আমরা তিনবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় পুরস্কার পেয়েছি, যা আমাদের কাজের বড় স্বীকৃতি।’

বর্তমানে বুলবুল টেক্সটাইলে সরাসরি কাজ করছেন প্রায় ২০০ জন শ্রমিক। প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছে এখান থেকে। তবে বুলবুল টেক্সটাইলের এই দীর্ঘ পথচলা সব সময় সহজ ছিল না। আধুনিক যুগের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পণ্যের ডিজাইন আর আধুনিকায়নে বিশেষ জোর দিতে হয়েছে। এই নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে তিনবার আন্তর্জাতিক পুরস্কারের গৌরব অর্জন করেছে এই প্রতিষ্ঠান।

আব্দুর রউফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ আমাদের প্রধান সংকট। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে কারখানার চাকা স্থবির হয়ে যায়, শ্রমিকদের কাজের ছন্দ নষ্ট হয়। তীব্র গরম যখন আসে তখন লোডশেডিং দেখা দেয় প্রচণ্ড। কোনো কোনো দিন সাত থেকে আট ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। এই পুরো সময়টা কারখানা বন্ধ থাকে। আবার অটোরিকশা, ভ্যান এসব পেশায় অনেকে জড়িত হচ্ছে। এসব কাজে শ্রম কম কিন্তু আয় বেশি, যার ফলে কারখানায় কাজ করতে শ্রমিকরা এখন আর আসে না। এ জন্য দক্ষ শ্রমিকের সংকটও প্রকট হচ্ছে।’

কুমারখালীতে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ছোট-বড় কারখানা থাকলেও মুষ্টিমেয় কিছু কারখানার ওপর ভ্যাট ও ট্যাক্সের বোঝা চাপানো হয়েছে। আব্দুর রউফ বলেন, ‘বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ করে এবং সব উদ্যোক্তার জন্য সমান ভ্যাট-ট্যাক্স নীতি প্রণয়ন করলে দেশের রাজস্ব যেমন বাড়বে, তেমনি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও রপ্তানিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন।’

বিকেলের পড়ন্ত রোদে কারখানার তাঁতগুলো যখন বিরামহীন শব্দে চলছে, তখন আব্দুর রউফের চোখে দেখা যায় এক দৃঢ় প্রত্যয়। দুই প্রজন্মের এই উত্তরাধিকার কেবল ব্যবসা নয়, যেন বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীলতার এক জীবন্ত মানচিত্র। ভবিষ্যৎ নিয়ে আব্দুর রউফ বেশ আশাবাদী। তিনি স্বপ্ন দেখেন, কুমারখালীর গামছা আর বেডশিট সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের বাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। তবে এর জন্য নিরবিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সুবিধার মতো অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে আব্দুর রউফদের মতো উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন বিপ্লব ঘটাতে পারেন।

বুলবুল টেক্সটাইলের পণ্য যাচ্ছে বিশ্ববাজারে

দেশ-বিদেশে সরবরাহের জন্য পণ্য প্যাকিং করা হচ্ছে।      ছবি : কালের কণ্ঠ