আশির দশকের শুরুর লগ্ন। সেদিন বানিয়া বাজারে হাটবার। বাবার হাত ধরে হাঁটছি। পথের ধারেই কড়িয়াইলের শামছুল ইসলাম খানের বিশাল বাড়ি। পুরো এলাকায় এত বড়, এত জাঁকজমকপূর্ণ বিল্ডিং আর একটিও ছিল না। আসা-যাওয়ার পথে খেয়াল করলাম, সেই বিশাল বাড়ির ছাদের ওপর কয়েকজন নারী দাঁড়িয়ে ধান ওড়াচ্ছেন। ধান থেকে চিটা আলাদা করার সেই চিরচেনা দৃশ্য। আমার ভেতরের কৌতূহলী শিশুমন আর শান্ত থাকল না। বাবার হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা আব্বা, ওরা অত ওপরে উঠল কিভাবে?’ বাবা স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন, ‘কেন, সিঁড়ি ডিঙিয়ে।’
সিঁড়ি? সেটি আবার কেমন জিনিস? কৌতূহল যেন এবার আকাশ ছুঁলো। বায়না ধরলাম, ‘আব্বা, আমি ওই সিঁড়ি দেখতে চাই। এখনই দেখব।’ বাবা কিছুটা তাড়া দিয়ে বললেন, ‘এখন তো সময় কম রে, বাবা। বাজারে যেতে হবে। অন্য একদিন দেখাব।’ কিন্তু অবুঝ মন কি আর সময়ের হিসাব বোঝে? বাবার মুখের ‘না’ শুনে আমার অভিমানী মন চট করে বিগড়ে গেল। এক পা-ও নড়ব না বলে জেদ ধরলাম। গত্যন্তর না পেয়ে তিনি নরম হলেন। নিজে বাড়ির বাইরে রাস্তার ধারে অপেক্ষা করে আমাকে ভেতরে পাঠালেন সেই কাঙ্ক্ষিত ‘সিঁড়ি’ দেখতে। মহা আনন্দে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। কিন্তু এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোথাও রাজকীয় বা জাদুকরী সিঁড়ি দেখলাম না। দেখলাম, বাঁশের তৈরি একটি মই! সেই মই বেয়েই লোকজন ওঠানামা করছে। হতাশ হয়ে বাবার কাছে ছুটে এলাম। ক্ষোভের সুরে বললাম, ‘আব্বা, আপনি তো মিছে কথা বললেন! ভেতরে কোনো সিঁড়িটিড়ি নেই। ওটা তো একটি মই!’ বাবা হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর আমার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘পাগল ছেলে, মইয়ের অপর নামই তো সিঁড়ি!’ আজ হয়তো কত আধুনিক, কত সুন্দর সিঁড়ি দেখি, কিন্তু শৈশবের সেই ‘বাঁশের মই’ আর বাবার মায়াবী হাসিটার চেয়ে আর কিছুই সুন্দর মনে হয় না।






