কবর অন্তহীন পরকালীন জীবনের প্রথম ঘাঁটি। ইসলামী আকিদা অনুসারে মুসলিম ও অমুসলিম সবাইকে পরকালে তিনটি প্রশ্ন করা হবে। এই তিন প্রশ্নের জবাব দিতে পারলে ব্যক্তির কবর হবে শান্তির, নতুবা তা জাহান্নামের টুকরায় পরিণত হবে। আর কবরে এই প্রশ্নগুলোর জবাব তারাই দিতে পারবে, যারা ঈমান ও ইসলামের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করবে।
কবরের প্রশ্ন ও তার জবাব
কবরে মানুষকে আল্লাহ, রাসুলুল্লাহ (সা.) ও ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন : বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তাকে পেছনে রেখে তার সাথিরা চলে যায় (এতটুকু দূরে যে) তখনো সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়, এমন সময় তার কাছে দুজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে দেন। অতঃপর তাঁরা প্রশ্ন করেন, এই যে মুহাম্মাদ! তাঁর সম্পর্কে তুমি কী বলো? তখন সে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তিনি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসুল। তখন তাকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার অবস্থানের জায়গাটি দেখে নাও, যার পরিবর্তে আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য জান্নাতে একটি স্থান নির্ধারিত করেছেন। নবী (সা.) বলেন, তখন সে দুটি স্থান একই সময় দেখতে পাবে। আর যারা কাফির বা মুনাফিক, তারা বলবে, আমি জানি না। অন্য লোকেরা যা বলত আমিও তাই বলতাম। তখন তাকে বলা হবে, না তুমি নিজে জেনেছ, না তিলাওয়াত করে শিখেছ। অতঃপর তার দুই কানের মাঝখানে লোহার মুগুর দিয়ে এমন জোরে মারা হবে, যাতে সে চিৎকার করে উঠবে, তার আশপাশের সবাই তা শুনতে পাবে মানুষ ও জিন ছাড়া। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩৩৮)
যাদের কবরে প্রশ্ন করা হবে না
১. নবী-রাসুলদের : কোরআন ও হাদিসে এ কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি যে কবরে নবী-রাসুল (আ.)-কে প্রশ্ন করা হবে না। তবে ইবনুল কায়্যিম জাওজি (রহ.) বলেছেন, বেশির ভাগ আলেমের মত হলো, কবরে নবী-রাসুলদের প্রশ্ন করা হবে না। (আর-রুহ, পৃষ্ঠা-১১০)
২. শহীদদের : আল্লাহর রাস্তায় যাঁরা জীবন দান করেন তাঁদেরও কবরে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। এক সাহাবি জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসুল! কেন শহীদ ছাড়া অন্য মুমিনরা কবরে ফিতনার সম্মুখীন হবে এবং এর কারণ কী? তিনি বললেন, তার মাথার ওপর তরবারির উজ্জ্বলতা তাকে কবরে ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকার জন্য যথেষ্ট হবে।
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২০৫৩)
উল্লেখ্য, এখানে এই মর্যাদা শুধু সেসব শহীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, যারা যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন রোগ বা দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যু হলে যাদের শহীদ বলা হয়েছে তারা এই মর্যাদা পাবে না।
৩. সীমান্ত প্রহরীদের : ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা যারা পাহারা দেয় এবং কর্মরত অবস্থায় তাদের মৃত্যু হলেও কবরে কোনো প্রশ্ন করা হবে না। সালমানুল খায়ের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় এক দিন ও এক রাত সীমান্ত পাহারা দেয়, তার জন্য এক মাস রোজা রাখার ও রাত জেগে ইবাদতের সওয়াব রয়েছে। আর যে ব্যক্তি পাহারার কাজে নিয়োজিত থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তার জন্যও অনুরূপ সওয়াব রয়েছে। আর তাকে (জান্নাত থেকে) রিজিক বরাদ্দ দেওয়া হবে, আর সে সব ফিতনা (কবরের জিজ্ঞাসাবাদ ও শাস্তি) থেকে সুরক্ষিত থাকবে।’
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৩১৬৭)
৪. জুমার দিন মৃত্যু বরণকারীদের : যারা জুমার দিন মারা যাবে কবরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলিম জুমার দিনে বা রাতে মারা যাবে, আল্লাহ তাকে কবরের ফিতনা থেকে রক্ষা করবেন।’
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৭৪)
৫. পেটের পীড়ায় যাদের মৃত্যু হয় : পেটের পীড়ায় যাদের মৃত্যু হয় তাদের কবরে জিজ্ঞাসাবাদ ও শাস্তি হয় না। রাসুলুল্লাহ বলেছেন, ‘যাকে তার পেট হত্যা করেছে তার কখনো কবরে শাস্তি হবে না।’
(মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৮৩১০)
৬. নিয়মিত সুরা মুলক পাঠকারী : যারা নিয়মিত সুরা মুলক পাঠ করে তাদেরও কবরে জিজ্ঞাসাবাদ ও শাস্তি হবে না। দীর্ঘ হাদিসের শেষে নবীজি (সা.) সুরা মুলক সম্পর্কে বলেছেন, ‘সুরাটি প্রতিরোধকারী, নাজাত দানকারী। এটি কবরের আজাব থেকে পাঠকারীকে মুক্তি দেয়।’
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৯০)