যেসব কাজ ব্যাপকভাবে মানুষকে উপকৃত করে, তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো খাল খনন। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক কাজ। এর মাধ্যমে কৃষিজমিতে সেচের ব্যবস্থা হয়, যা দেশের খাদ্য জোগান ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। তা ছাড়া পানির সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা থেকেও একটি বেশি উপকারী উদ্যোগ। ইসলামে মানুষের উপকারে আসে এমন প্রতিটি বৈধ কাজকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই খাল খননও ইসলামের দৃষ্টিতে একটি মহৎ আমল ও সওয়াবের কাজ।
আর প্রতিটি মহৎ কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করা মুমিনের দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো।’
(সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
খাল খনন এমন একটি উদ্যোগ, যার মাধ্যমে সমাজের সব শ্রেণি উপকৃত হয়। দেশজুড়ে কৃষিতে সহযোগিতার পাশাপাশি শহর ও উপশহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মানুষই নয়, এর সুফল পশুপাখি ও পরিবেশও ভোগ করে।
তাই যারা মানুষ ও পশুপাখির কল্যাণে এ ধরনের উদ্যোগ নেবে, তারা সব শ্রেণির দোয়া পাবে। হাদিস শরিফে তাদের উত্তম ব্যক্তি বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যারা মানুষের কল্যাণে কাজ করে।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন মানুষ নিজে মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং অন্যরাও তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। যে ব্যক্তি মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে চলতে পারে না এবং অন্যদেরও আপন করে নিতে পারে না, তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। আর মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো সে, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (তাবারানি, আল-মু‘জামুল আওসাত)
অন্য এক বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হলো সে, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো কোনো মুসলিমকে আনন্দিত করা, তার কোনো দুঃখ-কষ্ট দূর করা, তার ঋণ পরিশোধে সাহায্য করা অথবা তার ক্ষুধা দূর করা।’ (তাবারানি, আল-মু‘জামুল আওসাত ও মু‘জামুস সাগির)
তাই মানুষের কল্যাণে যেকোনো উদ্যোগ নেওয়া যেমন সওয়াবের কাজ, তেমনি খাল খনন করাও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ। খাল খননের প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর একটি হলো পানির প্রবাহ ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। ফলে এটি পানির সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। যার সওয়াব উদ্যোক্তার আমলনামায় মৃত্যুর পর যেতে থাকবে। আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সাতটি আমলের সওয়াব বান্দার মৃত্যুর পর কবরে থাকা অবস্থায় তার জন্য জারি থাকে। যে ব্যক্তি কাউকে বিদ্যা শিক্ষা দেবে, অথবা খাল খনন করবে, অথবা কূপ খনন করবে, অথবা খেজুরগাছ লাগিয়ে যাবে, অথবা মসজিদ তৈরি করবে, অথবা পবিত্র কোরআনের উত্তরাধিকার রেখে যাবে অথবা এমন সন্তান রেখে যাবে যে মৃত্যুর পর তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে।’
(আত তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস : ৭৩)
অতএব, খাল খনন নিছক একটি উন্নয়নমূলক কাজ নয়, বিশুদ্ধ নিয়তে ইখলাসের সঙ্গে করলে ইসলামের দৃষ্টিতে এটি মানবকল্যাণ, পরিবেশ রক্ষা এবং পানির ব্যবস্থা করার মতো মহৎ ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের উচিত পানির উৎস সংরক্ষণ, খাল পুনঃখনন এবং নতুন খাল খননের মতো জনকল্যাণমূলক কাজে এগিয়ে আসা, সহযোগিতা করা। এসব কাজ দুনিয়ার উন্নয়নের পাশাপাশি আখিরাতের পাথেয়ও হতে পারে। মহান আল্লাহ সবাইকে জনকল্যাণমূলক কাজে ইখলাসের সঙ্গে অংশগ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমিন।