• ই-পেপার

মসজিদে নববীতে শুরু হচ্ছে বিশেষ শিক্ষামূলক কর্মসূচি

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৪৫

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

আল্লাহই সমুদ্রকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তাঁর আদেশে নৌযানগুলো চলাচল করতে পারে এবং যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পারো এবং যেন তোমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সবকিছু নিজ অনুগ্রহে, চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য তাতে আছে নিদর্শন।...যে সৎকর্ম করে সে তার কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সেই ভোগ করবে, অতঃপর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। (সুরা : জাসিয়া, আয়াত : ১২-১৫)

আয়াতগুলোতে মুমিনদের জীবিকা অনুসন্ধান ও গবেষণার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

 

১. জীবনোপকরণের সহজলভ্যতা মহান আল্লাহর দান। সুতরাং এ জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা আবশ্যক।

২. আয়াতে সমুদ্রে জীবিকা অনুসন্ধানের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। আয়াতটি সমুদ্রসম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ারও প্রমাণ।

৩. (১৩ নং) আয়াতটি মুমিনের জন্য মহাবিশ্ব জয়ের অনুপ্রেরণা দেয়। কেননা এতে মহাবিশ্বকে মানুষের অধীন করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

৪. চিন্তাশীল ও গষেকরা আল্লাহর পরিচয় লাভ ও সত্য সন্ধানে অন্যদের তুলনায় অগ্রগামী হয়ে থাকে।

৫. প্রতিকূল পরিবেশে মুসলিমরা দ্বন্দ্ব-সংঘাত এড়িয়ে চলবে। কেননা মক্কার মুশরিকরা রাসুলুল্লাহ (সা.) ও কোরআন নিয়ে উপহাস করলেও মুমিনদের সংঘাতে জড়াতে নিষেধ করা হয়। (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির : ১২-১৫)

প্রশ্ন-উত্তর

সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

প্রশ্ন-উত্তর

কোরবানির জন্য কেনা গরু হস্তান্তরের আগে মারা গেলে

প্রশ্ন : আমি কোরবানির ঈদের আগে এক গরু বিক্রেতার কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা মূল্য নির্ধারণ করে গরু ক্রয় করি। ২০ হাজার টাকা তাকে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাডভান্স করি, বাকি ৫০ হাজার টাকা ঈদের সকালে গরু হস্তান্তর করলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঈদের কিছুদিন আগে গরুটি মারা যায়। এখন আমার প্রশ্ন হলোএক. ইসলামের দৃষ্টিতে আমি কি আমার অ্যাডভান্সের ২০ হাজার টাকা ফেরত পাব, নাকি আমাকে বাকি ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে?

দুই. আমি গরুর সঙ্গে ছাগলও ক্রয় করেছিলাম। এখন আমাকে আবার নতুন গরু ক্রয় করতে হবে?

হাসান পারভেজ, খিলক্ষেত, ঢাকা

উত্তর : এক. প্রশ্নের বিবরন মতে বেচাকেনা সম্পন্ন হলেও গরুটি ক্রেতাকে হস্তান্তর না করায় এর দায়দায়িত্ব বিক্রেতার ওপর রয়ে যায়। এ অবস্থায় গরুটি মারা যাওয়ায় অ্যাডভান্স হিসেবে গ্রহণ করা টাকা ফেরত দেওয়া ক্রেতার জন্য আবশ্যক।

দুই. ছাগল কোরবানির মাধ্যমে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। পুনরায় গরু ক্রয় করে কোরবানি করা আবশ্যক নয়। (রাদ্দুল মুহতার : ৭/৯৪, ফাতাওয়ায়ে উসমানি : ৩/৮২)

 

বাইতুল হিকমাহ : ইতিহাসের পুনঃপাঠ

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
বাইতুল হিকমাহ : ইতিহাসের পুনঃপাঠ

আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগে, বিশেষ করে অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাগদাদকে কেন্দ্র করে যে বৈশ্বিক রেনেসাঁর সূচনা হয়েছিল, তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপই হলো বাইতুল হিকমাহ বা জ্ঞানের গৃহ। সমকালীন ইতিহাসচর্চায় বাইতুল হিকমাহকে প্রায়শই শুধু একটি বিশাল গ্রন্থাগার বা অনুবাদকেন্দ্র হিসেবে সরলীকরণ করা হয়। তবে গভীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি ছিল মূলত মধ্যযুগের প্রথম রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত একটি বহু সাংস্কৃতিক একাডেমি, যা মানবসভ্যতার প্রাচীন জ্ঞানভাণ্ডারকে স্রেফ সংরক্ষণই করেনি, বরং তার এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটিয়েছিল।

আব্বাসীয় খিলাফতের ভূ-রাজনীতি ও মেধার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ

উমাইয়া বংশের পতনের পর ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয়রা যখন খিলাফতের দায়িত্ব নেয়, তখন সাম্রাজ্যের কেন্দ্র দামেস্ক থেকে স্থানান্তরিত হয় বাগদাদে। দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মনসুর কর্তৃক ৭৬২ খ্রিস্টাব্দে টাইগ্রিস নদীর তীরে বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা শুধু একটি ভৌগোলিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল একটি বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন। উমাইয়াদের আরবকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের বিপরীতে আব্বাসীয়রা পারসিক, সিরিয়াক এবং ইহুদি বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করে।

খলিফা আল-মনসুর নিজের ব্যক্তিগত পাঠাগার খিজানাতুল হিকমাহ (জ্ঞানের ভাণ্ডার) দিয়ে যে যাত্রার সূচনা করেছিলেন, খলিফা হারুন আল-রশিদের আমলে তা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। তবে এই উদ্যোগ একটি পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে খলিফা আবদুল্লাহ আল-মামুনের (রাজত্বকাল : ৮১৩-৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ) সময়ে। খলিফা আল-মামুন ছিলেন যুক্তিবাদী মুতাজিলা দর্শনের অনুসারী। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঐশ্বরিক বাণীর সত্যতাকে অনুধাবন করার জন্যও মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও যুক্তির বিকাশ অপরিহার্য। এই দর্শন বাইতুল হিকমাহকে একটি রাজকীয় তোশাখানা থেকে মুক্তচিন্তার এক স্বাধীন চত্বরে পরিণত করে।

অনুবাদ আন্দোলন : একটি বহুমাত্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তর

বাইতুল হিকমাহর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈপ্লবিক অধ্যায় হলো এর অনুবাদ আন্দোলন। খলিফা আল-মামুন ঘোষণা করেছিলেন, যেকোনো দুর্লভ পাণ্ডুলিপির প্রমিত আরবি অনুবাদের বিনিময়ে অনুবাদককে সেই গ্রন্থের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করা হবে। এই অর্থনৈতিক উদ্দীপনা তৎকালীন পৃথিবীর পণ্ডিত সমাজকে বাগদাদমুখী করতে বাধ্য করেছিল।

তবে এই অনুবাদ আন্দোলন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তৎকালীন প্রধান অনুবাদক, একজন নেস্টোরিয়ান খ্রিস্টান পণ্ডিত হুনায়ন ইবনে ইশহাকের নেতৃত্বে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে কাজ চলত। প্রথমে গ্রিক বা সংস্কৃত মূল পাঠকে সিরিয়াক ভাষায় এবং পরে তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আরবিতে রূপান্তর করা হতো। প্লেটোর রিপাবলিক, অ্যারিস্টটলের মেটাফিজিকস, ইউক্লিডের এলিমেন্টস, টলেমির অ্যালমাজেস্ট থেকে শুরু করে চিকিৎসাবিজ্ঞানী গ্যালেন ও হিপোক্রেটিসের সব কাজ আরবিতে অনূদিত হয়। একই সঙ্গে প্রাচীন ভারতের ব্রহ্মগুপ্তের গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের আকর গ্রন্থ ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত আরবিতে সিন্ধিন্দ নামে অনূদিত হয়ে আরবদের শূন্য এবং দশমিক পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র। খলিফার দরবারে মেধার মূল্যায়ন হতো, ধর্মের নয়। ফলে খ্রিস্টান, ইহুদি, পারসিক, জরোস্ট্রিয়ান এবং হিন্দু পণ্ডিতরা একই ছাদের নিচে বসে সভ্যতার অভিন্ন জ্ঞানভাণ্ডার তৈরি করছিলেন। এটি ছিল মধ্যযুগের বুকে দাঁড়িয়ে এক চরম আধুনিক বৈশ্বিকীকরণের রূপরেখা।

অনুবাদের গণ্ডি পেরিয়ে মৌলিক বিজ্ঞান ও দর্শন

ইউরোপীয় অনেক ঐতিহাসিক দীর্ঘদিন ধরে দাবি করার চেষ্টা করেছেন যে,আরবরা শুধু গ্রিক জ্ঞানের সংরক্ষক বা পাহারাদার ছিল। কিন্তু আধুনিক নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চায় এই দাবি সম্পূর্ণ খণ্ডিত ও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বাইতুল হিকমাহর পণ্ডিতরা শুধু অনুবাদ করেননি, তাঁরা প্রাপ্ত জ্ঞানকে কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করেছিলেন।

গণিতশাস্ত্রে বিপ্লব : মোহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি ভারতীয় ও গ্রিক গণিতকে বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারার জন্ম দেন, যা আজ আল-জাবর বা বীজগণিত নামে পরিচিত। তাঁর প্রণীত পদ্ধতিই আজকের ডিজিটাল পৃথিবীর মূল ভিত্তি অ্যালগরিদম

বলবিদ্যা ও প্রকৌশল : বনু মুসা ভ্রাতৃদ্বয় (আহমদ, মুহাম্মদ ও হাসান) তাঁদের কিতাব আল-হিয়াল গ্রন্থে শতাধিক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের নকশা প্রণয়ন করেন, যা আধুনিক সাইবারনেটিক্স এবং রোরটিক্সের আদি উৎস।

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মানমন্দির : খলিফা আল-মামুনের প্রত্যক্ষ অর্থায়নে বাগদাদের শাম্মাসিয়া এবং দামেস্কে দুটি সর্বাধুনিক মানমন্দির স্থাপিত হয়। এখানকার বিজ্ঞানীরা টলেমির মহাজাগতিক হিসাবের ত্রুটিগুলো সংশোধন করেন এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পৃথিবীর পরিধি ও অক্ষের হেলে থাকা পরিমাপ করেন।

কাগজের সহজলভ্যতা ও মেধার গণতন্ত্রীকরণ

বাইতুল হিকমাহর এই বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের পেছনে একটি প্রযুক্তিগত অনুঘটক কাজ করেছিলতা হলো কাগজের আবিষ্কার। ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে তলাসের যুদ্ধে বান্দ চীনা কারিগরদের কাছ থেকে আরবরা কাগজ তৈরির কৌশল আয়ত্ত করে। বাগদাদে প্রথম কাগজের কল স্থাপনের ফলে পার্চমেন্ট বা পশুর চামড়ার ওপর নির্ভরতা হ্রাস পায়। কাগজের এই সহজলভ্যতা জ্ঞানকে উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুম থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে আসে। বাগদাদের সুক আল-ওয়াররাকিন বা কাগজ বিক্রেতাদের বাজারে শত শত লাইব্রেরি ও প্রকাশনা সংস্থা গড়ে ওঠে, যা জ্ঞানকে সমাজে সমবণ্টন বা গণতন্ত্রীকরণ করতে সাহায্য করেছিল।

পতন : একটি সভ্যতার অকাল বিস্মৃতি

ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়টি রচিত হয় ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ফেব্রুয়ারি। মোঙ্গল সেনাপতি হালাকু খানের নেতৃত্বে মোঙ্গল বাহিনী বাগদাদ অবরোধ করে খিলাফতের অবসান ঘটায়। এই ধ্বংসযজ্ঞ শুধু একটি রাজনৈতিক পরাজয় ছিল না, এটি ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক বিপর্যয়। মোঙ্গলরা বাইতুল হিকমাহর শত বছরের সংগৃহীত লাখ লাখ পাণ্ডুলিপি টাইগ্রিস নদীতে ফেলে দেয়। সমকালীন ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন এবং অন্যদের বিবরণী অনুযায়ী, বইয়ের কালির কারণে টাইগ্রিস নদীর পানি কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছিল এবং মানুষের রক্তে বাগদাদের মাটি লাল হয়ে গিয়েছিল। এই পতনের পর মুসলিম বিশ্ব তার জ্ঞানতাত্ত্বিক নেতৃত্ব চিরতরে হারিয়ে ফেলে, যার ধাক্কা আজ পর্যন্ত তারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।      

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মানার

মহাখালী, ঢাকা

যে দুই অঙ্গের পাপ ধ্বংসের অন্যতম কারণ

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
যে দুই অঙ্গের পাপ ধ্বংসের অন্যতম কারণ

মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদা দিয়েছেন। তাদের সুন্দরতম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। তাদের এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তারা অন্য সব মাখলুকের ওপর রাজত্ব করতে পারে। মানুষকে মহান আল্লাহ যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করেছেন, তার মধ্যে দুটি অঙ্গ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১. জিহ্বা ও ২. লজ্জাস্থান। এ দুটি অঙ্গের সঠিক ব্যবহার যেমন মানুষের মর্যাদা, ইজ্জত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম হতে পারে, তেমনি এগুলোর অপব্যবহারে তার দুনিয়া ও আখিরাত ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই ইসলাম এ দুটি অঙ্গ সংরক্ষণের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে।

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু (জিহ্বা) এবং দুই ঊরুর মাঝখানের বস্তুর (লজ্জাস্থান) জামানত আমাকে দেবে, আমি তার জান্নাতের জিম্মাদার। (বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৪)

সাধারণত এই দুটি অঙ্গ দিয়েই মানুষ জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়। অথচ মানুষ মুখ দিয়ে যা বলে, সব তাৎক্ষণিক লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, যে কথাই মানুষ উচ্চারণ করে (তা সংরক্ষণের জন্য) তার নিকটে একজন সদা তৎপর প্রহরী আছে। (সুরা : কাফ, আয়াত : ১৮)

অতএব মানুষ তার জিহ্বাকে ব্যবহার করে গিবত, চোগলখুরি, গালিগালাজ, অপবাদ, মিথ্যা কথা, নাশোকরিমূলক উক্তি ও এজাতীয় অন্যান্য যে পাপাচারেই লিপ্ত হয়, সবই সংরক্ষিত হয়ে যায়। যেগুলোর পরিণতি খুবই ভয়াবহ। পবিত্র কোরআন গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করার সঙ্গে তুলনা করেছে। (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)

চোগলখোরদের বিশ্বাস করতে নিষেধ করা হয়েছে। (সুরা : কলম, আয়াত : ১১)। এমনিভাবে মিথ্যা, অপবাদ, গালাগালের  ভয়াবহতা নিয়ে বহু আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে।

মানুষের মুখের কথা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। কখনো কখনো একটি কথার কারণে মানুষের অনেক বড় বিপদ নেমে আসতে পারে, তার দুনিয়া-আখিরাত ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন যে নিশ্চয় বান্দা পরিণাম চিন্তা ব্যতিরেকেই এমন কথা বলে, যে কথার কারণে সে ঢুকে যাবে জাহান্নামের এমন গভীরে, যার দূরত্ব পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্বের চেয়েও বেশি।

(বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৭)

এ জন্য আল্লাহ মুখের জোর দিলেই তা দিয়ে মানুষকে হেয় করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, ঝগড়া করা, গালাগাল দেওয়া ও মিথ্যা ও কুফরি কথা বলার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে লজ্জাস্থানের পাপ মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। এ জন্য ইসলাম ব্যভিচারকে শুধু হারামই করেনি; বরং তার নিকটবর্তী হওয়ার পথও নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ। (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩২)

মুমিন কখনো এই পথে পা বাড়াতে পারে না। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে আল্লাহ বলেন, আর তারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী।

(সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৫)

কিয়ামতের দিন যেসব অঙ্গের পাপের কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষ জাহান্নামে যাবে, তার মধ্যে অন্যতম হলো এই দুটি অঙ্গ। রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে নিক্ষেপ করে? তিনি উত্তর দেন, মুখ ও লজ্জাস্থান। (তিরমিজি, হাদিস : ২০০৪)

বস্তুত জিহ্বা ও যৌন প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণই তাকওয়ার অন্যতম পরিচায়ক। যে ব্যক্তি গিবত, মিথ্যা, অপবাদ, অশ্লীল ভাষা ও কু-কথা থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং ব্যভিচার ও অশ্লীলতার সব পথ বন্ধ রাখে, সে নিজের ঈমান, সম্মান ও আখিরাতকে নিরাপদ রাখে। আর যে ব্যক্তি এ দুটি অঙ্গকে লাগামহীন ছেড়ে দেয়, সে নিজের হাতে নিজের ধ্বংস ডেকে আনে। তার পাপে দুনিয়া-আখিরাত ভারী হয়ে ওঠে। যাকে তার উভয় জাহানের লাঞ্ছনাকে ত্বরান্বিত করে। তাই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো সর্বদা জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করা। কেননা এ দুটির সঠিক ব্যবহার জান্নাতের পথ সুগম করে এবং অপব্যবহার জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়।