আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই তুঙ্গে উঠতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় আসে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। তৈরি হয় জুলাই অভ্যুত্থান। বিদায় নিতে বাধ্য হয় আওয়ামী লীগ সরকার। এই ধারাবাহিক সংগ্রামে বহু মানুষকে আত্মাহুতি দিতে হয়েছে, নির্যাতিত-নিগৃহীত হতে হয়েছে। তাদের সবাইকে মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে। সেই সত্যই প্রতিধ্বনিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কণ্ঠে। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে গত শনিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই শহীদ, জুলাই যোদ্ধা এবং বিগত ১৭ বছরে যতজন শহীদ হয়েছেন, তাঁদের প্রতি যদি সম্পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করতে হয়, তাহলে যার জন্য তাঁরা আত্মত্যাগ করেছেন, সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, ‘এটি হোক আজকের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের গৃহীত শপথ, এটি হোক আজকের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের গৃহীত প্রতিজ্ঞা।’
মানুষ তাদের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিল। আর তা করতে গিয়ে অনেককে জীবন দিতে হয়েছে। গুম-খুনের শিকার হতে হয়েছে। শহীদদের পরিবার এবং আহতদের কণ্ঠেও ছিল এর জন্য দায়ী প্রত্যেকের বিচার নিশ্চিত করার আহবান। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সেই দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তাঁর সরকারের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি তিনি এটিও বলেন যে বিচারের নামে অতীতের মতো প্রহসন যেন না হয়, বিচারের নামে যেন অবিচার না হয়, সেদিকেও সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যদি আজ আমার মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, গত ১৭ বছরে তাঁর ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, তিনি কি তার প্রতিশোধ চান? আমি নিশ্চিত, তিনি বলতেন, প্রতিশোধ নয়, দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে এগিয়ে যাও।’ তাঁর এই উপলব্ধি দেশের জন্য আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যন্ত সময়োপযোগী। দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকারত্ব ক্রমেই বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। অথচ ১৭ বছরে যাঁরা আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের সবাই একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে হলে কিংবা দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সবারই উপলব্ধি করতে হবে—আজ প্রতিশোধ নয়, ঐক্যের প্রয়োজন।
‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি’র যৌথ উদ্যোগে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জুলাই স্মৃতি স্মারক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি প্রথমেই বলেছি, রাষ্ট্র তার যথাসাধ্য দিয়ে আপনাদের মূল্যায়নের চেষ্টা করবে। আপনাদের আত্মত্যাগকে মূল্যায়ন করবে। কিন্তু একই সঙ্গে আপনাদের আত্মত্যাগকে যে রকম মূল্যায়ন করবে, আপনাদের বিরুদ্ধে যে অন্যায় হয়েছে, যেভাবে আপনার আপনজনকে হত্যা করা হয়েছে, অবশ্যই তার জন্য যারা দায়ী, তাদেরও বিচার হবে এই দেশের আইনে।’
আমরা বিশ্বাস করি, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেকেরই বিচার পাওয়ার অধিকার আছে এবং রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে আন্দোলন করেছিল, সেই প্রত্যাশিত পথে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

