চিকিৎসাবিজ্ঞান উন্নত হচ্ছে। স্বাস্থ্য সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ছে। ফলে বাড়ছে মানুষের গড় আয়ু। বাড়ছে বয়োবৃদ্ধ বা প্রবীণ মানুষের সংখ্যা। যত দিন যাবে এই সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে একই সঙ্গে বাড়ছে প্রবীণ মানুষের দুর্ভোগ, অসহায়ত্ব ও জীবন-যন্ত্রণা। সম্প্রতি গণমাধ্যমে আসা দুটি খবর বিবেকসম্পন্ন প্রতিটি মানুষের হৃদয়-যন্ত্রণার কারণ হয়েছে। মিরপুরে এক বাসায় একাকী মরে পড়ে ছিলেন এক মা, যাঁর শরীরে ঘা হয়ে গিয়েছিল। অথচ তাঁর দুই ছেলে ঢাকায়ই অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত। মিরপুরেই আরেক ফ্ল্যাট থেকে এক মায়ের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যাঁর স্বামী-সন্তান বিদেশে থাকেন। এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে।
গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অনেক প্রবীণের এমনই দুর্দশার করুণ চিত্র উঠে এসেছে। কেউ নিজের বাড়ি বা ফ্ল্যাটে একা থাকেন। কেউ প্রবীণনিবাসের ছোট্ট কুঠরির চার দেয়ালে বন্দি হয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করছেন। অনেকে সন্তান-স্বজনদের দেখা পাবেন—এমন আশাও ছেড়ে দিয়েছেন। আবার যাঁদের নিজের সংগতি কম, প্রবীণনিবাসের খরচ জোগানোর ক্ষমতা নেই, তাঁদের কী অবস্থা? প্রতিনিয়ত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে সন্তানের সংসারে মুখ গুঁজে কোনো রকমে পড়ে থাকতে হয়। মৃত্যু কেন আসে না বলে আক্ষেপ করতে হয়। অনেকের অবস্থা হয় আরো খারাপ। নিকট অতীতে বৃদ্ধ মা-বাবাকে দূরে কোথাও রাস্তার ধারে বা জঙ্গলে ফেলে আসার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের (বাইগাম) মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইন্তেজার রহমান বলেন, ‘এখানে যাঁরা আসেন, বাধ্য হয়েই আসেন। পরিবারের লোকজন এসে দেখা করে যায়। কিন্তু দিনশেষে তাঁরা একাকী। এটাই বাস্তবতা। তাঁদের একেকজনের একেক ধরনের কষ্ট।’ তিনি জানান, ঢাকাসহ সারা দেশে তাঁদের মোট ৯২টি শাখায় ১০ থেকে ১২ হাজার প্রবীণ থাকেন। প্রবীণ হিতৈষী লেখক ও সংগঠক হাসান আলী বলেন, ‘আগে প্রবীণদের আড্ডা দেওয়ার জায়গা ছিল। গল্প করতে পারতেন। এখন অনেকের জীবন চার দেয়ালে আটকে গেছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সময় যত যাবে, দেশে প্রবীণের সংখ্যা তত বাড়বে। তবে এখন যেহেতু যৌথ পরিবারের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই প্রবীণদের একাকিত্ব বাড়ছে। নিঃসঙ্গতার ফলে তাঁদের মধ্যে মৃত্যুভয়, বিষণ্নতা, মেজাজ খিটখিটে হওয়াসহ নানা শারীরিক ও মানসিক রোগ দেখা দেয়।’
মা-বাবার ভরণ-পোষণের বিষয়ে আইন আছে, কিন্তু আইনের বাস্তবায়ন নেই। আর যেখানে পারিবারিক বন্ধন, ভালোবাসা, মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে; সেখানে আইন কতটুকুই বা করতে পারবে! রাষ্ট্র ও সমাজকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। পদক্ষেপ নিতে হবে। আনন্দময় শৈশবের মতোই আনন্দময় বার্ধক্য নিশ্চিত করতে হবে।

