দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাবানল তখন পুরো ইউরোপকে গ্রাস করেছে। আকাশজুড়ে নািস যুদ্ধবিমানের গর্জন আর নিচে ধ্বংসস্তূপের আর্তনাদ। চারদিকে যখন মারণাস্ত্র তৈরির হিড়িক, ঠিক সেই সময়ই ইংল্যান্ডের গ্লুচেস্টারশায়ারের এক নির্জন পাহাড়ি এলাকায় জন্ম নিল এক অদ্ভুত বিদ্যাপীঠ। যুদ্ধের ধ্বংসলীলার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি চেয়েছিল নতুন এক পৃথিবী গড়তে। এর পোশাকি নাম ছিল ‘সার্ভিস ইন্টারন্যাশনাল ভলান্টারি ট্রেনিং সেন্টার’, কিন্তু সবার কাছে এটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘দ্য ক্যাম্প’ নামে। ব্যতিক্রমী এই প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে ছিলেন ব্রিটিশ শান্তিকামী সমাজকর্মী এবং কোয়াকার আন্দোলনের সদস্য পিয়েরে সেরেজোল। ১৯৪০ সালের সেই দিনগুলোতে লন্ডন যখন জার্মান বোমায় জ্বলছে, তখন সেরেজোল এবং কিছু স্বপ্নবাজ শিক্ষক মিলে এই পরিকল্পনা করেন। তাঁদের ভাবনা ছিল সোজাসাপ্টা—যুদ্ধ আজ হোক বা কাল, শেষ হবেই; কিন্তু তারপর? শহরগুলোর যখন কঙ্কালসার দশা হবে, মানুষ যখন খেতে না পেয়ে মরবে, তখন শুধু রাজনৈতিক ভাষণ দিয়ে দেশ বাঁচানো যাবে না। প্রয়োজন হবে একদল প্রশিক্ষিত মানুষের, যারা ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে নতুন করে সভ্যতা গড়ার কারিগরি জানবে। এই বিদ্যাপীঠের পাঠ্যক্রম ছিল বর্তমান সময়ের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও রোমাঞ্চকর। সেখানে ক্লাসরুমে বসে গতানুগতিক তত্ত্ব পড়ার বদলে ছাত্রদের শিখতে হতো কিভাবে বোমায় বিধ্বস্ত একটি সেতু দ্রুত মেরামত করা যায়, কিভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় কলেরার মতো মহামারি রুখতে হয়, কিংবা হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য তাঁবু গেড়ে অস্থায়ী শহর তৈরি করতে হয়। এটি ছিল মূলত এক ‘শান্তি-সেনা’ তৈরির কারখানা। সকালবেলা ছাত্ররা ক্লাসে আন্তর্জাতিক আইন বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাঠ নিত, আর রাতে যখন লন্ডন বা নিকটবর্তী শহরগুলোতে নািস বাহিনীর বোমা পড়ত, তারা দল বেঁধে সেখানে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাদের জন্য যুদ্ধ ছিল এক জীবন্ত ল্যাবরেটরি। প্রশিক্ষণার্থীদের শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা বাড়ানোর জন্য কঠোর ডিসিপ্লিনের মধ্য দিয়ে যেতে হতো, যেন যেকোনো জরুরি অবস্থায় তারা বিচলিত না হয়।
দ্য ক্যাম্পের ছাত্ররা শুধু তাত্ত্বিক শিক্ষা নিয়েই বসে ছিল না। যুদ্ধের শেষ দিকে এবং যুদ্ধোত্তর সময়ে তারা গ্রিস, ফ্রান্স ও ইতালির দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ ও পুনর্গঠন কাজে সরাসরি অংশ নিয়েছিল। তারা বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য ঘর বানানো, কৃষিজমি পুনরুদ্ধার এবং আহত সৈনিকদের সেবায় নিয়োজিত ছিল। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৪৪ সালে যখন মিত্রবাহিনী ইউরোপে এগোতে শুরু করে, তখন এই ক্যাম্পের প্রশিক্ষিত কর্মীরাই ছিল প্রথম কাতারের মানবিক স্বেচ্ছাসেবক।
তাঁরা সেনাবাহিনীর সমান্তরালে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যেখানে সরকারি ত্রাণ পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, সেখানে এই ক্যাম্পের গ্র্যাজুয়েটরা স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করেই মানুষের প্রাথমিক চাহিদা মিটিয়ে ফেলছে। পিয়েরে সেরেজোলের সেই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা থেকেই মূলত পরবর্তীকালে জন্ম নেয় সার্ভিস সিভিল ইন্টারন্যাশনাল (এসসিআই), যা আজও বিশ্বজুড়ে এক বিশাল স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক হিসেবে সক্রিয়। বর্তমানে এই সংগঠনের শাখা ৯০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বেলজিয়ামে এর সদর দপ্তর থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিস্তৃত ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা জুড়ে। পাশের দেশ ভারত এবং আমাদের বাংলাদেশেও এদের বিভিন্ন কার্যক্রম ও সহযোগী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই শান্তিবাদী আদর্শিক প্রভাব লক্ষ করা যায়।
বর্তমান সময়ে সংগঠনটি শুধু যুদ্ধ নয়, জলবায়ু পরিবর্তন, শরণার্থী সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে কাজ করে। তারা বিভিন্ন দেশে ইন্টারন্যাশনাল ভলান্টারি প্রজেক্ট বা ওয়ার্ক ক্যাম্প পরিচালনা করে, যেখানে বিভিন্ন দেশের তরুণরা একত্রিত হয়ে স্থানীয় কমিউনিটির উন্নয়নে কাজ করে, ঠিক যেমনটি গ্লুচেস্টারশায়ারের সেই পাহাড়ি ক্যাম্পে শুরু হয়েছিল। শান্তি রক্ষা ও আন্তর্জাতিক সংহতি স্থাপনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ এই সংগঠনকে ‘পিস মেসেঞ্জার’ খেতাবে ভূষিত করে।




