অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানামুখী সংকটে আছে দেশের অর্থনীতি। অর্থনীতির প্রাণ বেসরকারি শিল্প খাত ধুঁকছে। বহু শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হওয়ার পথে। এই পরিস্থিতিতে সমস্যায় থাকা শিল্প খাতকে টেনে তোলার জন্য বিএনপি সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়ে দেশের রুগ্ণ ও বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে বলেছেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রুগ্ণ শিল্প-কারখানাকে ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগিয়ে এসেছে ব্যাংকিং খাতও। গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গভীর আর্থিক সংকটে থাকা দেশের বৃহৎ একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপকে বাঁচাতে এর বিপুল ঋণ পুনর্গঠনের যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে দেশের ৩৬টি ব্যাংক।
ভোগ্যপণ্য, খাদ্যপণ্য, ভোজ্যতেল, চিনি, ময়দা, সিমেন্ট, স্টিল, কাগজসহ বিভিন্ন খাতে সিটি গ্রুপের কার্যক্রম রয়েছে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসা পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা বলে জানা গেছে। গ্রুপটিতে সরাসরি প্রায় ২৫ হাজার মানুষ কর্মরত। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট দীর্ঘ মেয়াদে গভীর হলে এর প্রভাব শুধু একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সরবরাহব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতগুলোতেও এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
জানা যায়, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, চলতি মূলধনের ঘাটতি, ব্যাংক সহায়তা কমে যাওয়া এবং নতুন প্রকল্পে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় শিল্প গ্রুপটির আর্থিক সংকট ক্রমেই প্রকট হয়েছে। গ্রুপের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। তাঁর দাবি, ২০২২ সালের পর থেকে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে সিটি গ্রুপের ক্ষতির পরিমাণ দুই হাজার ৫০০ কোটির টাকার বেশি। পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে ব্যাংকিং খাতের চলমান অস্থিরতা। সিটি গ্রুপের দাবি, অতীতে যেসব ব্যাংক বড় অঙ্কের চলতি মূলধন সহায়তা দিত, তাদের অনেকেই এখন আগের মতো সহায়তা দিতে পারছে না। কম্পানির তথ্য অনুযায়ী, মুন্সীগঞ্জে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে নির্মিত ছয়টি প্রকল্প উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত থাকলেও গ্যাস না পাওয়ায় সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। অথচ সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ, বেতন এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মতে, সিটি গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সচল রাখা শুধু প্রতিষ্ঠানটির জন্য নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং খাত, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ঋণগুলো তাৎক্ষণিকভাবে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করে একটি সমন্বিত পুনর্গঠন কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা মনে করছেন, কোনো একটি ব্যাংক এককভাবে পদক্ষেপ নিলে ঝুঁকি ও ক্ষতির আশঙ্কা বাড়তে পারে। কিন্তু সব ব্যাংক সমন্বিতভাবে এগোলে ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাঁদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বড় করপোরেট ঋণ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
দেশে বিনিয়োগ বা শিল্পায়নকে এগিয়ে নিতে হলে বিনিয়োগের পরিবেশ এবং স্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দেশি-বিদেশি সব উদ্যোক্তার কাছেই নেতিবাচক বার্তা যাবে। তাই ঋণ পুনর্গঠন, পর্যাপ্ত চলতি মূলধন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং নীতিগত সহায়তার সমন্বয় ঘটাতে হবে। আমরা মনে করি, শিল্প সুরক্ষায় বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো অবশ্যই সফল হবে।

