মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে দুইজনের মৃত্যুর ঘটনায় থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় গায়ক টিক শিরোকে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। আশির দশকের শেষভাগ ও নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই শিল্পীকে তার পোশাক-পরিচ্ছদ ও নাচের ধরন দেখে অনেকেই ‘থাইল্যান্ডের মাইকেল জ্যাকসন’ বলে ডাকতেন।
টিক শিরোর আসল নাম মানাসাউইন নানতাসেন। বুধবার ব্যাংককের একটি ফৌজদারি আদালত তাকে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে এই সাজা দেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবরে ৬৪ বছর বয়সী এই গায়ক ব্যাংককের একটি সেতু দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেন। মোটরসাইকেলটি তখন সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলে থাকা ২৮ বছর বয়সী এক নারী ঘটনাস্থলেই মারা যান। তার ২১ বছর বয়সী ভাই গুরুতর আহত হয়ে সেতু থেকে নিচে পড়ে যান। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে টিক শিরোকে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখা যায়। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
এই ঘটনা থাইল্যান্ডে বিশেষভাবে আলোচিত হয়, কারণ দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে এমন ধারণা রয়েছে যে ধনী, প্রভাবশালী বা বিখ্যাত ব্যক্তিরা অনেক সময় আইনের কঠোর শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারেন। রায়ের পর আদালত এক বিবৃতিতে জানায়, মানাসাউইন নানতাসেন তদন্তে সহযোগিতা করেছেন এবং স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছেন। এ ছাড়া মামলার বিচারকাজে সহায়ক তথ্যও দিয়েছেন। আদালত আরো উল্লেখ করে, তিনি নিহতদের শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছেন এবং নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন। এসব পদক্ষেপ তার অনুশোচনার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে আদালত শুধু কারাদণ্ডই দেননি, তার ড্রাইভিং লাইসেন্সও বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে একই দিনে থাইল্যান্ডে আরেকটি আলোচিত আইনি ঘটনা ঘটে। জনপ্রিয় রক সংগীতশিল্পী সেক লোসো মাদক এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রাখার মামলায় এক বছরের বেশি সময় কারাভোগের পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
তবে থাইল্যান্ডে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। দেশটিতে অতীতের বেশ কয়েকটি আলোচিত মামলাও এ ধরনের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
২০১২ সালে বিশ্বখ্যাত এনার্জি ড্রিংক ব্র্যান্ড ‘রেড বুল’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা চালেও যোবিদ্যার নাতি এবং কম্পানির উত্তরাধিকারী ভোরায়ুথ যোবিদ্যার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তিনি ব্যাংককের একটি অভিজাত এলাকায় ফেরারি গাড়ি চালিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ধাক্কা দিয়ে হত্যা করেন। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত হলেও শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
এ ছাড়া ২০০১ সালে প্রবীণ থাই রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য চালর্ম ইউবামরুংয়ের এক ছেলের বিরুদ্ধে ব্যাংককের একটি নাইটক্লাবে বিরোধের জেরে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে। তবে পরে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় তিনি আদালত থেকে খালাস পান।
সাম্প্রতিক রায়কে অনেক পর্যবেক্ষক থাইল্যান্ডের বিচারব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তবে দেশটিতে ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।