মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আর কোনো হামলা না করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। এই অবস্থায় নতুন হামলা পুরো প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিতে পারে।
মোহাম্মদ বাকের কালিবাফকে এক বার্তায় রবিবার (১৪ জুন) ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এমন একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, যা এই অঞ্চলে শান্তি আনতে পারে।’ তিনি সবাইকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এটা নষ্ট করে ফেলবেন না।'
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কিছুক্ষণ আগেই ইসরায়েলের সেনাবাহিনী জানায়, তারা লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহর বিভিন্ন অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে। এই হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। লেবাননের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, হামলার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া আহত অবস্থায় আরো ছয়জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বৈরুতের বিভিন্ন এলাকায় আকাশে ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর দুই দিন পর, ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এর পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভেতরে গত ২৫ বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক গুরুতর অভিযান চালিয়েছে। ইরান চায়, যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যে লেবাননের সংঘাতও অন্তর্ভুক্ত থাকুক।
ইরান এই হামলার জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, হামলার উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব হিসেবেই বৈরুতে এই অভিযান চালানো হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, হিজবুল্লাহ তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। এক যৌথ বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেন, 'নিজেদের ভূখণ্ডে হামলা কোনোভাবেই মেনে নেবে না ইসরায়েল।’ এরপর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় তারা উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, বৈরুতে একটি পাঁচতলা ভবনে হামলা হয়েছে। ভবনটির নিচতলায় দোকান ছিল। বিস্ফোরণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিচের দুটি তলা। হামলার পর দক্ষিণ বৈরুতের অনেক বাসিন্দাকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে দেখা গেছে। এই হামলা এমন একসময়ে হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। ট্রাম্প আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, রবিবারই চুক্তিটি স্বাক্ষর হতে পারে। তবে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চুক্তি এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা বাকি রয়েছে।
ইরানের প্রধান আলোচকদের একজন এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ইসরায়েলের হামলার পর এক্সে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেন। তিনি লেখেন, ‘আপনারা যদি নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ইচ্ছা ও সক্ষমতা না রাখেন, তাহলে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বা কথা বলার কোনো সুযোগ নেই।’ অন্যদিকে ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ডের উপপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ জাফর আসাদি বলেছেন, বৈরুতে হামলার জবাব অবশ্যই দেওয়া হবে।
গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা রবিবার ইরানে গিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করেছেন। তারা আশাবাদী যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের মতে, সম্ভাব্য চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত অনেকটাই কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি আবারও পুরোপুরি খুলে দেওয়ার পথ তৈরি হতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন ঘটায় সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। তবে চুক্তির অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং বিদেশে আটকে থাকা দেশটির শত শত কোটি ডলারের সম্পদ। সূত্রগুলো বলছে, এসব জটিল বিষয়ে সমাধানের জন্য চুক্তিতে একটি আলাদা আলোচনার কাঠামো রাখা হতে পারে। সেখানে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক আলোচনা চালানোর সুযোগ থাকবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ শনিবার (১৩ জুন, ২০২৬) জানিয়েছেন, রবিবারই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, এটি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেও হতে পারে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো সরাসরি অনুষ্ঠান ছাড়াই ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে। তবে এটি কখন এবং কীভাবে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরান সরকার সতর্ক করে বলেছে, এই চুক্তি নিয়ে দেশের ভেতরে বিভক্তি তৈরি হলে আলোচনায় তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। যারা আলোচকদের সমালোচনা করছেন, তারা মূলত জাতীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন বলে মন্তব্য করেছে কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনাকে দেওয়া এক বক্তব্যে মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বলেন, ‘ইরানিদের বোঝা উচিত, কোনো যুদ্ধই চিরকাল স্থায়ী হয় না।’
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪৪১ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এর বিশুদ্ধতার মাত্রা ৬০ শতাংশ, যা অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার কাছাকাছি। তবে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তারা এখনো প্রকাশ্যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ধারণা করা হয়, এসব ইউরেনিয়াম তিনটি পারমাণবিক স্থাপনার নিচে রাখা আছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সেসব স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
এদিকে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কিছু সমালোচক বলছেন, আলোচনায় থাকা চুক্তিটি ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে খুব বেশি ভালো নয়। অথচ প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প নিজেই যুক্তরাষ্ট্রকে সেই চুক্তি থেকে বের করে এনেছিলেন।
এদিকে আশা করা হচ্ছে, আজ শুরু হওয়া জি-সেভেন এর শীর্ষ সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণের বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প আলোচনা করবেন।




