• ই-পেপার

বিচারের জন্য বেনজীরকে ফেরাতেই হবে

প্রতিহিংসার রাজনীতি ছেড়ে পুনর্মিলনের বাংলাদেশ

আহসান হাবিব বরুন
প্রতিহিংসার রাজনীতি ছেড়ে পুনর্মিলনের বাংলাদেশ

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছরের দীর্ঘ কারাবাস, অকথ্য নির্যাতন, বর্ণবাদী শাসনের নির্মমতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের অসংখ্য ক্ষত বুকে নিয়েও তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। বরং তিনি বেছে নিয়েছিলেন ক্ষমা, পুনর্মিলন এবং জাতি গঠনের পথ। কারাগারের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে তিনি প্রতিশোধ নয়, জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, ঘৃণা আর ঘৃণার জন্ম দেয়, প্রতিশোধ আরেকটি প্রতিশোধকে ডেকে আনে; কিন্তু ক্ষমা একটি জাতিকে নতুন করে বাঁচার সুযোগ দেয়।

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য শুনতে গিয়ে বারবার নেলসন ম্যান্ডেলার সেই মানবিক দর্শনের কথাই মনে পড়ে। রাজনৈতিক মতাদর্শ, দলীয় অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে যদি একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে—ব্যক্তিগত নির্যাতনের স্মৃতি পেছনে ফেলে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে আহ্বান তারেক রহমান জানিয়েছেন, তার মধ্যে ম্যান্ডেলার দর্শনের এক সুস্পষ্ট প্রতিধ্বনি রয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ব্যক্তিগত ক্ষোভ, প্রতিশোধ কিংবা অতীতের নির্যাতনের হিসাব মেলানোর পরিবর্তে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করাই হওয়া উচিত সবার প্রধান লক্ষ্য।

এই বক্তব্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হলে আমাদের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের রাজনীতি প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ, বিভাজন এবং পাল্টাপাল্টি দমন-পীড়নের সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা বহুবার দেখা গেছে। ফলে জাতীয় উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই অনেক সময় প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তারেক রহমানের বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তিনি নিজেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি কারাবরণ করেছেন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমনকি এখনো তার শরীরে সেই নির্যাতনের চিহ্ন বহন করছেন। তার ভাষায়, এক্স-রে করলে এখনো দেখা যাবে তার পিঠের একটি হাড় বাঁকা হয়ে জোড়া লেগে আছে। কিন্তু এই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা বলার পর তিনি যে প্রশ্নটি করেছেন, সেটিই একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রশ্ন—‘আমি যদি তাদের সঙ্গে একই আচরণ করি, তাহলে কি আমার হাড় জোড়া লাগবে?’

আমি মনে করি, এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তারেক রহমানের একটি গভীর রাজনৈতিক দর্শন।

নেলসন ম্যান্ডেলা যখন কারাগার থেকে মুক্তি পান, তখন দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা বর্ণবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ম্যান্ডেলা বুঝেছিলেন, প্রতিশোধ একটি জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে পারে না। তাই তিনি জাতীয় পুনর্মিলনের পথ বেছে নিয়েছিলেন।

তারেক রহমানের বক্তব্যেও আমরা একই ধরনের উপলব্ধির প্রতিফলন দেখতে পাই। তিনি বলেছেন, প্রতিশোধ নিলে তার হারানো সময় ফিরে আসবে না, নির্যাতনের ক্ষতও মুছে যাবে না। তাই অতীতের ক্ষত নিয়ে পড়ে না থেকে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ধরনের ভাষা খুব বেশি শোনা যায়নি। কারণ রাজনীতিতে প্রতিশোধের ভাষা সহজ, ক্ষমার ভাষা কঠিন। ঘৃণা ছড়ানো সহজ, ঐক্যের আহ্বান জানানো কঠিন। বিভাজনের রাজনীতি সহজ, জাতিকে একত্রিত করা কঠিন। ম্যান্ডেলা সেই কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন। তারেক রহমানের বক্তব্যও সেই কঠিন পথের দিকেই ইঙ্গিত করছে।

তবে তারেক রহমানের এই মানবিক রাষ্ট্রদর্শনের উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে তার পারিবারিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের দিকে।

স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্য, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, আত্মনির্ভরতা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছিলেন। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা, নিপীড়ন ও ব্যক্তিগত বেদনার মধ্য দিয়ে পথ চলেছেন।

এই দুই নেতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী তারেক রহমানের বর্তমান অবস্থানকে তাই বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। মানুষের জন্য কাজ করার যে মানসিকতা আজ তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে, তা অনেকাংশেই তার পারিবারিক ও রাজনৈতিক শিক্ষার ধারাবাহিকতা। বলা যায়, দেশপ্রেম, জনকল্যাণ ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই মানসিকতা তার রক্তের উত্তরাধিকার।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রচারণা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে তারেক রহমান ও জিয়া পরিবারকে ঘিরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মিডিয়া ট্রায়াল এবং পরিকল্পিত চরিত্রহননের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু ব্যক্তি ও পরিবারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার কখনোই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।

বাস্তব জীবনে যারা তারেক রহমানকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের অনেকেই তার সৌজন্যবোধ, বিনয় এবং মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি উল্লেখ করেন। শৈশব থেকেই তার ভদ্রতা ও সৌজন্যের সুনাম বিভিন্ন মহলে আলোচিত। আমার নিকটাত্মীয়দের মুখে তারেক রহমানের অসাধারণ বিনয়ের কথা বহুবার শুনেছি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অপপ্রচারের কারণে তার সেই দিকটি প্রায়ই আড়ালে থেকে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার কিছু পদক্ষেপও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে মূল্যবোধভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা দিচ্ছেন। সরকারি ব্যয়সংকোচনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর সীমিত করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। পুরোনো প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি থেকে সরে এসে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন। অনেকের মতে, এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

গণমাধ্যম সম্পর্কে তার বক্তব্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, সরকারের ভুল হতে পারে এবং সেই ভুল ধরিয়ে দিতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং গণতন্ত্রের অংশীদার হিসেবে দেখতে চান।

তবে প্রাসঙ্গিকভাবে আমি এখানে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই। সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগগুলো কি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে? তারেক রহমান নিজেই আক্ষেপ করে বলেছেন, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার মতো বিশাল আয়োজন, যেখানে লাখো শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে, তা গণমাধ্যমে সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। প্রধানমন্ত্রীর এই অনুযোগ খুবই বাস্তবসম্মত। এর আগেও আমি বহুবার বলেছি যে, সরকারের ছোটখাটো সীমাবদ্ধতা বা ভুলত্রুটি অনেক সময় শিরোনাম হয়, কিন্তু জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো যথার্থ গুরুত্ব পায় না।

অবশ্যই গণমাধ্যমের কাজ সরকারের সমালোচনা করা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু একই সঙ্গে ইতিবাচক উদ্যোগের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করাও গণমাধ্যমের দায়িত্ব। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়।

এখানেই আরেকটি বাস্তবতা সামনে আসে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে যে মানবিকতা, ক্ষমাশীলতা এবং দেশগঠনের আন্তরিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু একজন নেতার সদিচ্ছা যতই মহৎ হোক না কেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হল একটি দক্ষ, সৎ, দেশপ্রেমিক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে এখনো দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং গোষ্ঠীস্বার্থের প্রবণতা পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে সরকারের অনেক ইতিবাচক উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাস্তবায়িত হতে পারছে না। একজন প্রধানমন্ত্রী একা দেশ গড়তে পারেন না; তাকে ঘিরে থাকতে হয় সৎ, দক্ষ, যোগ্য এবং দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের একটি শক্তিশালী দল।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় ঐক্য ও পুনর্মিলনের যে বার্তা প্রধানমন্ত্রী দিচ্ছেন, তার বিপরীতে বিভিন্ন মহল থেকে বিভাজন, ভুল বোঝাবুঝি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টাও দেখা যায়। একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে মানুষকে একত্রিত করতে হয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে একই লক্ষ্যে এগিয়ে আসতে হবে।

তারেক রহমান যদি তার কল্পিত আধুনিক, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চান, তবে তার চারপাশে প্রয়োজন হবে এমন একদল সৎ, সাহসী, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা, যারা ব্যক্তিস্বার্থ নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বড় নেতা একা ইতিহাস রচনা করেন না; তার নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হয় একদল নিবেদিতপ্রাণ মানুষ, যারা সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেম দিয়ে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়।

তরুণ সমাজ নিয়ে তার উদ্বেগও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। মাদকাসক্তি, নৈতিক অবক্ষয়, খেলাধুলার সংকট, সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব—এসব বিষয়ে তার বক্তব্য একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রচিন্তার পরিচয় বহন করে। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে সমাজের সব সমস্যা সমাধান করা যায় না। প্রয়োজন সুস্থ সংস্কৃতি, খেলাধুলা, বিজ্ঞানচর্চা এবং মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা।

এখানে ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষার কথাও স্মরণ করা প্রয়োজন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বারবার ক্ষমা, ধৈর্য ও সংযমের কথা বলেছেন। আল্লাহ নিজেই পরম ক্ষমাশীল। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনও ছিল ক্ষমা, বিনয় ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যারা তাকে নির্যাতন করেছে, অপমান করেছে, তাদের অনেককেই তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

সুতরাং প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও মানবিকতার যে বার্তা আজ তারেক রহমান দিচ্ছেন, তা শুধু রাজনৈতিক দর্শনের নয়; এটি আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গেও গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আজকের বিশ্বে নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে মানবিক নেতৃত্বের সংকট। ক্ষমতা অর্জনের জন্য নেতা পাওয়া যায়, কিন্তু ক্ষমতা পেয়ে ক্ষমাশীল থাকা নেতার সংখ্যা খুবই কম। ক্ষমতায় বসে প্রতিশোধ নেওয়া সহজ; ক্ষমা করা কঠিন। ঘৃণা ছড়ানো সহজ; জাতিকে একত্রিত করা কঠিন। বিভাজনের রাজনীতি সহজ; পুনর্মিলনের রাজনীতি কঠিন।

নেলসন ম্যান্ডেলা সেই কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি ব্যক্তিগত ক্ষতকে জাতীয় অগ্রগতির পথে বাধা হতে দেননি। কারাগারের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকাকে শিখিয়েছিলেন—একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রতিশোধে নয়, ক্ষমা ও ঐক্যের মধ্যে নিহিত থাকে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও আমি সেই মানবিক দর্শনের প্রতিধ্বনি খুঁজে পাই। যে মানুষটি নিজেই রাজনৈতিক নির্যাতন, কারাবরণ এবং দীর্ঘ প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তিনি যদি আজ প্রতিশোধের পরিবর্তে দেশ ও মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান, তবে সেটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার মতো একটি রাজনৈতিক বার্তা।

অবশ্যই ইতিহাসই শেষ কথা বলবে। সময়ই নির্ধারণ করবে তারেক রহমান তার ঘোষিত দর্শন ও অঙ্গীকারকে কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারেন। কিন্তু এটুকু বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যদি সত্যিই প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতা, বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য এবং ক্ষমতার অহংকারের পরিবর্তে মানবিক নেতৃত্বের নতুন ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা হবে জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন।

পরিশেষে বলতে চাই, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে যে মানবিক আহ্বান, ক্ষমাশীলতার বার্তা এবং জাতীয় পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে, তা অনেকের কাছেই নেলসন ম্যান্ডেলার স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। আর যদি তিনি সত্যিই এই দর্শনকে ধারণ করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার অধ্যায়টি কেবল একটি রাজনৈতিক অধ্যায় হবে না; বরং তা হয়ে উঠতে পারে মানবিক নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রগঠনের এক নতুন দৃষ্টান্ত।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

পথহারা কূটনীতি, ফেরাতে হবে সঠিক পথে

অদিতি করিম
পথহারা কূটনীতি, ফেরাতে হবে সঠিক পথে

বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে যখন পুশইন নিয়ে টানাপোড়েন এবং উত্তেজনা, ঠিক তখনই বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে বাংলাদেশে এলেন নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। গত শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার পর তিনি বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দিনেশ ত্রিবেদী পেশাদার কূটনৈতিক নন। তিনি একজন রাজনীতিবিদ। গত এপ্রিলে ভারত সরকার দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। দুই দেশের ৫৫ বছরের সম্পর্কের ইতিহাসে ভারত এ প্রথম কোনো রাজনীতিবিদকে দেশটির হাইকমিশনার করে বাংলাদেশে পাঠাল। বাংলাদেশে প্রবেশ করেই দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমাদের যা পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি। তার সঙ্গে ২০ কোটি (বাংলাদেশের) অ্যাড করেছি। ১৬০ কোটি। আমি এখানে যা করতে চাই, তা সব একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে ভাবছি না। দেখছেন না আমি হেঁটে চলে আসছি। একই আকাশ একই বাতাস একই। আমরা মিলেমিশে ভিসার সমাধান করব। শুধু অভিন্ন সীমান্ত নয়, অভিন্ন স্বপ্নও আছে। আমাদের আকাশ এক, বাতাস এক, চ্যালেঞ্জও অনেক ক্ষেত্রে এক। তাই আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। ভালোবাসা আর পারস্পরিক আন্তরিকতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

হাইকমিশনার হিসেবে নিজের অগ্রাধিকারের প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার একমাত্র অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাইবোন। আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন শুধু ভালোবাসা ও পারস্পরিক আন্তরিকতা। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু সীমান্তের নয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও আমরা যুক্ত। যারা আমাদের ভাইবোন ও মা-তাদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন সিনিয়র রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করার মধ্য দিয়ে ভারত একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তা হলো, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। তাই বাংলাদেশকেও এখন এ সম্পর্ক উন্নয়নে কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সীমান্তে উত্তেজনা, মানুষ হত্যা, পুশইনের মতো অমানবিক ঘটনা কখনো ভালো সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে না। এটা দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততার প্রকাশ। দুই দেশের জন্যই এ বৈরিতা ক্ষতিকর। বর্তমান বিশ্বে বল প্রয়োগ, যুদ্ধ কোনো সংকটের সমাধান দেয় না। বরং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। ভারতের অযৌক্তিক পুশইন নিয়ে আর কালবিলম্ব না করে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করতে হবে।

প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তেজনা কারও জন্যই ভালো ফল দেবে না। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ-ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থল সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার। এটি বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম স্থল সীমান্ত, যা ভারতের পাঁচটি রাজ্য-পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। এই সীমান্তে উত্তেজনা এবং অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি দুই দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকি। শুধু সীমান্ত নয়, দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে টানাপোড়েন রয়েছে। পদ্মা, তিস্তাসহ একাধিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্সা, ভিসা জটিলতা, ভারতের বন্দরগুলো দেড় বছর ধরে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে না দেওয়ার মতো ইস্যুগুলো নিয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু করা দরকার। একটি দেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তির জন্য প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ এবং পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার সম্পর্ক জরুরি। সবকিছু পাল্টানো যায় কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো সম্ভব না। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনার সম্পর্ক নয় দরকার আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা। তা ছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতা আমাদের বন্ধুত্বের শক্তি। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সমস্যা থাকবেই। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো আলাপ-আলোচনা। পুশইন করে কিংবা সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব না। ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত আসার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। দুই দেশকেই এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এ সময় উগ্র ভারত বিরোধিতা নামে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ভুল পথে নিয়ে যায়। ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টাদের দায়িত্বহীন ভারত বিদ্বেষী কথাবার্তায় বাংলাদেশের ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয়নি। ইউনূস ভারতের সেভেন সিস্টার নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন তা সুস্পষ্টভাবে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করে বলে অসত্য তথ্য ছড়িয়ে দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত করেছেন। ইউনূস সরকার বাইরে ভারত বিরোধিতা করে ভিতরে দেশকে আরও বেশি ভারতীয় পণ্যের ওপর নির্ভরশীল করেছেন। ভারত থেকে পণ্য আমদানি বাড়ে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। কিন্তু ভারতের ভিসা বন্ধ হয়ে যায়, বাংলাদেশের পণ্য ভারতের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। আজকের পুশইন ইউনূস সরকারের ভুল কূটনৈতিক তৎপরতার ফল। শুধু ভারত নয় সারা বিশ্বের সঙ্গেই বাংলাদেশ যেন ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ড. ইউনূসের ভুল নীতির কারণে। বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো নয়। বারো লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নয় বছর ধরে অবস্থান করছে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল চাপ। রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই। ক্ষমতা নেওয়ার শুরুতে মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলেও, বাস্তবে তার করা কোনো গোল আমরা উদ্যাপন করতে পারিনি। পাকিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য নেই। ইউনূস বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা এ বছরের (গত বছর) রোজার ঈদ করবেন মিয়ানমারে, সেটা কার্যকর তো হয়নি উল্টো এর মধ্যে অন্তত লাখ দুয়েক রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। ক্ষমতা নেওয়ার পর ইউনূস বলেছিলেন, বিশ্ব আমাদের কাছে আসবে। কিন্তু কার্যত, দেড় বছরে বিশ্বের দরজাই বাংলাদেশের জন্য আজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ইউনূস বলেছিলেন, ইউরোপের যেদেশগুলোর বাংলাদেশে ভিসা সেন্টার নেই, তারা বাংলাদেশে কাজ শুরু করবে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের দিল্লি থেকে ঢাকায় দাওয়াত দিয়ে আনেন। কিন্তু, ইউনূস দেড় বছরে একটা দেশেরও ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে ঢাকায় সরিয়ে আনতে পারেননি, ফলে বিদেশে পড়তে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। যেসব দেশে ভিসা ছাড়া বাংলাদেশের নাগরিকরা প্রবেশ করতে পারত, সেই সব দেশের অধিকাংশই ভিসা ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে, বাকি অধিকাংশ দেশ ভিসা দেওয়ার হার কমিয়েছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের ভিসা এখন সোনার হরিণ। ইউনূস মালয়েশিয়া শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন কিন্তু বাস্তবে তা চালু হয়নি। বহু দেশে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে। আমেরিকা তো রীতিমতন ভিসার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান কমে ইয়েমেন, আফগানিস্তান বা ফিলিস্তিন লেভেলে নেমে গেছে।

দেড় বছরে ১৪ বার এবং প্রথম ১২ মাসে ১১ বার বিদেশ সফর করলেও ‘ইউনূস ম্যাজিক’ কার্যত ফেইল করেছে। বাংলাদেশের কূটনীতি আজ পথ হারা। তাই, নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে, আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে সঠিক পথে নিয়ে আসা। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জন্য কিছু সুখবর নিয়ে এসেছে বিএনপি সরকার। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে ৮ ভোটে পরাজিত করে তিনি এক বছরের জন্য এ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর হচ্ছে মালয়েশিয়া। ২১ জুন প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে বন্ধ শ্রমবাজার খুলবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এটি হবে তারেক রহমানের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি সাফল্য।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। সেই ভিত্তিকে আবার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে দিতে হবে অগ্রাধিকার। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে হবে কূটনীতিতে। আমরা আশাবাদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি শিগগিরই পথ খুঁজে পাবে।

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত সার্বভৌম কূটনীতির পরিচয়

আহসান হাবিব বরুন
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত সার্বভৌম কূটনীতির পরিচয়

আধুনিক বিশ্বে কূটনীতি আর শুধু রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যম নয়; এটি উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার একটি কৌশলগত হাতিয়ার। তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে নিছক দুটি রাষ্ট্র সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ, যা দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে এসেছে। আগামী দিনের লক্ষ্য উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। সফরের ক্রম, আলোচ্যসূচি এবং সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রতীকবাদের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি শুধু একটি অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের আধুনিক উন্নয়নের অন্যতম সফল মডেল। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো জনশক্তি। লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে কর্মরত রয়েছেন এবং তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আরও সম্প্রসারিত হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে বর্তমান বিশ্বে শুধু শ্রম রপ্তানি নয়, দক্ষ জনশক্তি গঠনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি এই সফরে কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে। কারণ আগামী দিনের প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার শিল্প ও বিনিয়োগ খাতেও বাংলাদেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
 ইলেকট্রনিকস, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে তা দেশের শিল্পায়নকে নতুন গতি দিতে পারে।

তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে চীনকে ঘিরে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশের বহু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সহায়তা রয়েছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নের ইতিহাসে সড়ক, সেতু, রেল, বিদ্যুৎ, বন্দর এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর বহু প্রকল্পের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ বর্তমানে যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, তার মধ্যে অন্যতম হলো বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে চীনা বিনিয়োগ নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা তিস্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে নদীর নাব্যতা সংকট, ভাঙন, পানির স্বল্পতা এবং সেচ সমস্যার কারণে এ অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট উৎপাদন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো আগামী দিনের অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ যদি এসব খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা আকৃষ্ট করতে পারে, তাহলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে এই সফরগুলোর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্নও উঠে আসে। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেকেই লক্ষ্য করেছেন যে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রতিবেশী ভারতও সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র কোন দেশকে কখন অগ্রাধিকার দেবে, সেটি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

এখানে মনে রাখা দরকার, বিএনপির কূটনৈতিক দর্শন কোনো নতুন বিষয় নয়। স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে যে পররাষ্ট্রনীতি অনুসৃত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি ছিল জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক মর্যাদা এবং সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা।

এই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকেও একই ধরনের নীতিগত অবস্থান প্রত্যাশিত। কারণ একটি রাজনৈতিক দলের পররাষ্ট্রনীতি কেবল কোনো ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, আদর্শ এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সুতরাং বিএনপির কূটনৈতিক রেওয়াজে হঠাৎ করে মৌলিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা খুবই কম। দলটি ঐতিহাসিকভাবেই এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা নয়, আবার কোনো দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতাও নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পরিস্থিতি, কথিত পুশ-ইন, ভিসা ও কূটনৈতিক যোগাযোগসংক্রান্ত কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনাকে অনেকেই দুই দেশের সম্পর্কে বিদ্যমান কিছু অস্বস্তির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

তবে এ কথাও সত্য যে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল সরকার পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশ একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অংশীদার।

সেই কারণেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বাস্তবতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কোনো রাষ্ট্র তার নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে—এটিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক নিয়ম। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মানদণ্ডে বিচার করা পরিপক্ব কূটনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভারতেরও উপলব্ধি করা উচিত যে আজকের বাংলাদেশ আর দুই দশক আগের বাংলাদেশ নয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এখন বাংলাদেশকে নতুন দৃষ্টিতে দেখছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান তাকে একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি এবং অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যার টেকসই সমাধানই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

বাংলাদেশ যেমন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তেমনি সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে। কারণ আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো সমতা, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থ।

আজকের বাংলাদেশ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা নয়, বরং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সাফল্যের চাবিকাঠি।

তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির সংখ্যা নয়, বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বহু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই এবার প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

বাংলাদেশের মানুষ এখন বড় বড় ঘোষণার চেয়ে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা দেখতে চায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে, শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে, কৃষি ও প্রযুক্তি খাত এগিয়ে যাচ্ছে এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

যদি মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

সবশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও বাস্তবভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই সফর দেশের জন্য টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন অধ্যায় রচনা করতে সক্ষম হতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন
ই-মেইল : [email protected]  

প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ : সদিচ্ছার প্রতিফলন, তবে বাস্তবায়নের পথ কঠিন

মাহামুদ হোসেন
প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ : সদিচ্ছার প্রতিফলন, তবে বাস্তবায়নের পথ কঠিন

ক্ষমতায় আসার পর একটি সরকারের প্রথম বাজেট সাধারণত তার রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটায়। সেই বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট নিঃসন্দেহে বর্তমান সরকারের নীতি-অবস্থান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এ বাজেটে জনকল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রতি সরকারের সদিচ্ছা স্পষ্ট। তবে বাজেট কেবল ভালো উদ্দেশ্যের ঘোষণাপত্র নয়; এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দৃঢ়তার মাধ্যমে।

এই বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য খাতে প্রায় দ্বিগুণ বরাদ্দ, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগ একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণাকে সামনে আনে। বিশেষ করে ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ হতে পারে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরের ব্যক্তিশ্রেণির করকাঠামো একসঙ্গে ঘোষণা করা, বৈদ্যুতিক যানবাহনে দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক ছাড় এবং ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ও স্পোর্টস ইকোনমিকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো উদ্যোগ দূরদর্শী পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু সদিচ্ছা যতই প্রশংসনীয় হোক, বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হলো প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, জবাবদিহির অভাব এবং অদক্ষতার ভার বহন করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে কর প্রশাসনে মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। করদাতা হয়রানি বন্ধ, অটোমেশন বাস্তবায়ন এবং ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট চালু করা শুধু নীতিগত ঘোষণার বিষয় নয়; এগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন মানসিকতা পরিবর্তন, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।

এডিপি বাস্তবায়নের অতীত রেকর্ডও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। লক্ষ্যমাত্রা বাড়লেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা সেই হারে বাড়েনি। ফলে প্রস্তাবিত ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপিতে উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়ন ঘাটতির ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো বড় উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাঠপর্যায়ে ডিজিটাল অবকাঠামো এখনো দুর্বল, কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে এবং মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। একদিকে ব্যাপক করছাড় ও অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে রেকর্ড রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হলেও উচ্চ সুদের হার কমানোর সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অনুপস্থিত। এসব লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে হলে শক্তিশালী সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল দরকার, যা বাজেট বক্তৃতায় যথেষ্ট স্পষ্টভাবে দেখা যায় না।

বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো এনবিআর রাজস্ব ৫৬ শতাংশ বাড়ানোর মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের বিপরীতে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনার অভাব। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কয়েক গুণ বাড়ানোর লক্ষ্যও প্রশংসনীয়, কিন্তু বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, সুদের হার, নীতি-স্থিতিশীলতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর না হলে এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হবে। মূল্যস্ফীতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অপরিহার্য; কিন্তু সেই সমন্বয়ের ধাপভিত্তিক রূপরেখা আরো পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

সরকারের ঘোষিত পুনরুদ্ধার, পুনরুজ্জীবন ও পুনর্গঠনের ত্রিস্তরীয় কৌশল ধারণাগতভাবে সঠিক। কিন্তু প্রথম ধাপ মাত্র এক বছরে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী বলে মনে হয়। প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, মাইলস্টোন, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহির কাঠামো না থাকলে এ ধরনের কৌশল শেষ পর্যন্ত আকর্ষণীয় স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য ত্রৈমাসিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এবং সেগুলো পূরণে ব্যর্থ হলে দৃশ্যমান জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে একটি বাস্তবসম্মত সংশোধিত বাজেটের প্রস্তুতিও এখন থেকেই নেওয়া উচিত। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্নির্ধারণ করা গেলে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে না; বরং বাড়বে।

অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণে দেশীয় অর্থনীতিবিদ, পেশাদার হিসাববিদ, বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। এটি দুর্বলতার স্বীকৃতি নয়; বরং দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচায়ক। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ কমানো, মূলধন পর্যাপ্ততা পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে একটি সদিচ্ছাপূর্ণ ও জনকল্যাণমুখী বাজেট বলা যায়। তবে গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব কেবল ভালো উদ্দেশ্য ঘোষণা করা নয়; সেই উদ্দেশ্যকে কার্যকর নীতিতে এবং নীতিকে দৃশ্যমান ফলাফলে রূপান্তর করা। সদিচ্ছা যদি বাস্তবে রূপ না পায়, তবে তা শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই বাজেটের সাফল্য তাই সংখ্যার বিশালতায় নয়, বরং বাস্তবায়নের সততা, দক্ষতা এবং জবাবদিহির ওপর নির্ভর করবে।

মাহামুদ হোসেন এফসিএ
আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ও সাবেক কাউন্সিল মেম্বার আইসিএবি