দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, সৌর ও বায়ুশক্তির বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও উচ্চ কর, নীতিগত বৈপরীত্য এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর গ্রিন লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য উৎস : চাই বাজেটের নীতিগত পরিবর্তন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি উত্থাপন করা হয়। যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)।
সহ-আয়োজক হিসেবে ছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (ইটিআই), ল-ইয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (লিড) এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট স্থাপিত সক্ষমতা মাত্র ১ হাজার ৬৭৯ মেগাওয়াট। অথচ সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর ২৭ থেকে ৬১ শতাংশ পর্যন্ত কর ও শুল্ক আরোপের কারণে খাতটির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বক্তারা বলেন, বর্তমানে সৌর প্যানেল ও ইনভার্টারের ওপর প্রায় ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ কর আরোপ করা হলেও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সুবিধা অব্যাহত রয়েছে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির খরচ বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে কিছু অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত হিসাব তুলে ধরে বলা হয়, প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে প্রায় ৩ কোটি ১১ লাখ টাকার জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় করতে পারে এবং ১ হাজার ১৮০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে সক্ষম। এ ছাড়া প্রতি কিলোওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বছরে প্রায় ৩১ হাজার টাকা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারে।
আসন্ন জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য সংবাদ সম্মেলন থেকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো—
- আগামী ১০ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট ও অগ্রিম করসহ সব ধরনের কর ও শুল্ক প্রতীকী ১ শতাংশে নামিয়ে আনা।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে ২৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ আবর্তনশীল তহবিল গঠন, যাতে উদ্যোক্তারা ৫ শতাংশের কম সুদে ঋণ পেতে পারেন।
- আবাসিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা ভর্তুকি এবং নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকল্পে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ভর্তুকি প্রদান।
- নতুন ইউটিলিটি-স্কেল প্রকল্পে ন্যূনতম ২০ শতাংশ ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ বাধ্যতামূলক করা, করপোরেট বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (সিপিপিএ) চালু এবং নির্গমন কর আরোপ।
- যুব উন্নয়ন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে প্রতি বছর ১০ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় আকারের ভূমিনির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং জলাশয়ভিত্তিক ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এতে কৃষিজমি সংরক্ষণ হবে, দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানিতে অব্যাহত ভর্তুকি ও প্রণোদনার পরিবর্তে আসন্ন জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার, কর-শুল্ক অব্যাহতি এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত না হলে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয় ও আমদানিনির্ভরতার চক্রে আটকে পড়বে।’
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়। সরকার কর ও শুল্ক কমিয়ে সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগের পথ সহজ করলে জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
লিডের গবেষণা পরিচালক অ্যাডভোকেট শিমনউজ্জামান বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। এই ব্যবধান দূর করতে বাজেটে শক্তিশালী নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।’
ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম বলেন, ‘জ্বালানি সার্বভৌমত্ব এখন জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। শিল্পখাত ও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাজেটে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।’
বক্তারা সতর্ক করে বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের নীতিগত ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা না হলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা আরো বাড়বে। অন্যদিকে সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ালে জ্বালানি আমদানি কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সহজ হবে।