বাংলাদেশের পরিবহন খাতকে সবুজ ও টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তরের সময় শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি বলেছেন, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির বিকল্প নেই।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাজধানীর আলোকি কনভেনশন সেন্টারে ইয়ুথনেট গ্লোবাল ও ফ্রেডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুঙ (এফইএস) বাংলাদেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত জাতীয় যুব সম্মেলন ‘জাস্ট ট্রানজিশন অ্যান্ড সাসটেইনেবল আরবান মোবিলিটি’র সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্মেলনে তরুণ নেতা, নীতিনির্ধারক, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, গবেষক, শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী ও শ্রমিক প্রতিনিধিসহ প্রায় ১৫০ জন অংশ নেন। তারা বাংলাদেশের নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও সবুজ, নিরাপদ ও ন্যায়সংগত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
মাইকেল মিলার বলেন, দ্রুত নগরায়ণের ফলে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন, গণপরিবহন ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা নিয়ে আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা আগামী কয়েক দশকের জীবনমান নির্ধারণ করবে।
তিনি বলেন, নগর চলাচল কেবল পরিবহনের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু সহনশীলতা এবং সামাজিক কল্যাণের সঙ্গেও জড়িত। বাংলাদেশ যখন ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, তখন যানজটজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে কার্যকর নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
ইইউ রাষ্ট্রদূত ইয়ুথনেট গ্লোবালের ১০ বছরের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বলেন, জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সার্কুলার অর্থনীতি নিয়ে সংগঠনটির কাজ ইইউ-বাংলাদেশ সহযোগিতার অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তরুণদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু তাদের কথা শোনা নয়, নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের মতামতের প্রতিফলনও ঘটাতে হবে।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ যখন হালনাগাদ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি ৩.০) বাস্তবায়ন এবং কপ-৩১ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন পরিবহন খাতকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মিলার বলেন, টেকসই পরিবহন অবকাঠামো ইইউর ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক ও ইইউ সদস্যদেশগুলোর সহায়তায় বাংলাদেশে রেল যোগাযোগ ও বিদ্যুতায়নসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-গাজীপুর সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক রেল করিডরের বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আর বিলম্বের সুযোগ নেই। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যেখানে শ্রমিক, চালক, যাত্রী, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন সমান গুরুত্ব পাবে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ সাফিউল্লাহ বলেন, পরিবহন খাতে রূপান্তর প্রয়োজন হলেও সেই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে হবে।
এফইএস বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি ড. ফেলিক্স গেরডেস বলেন, নগর পরিবহন ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সংলাপ ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, ন্যায়সংগত ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, কম কার্বন নিঃসরণকারী ও জলবায়ু সহনশীল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুব নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
‘নগর সহনশীলতা, সুশাসন ও সবুজ অবকাঠামো’ শীর্ষক এক অধিবেশনে সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ও উন্নয়ন সহযোগিতার উপপ্রধান নয়োকা মার্টিনেজ-ব্যাকস্ট্রম বলেন, ঢাকার পরিবহন সংকট সমাধানে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, সমন্বিত পরিকল্পনাও প্রয়োজন। তিনি বৈদ্যুতিক বাস, উন্নত ফুটপাত ও সাইকেল ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. আহমাদ কামরুজ্জামান মজুমদার পরিবহন খাতে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উন্নত জ্বালানি মান, পরিবেশগত নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
শ্রমিক প্রতিনিধি নাহিদুল হাসান নয়ন বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের তথ্যভান্ডার, পরামর্শ প্রক্রিয়া ও সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো দুর্বল। তিনি শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, অধিকার সুরক্ষা এবং বড় নীতিগত সিদ্ধান্তে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানান।




