ভূমিকম্পসহ বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় রাজধানী ঢাকাকে আরো প্রস্তুত ও সহনশীল নগরীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য ১ লাখ প্রশিক্ষিত ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ বা স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগের পর নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় ৪৫০টি অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে।
বুধবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে অনুষ্ঠিত আরবান আইএনজিও ফোরাম বাংলাদেশের ‘নবম আরবান ডায়ালগ ২০২৬’-এ এসব তথ্য জানানো হয়। সংলাপে নীতিনির্ধারক, নগর পরিকল্পনাবিদ, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও কমিউনিটি নেতারা অংশ নেন।
সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্প ঝুঁকি নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার অংশ হিসেবে ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যারা দুর্যোগের সময় প্রথম সাড়া প্রদানকারী হিসেবে কাজ করবে। তারা উদ্ধার কার্যক্রম, প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরি সহায়তা ও নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরে ভূমিকা রাখবে।
আরো পড়ুন
অভিনেতা জাহের আলভী দুই দিনের রিমান্ডে
সচিব আরো জানান, অতীতে থাকা প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ভলান্টিয়ারের ডাটাবেস হালনাগাদ করা হচ্ছে। নতুন তালিকায় ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ হাজার ৫০০ জনের নতুন তালিকা প্রস্তুত হয়েছে। অবশিষ্ট স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের জন্য শিগগিরই উন্মুক্ত আবেদন আহ্বান করা হবে।
দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে মানুষের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করতে রাজধানীতে ৪৫০টি অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো প্রধানত খোলা স্থান, মাঠ ও উপযুক্ত এলাকা থেকে নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তালিকাটি অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদনের পর তা প্রকাশ করা হবে এবং এসব স্থানে নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আরো কার্যকর করতে সশস্ত্র বাহিনী, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থার ভারী যন্ত্রপাতির তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি হেলিকপ্টার সেবা, হাসপাতালের শয্যা-সক্ষমতা ও জরুরি চিকিৎসা অবকাঠামোর তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয় বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্যোগকালীন সমন্বয় নিশ্চিত করতে ‘ইনসিডেন্ট কমান্ড সিস্টেম (আইসিএস)’ চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
বিদেশি সহায়তা দ্রুত ব্যবস্থাপনার জন্য সিভিল অ্যাভিয়েশন বা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ‘হিউম্যানিটারিয়ান স্টেজিং এরিয়া’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান সচিব। তিনি বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আবহাওয়া অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
আরো পড়ুন
ঢাকার আশপাশে একাধিক উৎপত্তিস্থল কি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?
শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্যোগ প্রস্তুতি অন্তর্ভুক্ত করতে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে পাঠ্যক্রমে বিষয়টি আরো গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, ভূমিকম্প ঝুঁকি ও জনসংখ্যার চাপের বাস্তবতায় বাংলাদেশকে দুর্যোগ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতির ওপর জোর দিতে হবে। রাজধানী ঢাকাকে একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দুর্যোগ সহনশীল নগরীতে রূপান্তর করতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।