গাইবান্ধায় তিস্তা নদীর পানি কিছুটা হ্রাস পেলেও অন্যান্য নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। তিস্তা নদীর পানি গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় বিপৎসীমার ৩ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও মঙ্গলবার বিকেলে গত ২৪ ঘণ্টায় কাউনিয়া পয়েন্টে ৪৩ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এখন পর্যন্ত গাইবান্ধায় কোনো নদ-নদীর পানিই বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
মঙ্গলবার পাউবোর দুপুরের রিপোর্ট অনুযায়ী গত ২৪ ঘন্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ১৯ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৭২ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ২০ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার ও করতোয়া নদীর পানি গোবিন্দগঞ্জের চকরহিমাপুর স্টেশন পয়েন্টে ৫৩ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩৫৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাইবান্ধার প্রধান নদ-নদীগুলোতে উজানের ঢল ও পানি বাড়া কমার সঙ্গে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। বসতভিটা, আবাদি জমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড নদ নদী তীরবর্তী জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্টে ভাঙনের কথা স্বীকার করেছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলা। গত এক সপ্তাহের অব্যাহত ভাঙনে সদর, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও সাদুল্লাপুর উপজেলার নদী তীরবর্তী সহস্রাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদী পাড়ের মানুষ।
ভাঙনকবলিত এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে সুন্দরগঞ্জের কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালির খামার গ্রামের শখের বাজার, হরিপুর ইউনিয়নের চর চরিতাবাড়ী, রাঘব, চন্ডিপুর ইউনিয়নের উত্তর সীচা, কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার, কেরানির চর, মিন্টু মিয়ার চর ও বাদামের চর। এসব এলাকার দু’শ পরিবারের বসতভিটা ও দেড়’ শ বিঘা আবাদি জমি তিস্তা নদীতে ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে।
সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনজু মিয়া বলেন, ওই ইউনিয়নের ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের লাল চামার ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কেরানীর চর ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে। অব্যাহত ভাঙনে ২’শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। শতাধিক বিঘা ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে।
ফুলছড়ি উপজেলার ভাঙনকবলিত এলাকার মধ্যে রয়েছে কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসীঘাট, রসুলপুর, উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর, ফজলুপুর ইউনিয়নের মধ্য ও দক্ষিণ খাটিয়ামারীর চর ও চর চৌমোহন।
চর চৌমোহনে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে ইতোমধ্যে অন্তত দু’শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে চৌমোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চার’শ বিঘা আবাদি জমি ও বিপুল সংখ্যক গাছপালা। ভাঙনের শিকার নরনারী ঘরবাড়ির টিন কাঠ ও আসবাবপত্র সরিয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়াও সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামেও নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। ফজলুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনছার আলী মন্ডল বলেন, পানি বাড়তে শুরু করার পর এলাকার মধ্য ও দক্ষিণ খাটিয়ামারীর চর ও চর চৌমোহনসহ বেশ কিছু এলাকার ৫’শ থেকে ৭’শ পরিবার নদী ভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়েছে। উড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, নদীতে পানি বাড়া কমার এই সময়ে রতনপুরে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের সিধাইল এলাকায় ভাঙনে এর মধ্যে ২০ থেকে ৩৫ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। ভাঙনের মুখে আছে আরও অনেক পরিবার। ভাঙনের মুখে স্থানীয় সিধাইল কওমি মাদরাসার দু’টি ঘর সরিয়ে নিতে হয়েছে। বিপদের মুখে আরও দুটি ঘর দ্রুত না সরাতে পারলে ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে হারিয়ে যাবে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম কালের কন্ঠকে বলেন, জেলার নদী তীরবর্তী অঞ্চল ও চরাঞ্চলে ২০ থেকে ২৫টি স্পটে ভাঙন শুরু হয়েছে। রিপোর্ট পাঠানোর পর উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে ভাঙ্গন প্রতিরোধে কাজ করা হচ্ছে।
এদিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা মঙ্গলবার ভাঙ্গন কবলিত দক্ষিন রসুলপুরএলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি সেখানকার অসহায় মানুষদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দেন। তিনি গৃহহীন এক নারীকে আর্থিক সহায়তা ও শুকনো খাবার দেন।