এক সময়ের টইটুম্বর বড়ালের যৌবন ফিরিয়ে আনার দাবি এ অঞ্চলের ৫০ লাখ মানুষের। বড়ালকে দখল ও দূষণমুক্ত করে পূন: খনন করে জলদারা ফিরিয়ে আনার দীর্ঘদিনের দাবী পূরণের অপেক্ষায় এ অঞ্চলের মানুষের।
যৌবন শূন্য বড়াল এখন সরু খালে পরিনত হয়েছে। দূ’ধার প্রভাবশালীদের দখলে। বড়াল চরে সবুজ ফসল শোভা পাচ্ছে। গড়ে উঠেছে দোকানঘর ও বসতবাড়ি। কাল পরিক্রমায় বড়াল নদী টইটুম্বর যৌবন হারিয়ে ফেলেছে। এককালের খরস্রোতা বড়াল নদীর তলদেশ পলি মাটিতে ভরাট হয়ে জল সীমানা সরু হয়ে খালের আকার ধারণ করেছে। বড়াল চর প্রভাবশালীরা দখলে নিয়ে দোকানপাট ও বসতবাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি নানা প্রকার ফসল ফলাচ্ছেন । বড়াল পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজন শুষ্ক মৌসুমে বড়াল প্রায় পানিশূন্য থাকায় গোসলের পানি পেতে দূর্যোগের শিকার হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মরা বড়ালের ইতিহাস রূপকথা বলে মনে করবে।
শীতকাল শুরুর পরে ও শুকনো মৌসুমের শুরু না হতেই চলনবিলের নদ-নদীগুলো পানিশুন্য হয়ে পড়েছে। বিশাল জলরাশির চলনবিল এবং এর আশপাশের নদ নদী এখন শুকনো। এটাই এখন বিল আর তার ধমনী নদ-নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা। অথচ নিকট অতীতেও সারা বছর না হলেও ছয় মাস পানি বুকে ধারণ করতো বিল ও তার নিকটবর্তী নদ নদী গুলো।
পাবনার চাটমোহর উপজেলার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত এক কালের প্রমত্তা বড়াল নদী এখন আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। চাটমোহর পৌরসভার বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেসরকারি ক্লিনিক ও বাসাবাড়ির বর্জ্রের ঠিকানা এখন শুকিয়ে যাওয়া এ নদী। নদীর দুই পাড় দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে পাকা স্থাপনা। দখল, দূষণ আর কচুরিপানার কারণে বড়াল এখন মশা উৎপাদনের সূতিকাগারে পরিণত হয়েছে। অস্তিত্ব হারাচ্ছে দেশের অন্যতম প্রধান এ নদী।
রাজশাহীর চারঘাট পদ্মা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে ২২০ কিলোমিটার বড়াল নদী গিয়ে মিশেছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে যমুনা নদীতে। কিন্তু আশির দশকে চারঘাটে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীর উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণ করে বড়ালের পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এতে অস্তিত্ব হারাতে থাকে প্রমত্তা বড়াল। এরপর বাগাতিপাড়ার আটঘরি ও চাটমোহরের দহপাড়ায় আরো দুটি স্লুইস গেট নির্মাণ করে পাউবো। এ ছাড়া চাটমোহর উপজেলা পরিষদ বড়ালের চাটমোহর অংশে তিনটি ক্রসবাঁধ নির্মাণ করে মাছ চাষ শুরু করে।
২০০৮ সালে চাটমোহর থেকে শুরু হয় বড়াল রক্ষা আন্দোলন। গঠিত হয় কমিটি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ফলে সরকার বড়াল চালুর উদ্যোগ নেয়। অপসারণ করা হয় চাটমোহরের তিনটি ক্রসবাঁধ ও দহপাড়া স্লুইস গেট। কিন্তু বড়াল খনন কিংবা অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কোনো প্রকার পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বড়ালে তলদেশে এখন বিভিন্ন ফসলের যেমন আবাদ হচ্ছে। তেমনি ময়লা-আবর্জনাসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলাও হচ্ছে বড়ালে। কচুরিপানায় পরিপূর্ণ বড়াল এখন মশা উৎপাদনের সূতিকাগার। বড়ালে ফেলা বর্জ্যরে দুর্গন্ধে টেকা দায়। কচুরিপানা পরিষ্কারের দাবি জোরালো হয়েছে। বড়াল নদী দখলের প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে। বর্জ্য ফেলা হচ্ছে অপ্রতিরোধ্যভাবে। পরিবেশ দূষণ বাড়ছে।
পরিবেশবাদী সচেতন মহলের ভাষ্য, বড়ালের বেহাল দশার পিছনে রয়েছে সরকারি নদী শাসনের ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ও মৃত. প্রায় বড়ালের বুকে ভূমিদস্যুদের জায়গা দখলের মহৎসব। স্থানীয় বিভিন্ন প্রভাবশালীদের দাখলদারিত্বের কারণে দু’পাড় ক্রমান্বয়ে চেয়ে গেছে। এমনকি নদের পাড়ে দিনকে দিন তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা যা এক সময়ের খরস্রোতা বাড়লের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা।
বাপা পাবনা জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট তোসলিম হাসান সুমন বলেন, ‘বড়াল নদীকে দখল ও দূষণ মুক্ত করতে যত দ্রুত সম্ভব জলপ্রবাহ নিশ্চিত করনের মাধ্যমে পরিবেশের উন্নয়ন ও ভারসাম্য রক্ষার দাবি জানাচ্ছি।’
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা স্থানীয় এনজিও টিএসপি’র পরিচালক সরকার মোহাম্মদ আলি বলেন, ‘সিএস রেকর্ড অনুযায়ী বড়াল নদীর সীমানা নির্ধারন করে দ্রুত খনন করে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।’
বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এস.এম. মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাজশাহীর চারঘাটে বড়াল নদীর ওপর স্লুইসগেট ভেঙ্গে বড় করে পরিবেশ বান্ধব ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে, এছাড়া তার ৪৬ কিলোমিটার ভাটিতে নাটোরের আটঘরিতে একটি স্লুইস গেট ভেঙ্গে সেটিও বড় ব্রিজ করতে হবে ও আটঘরি থেকে বনপাড়া পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার দখল মুক্ত করতে হবে। আইডব্লিউ এমের সুপারিশ অনুযায়ী রাজশাহীর চারঘাট থেকে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি পর্যন্ত ছোট ছোট ব্রিজ কালভার্ট ভেঙ্গে ফেলতে হবে এবং নদী দ্রুত পূনখনন করলে ৫০ লক্ষ মানুষের দীর্ঘ দিনের প্রাণের দাবি পূরণ হবে।’
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বড়াল নদী পূন:খনন নিয়ে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়েছে, ফিজিবিলিটি স্টাডির আলোকে দ্রুত বড়াল নদী পূন:খনন করা হবে।’




