পৃথিবীতে সম্পদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত পুরনো, এর মালিকানার প্রশ্নটিও তত পুরনো। মানুষ সব যুগেই কিছু জিনিসকে নিজের বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছে। জমি, ঘর, ব্যবসা কিংবা অর্থ—এসবের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যক্তি যেমন চেষ্টা করেছে, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রও বিভিন্ন নিয়ম-কানুন তৈরি করেছে।
অর্থনীতির ইতিহাসের একটি বড় অংশ জুড়েই আছে এই মালিকানার প্রশ্ন। কে সম্পদের মালিক হবে, তার অধিকার কতটুকু হবে, সেই অধিকার কোথায় গিয়ে শেষ হবে—সভ্যতার বিভিন্ন পর্যায়ে এসব প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দেওয়া হয়েছে। তবে ইতিহাসের একটি বাস্তবতা কখনো পরিবর্তিত হয়নি।
মানুষের মালিকানা স্থায়ী নয়। যে জমি একসময় একজনের ছিল, পরবর্তী সময়ে তা অন্যের হয়েছে। যে সম্পদ নিয়ে মানুষ গর্ব করেছে, মৃত্যুর পর তা উত্তরাধিকারীদের হাতে চলে গেছে। মানুষ পৃথিবী ছেড়ে গেছে, কিন্তু সম্পদ পৃথিবীতেই রয়ে গেছে। এই সরল অথচ গভীর সত্যটিকেই ইসলাম মালিকানা দর্শনের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।
ইসলামী অর্থনীতি মানুষের মালিকানাকে অস্বীকার করে না; বরং ব্যক্তিমালিকানা স্বীকৃতি দেয়, সুরক্ষা দেয় এবং বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনকে উৎসাহিত করে। কিন্তু ইসলাম একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মালিকানা চূড়ান্ত নয়। মানুষের হাতে যা কিছু আছে, তা মূলত তার কাছে অর্পিত একটি আমানত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আসমান ও পৃথিবীর সার্বভৌম মালিকানা আল্লাহর।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৯)
অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদ দিয়েছেন, তা থেকে তাদের প্রদান করো।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩৩)
দ্বিতীয় আয়াতটির ভাষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে মানুষের হাতে থাকা সম্পদকেও ‘আল্লাহর সম্পদ’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ সম্পদের ভোগদখলকারী হতে পারে, আইনগত মালিক হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত মালিক নয়। ইসলামী অর্থনীতির মালিকানা-দর্শনের ভিত্তি এখানেই। মানবসভ্যতার অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ গড়ে উঠেছে।
ইংরেজ দার্শনিক জন লক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সেকেন্ড ট্রিটিজ অব গভর্নমেন্ট’-এ ব্যক্তিগত মালিকানার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘Though the earth, and all inferior creatures, be common to all men, yet every man has a property in his own person...’
লকের মতে, মানুষের শ্রম তার নিজের সম্পত্তি। আর যখন সে তার শ্রমকে কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত করে, তখন সেই বস্তু তার বৈধ সম্পত্তিতে পরিণত হয়। আধুনিক ব্যক্তিগত মালিকানাতত্ত্বের বিকাশে এই ধারণা গভীর প্রভাব ফেলেছে।
ইসলাম শ্রমের মর্যাদাকে অস্বীকার করে না; বরং শ্রম, উদ্যোগ ও বৈধ উপার্জনকে সম্মানের চোখে দেখে। কিন্তু ইসলাম এখানেই থেমে যায় না। ইসলাম প্রশ্ন করে—শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ কি মানুষকে সীমাহীন অধিকার দেয়? সে কি ইচ্ছামতো সম্পদ ব্যবহার করতে পারে? তার সম্পদের মধ্যে কি অন্য কারো কোনো অধিকার নেই? ইসলামের উত্তর হলো, সম্পদের সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। সম্পদ শুধু অধিকার নয়, আমানতও।
এই দায়িত্বের ধারণাই ইসলামী অর্থনীতিকে শুধু অর্থনৈতিক তত্ত্বের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তাকে একটি নৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ এমন এক বিষয়, যার ব্যাপারে মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে। সে শুধু কত সম্পদ অর্জন করেছে, তা নয়; কিভাবে অর্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই কোরআন সম্পদকে নিছক আশীর্বাদ হিসেবে নয়, পরীক্ষা হিসেবেও উল্লেখ করেছে। ‘তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১৫)
এই আয়াত আমাদের একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষা দেয়। মানুষ সাধারণত সম্পদকে সাফল্যের প্রতীক মনে করে। কিন্তু কোরআন সম্পদকে দায়িত্বের মানদণ্ড হিসেবেও দেখছে। সম্পদ মানুষের মর্যাদা বাড়াতে পারে, আবার তাকে বিভ্রান্তও করতে পারে। সম্পদ মানুষের কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে, আবার তার নৈতিক পতনের কারণও হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই জবাবদিহির বিষয়টিকে আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পদক্ষেপ সরবে না, যতক্ষণ না তাকে তার সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে—কোথা থেকে তা অর্জন করেছে এবং কোথায় তা ব্যয় করেছে।’ (জামে তিরমিজি)
এই হাদিস ইসলামী অর্থনীতির একটি মৌলিক নীতি তুলে ধরে। পৃথিবীর বহু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের সম্পদের পরিমাণকে গুরুত্ব দেয়; ইসলাম গুরুত্ব দেয় তার উৎস ও ব্যবহারের ওপর। একজন ব্যক্তি বিপুল সম্পদের মালিক হতে পারেন, কিন্তু যদি সেই সম্পদ অন্যায়ভাবে অর্জিত হয় কিংবা অন্যায় কাজে ব্যয় হয়, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে তা সাফল্য নয়। এ কারণেই ইসলামে উপার্জনের বৈধতা একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। শুধু ধনী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়, বৈধ উপায়ে ধনী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ব্যয় করা গুরুত্বপূর্ণ নয়, সঠিক স্থানে ব্যয় করা গুরুত্বপূর্ণ।
সমকালীন ইসলামী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ওমর চাপরা তাঁর ‘ Islam and the Economic Challenge’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে নৈতিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে প্রকৃত মানবকল্যাণ অর্জন সম্ভব নয়। সম্পদ বৃদ্ধি সমাজের জন্য কল্যাণকর হতে পারে, কিন্তু সেই সম্পদ যদি ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সামাজিক ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা নতুন সংকটও সৃষ্টি করতে পারে।
ইসলামী অর্থনীতিতে মালিকানা তাই একাধারে অধিকার ও দায়িত্ব। একজন ব্যক্তি তার সম্পদের মালিক, কিন্তু সেই সম্পদের মধ্যে দরিদ্রের অধিকার রয়েছে। একজন ব্যবসায়ী তাঁর লাভের অধিকার রাখেন, কিন্তু প্রতারণার অধিকার রাখেন না। একজন ধনী তাঁর সম্পদ ভোগ করতে পারেন, কিন্তু অপচয়ের অধিকার রাখেন না। এ কারণেই ইসলামে জাকাত শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এটি মালিকানার দর্শনের একটি বাস্তব প্রকাশ। কারণ ইসলাম মনে করে সম্পদ একেবারে ব্যক্তিগত বিষয় নয়। সমাজের দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষেরও সেই সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে।
একইভাবে উত্তরাধিকার আইনও ইসলামী অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বহু সভ্যতায় সম্পদ কয়েকটি পরিবারের হাতে শতাব্দীর পর শতাব্দী কেন্দ্রীভূত থেকেছে। ইসলাম উত্তরাধিকারের মাধ্যমে সেই কেন্দ্রীভবনকে ভেঙে সম্পদের বিস্তৃত বণ্টনের ব্যবস্থা করেছে। ফলে সম্পদ সমাজে চলাচল করে, স্থবির হয়ে থাকে না।
কোরআন সম্পদের সঞ্চয়কে নয়, সম্পদের সঠিক প্রবাহকে গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণেই সুরা আল-হাশরে বলা হয়েছে, ‘যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৭)
এই সংক্ষিপ্ত আয়াতটি ইসলামী অর্থনীতির সামাজিক দর্শনকে গভীরভাবে ধারণ করে। ইসলাম সম্পদের বিরোধিতা করে না; বরং সম্পদের একচেটিয়া আধিপত্যের বিরোধিতা করে।
ইসলামের ইতিহাসে আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাই। উসমান ইবনে আফফান (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন মদিনার অন্যতম ধনী সাহাবি। ইসলাম তাঁদের সম্পদের জন্য সমালোচনা করেনি; বরং তাঁদের সম্পদকে সমাজকল্যাণে ব্যয় করার জন্য প্রশংসা করেছে। এতে স্পষ্ট হয় যে ইসলামের আপত্তি সম্পদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে নয়; বরং সম্পদের অহংকার, অপব্যবহার এবং অন্যায় কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে। বস্তুত ইসলামী অর্থনীতির মালিকানা-দর্শন মানুষকে দুটি ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। একদিকে এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও মালিকানার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, অন্যদিকে সীমাহীন মালিকানার ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি মানুষকে সম্পদ অর্জনে উৎসাহিত করে, কিন্তু সম্পদের দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকতে শিক্ষা দেয়।
এ কারণেই ইসলামে সম্পদকে শুধু ভোগের উপকরণ হিসেবে দেখা হয় না; বরং একটি আমানত হিসেবে দেখা হয়। আর আমানতের প্রকৃতি হলো তার সঙ্গে দায়িত্ব জড়িত থাকে। মানুষ তার সম্পদের হিসাব ব্যাংকের কাছে দিতে পারে, রাষ্ট্রের কাছেও দিতে পারে; কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে তাকে একদিন তার রবের কাছেও হিসাব দিতে হবে। সেই বোধই ইসলামী অর্থনীতির মালিকানা-দর্শনের প্রাণ। এখানে সম্পদ আছে, মালিকানা আছে, বাজার আছে, উদ্যোগ আছে; কিন্তু সবকিছুর ওপর রয়েছে নৈতিক জবাবদিহির ছায়া। আর এখানেই ইসলামী অর্থনীতি শুধু একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়, বরং একটি নৈতিক সভ্যতার অংশ হয়ে ওঠে।




