• ই-পেপার

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় মুমিনের করণীয়

শতাব্দীর প্রাচীনতম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
শতাব্দীর প্রাচীনতম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র সিলেটের দরগাহ। এখানেই শায়িত আছেন উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের অন্যতম অগ্রদূত শাহজালাল ইয়ামেনি (রহ.)। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দরগাহ শুধু একটি সমাধিস্থল নয়; বরং এটি ইসলামের ইতিহাস, আধ্যাত্মিক সাধনা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত স্মারক হিসেবে পরিচিত।

আরব থেকে সিলেটে
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মহান আল্লাহর নির্দেশনা স্বপ্নে লাভ করার পর শাহজালাল (রহ.) সুদূর ইয়েমেন থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেটে আগমন করেন। সে সময় সিলেটে হিন্দু রাজা গৌড়গোবিন্দের শাসন চলছিল। নানা প্রতিরোধ, অগ্নিবাণ ও কৌশল ব্যর্থ করে শাহজালাল (রহ.) এবং তাঁর সাহসী সঙ্গীরা সিলেট বিজয় করেন।

এই বিজয়ের পর শ্রীহট্ট নতুন পরিচয়ে ‘জালালাবাদ’ নামে খ্যাতি লাভ করে এবং এ অঞ্চলজুড়ে ইসলামের শিক্ষা, দাওয়াত ও নৈতিক আদর্শের প্রসার শুরু হয়। পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গীর সংখ্যা ৩৬০ জনে উন্নীত হয়। তাঁরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে ইসলাম প্রচার, শিক্ষা বিস্তার এবং নতুন মুসলমানদের দ্বীনি প্রশিক্ষণে আত্মনিয়োগ করেন। শাহজালাল (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক মর্যাদা এতটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল যে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর সাক্ষাৎ লাভে ছুটে আসতেন। এমনকি বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতাও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের ভ্রমণবৃত্তান্তে তাঁর প্রশংসা লিপিবদ্ধ করেন।

সিলেটকে খাজনামুক্ত ঘোষণা
সিলেট বিজয়ের পর দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ শাহজালাল (রহ.)-কে সিলেটের শাসনভার গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু ক্ষমতা ও রাজকীয় মর্যাদার প্রতি অনাসক্ত এই মহান সাধক সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর সুলতান বিশেষ ফরমান জারি করে সিলেট শহরকে খাজনামুক্ত ঘোষণা করেন এবং শাহজালাল (রহ.)-এর সম্মানে এ বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেন। ঐতিহাসিক সূত্র মতে, এই বিশেষ মর্যাদার প্রভাব বহুদিন পর্যন্ত বহাল ছিল।
সুলতানি যুগ থেকে ব্রিটিশ শাসনের প্রারম্ভ পর্যন্ত এক ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য প্রচলিত ছিল। দিল্লি থেকে যেসব শাসনকর্তা সিলেটে আসতেন, তাঁরা প্রথমে শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে উপস্থিত হয়ে জিয়ারত করতেন। এরপর দরগাহর খাদিমদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও পাগড়ি গ্রহণ করার পরই জনগণ তাঁদের শাসক হিসেবে গ্রহণ করত। ঐতিহাসিক শামসুল আলম সি.এস.পি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এই প্রথা সিলেটবাসীর হৃদয়ে শাহজালাল (রহ.)-এর গভীর সম্মান ও প্রভাবেরই প্রতিফলন।

যেভাবে নির্মিত হয়েছে শাহজালালের (রহ.) মাজার
বর্তমান দরগাহ টিলা বহু শতাব্দীর নির্মাণ ও সংস্কারের ফল। প্রাচীরবেষ্টিত স্থানে চার কোণে চারটি উঁচু স্তম্ভবিশিষ্ট সমাধিটি নির্মিত হয়েছে। সমাধির পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি ছোট মসজিদ, যা পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলে সিলেটের ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর উইলস পুনর্নির্মাণ করেন। সমাধির পূর্ব পাশে ইয়েমেনের যুবরাজ শেখ আলী এবং পশ্চিম পাশে গৌড়ের উজির মকবুল খানের কবর রয়েছে।

সুলতান ও মোগলদের নির্মাণে সমৃদ্ধ দরগাহ চত্বর
বর্তমান দরগাহ চত্বরের অধিকাংশ স্থাপনা বিভিন্ন সময়ে বাংলার সুলতান, মোগল সম্রাট এবং তৎকালীন শাসকদের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে। দক্ষিণ প্রবেশপথে রয়েছে চিল্লাখানা এবং শাহজালাল (রহ.)-এর কয়েকজন সঙ্গীর সমাধি। পাশেই শায়িত আছেন দরগাহর সাবেক মুতাওয়াল্লিরা। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সিলেটের ফৌজদার ফরহাদ খান নির্মাণ করেন বিশাল গম্বুজ ভবন, যা আজও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এর পাশেই রয়েছে ‘ঘড়িঘর’ নামে পরিচিত আরেকটি স্থাপনা।

ছয় শতাব্দীর পুরোনো দরগাহ মসজিদ
দরগাহ চত্বরে অবস্থিত বৃহৎ মসজিদটি বাংলার সুলতান আবু মুজাফফর ইউসুফ শাহের আমলে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে মন্ত্রী মজলিশে আতার নির্মাণ করেন। পরে ১৭৪৪ সালে বাহারাম খান ফৌজদারের সময় এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি সিলেট শহরের অন্যতম প্রধান জুমার মসজিদ হিসেবে পরিচিত।

দরগাহ পুকুরের রহস্যময় গজার মাছ
দরগাহ টিলার নিচে অবস্থিত বড় পুকুরে আজও গজার মাছ অবাধে বিচরণ করে। দর্শনার্থীরা খাবার নিয়ে ডাক দিলে মাছগুলো তীরে ভিড় জমায়। লোককাহিনিতে প্রচলিত আছে, এই মাছগুলো শাহজালাল (রহ.)-এর সময় থেকেই সংরক্ষিত। যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, তবুও এটি সিলেটের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।

বিশাল ডেগচি ও লঙ্গরখানার ইতিহাস
দরগাহ প্রাঙ্গণে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে তামার তৈরি দুটি বিশাল ডেগচি। ইতিহাস অনুযায়ী, একেকটিতে একসঙ্গে সাতটি গরু ও সাত মন চাল রান্না করা সম্ভব। ডেগচির গায়ে উৎকীর্ণ ফারসি লিপি থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগরের (বর্তমান ঢাকা) শেখ আবু সায়িদ ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে এগুলো তৈরি করে মুরাদ বখশের মাধ্যমে দরগাহে পাঠিয়েছিলেন। একসময় এখানকার লঙ্গরখানায় ভ্রমণকারী, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা ছিল।

শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত ঐতিহাসিক নিদর্শন
দরগাহে সংরক্ষিত রয়েছে শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত বলে প্রচলিত কয়েকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এর মধ্যে রয়েছে তাঁর তরবারি, কাঠের খড়ম, হরিণের চামড়ার তৈরি জায়নামাজ, তামার প্লেট ও বাটি। তামার একটি বাটিতে আরবি ভাষায় কিছু লেখা রয়েছে। অনেক মানুষ এটিকে বরকতের নিদর্শন হিসেবে মনে করেন। তবে ইসলামী আকীদা অনুযায়ী রোগমুক্তি একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে। কোনো বস্তু নিজস্ব ক্ষমতায় উপকার বা ক্ষতি করতে পারে—এমন বিশ্বাস শরিয়তসম্মত নয়।

শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ বাংলায় ইসলামের ইতিহাস, সুলতানি ও মোগল স্থাপত্য, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শত শত বছরের ইতিহাস বহনকারী এই দরগাহ আজও দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র। তবে এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার পাশাপাশি ইসলামের আকীদা অনুযায়ী আল্লাহর একত্ববাদকে অটুট রাখা এবং যেকোনো প্রকার অতিরঞ্জিত বা ভিত্তিহীন বিশ্বাস থেকে বিরত থাকাও একজন মুসলিমের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষের ভাগ্য কি পরিবর্তনশীল, ইসলাম কী বলে ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
মানুষের ভাগ্য কি পরিবর্তনশীল, ইসলাম কী বলে ?
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও জিজ্ঞাসিত বিষয়গুলোর একটি হলো—‘ভাগ্য কি পরিবর্তনশীল?’ অনেকেই মনে করেন, যেহেতু আল্লাহ সবকিছু পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন, তাই মানুষের চেষ্টা, দোয়া কিংবা সৎকর্মের কোনো প্রভাব নেই। আবার কেউ কেউ মনে করেন, মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই সম্পূর্ণভাবে গড়ে তোলে। ইসলাম এ দুই চরমপন্থার কোনোটিকেই সমর্থন করে না।

ইসলামের দৃষ্টিতে তাকদির তথা ভাগ্য হলো-আল্লাহ তাআলার সর্বজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচারের অংশ। তিনি সবকিছু জানেন, সবকিছু লিখে রেখেছেন; তবে একই সঙ্গে মানুষকে ইচ্ছাশক্তি, কর্মক্ষমতা এবং দোয়ার সুযোগও দিয়েছেন। তাই একজন মুমিন বিশ্বাস করে—আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কিছুই ঘটে না, আবার আল্লাহর নির্দেশিত উপায় অবলম্বন করলে তিনি বান্দার অবস্থা ও নির্ধারিত অনেক বিষয় পরিবর্তনও করেন।

তাকদির বা ভাগ্য কী?
তাকদির অর্থ হলো—মহান আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান অনুযায়ী সৃষ্টিজগতের সবকিছুর পরিমাণ, সময়, অবস্থা ও পরিণতি পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই সমস্ত সৃষ্টির তাকদীর লিখে রেখেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৫৩)

ভাগ্য কি পরিবর্তন হয়?
এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, আল্লাহ যেসব বিষয় পরিবর্তনের সঙ্গে শর্তযুক্ত রেখেছেন, সেগুলো দোয়া, সৎকর্ম, তওবা ও আমলের মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে। তবে আল্লাহর চূড়ান্ত ও সর্বজ্ঞ সিদ্ধান্ত কখনো ভুল হয় না।

১. চেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের অবস্থা পরিবর্তন করেন
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ১১)
এই আয়াত প্রমাণ করে, মানুষের ঈমান, আমল, চরিত্র ও কর্মের পরিবর্তনের সঙ্গে আল্লাহ তাদের অবস্থাও পরিবর্তন করেন।

২. দোয়া ভাগ্যের পরিবর্তনের অন্যতম মাধ্যম
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দোয়া ছাড়া কোনো কিছুই তাকদীরকে প্রতিহত করতে পারে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২১৩৯)
অর্থাৎ, আল্লাহ এমনভাবেই তাকদির নির্ধারণ করেছেন যে বান্দা দোয়া করলে বিপদ দূর হবে, আর দোয়া না করলে তা নেমে আসবে।

৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি পায়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং তার আয়ু বরকতময় হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬)

তাকদিরের দুই স্তর
আলেমগণ তাকদিরকে সাধারণভাবে দুই ভাগে ব্যাখ্যা করেছেন—
১. চূড়ান্ত তাকদির (যা আল্লাহর চিরন্তন জ্ঞানে সংরক্ষিত)। এটি লাওহে মাহফুজে লিখিত, যা কখনো পরিবর্তিত হয় না।

২. শর্তযুক্ত তাকদীর
এটি ফেরেশতাদের নিকট লিখিত বিষয়, যা আল্লাহর নির্দেশে দোয়া, তওবা, সদকা, নেক আমল ইত্যাদির কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন; আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল কিতাব (লাওহে মাহফুজ)।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ৩৯)

অতএব, মানুষের ভাগ্য নিয়ে ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা সবকিছু পূর্ব থেকেই জানেন এবং তাঁর জ্ঞানে কোনো পরিবর্তন হয় না। তবে তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য এমন অনেক বিষয় শর্তসাপেক্ষে নির্ধারণ করেছেন, যা দোয়া, তওবা, সৎকর্ম, তাকওয়া ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ‘ভাগ্যে যা আছে তাই হবে’—এই অজুহাতে অলস বসে থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং একজন মুমিন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, আল্লাহর কাছে কান্নাভেজা দোয়া করবে, নেক আমলে নিজেকে সমৃদ্ধ করবে এবং সবশেষে ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করবে।

আসুন, আমরা তাকদিরের ওপর দৃঢ় ঈমান রাখি, দোয়া ও সৎকর্মকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানাই এবং বিশ্বাস করি—যিনি তাকদিরের মালিক, তিনিই চাইলে আমাদের জীবনকে অন্ধকার থেকে আলোয়, সংকট থেকে স্বস্তিতে এবং হতাশা থেকে সফলতায় পরিবর্তন করে দিতে পারেন।

অন্তরের পবিত্রতা রক্ষায় মহামূল্যবান দুইটি দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
অন্তরের পবিত্রতা রক্ষায় মহামূল্যবান দুইটি দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার ঈমান ও পরিশুদ্ধ অন্তর। বাহ্যিক সৌন্দর্য, ধন-সম্পদ কিংবা সামাজিক মর্যাদা মানুষকে আল্লাহর কাছে সম্মানিত করে না; বরং সম্মান ও সফলতার মূল ভিত্তি হলো আত্মশুদ্ধি (তাজকিয়াতুন নফস) ও তাকওয়া। আত্মশুদ্ধি এমন একটি অবিরাম সাধনা, যার মাধ্যমে মানুষ নিজের অন্তরকে হিংসা, অহংকার, রিয়া, লোভ ও পাপাচার থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে।

এ কারণেই বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) শুধু উম্মতকে আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং তিনি নিজেও আল্লাহর কাছে বারবার আত্মার পবিত্রতা, তাকওয়া এবং ঈমানে অবিচল থাকার জন্য দোয়া করতেন। তেমনি দুটি দোয়া হলো-

১. অন্তরের পবিত্রতার দোয়া 

 اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা আতি নাফসি তাকওয়াহা, ওয়া জাক্কিহা আনতা খাইরু মান জাক্কাহা, আনতা ওয়ালিয়্যুহা ওয়া মাওলাহা।
অর্থ : হে আল্লাহ! আমার আত্মাকে তাকওয়া দান করুন এবং তাকে পরিশুদ্ধ করুন। আপনিই সর্বোত্তম পরিশুদ্ধকারী। আপনিই তার অভিভাবক ও মালিক। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭২২)

২. ঈমানে অবিচল থাকার দোয়া
আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি অন্তরকে দ্বীনের ওপর অটল রাখার জন্যও মহানবী (সা.) অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী একটি দোয়া করতেন—

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ

উচ্চারণ : ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত ক্বালবী আলা দ্বীনিক।
অর্থ : ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর সুদৃঢ় রাখুন।’(জামে তিরমিজি, হাদিস : ২১৪০)

মানুষের অন্তর মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়। তাই আল্লাহর মহানবী (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, অন্তর যেন কখনো সত্যপথ থেকে বিচ্যুত না হয়—সেজন্য সর্বদা আল্লাহর কাছেই আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে।  আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে পরিশুদ্ধ অন্তর, অটল ঈমান এবং তাকওয়াপূর্ণ জীবন দান করুন। আমিন।

হাদিসের বাণী

আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অবজ্ঞা করা নিন্দনীয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অবজ্ঞা করা নিন্দনীয়
সংগৃহীত ছবি

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা একসঙ্গে ছয় জন মহানবী (সা.)-এর দরবারে বসা ছিলাম। তখন মুশরিকরা মহানবী (সা.)-কে বলল, তাদেরকে আপনি আপনার মজলিস থেকে বের করুন, যাতে তারা আমাদের ব্যাপারে কোনো দুঃসাহস না দেখাতে পারে। সাদ (রা.) বলেন, সেখানে আমি, ইবনে মাসউদ, হুজাইল গোত্রের এক ব্যক্তি, বিলাল এবং আরও দুজন লোক ছিলাম, যাদের নাম নিচ্ছি না। তাই মহানবী (সা.)-এর অন্তরে যা ইচ্ছা উদ্রেক হলো যে, তিনি মনে-মনে (আমাদের সরানোর কথা) ভাবছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করলেন, ‘যারা তাদের রবকে সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ডাকে, আপনি তাদের তাড়িয়ে দেবেন না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৫২, সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬২৪১)

হাদিসের শিক্ষাসমূহ

১. মানুষের মর্যাদার ভিত্তি হলো ঈমান ও তাকওয়া, ধন-সম্পদ, বংশ বা সামাজিক মর্যাদা নয়।
২. দরিদ্র ও দুর্বল মুমিনদের অবহেলা করা বা তুচ্ছ মনে করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
৩. যারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে, তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা।
৪. দ্বীনের দাওয়াতে ধনীদের সন্তুষ্টির জন্য নীতির সঙ্গে আপস করা যাবে না।
৫. ইসলামে সকল মানুষ সমান। ধনী-গরিব, সাদা-কালো, আরব-অনারব—সবার মর্যাদা তাকওয়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
৬. দাওয়াতের ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি ও আদর্শ বিসর্জন দেওয়া যাবে না, যদিও এতে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অসন্তুষ্ট হয়।
৭. সাহাবায়ে কিরাম ছিলেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তাঁদের দারিদ্র্য তাঁদের মর্যাদা কমাতে পারেনি।
৮. কোরআনের আয়াত অনেক সময় নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে নাজিল হলেও, তার শিক্ষা সর্বকালের সব মুসলিমের জন্য প্রযোজ্য।

অতএব, কোনো মুমিনকে তার আর্থিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থান বা বাহ্যিক পরিচয়ের কারণে কখনোই ছোট করে দেখা বা অবজ্ঞা করা উচিত নয়। কেননা ইসলামে সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া।