• ই-পেপার

মহররম মাসে মুমিনের করণীয় বিশেষ ১০ আমল

বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার বিশিষ্ট মসজিদ ‘জামিউল জাজাইর’

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার বিশিষ্ট মসজিদ ‘জামিউল জাজাইর’
সংগৃহীত ছবি

ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির তীরে, আলজেরিয়ার রাজধানীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক ইসলামি স্থাপত্যের এক বিস্ময়—‘জামিউল জাজাইর’। ইসলামের সৌন্দর্য, জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল এই বিশাল মসজিদ আজ শুধু আলজেরিয়ার নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের গর্বের প্রতীক। চার লাখ বর্গমিটারেরও বেশি বিস্তৃত এই মহাপরিকল্পনা মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববীর পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ এবং আফ্রিকা মহাদেশের সর্ববৃহৎ মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত।

যে ভূমিতে আজ ইসলামের এই মহিমান্বিত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে সেই এলাকাকে মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক কার্ডিনাল লাভিজেরির নামে নামকরণ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর আলজেরিয়া সেই ইতিহাসকে পেছনে ফেলে ইসলামী পরিচয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটায়। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজ শেষে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দেল মাজিদ তেব্বুন আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদটির উদ্বোধন করেন। 

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মিনার
জামিউল জাজাইরের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর ২৩৫ মিটার (প্রায় ৮৬৯ ফুট) উচ্চতার মিনার, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার হিসেবে পরিচিত। ৪৩ তলাবিশিষ্ট এই মিনারটি কেবল আজানের জন্য নির্মিত হয়নি; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্র। এর ভেতরে রয়েছে— ইসলামি সভ্যতা জাদুঘর, গবেষণা কেন্দ্র, আধুনিক গ্রন্থাগার, পর্যটকদের জন্য অবজারভেশন ডেক ও রেস্তোরাঁ ও সাংস্কৃতিক সুবিধা। মিনারের উপরের তলা থেকে পুরো আলজিয়ার্স শহর এবং ভূমধ্যসাগরের অপূর্ব দৃশ্য এক নজরে দেখা যায়। রাতের বেলায় এটি সমুদ্রগামী জাহাজগুলোর জন্য বাতিঘরের ভূমিকাও পালন করে।

লাখো মুসল্লির ইবাদতের কেন্দ্র
মসজিদের মূল নামাজঘরে একসঙ্গে প্রায় ৩৬ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বিশাল চত্বর ও বহিরাঙ্গনসহ মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের। ২২ হাজার বর্গমিটার আয়তনের নামাজঘরের উপরে রয়েছে প্রায় ৫০ মিটার ব্যাসের এক বিশাল গম্বুজ। দেয়ালজুড়ে খোদাই করা হয়েছে কোরআনের আয়াত ও দৃষ্টিনন্দন ইসলামি ক্যালিগ্রাফি, যা পুরো পরিবেশকে আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যে ভরিয়ে তোলে। মসজিদের মিম্বারটি আফ্রিকান ওক কাঠ ও প্রাকৃতিক মুক্তা দিয়ে নির্মিত। 

ভয়াবহ ভূমিকম্পেও নিরাপদ
আলজিয়ার্স অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় মসজিদটির নিচে বসানো হয়েছে শত শত আধুনিক সিসমিক আইসোলেটর ও ড্যাম্পার। এই প্রযুক্তি ভূমিকম্পের কম্পন উল্লেখযোগ্যভাবে শোষণ করে ভবনকে নিরাপদ রাখে। ফলে এটি আধুনিক প্রকৌশলের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইসলামিক থিমেটিক গার্ডেন
মসজিদ কমপ্লেক্সের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে এক মনোমুগ্ধকর ইসলামিক বাগান। এখানে কোরআনে উল্লেখিত বিভিন্ন বৃক্ষ যেমন— ত্বীন (ডুমুর), জাইতুন (অলিভ), ডালিম, সুগন্ধি লেবু, জুঁই ফুল রোপণ করা হয়েছে। বিশেষভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির প্রতীক হিসেবে আল-আকসা প্রাঙ্গণের মাটি থেকে আনা অলিভ গাছও এখানে স্থান পেয়েছে।

স্বর্ণখচিত বিশাল ঝাড়বাতি
মসজিদের কেন্দ্রীয় ঝাড়বাতিটি বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতিগুলোর অন্যতম। ১৩.৫ মিটার ব্যাস এবং প্রায় ৯.৫ টন ওজনের এই ঝাড়বাতি ২৪ ক্যারেট স্বর্ণে আবৃত। এতে ব্যবহৃত হয়েছে তিন লক্ষাধিক স্বরোভস্কি ক্রিস্টাল, যা আলো প্রতিফলিত করে পুরো নামাজঘরকে অপূর্ব আভায় আলোকিত করে তোলে।

জ্ঞান, গবেষণা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র
জামিউল জাজাইর শুধুমাত্র একটি মসজিদ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জ্ঞানকেন্দ্র। এখানে রয়েছে— দারুল কোরআন, উচ্চতর ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রায় ১০ লক্ষ বইয়ের গ্রন্থাগার, আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী হল, আধুনিক ভূগর্ভস্থ পার্কিং ব্যবস্থা। এসব সুবিধা ইসলামের জ্ঞান, গবেষণা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে। প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত জামিউল জাজাইর ইতিহাস, স্থাপত্য, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জ্ঞানচর্চা ও ইসলামি সভ্যতার এক মহাকাব্যিক প্রকাশ। ভূমধ্যসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহান স্থাপনাটি যেন মুসলিম উম্মাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়—ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি জ্ঞান, সৌন্দর্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানবকল্যাণের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। 

হাদিসের বাণী

যাদের ব্যাপারে মহানবী (সা.) কসম করেছেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যাদের ব্যাপারে মহানবী (সা.) কসম করেছেন
সংগৃহীত ছবি

আবু কাবশাহ আমর ইবনে সাদ আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, মহানবী (সা.) বলেন, আমি তিনটি বিষয়ে তোমাদের জন্য কসম করছি। আর তোমাদের কাছে একটি হাদিস বর্ণনা করব, তা তোমরা সংরক্ষণ করে রাখবে, ১. কোনো ব্যক্তি তার সম্পদ থেকে সাদাকাহ করলে তার সম্পদ কমে যায় না। ২. কোনো ব্যক্তির ওপর জুলুম করা হলে, সে তাতে সবর করলে, আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধি করে দেন। ৩. যে ব্যক্তি ভিক্ষার দরজাকে খোলে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যও দরিদ্রতার দরজাকে খুলে দেন। অথবা তিনি এমন কোনো শব্দ বলেছেন।

আর তোমাদেরকে একটি হাদিস বর্ণনা করব, সেটা সংরক্ষণ রাখো। তিনি বললেন, দুনিয়াতে চার ধরনের লোক আছে, ১. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ ও ইলম দান করেছেন, আর সে আল্লাহকে ভয় করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে, আর এতে যে আল্লাহর হক রয়েছে তা সে জানে-(ও সে অনুযায়ী কাজ করে।) তাহলে সে আল্লাহর কাছে উত্তম স্থানে থাকবে। ২. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ ইলম দান করেছেন, কিন্তু সম্পদ দান করেননি। কিন্তু সে সত্য নিয়তে বলে-অমুকের মতো যদি আমারও সম্পদ থাকত, তাহলে আমি অমুকের মতো ভালো কাজ করতাম। ফলে সেও নিয়ত অনুযায়ী সাওয়াব পাবে। আর তাদের দুজনের (দানকারী ও একনিষ্টভাবে দানকরার ইচ্ছাকারী) সাওয়াবও সমান হবে। ৩. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা তাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু তার কোনো ইলম নেই; ফলে সে অবৈধ পন্থায় সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহকে ভয় করে না ও আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখে না; ও তার সম্পদে কী হক আছে, তা সে জানে না। (আদায় করে না।)-সে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্ট স্তরে অবস্থান থাকবে। ৪. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ ও ইলম কোনো কিছুই দান করেননি; কিন্তু সে বলে, যদি আমার নিকট মাল থাকত, তাহলে আমিও অমুকের মতো আমল করতাম। ফলে তার স্থান নির্ধারিত হবে তার নিয়ত অনুযায়ী। সুতরাং তাদের উভয়ের গুনাহ হবে সমান। (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩২৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১৮০৩১)

শিক্ষা ও বিধান 
১. সদকা করলে সম্পদ কমে না। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) কসম করে বলেছেন, সদকা করার কারণে সম্পদ কমে না। বাহ্যিকভাবে কিছু অর্থ খরচ হলেও আল্লাহ তাআলা বরকত, কল্যাণ ও প্রতিদানের মাধ্যমে তা পূরণ করে দেন।
২. জুলুমের শিকার হয়ে সবর করলে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কেউ অন্যায় করলে প্রতিশোধের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদান আশা করা সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ।
৩. ভিক্ষাবৃত্তি দারিদ্র্যের কারণ। অপ্রয়োজনে মানুষের কাছে হাত পাতার অভ্যাস মানুষকে আত্মমর্যাদাহীন করে এবং দরিদ্রতার দিকে ঠেলে দেয়। ইসলাম কর্ম ও আত্মনির্ভরশীলতাকে উৎসাহিত করে।
৪. ইলম ও সম্পদের সমন্বয় সবচেয়ে বড় নেয়ামত। যে ব্যক্তি সম্পদ ও দ্বীনি জ্ঞান উভয়ই পেয়েছে এবং সেগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করে, সে সর্বোত্তম মর্যাদার অধিকারী।
৫. তাকওয়া সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মূল ভিত্তি। সম্পদ থাকলেই সেটা কল্যাণকর হয় না; বরং তাকওয়া থাকলে সম্পদ কল্যাণের মাধ্যম হয়, আর তাকওয়া না থাকলে তা ধ্বংসের কারণ হয়।
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তাই হাদিসে উত্তম বান্দার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার কথা বলা হয়েছে।
৭. সম্পদে আল্লাহর হক রয়েছে। জাকাত, সদকা, আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা, অসহায়দের সাহায্য—এসব সম্পদের হক। এগুলো আদায় করা মুমিনের দায়িত্ব।
৮. নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। ভালো কাজ করার আন্তরিক ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্য না থাকলে আল্লাহ তাআলা সেই নিয়তের কারণে পূর্ণ সাওয়াব দান করেন।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, মানুষের মর্যাদা সম্পদে নয়, বরং তাকওয়া, ইলম, সৎ নিয়ত ও নেক আমলে। সদকা সম্পদকে বরকতময় করে, সবর সম্মান বৃদ্ধি করে এবং সৎ নিয়ত মানুষকে বড় সাওয়াবের অধিকারী বানায়। অন্যদিকে ইলমহীন সম্পদ ও অসৎ নিয়ত মানুষকে আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট অবস্থানে পৌঁছে দিতে পারে। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত ইলম অর্জন করা, সম্পদের হক আদায় করা, সৎ নিয়ত রাখা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চলা।

মহররম মাসে যেসব কাজ বর্জনীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
মহররম মাসে যেসব কাজ বর্জনীয়
সংগৃহীত ছবি

মহররম ইসলামী বছরের প্রথম মাস এবং আল্লাহ তাআলার নিকট মর্যাদাপূর্ণ চারটি হারাম মাসের অন্যতম। এ মাস ইবাদত, তওবা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে যুগে যুগে কিছু মানুষ এ মাসের প্রকৃত শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে বিভিন্ন কুসংস্কার, বিদআত ও শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মহররমের বরকত ও শিক্ষার পরিবর্তে সমাজে বিভ্রান্তি, বাড়াবাড়ি ও ধর্মীয় অপসংস্কৃতির প্রসার ঘটেছে।

ইসলাম আমাদেরকে প্রত্যেক আমল কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে করার শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)  যে পথ দেখিয়েছেন, সেটিই হলো মুক্তি ও সফলতার পথ। তাই মহররম মাসের ফজিলত অর্জন করতে হলে যেমন কিছু আমল পালন করা জরুরি, তেমনি কিছু ভুল ও বর্জনীয় কাজ থেকেও দূরে থাকা আবশ্যক। আসুন, কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মহররম মাসে প্রচলিত কয়েকটি বর্জনীয় আমল সম্পর্কে জানি।

১. আশুরাকে শোক ও মাতমের দিবস বানানো
অনেক মানুষ আশুরার দিনকে শুধু শোক, বিলাপ ও মাতমের দিন হিসেবে পালন করে। অথচ ইসলাম কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্থায়ী শোক দিবস পালনকে সমর্থন করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 

لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَطَمَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ

‘সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলিয়াতের মতো বিলাপ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৩)
অতএব আশুরাকে শোক ও বিলাপের দিবস বানানো সুন্নাহসম্মত নয়।

২. নিজের শরীরে আঘাত করা ও রক্ত ঝরানো
কিছু সম্প্রদায় আশুরার দিনে নিজেদের শরীরে আঘাত করে, শিকল বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে রক্তাক্ত করে এবং এটিকে ইবাদত বা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ মনে করে। কিন্তু ইসলাম স্পষ্টভাবে আত্মনির্যাতন নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

 وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا

‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংস কর না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,

 وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ

‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কর না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৫)
অতএব নিজেকে আঘাত করা, রক্ত ঝরানো বা শারীরিক কষ্ট দেওয়া ইসলামে বৈধ নয়।

৩. বিদআত ও মনগড়া ইবাদত চালু করা
অনেক স্থানে মহররম উপলক্ষে বিশেষ নামাজ, বিশেষ জিকির, নির্দিষ্ট রাকাতের সালাত বা বিশেষ অনুষ্ঠানকে ধর্মীয় আমল হিসেবে প্রচার করা হয়; অথচ এগুলোর কোনো সহিহ ভিত্তি নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

 مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ
‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন চালু করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৬৯৭)
সুতরাং দ্বিনের নামে নতুন নতুন ইবাদত আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

৪. বিশেষ খাবার রান্না আবশ্যক মনে করা
কিছু অঞ্চলে আশুরার দিনে বিশেষ খাবার, খিচুড়ি বা নির্দিষ্ট খাদ্য প্রস্তুত করাকে ধর্মীয় কর্তব্য মনে করা হয়। বাস্তবে কোরআন বা সহিহ হাদিসে আশুরার দিন বিশেষ কোনো খাবার রান্না করাকে ইবাদত হিসেবে প্রমাণিত করা হয়নি। কেউ সাধারণ দান-সদকার উদ্দেশ্যে খাবার বিতরণ করলে তা সওয়াবের কাজ হতে পারে, কিন্তু এটিকে সুন্নাহ বা বাধ্যতামূলক ধর্মীয় রীতি মনে করা সঠিক নয়।

৫. ভিত্তিহীন ফজিলতের গল্প ও জাল হাদিস প্রচার করা
মহররম মাস এলেই অনেক মনগড়া ঘটনা, জাল হাদিস ও ভিত্তিহীন ফজিলতের বর্ণনা ছড়িয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 

 مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ

‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৭)
তাই কোনো বর্ণনা প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

৬. হারাম মাসের মর্যাদা নষ্ট করে গুনাহে লিপ্ত হওয়া
মহররম যেহেতু হারাম মাস, তাই এ মাসে গুনাহ, অন্যায়, জুলুম, গীবত, মিথ্যা ও অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়া থেকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ

‘সুতরাং তোমরা এসব সম্মানিত মাসে নিজেদের প্রতি জুলুম কর না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)
এ আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে হারাম মাসগুলোতে পাপ থেকে আরো বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

মহররম মাস আমাদের জন্য শোক, কুসংস্কার বা বিদআতের মাস নয়; বরং এটি তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, তওবা ও ইবাদতের মাস। একজন সচেতন মুমিন কখনো আবেগ, অন্ধ অনুসরণ বা সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির ভিত্তিতে দ্বীনের আমল নির্ধারণ করেন না; বরং কোরআন ও সহিহ সুন্নাহকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেন।

তাই আসুন, আমরা মহররম মাসে সব ধরনের বিদআত, কুসংস্কার, মাতম, আত্মনির্যাতন ও ভিত্তিহীন কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো বিশুদ্ধ আমলের মাধ্যমে এ মাসের বরকত অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ এবং তার অনুসরণ করার, আর অসত্যকে অসত্য হিসেবে চিনে তা থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

নকল তালাকনামা তৈরির ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি

মুফতি ওমর বিন নাছির
নকল তালাকনামা তৈরির ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি
সংগৃহীত ছবি

বিবাহ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন। আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ভালোবাসা, দয়া ও প্রশান্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু কখনো কখনো বিভিন্ন প্রশাসনিক, আইনি বা পারিবারিক প্রয়োজনে কিছু মানুষ ‘কৃত্রিম’ বা ‘নকল’ তালাকনামা প্রস্তুত করার চিন্তা করেন। অনেকেই মনে করেন, যেহেতু প্রকৃতপক্ষে তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্য নেই, তাই এমন কাগজপত্র তৈরি করলেও কোনো সমস্যা হবে না। অথচ ইসলামী শরিয়তে তালাক একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়; এখানে অসাবধানতা, রসিকতা কিংবা বাহ্যিক অভিনয়ও অনেক সময় বাস্তব তালাকের কারণ হয়ে যেতে পারে। তাই কৃত্রিম তালাকনামা তৈরি করার আগে শরিয়তের বিধান জানা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় একটি কাগজে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বিশেষ সতর্কবাণী
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর বিধানসমূহকে উপহাসের বস্তু বানিও না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩১)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, বিবাহ ও তালাকের মতো শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান নিয়ে খেলা করা বা তামাশা করা বৈধ নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি বিষয় এমন যে, এগুলোর বাস্তব কথাও বাস্তব এবং ঠাট্টা-তামাশার কথাও বাস্তব—বিবাহ, তালাক ও রুজু (স্ত্রীকে এক তালাকে রজয়ি দেয়ার পর ফিরিয়ে নেওয়া)।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৯৪, তিরমিজি, হাদিস : ১১৮৪)

এই হাদিস প্রমাণ করে যে তালাকের ক্ষেত্রে ‘আমি সত্যি চাইনি’—এমন অজুহাত সবসময় গ্রহণযোগ্য নয়।

নকল তালাকনামা কী?
নকল তালাকনামা বলতে এমন দলিলকে বোঝায়, যা প্রকৃত তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়; বরং কোনো প্রশাসনিক, আইনি বা অন্য কোনো পার্থিব সুবিধা অর্জনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে প্রশ্ন হলো—এমন দলিল লিখলে বা স্বাক্ষর করলে কি তালাক সংঘটিত হবে?

নকল তালাকনামা প্রস্তুত করলে কখন তালাক হবে না?
ফুকাহায়ে কেরামের বর্ণনা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি দুজন সাক্ষীকে উপস্থিত রেখে স্পষ্টভাবে বলে—‘আমি প্রকৃত তালাক দেওয়ার জন্য নয়; বরং একটি কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা প্রস্তুত করছি।’ তাহলে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তার এই বক্তব্য প্রমাণিত থাকবে এবং এ অবস্থায় তালাক কার্যকর হবে না। কারণ সাক্ষীরা পরবর্তীতে সাক্ষ্য দিতে পারবেন যে, তার উদ্দেশ্য প্রকৃত তালাক ছিল না; বরং শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কাগজ প্রস্তুত করা ছিল। অন্যথায় সাক্ষী ছাড়া কৃত্রিম তালাকনামা তৈরি করলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে।

যদি কেউ কোনো সাক্ষী ছাড়া তালাকনামা লিখায়, অথবা নিজে পড়ে স্বাক্ষর করে এবং তাতে তালাকের শব্দ উল্লেখ থাকে, তাহলে ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী তা বাস্তব তালাক হিসেবে গণ্য হতে পারে। বিশেষত যদি—
সে নিজেই দলিল প্রস্তুত করার নির্দেশ দেয়, অথবা দলিলটি পড়ে স্বাক্ষর করে, অথবা পরে স্বীকার করে যে দলিলটি তার নির্দেশে প্রস্তুত হয়েছে। তাহলে তালাকনামায় যত তালাক লেখা থাকবে, তত তালাকই সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ইমাম ইবন আবেদীন রহ. বলেন, ‘যদি কেউ লেখককে বলে, ‘লিখো যে আমার স্ত্রী তালাকপ্রাপ্তা’, তবে লেখক তা না লিখলেও এই বক্তব্য তালাকের স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হবে।’ (রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৬)

আরো বলা হয়েছে, ‘যে দলিল নিজের হাতে লেখা নয় এবং নিজে বলে দেওয়াও হয়নি, তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না; যতক্ষণ না ব্যক্তি তা নিজের বলে স্বীকার করে।’ (রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৭)
‘আর যদি কেউ মিথ্যা ঘোষণা করার উদ্দেশ্যে বলে, ‘তোমাকে তালাক দেওয়া হলো’, তাহলে সাক্ষীরা তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের সাক্ষ্য না দেওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তালাক কার্যকর বলে বিবেচিত হবে।’ (আদ-দুররুল মুখতার, ৩/২৯৩)

‘যদি সে দাবি করে যে, ‘আমি শুধু ভয় দেখানোর জন্য এমন করেছি’, তবে পূর্বে সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত না হলে তার এ দাবি গ্রহণ করা হবে না।’ (আদ-দুররুল মুখতার, ৪/৪৬০)

এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
১. তালাক নিয়ে খেলাধুলা করা হারাম

তালাক শরিয়তের একটি গুরুতর বিধান। এটি নিয়ে অভিনয়, প্রতারণা বা অসতর্ক আচরণ করা বৈধ নয়।

২. মিথ্যা দলিল তৈরি করা গুনাহ
যদি কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়, তাহলে তা প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১

৩. বিশেষজ্ঞ আলেমের পরামর্শ ছাড়া এমন পদক্ষেপ নেওয়া বিপজ্জনক
অনেক সময় একটি শব্দ, একটি স্বাক্ষর বা একটি বাক্যই বৈবাহিক সম্পর্কের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অভিজ্ঞ মুফতি বা নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের কাজ করা উচিত নয়।

অতএব, কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা প্রস্তুত করার বিষয়টি সাধারণ মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে তালাক শুধু একটি কাগজের বিষয় নয়; বরং এটি একটি পরিবার, একটি সম্পর্ক এবং বহু অধিকার-দায়িত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুতর বিধান। তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে নকল তালাকনামা প্রস্তুত করতে গিয়ে বাস্তব তালাক সংঘটিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই কেউ যদি বিশেষ কোনো কারণে কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা প্রস্তুত করতেই বাধ্য হয়, তবে অবশ্যই শরিয়তের বিধান অনুযায়ী দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নিজের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে তা করবে। আর ইতোমধ্যে কোনো তালাকনামা প্রস্তুত হয়ে থাকলে, তালাক সংঘটিত হয়েছে কি না—সে বিষয়ে অভিজ্ঞ মুফতি বা দারুল ইফতার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত মাসআলা জেনে নেওয়া আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিবাহ ও তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সচেতনতা, তাকওয়া এবং শরিয়তের সীমারেখা মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।