বিকেলের সোনাঝরা রোদ, মাঠজুড়ে ছুটে চলা দুরন্ত কিশোরেরা, বন্ধুদের প্রাণখোলা হাসি, ফুটবল আর ক্রিকেটের উত্তেজনা—একসময় এ দৃশ্য ছিল আমাদের সমাজের অতি পরিচিত ছবি। মাগরিবের আজান না হওয়া পর্যন্ত চলত দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা আর আনন্দ-উচ্ছ্বাস। ধুলোবালি মাখা শরীর, ঘামে ভেজা জামা আর ক্লান্ত মুখের প্রশান্ত হাসিতে ফুটে উঠত একটি সুস্থ ও প্রাণবন্ত শৈশবের প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু আজ সেই দৃশ্য যেন ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। মাঠের জায়গা দখল করেছে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন, বন্ধুর আড্ডার জায়গা নিয়েছে ভার্চুয়াল চ্যাট, আর বাস্তব খেলাধুলার পরিবর্তে শিশু-কিশোরেরা ডুবে যাচ্ছে ডিজিটাল গেমসের কৃত্রিম জগতে। আজকের শিশুদের বড় একটি অংশ বন্দি হয়ে পড়েছে চার দেয়ালের ভেতর, হাতে স্মার্টফোন আর চোখে স্ক্রিনের নীল আলো। এটি শুধুমাত্র প্রযুক্তির অগ্রগতির গল্প নয়; বরং এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তা, চরিত্র, স্বাস্থ্য ও জীবনদর্শনের পরিবর্তনের গল্প।
উদ্দেশ্যহীন জীবন কাম্য নয়
মানুষকে আল্লাহ তাআলা অনর্থক সৃষ্টি করেননি। মানুষের জীবন একটি মহান উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবন। তাই সময়, শক্তি ও মেধাকে অর্থহীন কাজে ব্যয় করা একজন মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১১৫)
আজ যখন অসংখ্য শিশু-কিশোর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করছে, ভার্চুয়াল যুদ্ধের খেলায় মগ্ন থাকছে এবং বাস্তব জীবনের মূল্যবান সময় অপচয় করছে, তখন এই আয়াত আমাদের সামনে গভীর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যাচ্ছি?
হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের প্রাণচাঞ্চল্য
একসময় শিশুদের আনন্দ ছিল মাঠে। তারা দলবদ্ধভাবে খেলত, নেতৃত্ব শিখত, সহযোগিতা শিখত, জয়-পরাজয় মেনে নিতে শিখত। খেলাধুলা তাদের শুধু শরীরকে শক্তিশালী করত না; বরং চরিত্র, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক দক্ষতাও গড়ে তুলত। কিন্তু আজ বাস্তব মাঠের জায়গা দখল করেছে ফ্রি ফায়ার, পাবজি কিংবা অন্যান্য ভার্চুয়াল গেমস। বাস্তব জীবনের বন্ধুদের পরিবর্তে স্ক্রিনের ভেতরের চরিত্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠছে। ফলে শিশুরা ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। যেখানে ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, অল্পবয়সী সাহাবিরা ঈমান, সাহস ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন; সেখানে আমাদের অনেক কিশোর আজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কৃত্রিম জগতের পেছনে ব্যয় করছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দার দুই পা এক কদমও সরবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে—তার জীবন কী কাজে ব্যয় করেছে, তার জ্ঞান দিয়ে কী করেছে, তার সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছে ও কোথায় ব্যয় করেছে এবং তার শরীর কী কাজে ক্ষয় করেছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৭)
এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর নিকট জবাবদিহির বিষয়। তাই সময়কে এমন কাজে ব্যয় করা উচিত যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণ বয়ে আনে।
যেসব কারণে আমাদের শিশুরা মাঠ ছেড়ে স্ক্রিনে
১. খেলার মাঠের সংকট
অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহর ও মফস্বলে খেলার মাঠ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বহুতল ভবনের ভিড়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ উন্মুক্ত স্থান দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
২. নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ
ব্যস্ত জীবনযাপন এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বাইরে পাঠাতে স্বস্তি বোধ করেন না। ফলে শিশুদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন।
৩. প্রযুক্তির আসক্তিমূলক নকশা
আধুনিক অ্যাপস, গেমস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে এগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকে। প্রতিনিয়ত নতুন কনটেন্ট, নোটিফিকেশন এবং পুরস্কারভিত্তিক ডিজাইন শিশুদের মনোযোগকে আটকে রাখে।
শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ
দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে স্থূলতা, ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ব্যথা, চোখের সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। মাঠের খেলাধুলা মানুষকে দলগত জীবন শেখায়। কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভরতা শিশুদের একাকী, আত্মকেন্দ্রিক ও খিটখিটে করে তোলে। বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সম্পর্ক তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়। দীর্ঘ সময় কোনো কাজে একাগ্র থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় উত্তম এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়।’(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
এখানে শক্তি বলতে শুধু শারীরিক শক্তি নয়; বরং ঈমানি শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা, কর্মক্ষমতা এবং উপকারী দক্ষতাও অন্তর্ভুক্ত। খেলাধুলা, শরীরচর্চা এবং সুস্থ জীবনযাপন একজন মুমিনকে এই শক্তি অর্জনে সহায়তা করে।
তরুণদের যৌবন, মেধা ও শক্তি আল্লাহর এক মহান আমানত। এই মূল্যবান সময়কে অর্থহীন বিনোদন, অবিরাম স্ক্রোলিং এবং ভার্চুয়াল জগতের পেছনে নষ্ট করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আজ যারা বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, জ্ঞান অর্জন করবে, শরীরচর্চা করবে, ইসলামী আদর্শে নিজেকে গড়বে—তারাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। আর যারা কেবল স্ক্রিনের নেশায় ডুবে থাকবে, তারা ধীরে ধীরে নিজেদের সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করবে।
আজকের শিশু আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, আলেম, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, উদ্যোক্তা ও সমাজনেতা। তাই তাদের শৈশবকে স্ক্রিনের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা সময়ের অন্যতম বড় দাবি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ, সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে, যেন প্রযুক্তি হয় উপকারের মাধ্যম, ধ্বংসের নয়।
মনে রাখতে হবে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশুদের হাতে। আজ আমরা যদি তাদের হাতে বই, জ্ঞান, চরিত্র ও সুস্থ জীবন তুলে দিতে পারি, তবে আগামীকাল তারা হবে উম্মাহর গর্ব। আর যদি তাদেরকে স্ক্রিনের নেশা ও উদ্দেশ্যহীন বিনোদনের মাঝে হারিয়ে যেতে দিই, তবে তার মাশুল পুরো সমাজকেই দিতে হবে। আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুত তাক্বওয়া আল-ইউসুফিয়্যাহ সরাইল, বি-বাড়িয়া।