১৬ বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলে শুনানি শেষ হয়েছে। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) রায় ঘোষণা করবেন সর্বোচ্চ আদালত।
টানা ৩ দিন শুনানির পর আজ বুধবার রায়ের এ দিন ধার্য করেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। এই রায়ের মাধ্যমে জানা যাবে হাইকোর্টের রায়ই বহাল থাকছে, নাকি বাতিল হতে যাচ্ছে পুরো সংশোধনীটাই।
২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ‘পঞ্চদশ সংশোধনী আইন’ নামে পাস হয় এবং রাষ্ট্রপতি ২০১১ সালের ৩ জুলাই তাতে অনুমোদন দেন। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই সংশোধনী বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচবিশিষ্ট ব্যক্তি। এই রিটে প্রাথমিক শুনানির পর ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট হাইকোর্ট রুল জারি করেন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইন, ২০১১ কেন অসাংবিধানিক এবং বাতিল ঘোষণা করা হবে না, জানতে চাওয়া হয় রুলে। চূড়ান্ত শুনানির পর রুল নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হয় রায়ে। এ রায়ের মধ্য দিয়ে সংবিধানে ফিরে আসে গণভোটের বিধান। একই সঙ্গে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফেরার পথও সুগম হয়।
গত বছর ৩ নভেম্বর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভ টু আপিল) করেন চার রিট আবেদনকারী। পরে নওগাঁর বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও লিভ টু আপিল করেন। গত বছর ১৩ নভেম্বর এসব লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে তাঁদের আপিল করার অনুমিত দেন সর্বোচ্চ আদালত। পরে তাঁরা নিয়মিত আপিল করেন। এরপর শুরু হয় শুনানি। এসব আপিলে শুনানি চলার মধ্যে গত বছর ২ ডিসেম্বর বিএনিপির পক্ষে এ মামলায় পক্ষভুক্ত হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে ইন্টারভেনার (সহযোগী মধ্যস্থতাকারী) হিসেবে যুক্ত হয় আরো দুটি সংগঠন।
গত ৬ জুলাই তিনটি আপিলে শুনানি শুরু হয়। রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. শরীফ ভূইয়া। এরপর শুনানি শুরু করেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। আর ইন্টারভেনারদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক, এ এস এম শাহরিয়ার কবির ও আইনজীবী হামিদুল মিজবাহ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ অনীক রুশদ হক ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্যাহ আল মাসুদ। আজ তৃতীয় দিনের শুনানির পর আগামীকাল রায় ঘোষণার জন্য রেখেছেন আপিল বিভাগ।
শুনানির পর অ্যাটর্নি জেনালে রুহুল কুদ্দুস কাজল নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের রায় উল্লেখ করে আমরা আদালতকে বলেছি, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ-নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ স্বতন্ত্রভাবে তাদের কাজ করবে। স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে একে অপরের পরিপূরক হবে। কিন্তু একটি বিভাগ আরেকটি বিভাগের কাজে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। সর্বোচ্চ আদালত রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে যেন এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন।’
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা মনে করি আইন প্রণয়ন বা সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদ সার্বভৌম। বর্তমানে সংসদ অত্যন্ত কার্যকর। গণতেন্ত্রের জন্য দেশের মানুষের যে আকুতি, সেটি গত ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। এখন পার্লামেন্ট ইজ ভেরি ভাইব্রেন্ট। সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের নানা তর্ক-বিতর্ক দেশের মানুষকে উদ্বেলিত করছে। আমরা গণতন্ত্রের দিকে যাচ্ছি। গণতান্ত্রিক চর্চা চলছে। আদালত আমাদের কথা শুনে বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেছেন।’
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমরা তো মনে করি বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রমনা। বাংলাদেশের মানুষ আগামীর দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দেখতে চায়। সুতরাং কোনো একদলীয় স্বৈরশাসন দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে না। বর্তমান সংসদ যারা আছেন, তারাও তিক্ত অতীত পার করে আজকে এই পর্যায়ে এসেছেন। তারাও নিশ্চয়ই এই জাতিকে দেশের মানুষকে সেই পুরনো কালো অন্ধকার যুগের দিকে ধাবিত করবেন না।’






