টাকা ছাড়া বরিশাল বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে সেবাগ্রহীতাদের আবেদন গৃহীত হয় না—এমন অভিযোগের প্রমাণ খুঁজতে সোমবার নতুল্লাবাদ পাসপোর্ট অফিসে যান এই প্রতিবেদক। অফিসের প্রবেশদ্বারে থাকা কম্পিউটারের দোকান সততা এন্টারপ্রাইজের মালিক সোহাগ এই প্রতিবেদককে আটকে দেন। পাসপোর্ট করাতে এসেছি এমনটি ভেবে তিনি অফার করেন, কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই পাসপোর্ট করে দিতে পারবেন।
সোহাগ বলেন, ১০ বছরের একটি পাসপোর্ট করতে আট হাজার ও পাঁচ বছরের একটি পাসপোর্ট করতে ছয় হাজার টাকা দিতে হবে তাঁকে। মাত্র ৩০ মিনিটেই ফিঙ্গারসহ সব কিছু করে দেওয়ার নিশ্চয়তাও দেন তিনি। যদিও ১০ বছরমেয়াদি ই-পাসপোর্ট (৪৮ পৃষ্ঠা) নিয়মিত ডেলিভারি (২১ দিন) পাঁচ হাজার ৭৫০ টাকা হলেও দুই হাজার টাকা বাড়তি অফিস খরচ হিসেবে দাবি করেন। অন্যদিকে পাঁচ বছরমেয়াদি ই-পাসপোর্টের (৪৮ পৃষ্ঠা) নিয়মিত ডেলিভারি (২১ দিন) চার হাজার ২৫ টাকা হলেও সেখানে বাড়তি দুই হাজার টাকা অফিস খরচ প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
সোহাগের সঙ্গে কথা বলার মধ্যেই পাসপোর্ট অফিসের ভেতর থেকে বের হন উজিরপুর উপজেলার বরাকোঠা ইউনিয়নের কৃষক নূরে আলম হাওলাদার। তাঁকে কাছে ডেকে সাক্ষী মানেন সোহাগ। সোহাগ বলেন, ভাই, তাঁর (কৃষক নূরে আলম) ছেলে আতিকুল ইসলামের পাসপোর্ট তিনি করে দিয়েছেন। নূরে আলম মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি দেন।
সোহাগ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভাই খরচ ছয় হাজার টাকা। কিন্তু ভেতরে দুই হাজার টাকা বাড়তি দিতে হয়। আপনাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা ভেতরে বসে নেবে না। সিস্টেম চেঞ্জ হইছে। আমি ফরম পাঠিয়ে দেব সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করবে। কারণ ওপরে আমার দোকানের নামের প্রথম অক্ষর আপনার ফরমের কর্নারে অথবা পেছনের দিকে পেনসিল দিয়ে লেখা থাকবে। যিনি ফরম জমা নেন, তিনি রাতে এসে ফরমগুলো গুনে আমাদের কাছ থেকে প্রতি ফরমের জন্য দুই হাজার টাকা নিয়ে যাবেন। আমার কাছ থেকে না করলেও যেখান থেকেই করেন প্রত্যেক কম্পিউটার দোকান দুই হাজার টাকা বেশি নেবে অফিস খরচ হিসেবে।’
পাসপোর্ট অফিসের ভেতর প্রবেশ করতেই দেখা হয় আতিকুল ইসলামের সঙ্গে। মুখ বেশ হাসিখুশি। সত্যিই তিনি ৩০ মিনিটে ফিঙ্গার প্রদান করেছেন এবং ছবি তুলেছেন। আতিক এই প্রতিবেদককে জানান, ভাই ১০০ জনের মধ্যে ৯৫ জনই সামনের কম্পিউটার দোকানগুলো থেকে দুই হাজার টাকা বেশি দিয়ে ফরম পূরণ করে আসে। তাতে মোটেই ভোগান্তি পোহাতে হয় না। কারণ ফরমের কর্নারে পেনসিল দিয়ে সাংকেতিক চিহ্ন দেওয়া থাকে। ফরম জমা নিয়ে ওই চিহ্নটি মুছে দেন। কাগজপত্র চেক হয় না। আর যারা এ কাজ না করে, তাদের ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পাসপোর্টের আবেদন জমাও নেয় না।
শুধু সোহাগ ও লিটন চক্রবর্তীর কম্পিউটারের দোকানই নয়, পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে রয়েছে ১০টি কম্পিউটারের দোকান। এর মধ্যে পাঁচটি পাসপোর্ট অফিসের প্রবেশদ্বারে। সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আইডিয়াল ফটোকপি, জিয়া এন্টারপ্রাইজ, এস এ এন্টারপ্রাইজ, স্টার এন্টারপ্রাইজ, খান এন্টারপ্রাইজ, মা-বাবার আশীর্বাদ অনলাইন কম্পিউটার, সততা এন্টারপ্রাইজ, মোস্তাফিজ আইটি, জয়গুরু অনলাইন, বিসমিল্লাহ ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস এই দোকানগুলোতে পাসপোর্ট করতে আসা সেবাগ্রহীতাদের ভিড়। যারা নিজ নিজ এলাকা থেকে আবেদন করেছে, তাদের নতুন করে আবেদন করতে হচ্ছে এই দোকানগুলো থেকে। কারণ প্রতিটি আবেদনেই তারা দোকানের নামের প্রথম অক্ষর পেনসিল দিয়ে সাংকেতিক চিহ্ন দেয়। অফিসে ফরম জমা নেন ইউডিএ শরিফুল ইসলাম।
বরিশাল বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের উপপরিচালক রোজী খন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসের সীমানাপ্রাচীরের সঙ্গে থাকা কম্পিউটারের দোকানগুলো সরানোর জন্য উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় আমরা আবেদন করেছি। ওই কম্পিউটার দোকানিরা আবেদনের সময় আমাদের অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেয়। যেহেতু ইউডিএ শরিফুল ইসলাম ফ্রন্ট ডেক্সে বসেন এবং আবেদনগুলো জমা নেন, সেহেতু তাঁর নামটা এর সঙ্গে বেশি জড়ায়।’ জমাকৃত ফরমের ওপর সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের তদন্ত করতে হবে। যদি ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

