একদিন ঘুমভাঙা ভোরে, মিঠেখালীর বাড়িতে বিছানা ছেড়ে ঘরময় পায়চারি শুরু করল তরুণ কবি ও ভাবুক হিমেল বরকত।
হিমেল, যার অন্য নাম মুহম্মদ বরকতুল্লাহ। এই নামটি তার ডাক্তার বাবা শেখ মুহম্মদ ওয়ালীউল্লাহ রেখেছিলেন। কী যেন কী ভেবে হিমেল ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে আসে।
বাইরে, রোজকার ভোরের মতো যে যার কাজে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ছে। অনেকে ঘরের কাজে ব্যস্ত। কেউ কাজে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ভোরের এই সময়টা অদ্ভুত সুন্দর। পাখির কিচিরমিচির, শিশিরভেজা ঘাস ও পুব আকাশের মনোরম আলো—পৃথিবী এক অপার্থিব সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। চারপাশে কচি লেবুপাতার মতো সুন্দর ও স্নিগ্ধ আলো ফোটে। কী যে ভালো লাগে! ভালোলাগায় মন প্রশান্ত হয়ে যায়।
ক্যামেরা ঘোরানোর মতো করে হিমেল একবার মাথাটা এদিক-ওদিক ঘোরায়। সে মুহূর্তেই সবার অলক্ষ্যে আলগোছে বাড়ির পেছনে চলে এলো। এদিকে খানিকটা বুনো পরিবেশ, বিচিত্র গাছপালা ও ফসলি জমি। অদূরে পারিবারিক কবরস্থান।
হঠাৎ হিমেলের বুকের বাঁ পাশে অদ্ভুত শিহরণ খেলে যায়। আর হাহাকার। বাইরে ঝকঝকে সকালের রোদ গোলাপকুঁড়ির মতো চারদিকে পেখম মেলে দিচ্ছে। বাইরে মৃদু বাতাস বইছে। বাইরে সকালে এমন বাতাস রোজই বয়। তবু তার মনে হলো, আজকের বাইরের বাতাস অন্যদিনের থেকে একটু আলাদা ও রহস্যময়। কেন তার এমন মনে হলো?
হিমেল একবার দূরের আকাশে চোখ রাখল। চোখ নামিয়ে আনল এবং আচমকা সে লক্ষ করল, সারি সারি কবরের একদিকে তার দাদা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবরটা।
নতুন কবরের চিহ্ন ধীরে মুছে গেছে। সময়ের পলি পড়তে পড়তে রোদ-বৃষ্টি ও ঝড়ে কবরের উঁচু অংশটা মিশেছে পাশের সমতল মাটির সঙ্গে। এমন হয়।
মানুষের মৃত্যুর পর, জীবনের এই তো নিয়তি।
বুকের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে ওর কথাটা বেরিয়ে আসে। হিমেলের মনে একবার কৌতূহল উঁকি দেয়, এক বুক মাটির নিচে কবরের ভেতরে কেমন আছে, আমার প্রিয় রুদ্রদা?
বড় ভাই রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে হিমেল সব সময় দাদাই ডাকত। কত দিন হয়ে গেল, দাদার ভালো-মন্দ জানতে পারে না! মাঝে মাঝে মনটা খুব উচাটন হয়, হাহাকার করে ওঠে। চোখ ভরে আসে জলে।
ঘরে ও বাইরে, এমনকি সারা পৃথিবীর মানুষের খবর কোনো না কোনোভাবে জানা যায়, শোনা যায়। শুধু বাড়ির পাশে কবরের ভেতরে কী হচ্ছে, মানুষটি কেমন আছে, জানা হয় না।
হঠাৎ রুদ্রর লেখা একটি কবিতার কথা হিমেলের মনে পড়ে। অদ্ভুত কবিতা, নাম ‘অনিদ্রাতাড়িত সময়ের বিছানায়’।
এই কবিতায় রুদ্রদা তাঁর জীবনের একাকিত্ব, ঘুম ও মৃত্যুকল্পনা নিয়ে ভাবনার প্রকাশ করেছিলেন—
নোতুন কোথাও এলে আমি ঘুমুতে পারি না
অপরিচিত রাতে—
অনিদ্রাতাড়িত হয়ে জেগে থাকি বিছানায়
অচেনা শব্দেরা সব ছুটে আসে ঝাঁক ঝাঁক আরশোলা
যেন অনধিকার প্রবেশ আমার কোনো এলাকায়
আমি ঘুমুতে পারি না।
এখন দাদার কবরটা আর সব কবরের মতো সাধারণ কবর। কবরের ওপরে ছিন্ন কাঁঠালপাতা ও কড়ইগাছের শুকনো পাতা এসে পড়ছে। বোঁটাচ্যুত শুকনো পাতাগুলো কবরের চারপাশে এলোমেলো উড়ছে।
গাছের ঝরা পাতা আপন মনে এমন ওড়ে। উড়তেই পারে। এতে অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নেই। কিন্তু হিমেল খেয়াল করল, ঝরা পাতাগুলো ধীরে ধীরে কাগজের টুকরোর মতো আকার ও রং ধরে নিতে লাগল। ক্রমশ কাচভাঙা রোদের মিশেলে এক ধরনের চোখ-ঝলসানো ছায়া পড়তে লাগল কবরের ওপর। শীতের সকালে পুকুরের জলে সূূর্যের কিরণ পড়লে যেমন রহস্যময় দৃশ্যের রূপ তৈরি করে, তেমন।
হিমেলের চোখে দ্রুত পলক পড়ল। একবার সে ভাবল, একি স্বপ্নকল্পনা? নাকি বাস্তবেই ঘটছে? সে বুঝতে পারল না। সে কিছুটা দিশাহারা বোধ করতে লাগল।
ঝরা পাতা কাগজে রূপ নেওয়ার পর চোখের পলকে ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলো এক এক করে জোড়া লাগছে। জোড়া কাগজের একেকটা টুকরো বড় আকার পেতে লাগল। যেন একেকটা টুকরো চিঠি। সেই চিঠির রূপ পাওয়া কাগজ কবরের চারপাশে পুঁতে রাখা বাঁশের বেড়ার ধ্বংসাবশেষের একেক দিকে সেঁটে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আরো কিছু ছিন্ন পাতা চারপাশে উড়ছে।
হিমেল স্বপ্নগ্রস্তের মতো পায়ে পায়ে দাদার কবরের পাশে এসে দাঁড়ায়। এত সকালে এদিকটায় কারো আসার কথা নয়। তবু সতর্ক চোখে সে একবার চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। কেউ তাকে অনুসরণ করছে না তো?
কাগজের টুকরো বা জোড়ালাগা কাগজ স্রেফ সাদা পাতা নয়। ছাড়া ছাড়াভাবে কিছু লেখা। কী লেখা আছে ওই কাগজের টুকরোগুলোতে?
হিমেল কবরের আরো কাছে সরে এলো। ধীরে ধীরে তার চোখে পরিষ্কার হতে থাকল—কাগজে ঠিক ছাপার অক্ষরের লেখা নয়, বলপয়েন্ট কলমে লেখা অজস্র শব্দ, বাক্য ও দীর্ঘশ্বাস।
একনজর দেখেই সে বুঝতে পারল, টুকরো কাগজে হাতের লেখাটা বেশ সুন্দর। গোছানো। কিছুটা মেয়েলি ধাঁচের লেখা অক্ষর। ওর মনে হলো, এই অক্ষর ও শব্দগুচ্ছ আগেও সে অন্য কোথাও দেখেছে। কোথায় দেখেছে কিছুতেই সে মনে করতে পারল না।
মাথাটা খানিক নুইয়ে চোখ সরু করে আনল হিমেল বরকত। কবরে বাঁশের বেড়ায় ও ছড়িয়ে থাকা ছিন্ন শব্দ ও বাক্যগুলোর পাঠোদ্ধারে সে প্রাণান্ত চেষ্টা করতে লাগল—
প্রিয় রুদ্র,
প্রযত্নে আকাশ,
তুমি আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলেছিলে। তুমি কি এখন আকাশজুড়ে থাকো? তুমি আকাশে উড়ে বেড়াও? তুলোর মতো, পাখির মতো? তুমি এই জগৎসংসার ছেড়ে আকাশে চলে গেছ। তুমি আসলে বেঁচেই গেছ রুদ্র। আচ্ছা, তোমার কি পাখি হয়ে উড়ে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না? তোমার সেই ইন্দিরা রোডের বাড়িতে, আবার সেই নীলক্ষেত, শাহবাগ, পরীবাগ, লালবাগ চষে বেড়াতে? ইচ্ছে তোমার হয় না এ আমি বিশ্বাস করি না, ইচ্ছে ঠিকই হয়, পারো না। অথচ একসময় যা ইচ্ছে হতো তোমার তা-ই করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারা রাত না ঘুমিয়ে গল্প করতে...করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারা দিন পথে পথে হাঁটতে...হাঁটতে। কে তোমাকে বাধা দিত? জীবন তোমার হাতের মুঠোয় ছিল। এই জীবন নিয়ে যেমন ইচ্ছে খেলেছ। আমার ভেবে অবাক লাগে, জীবন এখন আর তোমার হাতের মুঠোয় নেই। ওরা তোমাকে ট্রাকে উঠিয়ে মিঠেখালী রেখে এলো, তুমি প্রতিবাদ করতে পারোনি।
আচ্ছা, তোমার লালবাগের সেই প্রেমিকাটির খবর কী, দীর্ঘ বছর প্রেম করেছিলে তোমার যে নেলী খালার সঙ্গে? তার উদ্দেশে তোমার দিস্তা দিস্তা প্রেমের কবিতা দেখে আমি কি ভীষণ কেঁদেছিলাম একদিন! তুমি আর কারো সঙ্গে প্রেম করছ, এ আমার সইত না। কী অবুঝ বালিকা ছিলাম, তাই না! যেন আমাকেই তোমার ভালোবাসতে হবে। যেন আমরা দুজন জন্মেছি দুজনের জন্য। যেদিন ট্রাকে করে তোমাকে নিয়ে গেল বাড়ি থেকে, আমার খুব দম বন্ধ লাগছিল। ঢাকা শহরটিকে এত ফাঁকা আর কখনো লাগেনি। বুকের মধ্যে আমার এত হাহাকারও আর কখনো জমেনি। আমি ঢাকা ছেড়ে সেদিন চলে গিয়েছিলাম ময়মনসিংহে। আমার ঘরে তোমার বাক্সভর্তি চিঠিগুলো হাতে নিয়ে জন্মের কান্না কেঁদেছিলাম। আমাদের বিচ্ছেদ ছিল চার বছরের। এত বছর পরও তুমি কী গভীর করে বুকের মধ্যে রয়ে গিয়েছিলে! সেদিন আমি টের পেয়েছি।
আমার বড় হাসি পায় দেখে, এখন তোমার শয়ে শয়ে বন্ধু বেরোচ্ছে। তারা তখন কোথায় ছিল? যখন পয়সার অভাবে তুমি একটি শিঙাড়া খেয়ে দুপুর কাটিয়েছ। আমি না হয় তোমার বন্ধু নই, তোমাকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম বলে। এই যে এখন তোমার নামে মেলা হয়, তোমার চেনা এক আমিই বোধ হয় অনুপস্থিত থাকি মেলায়। যারা এখন রুদ্র রুদ্র বলে মাতম করে, বুঝি না তারা তখন কোথায় ছিল?
শেষ দিকে তুমি শিমুল নামের এক মেয়েকে ভালোবাসতে। বিয়ের কথাও হচ্ছিল। আমাকে শিমুলের সব গল্প একদিন করলে। শুনে...তুমি বোঝোনি আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। এই ভেবে যে, তুমি কী অনায়াসে প্রেম করছ! আর তার গল্প শোনাচ্ছ! ঠিক এই রকম অনুভব একসময় আমার জন্য ছিল তোমার! আজ আরেকজনের জন্য তোমার অস্থিরতা। নির্ঘুম রাত কাটানোর গল্প শুনে আমার কান্না পায় না বলো? তুমি শিমুলকে নিয়ে কী কী কবিতা লিখলে তা দিব্যি বলে গেলে! আমাকে আবার জিজ্ঞেসও করলে, কেমন হয়েছে? আমি বললাম, খুব ভালো। শিমুল মেয়েটিকে আমি কোনো দিন দেখিনি, তুমি তাকে ভালোবাসো, যখন নিজেই বললে, তখন আমার কষ্টটাকে বুঝতে দিইনি। তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি ঠিকই, কিন্তু আর কাউকে ভালোবাসতে পারিনি। ভালোবাসা যে যাকে-তাকে বিলানোর জিনিস নয়।
আকাশের সঙ্গে কত কথা হয় রোজ! কষ্টের কথা, সুখের কথা। একদিন আকাশভরা জোছনায় গা ভেসে যাচ্ছিল আমাদের। তুমি দু-চারটি কষ্টের কথা বলে নিজের লেখা একটি গান শুনিয়েছিলে। ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’। মোংলায় বসে গানটি লিখেছিলে। মনে মনে তুমি কার চিঠি চেয়েছিলে? আমার? নেলী খালার? শিমুলের? অনেক দিন ইচ্ছে তোমাকে একটা চিঠি লিখি। একটা সময় ছিল তোমাকে প্রতিদিন চিঠি লিখতাম। তুমিও লিখতে প্রতিদিন। সেবার আরমানিটোলার বাড়িতে বসে দিলে আকাশের ঠিকানা। তুমি পাবে তো এই চিঠি? জীবন এবং জগতের তৃষ্ণা তো মানুষের কখনো মেটে না, তবু মানুষ আর বাঁচে কদিন বলো? দিন তো ফুরায়। আমার কি দিন ফুরাচ্ছে না? তুমি ভালো থেকো। আমি ভালো নেই।
ইতি,
সকাল
পুনশ্চ : আমাকে সকাল বলে ডাকতে তুমি। কতকাল ওই ডাক শুনি না। তুমি কি আকাশ থেকে সকাল, আমার সকাল বলে মাঝেমধ্যে ডাকো? নাকি আমি ভুল শুনি?
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ জীবনের মায়া ত্যাগ করে অনন্তের পথে চলে গেছেন সেই কবে! রুদ্রদার পরিযায়ী বউ তসলিমা নাসরিনও তাঁর জীবনের বাঁক ফিরিয়ে অন্য কোথাও তরি ভিড়িয়েছে। দুজনের সম্পর্ক, বোঝাপড়া ও লেনদেন কবেই চুকেবুকে গেছে। স্মৃতিরাও ঝাপসা হতে হতে ধুলায় মিশে চলেছে।
এত দিন পর সে কেন আবার লিখল রুদ্রদাকে?
কবরস্থানে সকালের হাওয়ায় ভেসে আসা গাছের ছিন্ন পাতায় পাতায় অলৌকিকভাবে ফুটে উঠেছে কথা ও অভিমান। এক বই পরিমাণ সেই কথা ও অভিমান পড়তে পড়তে কিছু অদ্ভুত স্মৃতিভার হিমেলের ভাবনার করোটিতে ভিড় জমায়।
তসলিমা নাসরিন মেধাবী ও সুন্দরী নারী। তার চোখ সুন্দর। সে কথা বলে সুন্দর করে। মানুষকে সহজেই আপন করে নিতে পারে। বিদুষী ও সাহসী। সে কখনো কাউকে পরোয়া করেনি। আজও করে না। সমাজের আড়চোখ অথবা বাঁকা চোখে তার যায় আসে না। প্রায় কাছাকাছি নামে তসলিমার একটি কবিতার বইও আছে : ‘আমার কিছু যায় আসে না’।
তসলিমার আছে এক আশ্চর্য প্রেমিক মন আর প্রেমে পড়ার অসামান্য ক্ষমতা। প্রেম পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও মৌলিক অনুভূতি। জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিস। প্রেম ছাড়া জীবনের মূল্য কানাকড়িও নয়। প্রেমে পড়েই তো একসঙ্গে মিলেছিল—রুদ্রদা ও তসলিমা বউদি।
পরে প্রজাপতির মতো, কখনো ভ্রমর হয়ে তসলিমা রুদ্রফুল থেকে অন্য ফুলে, কখনো আরেক ফুলে উড়ে গিয়ে বসেছে। নতুন স্বপ্নবাসনায় থিতু হয়েছে। অথবা হয়নি। অন্য ফুলে সে বসতেই পারে। রুদ্রদা বেঁচে থাকতে যেমন পারে, তাঁকে দেখিয়ে দেখিয়ে; দাদার মৃত্যুর পরে প্রেমের সেই পথ আরো মসৃণ হয়েছে।
অথচ আশ্চর্য, প্রেমের কাছে কী অসহায়ভাবে হেরে গেছে তসলিমা! রুদ্রদার জন্য এখনো তার মন কেমন করে। প্রাণ কাঁদে। দাদা মরে গিয়ে ভূত হয়ে গেছে। তবু দাদা কবে কোন অনুরাগিণীর সঙ্গে মিশেছে এবং ঘুরে বেড়িয়েছে, সেসব মনে করে আজও তসলিমার অভিমান হয়। অভিযোগ মনে আসে।
পৃথিবী কত বদলে গেল, মানুষ কত এগিয়ে গেল, রুদ্রদা মরে গিয়ে তো ফুরিয়েই গেল, তসলিমা নিজে বদলেছে আরো বেশি এবং সে বিশ্বময় ছড়িয়ে গেছে।
তবু কী আশ্চর্য, প্রেমে ও অপ্রেমে রুদ্রদা আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়!
মানুষের জীবনে এমনও হয়? হতে পারে?
বন্ধুরা কেউ কেউ বলে, এমনকি বাড়িতে বড় বোনেরাও খোঁচা দেয়, হিমেল, তুই একটা উদাসী প্রেমিক। আবার কবি। তোর কপালে কী আছে, আল্লাহই ভালো জানে।
হিমেল নিজেও উপলব্ধি করে, আর সব তরুণের মতো সে ডানপিটে নয়। শান্ত ও ভাবুক। প্রকৃতি তার ভালো লাগে। আর কবিতা। কখনো নদী। নির্জন মেঠো পথ।
তারপর কী ঘটেছিল কবরস্থানে হিমেল বরকতের সঙ্গে, একা নিরালায়? কেউ জানে না।
বেলা বাড়ছে, সেই সঙ্গে রোদের তেজ। হিমেলের যখন জ্ঞান ফিরল, সে দেখল, বাড়ির ভেতরে বারান্দায় সে শুয়ে আছে। মাথার নিচে মানকচুর পাতা রেখে বড় বোন তার মাথায় পানি ঢালছে। মুখের ওপর মা-বাবা ও ভাই-বোনেরা চিন্তিত এবং আর্ত চোখে তাকিয়ে আছে।
বাবা নিজে ডাক্তার। তবু শহর থেকে ডাক্তার ডেকে নিয়ে এসেছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় সে কেঁপে উঠল। বাড়ির পরিবেশ উপেক্ষা করে মৃদু হাসল। এতে সবার মধ্যে শুকরিয়া জ্ঞাপনের ইশারা ফুটে উঠল।
কেউ বলেনি, অভিযোগ করেনি, নিজেই সে উপলব্ধি করতে পারে, কিছুটা নস্টালজিয়াকাতর ধরনের মানুষ হিমেল বরকত।
গল্পের মতো সকালবেলার এই ঘটনাপ্রবাহ বাস্তবেই ঘটেছিল কি না, সে মনে করতে পারে না।
ডাক্তার বললেন, ‘দুশ্চিন্তার কারণ নেই। ছেলের শরীর দুর্বল। নানা কারণে মনের ওপর চাপ পড়েছে। একটু হাওয়া বদল করতে পারলে দ্রুত সেরে যাবে। আমি চলি।’
মা এসে বসলেন ছেলের বিছানার পাশে। কপালে হাত রেখে বললেন, ‘এখন কেমন আছিস, বাবা?’
হিমেল মায়ের কথার উত্তর দিল না। একটা হাত মায়ের আঁচলে রেখে উঠানের ডালিমগাছে তাকিয়ে থাকল।
অনেক দিন আগে এক সকালে, ময়লা জামা-কাপড় বালতিতে ভেজানো ডিটারজেন্ট পাউডারে ডোবাতে গিয়ে হিমেল বেলিফুলের ঘ্রাণ পেয়েছিল। সন্দেহের চোখে আঁতিপাঁতি হাতড়ে সে ঠিকই বেলিফুলের একটা মালা আবিষ্কার করেছিল, বুকপকেটে। পরে মনে পড়ে, স্কুলের এক সহপাঠিনী তাকে ফুলটা উপহার দিয়েছিল।
সকালে ঘুম ভাঙার পর এক অদ্ভুত ঘটনাপ্রবাহ ও বিভ্রমের সড়কদ্বীপে হিমেল ডুবে গিয়েছিল। বারান্দায় শুয়ে মায়ের আঁচলের গন্ধ নিতে নিতে সে টের পেল, ঘটনাপ্রবাহের সত্য-মিথ্যা সন্দিহান চোখে তার মুখে তেরচা চোখে তাকিয়ে আছে।
কী এর রহস্য? হিমেল ভাবল। আবার ভাবল। আরো একবার ভাবল। কিছুই তার কাছে পরিষ্কার হলো না। একসময় তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। উঠানে তীব্র রোদ, মানুষের কোলাহল ও ব্যস্ততা। বাড়ির পেছনে একটা কোকিল অস্পষ্ট গলায় ডেকে উঠল। ধীরে ধীরে সে গাঢ় ঘুমের ভেতর তলিয়ে যেতে লাগল।





ইসরাতের ছিল ভীষণ পড়ার ঝোঁক। অনেকেই তাকে বলত বইপোকা। আগে সে বই সংগ্রহ করত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে। কিছু বই কিনত নীলক্ষেত থেকে। কিন্তু আরাবের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও রিলেশনে আসার পর বই সংগ্রহের সব দায়িত্ব নিয়েছিল আরাবই। ইসরাতের পছন্দের বেশির ভাগ বই আরাব গিফট করেছে। তার মাঝারি মানের পড়ার অভ্যাসটাও বড় পড়ুয়ায় পরিণত হয়েছে। বই পড়ার পর দুজনে আবার সেই বইয়ের আলোচিত চরিত্র, বইয়ের থিম, লেখার মান নিয়ে আলোচনা করত।