• ই-পেপার

লুনাটিক বা পাখির নীড়ের মতো

  • ধ্রুব এষ

অনিদ্রাতাড়িত ভায়োলিন

মাসউদ আহমাদ

অনিদ্রাতাড়িত ভায়োলিন
অঙ্কন : তানভীর মালেক

একদিন ঘুমভাঙা ভোরে, মিঠেখালীর বাড়িতে বিছানা ছেড়ে ঘরময় পায়চারি শুরু করল তরুণ কবি ও ভাবুক হিমেল বরকত।

হিমেল, যার অন্য নাম মুহম্মদ বরকতুল্লাহ। এই নামটি তার ডাক্তার বাবা শেখ মুহম্মদ ওয়ালীউল্লাহ রেখেছিলেন। কী যেন কী ভেবে হিমেল ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে আসে।

বাইরে, রোজকার ভোরের মতো যে যার কাজে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ছে। অনেকে ঘরের কাজে ব্যস্ত। কেউ কাজে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ভোরের এই সময়টা অদ্ভুত সুন্দর। পাখির কিচিরমিচির, শিশিরভেজা ঘাস ও পুব আকাশের মনোরম আলোপৃথিবী এক অপার্থিব সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। চারপাশে কচি লেবুপাতার মতো সুন্দর ও স্নিগ্ধ আলো ফোটে। কী যে ভালো লাগে! ভালোলাগায় মন প্রশান্ত হয়ে যায়।

ক্যামেরা ঘোরানোর মতো করে হিমেল একবার মাথাটা এদিক-ওদিক ঘোরায়। সে মুহূর্তেই সবার অলক্ষ্যে আলগোছে বাড়ির পেছনে চলে এলো। এদিকে খানিকটা বুনো পরিবেশ, বিচিত্র গাছপালা ও ফসলি জমি। অদূরে পারিবারিক কবরস্থান।

হঠাৎ হিমেলের বুকের বাঁ পাশে অদ্ভুত শিহরণ খেলে যায়। আর হাহাকার। বাইরে ঝকঝকে সকালের রোদ গোলাপকুঁড়ির মতো চারদিকে পেখম মেলে দিচ্ছে। বাইরে মৃদু বাতাস বইছে। বাইরে সকালে এমন বাতাস রোজই বয়। তবু তার মনে হলো, আজকের বাইরের বাতাস অন্যদিনের থেকে একটু আলাদা ও রহস্যময়। কেন তার এমন মনে হলো?

হিমেল একবার দূরের আকাশে চোখ রাখল। চোখ নামিয়ে আনল এবং আচমকা সে লক্ষ করল, সারি সারি কবরের একদিকে তার দাদা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবরটা।

নতুন কবরের চিহ্ন ধীরে মুছে গেছে। সময়ের পলি পড়তে পড়তে রোদ-বৃষ্টি ও ঝড়ে কবরের উঁচু অংশটা মিশেছে পাশের সমতল মাটির সঙ্গে। এমন হয়।

মানুষের মৃত্যুর পর, জীবনের এই তো নিয়তি।

বুকের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে ওর কথাটা বেরিয়ে আসে। হিমেলের মনে একবার কৌতূহল উঁকি দেয়, এক বুক মাটির নিচে কবরের ভেতরে কেমন আছে, আমার প্রিয় রুদ্রদা?

বড় ভাই রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে হিমেল সব সময় দাদাই ডাকত। কত দিন হয়ে গেল, দাদার ভালো-মন্দ জানতে পারে না! মাঝে মাঝে মনটা খুব উচাটন হয়, হাহাকার করে ওঠে। চোখ ভরে আসে জলে।

ঘরে ও বাইরে, এমনকি সারা পৃথিবীর মানুষের খবর কোনো না কোনোভাবে জানা যায়, শোনা যায়। শুধু বাড়ির পাশে কবরের ভেতরে কী হচ্ছে, মানুষটি কেমন আছে, জানা হয় না।

হঠাৎ রুদ্রর লেখা একটি কবিতার কথা হিমেলের মনে পড়ে। অদ্ভুত কবিতা, নাম অনিদ্রাতাড়িত সময়ের বিছানায়

এই কবিতায় রুদ্রদা তাঁর জীবনের একাকিত্ব, ঘুম ও মৃত্যুকল্পনা নিয়ে ভাবনার প্রকাশ করেছিলেন

নোতুন কোথাও এলে আমি ঘুমুতে পারি না

অপরিচিত রাতে

অনিদ্রাতাড়িত হয়ে জেগে থাকি বিছানায়

অচেনা শব্দেরা সব ছুটে আসে ঝাঁক ঝাঁক আরশোলা

যেন অনধিকার প্রবেশ আমার কোনো এলাকায়

আমি ঘুমুতে পারি না।

 

এখন দাদার কবরটা আর সব কবরের মতো সাধারণ কবর। কবরের ওপরে ছিন্ন কাঁঠালপাতা ও কড়ইগাছের শুকনো পাতা এসে পড়ছে। বোঁটাচ্যুত শুকনো পাতাগুলো কবরের চারপাশে এলোমেলো উড়ছে।

গাছের ঝরা পাতা আপন মনে এমন ওড়ে। উড়তেই পারে। এতে অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নেই। কিন্তু হিমেল খেয়াল করল, ঝরা পাতাগুলো ধীরে ধীরে কাগজের টুকরোর মতো আকার ও রং ধরে নিতে লাগল। ক্রমশ কাচভাঙা রোদের মিশেলে এক ধরনের চোখ-ঝলসানো ছায়া পড়তে লাগল কবরের ওপর। শীতের সকালে পুকুরের জলে সূূর্যের কিরণ পড়লে যেমন রহস্যময় দৃশ্যের রূপ তৈরি করে, তেমন।

হিমেলের চোখে দ্রুত পলক পড়ল। একবার সে ভাবল, একি স্বপ্নকল্পনা? নাকি বাস্তবেই ঘটছে? সে বুঝতে পারল না। সে কিছুটা দিশাহারা বোধ করতে লাগল।

ঝরা পাতা কাগজে রূপ নেওয়ার পর চোখের পলকে ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলো এক এক করে জোড়া লাগছে। জোড়া কাগজের একেকটা টুকরো বড় আকার পেতে লাগল। যেন একেকটা টুকরো চিঠি। সেই চিঠির রূপ পাওয়া কাগজ কবরের চারপাশে পুঁতে রাখা বাঁশের বেড়ার ধ্বংসাবশেষের একেক দিকে সেঁটে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আরো কিছু ছিন্ন পাতা চারপাশে উড়ছে।

হিমেল স্বপ্নগ্রস্তের মতো পায়ে পায়ে দাদার কবরের পাশে এসে দাঁড়ায়। এত সকালে এদিকটায় কারো আসার কথা নয়।  তবু সতর্ক চোখে সে একবার চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। কেউ তাকে অনুসরণ করছে না তো?

কাগজের টুকরো বা জোড়ালাগা কাগজ স্রেফ সাদা পাতা নয়। ছাড়া ছাড়াভাবে কিছু লেখা। কী লেখা আছে ওই কাগজের টুকরোগুলোতে?

হিমেল কবরের আরো কাছে সরে এলো। ধীরে ধীরে তার চোখে পরিষ্কার হতে থাকলকাগজে ঠিক ছাপার অক্ষরের লেখা নয়, বলপয়েন্ট কলমে লেখা অজস্র শব্দ, বাক্য ও দীর্ঘশ্বাস।

একনজর দেখেই সে বুঝতে পারল, টুকরো কাগজে হাতের লেখাটা বেশ সুন্দর। গোছানো। কিছুটা মেয়েলি ধাঁচের লেখা অক্ষর। ওর মনে হলো, এই অক্ষর ও শব্দগুচ্ছ আগেও সে অন্য কোথাও দেখেছে। কোথায় দেখেছে কিছুতেই সে মনে করতে পারল না।

মাথাটা খানিক নুইয়ে চোখ সরু করে আনল হিমেল বরকত। কবরে বাঁশের বেড়ায় ও ছড়িয়ে থাকা ছিন্ন শব্দ ও বাক্যগুলোর পাঠোদ্ধারে সে প্রাণান্ত চেষ্টা করতে লাগল

প্রিয় রুদ্র,

প্রযত্নে আকাশ,

তুমি আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলেছিলে। তুমি কি এখন আকাশজুড়ে থাকো? তুমি আকাশে উড়ে বেড়াও? তুলোর মতো, পাখির মতো? তুমি এই জগৎসংসার ছেড়ে আকাশে চলে গেছ। তুমি আসলে বেঁচেই গেছ রুদ্র। আচ্ছা, তোমার কি পাখি হয়ে উড়ে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না? তোমার সেই ইন্দিরা রোডের বাড়িতে, আবার সেই নীলক্ষেত, শাহবাগ, পরীবাগ, লালবাগ চষে বেড়াতে? ইচ্ছে তোমার হয় না এ আমি বিশ্বাস করি না, ইচ্ছে ঠিকই হয়, পারো না। অথচ একসময় যা ইচ্ছে হতো তোমার তা-ই করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারা রাত না ঘুমিয়ে গল্প করতে...করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারা দিন পথে পথে হাঁটতে...হাঁটতে। কে তোমাকে বাধা দিত? জীবন তোমার হাতের মুঠোয় ছিল। এই জীবন নিয়ে যেমন ইচ্ছে খেলেছ। আমার ভেবে অবাক লাগে, জীবন এখন আর তোমার হাতের মুঠোয় নেই। ওরা তোমাকে ট্রাকে উঠিয়ে মিঠেখালী রেখে এলো, তুমি প্রতিবাদ করতে পারোনি।

আচ্ছা, তোমার লালবাগের সেই প্রেমিকাটির খবর কী, দীর্ঘ বছর প্রেম করেছিলে তোমার যে নেলী খালার সঙ্গে? তার উদ্দেশে তোমার দিস্তা দিস্তা প্রেমের কবিতা দেখে আমি কি ভীষণ কেঁদেছিলাম একদিন! তুমি আর কারো সঙ্গে প্রেম করছ, এ আমার সইত না। কী অবুঝ বালিকা ছিলাম, তাই না! যেন আমাকেই তোমার ভালোবাসতে হবে। যেন আমরা দুজন জন্মেছি দুজনের জন্য। যেদিন ট্রাকে করে তোমাকে নিয়ে গেল বাড়ি থেকে, আমার খুব দম বন্ধ লাগছিল। ঢাকা শহরটিকে এত ফাঁকা আর কখনো লাগেনি। বুকের মধ্যে আমার এত হাহাকারও আর কখনো জমেনি। আমি ঢাকা ছেড়ে সেদিন চলে গিয়েছিলাম ময়মনসিংহে। আমার ঘরে তোমার বাক্সভর্তি চিঠিগুলো হাতে নিয়ে জন্মের কান্না কেঁদেছিলাম। আমাদের বিচ্ছেদ ছিল চার বছরের। এত বছর পরও তুমি কী গভীর করে বুকের মধ্যে রয়ে গিয়েছিলে! সেদিন আমি টের পেয়েছি।

আমার বড় হাসি পায় দেখে, এখন তোমার শয়ে শয়ে বন্ধু বেরোচ্ছে। তারা তখন কোথায় ছিল? যখন পয়সার অভাবে তুমি একটি শিঙাড়া খেয়ে দুপুর কাটিয়েছ। আমি না হয় তোমার বন্ধু নই, তোমাকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম বলে। এই যে এখন তোমার নামে মেলা হয়, তোমার চেনা এক আমিই বোধ হয় অনুপস্থিত থাকি মেলায়। যারা এখন রুদ্র রুদ্র বলে মাতম করে, বুঝি না তারা তখন কোথায় ছিল?

শেষ দিকে তুমি শিমুল নামের এক মেয়েকে ভালোবাসতে। বিয়ের কথাও হচ্ছিল। আমাকে শিমুলের সব গল্প একদিন করলে। শুনে...তুমি বোঝোনি আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। এই ভেবে যে, তুমি কী অনায়াসে প্রেম করছ! আর তার গল্প শোনাচ্ছ! ঠিক এই রকম অনুভব একসময় আমার জন্য ছিল তোমার! আজ আরেকজনের জন্য তোমার অস্থিরতা। নির্ঘুম রাত কাটানোর গল্প শুনে আমার কান্না পায় না বলো? তুমি শিমুলকে নিয়ে কী কী কবিতা লিখলে তা দিব্যি বলে গেলে! আমাকে আবার জিজ্ঞেসও করলে, কেমন হয়েছে? আমি বললাম, খুব ভালো। শিমুল মেয়েটিকে আমি কোনো দিন দেখিনি, তুমি তাকে ভালোবাসো, যখন নিজেই বললে, তখন আমার কষ্টটাকে বুঝতে দিইনি। তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি ঠিকই, কিন্তু আর কাউকে ভালোবাসতে পারিনি। ভালোবাসা যে যাকে-তাকে বিলানোর জিনিস নয়।

আকাশের সঙ্গে কত কথা হয় রোজ! কষ্টের কথা, সুখের কথা। একদিন আকাশভরা জোছনায় গা ভেসে যাচ্ছিল আমাদের। তুমি দু-চারটি কষ্টের কথা বলে নিজের লেখা একটি গান শুনিয়েছিলে। ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো। মোংলায় বসে গানটি লিখেছিলে। মনে মনে তুমি কার চিঠি চেয়েছিলে? আমার? নেলী খালার? শিমুলের? অনেক দিন ইচ্ছে তোমাকে একটা চিঠি লিখি। একটা সময় ছিল তোমাকে প্রতিদিন চিঠি লিখতাম। তুমিও লিখতে প্রতিদিন। সেবার আরমানিটোলার বাড়িতে বসে দিলে আকাশের ঠিকানা। তুমি পাবে তো এই চিঠি? জীবন এবং জগতের তৃষ্ণা তো মানুষের কখনো মেটে না, তবু মানুষ আর বাঁচে কদিন বলো? দিন তো ফুরায়। আমার কি দিন ফুরাচ্ছে না? তুমি ভালো থেকো। আমি ভালো নেই।

ইতি,

সকাল

পুনশ্চ : আমাকে সকাল বলে ডাকতে তুমি। কতকাল ওই ডাক শুনি না। তুমি কি আকাশ থেকে সকাল, আমার সকাল বলে মাঝেমধ্যে ডাকো? নাকি আমি ভুল শুনি?

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ জীবনের মায়া ত্যাগ করে অনন্তের পথে চলে গেছেন সেই কবে! রুদ্রদার পরিযায়ী বউ তসলিমা নাসরিনও তাঁর জীবনের বাঁক ফিরিয়ে অন্য কোথাও তরি ভিড়িয়েছে। দুজনের সম্পর্ক, বোঝাপড়া ও লেনদেন কবেই চুকেবুকে গেছে। স্মৃতিরাও ঝাপসা হতে হতে ধুলায় মিশে চলেছে।

এত দিন পর সে কেন আবার লিখল রুদ্রদাকে?

কবরস্থানে সকালের হাওয়ায় ভেসে আসা গাছের ছিন্ন পাতায় পাতায় অলৌকিকভাবে ফুটে উঠেছে কথা ও অভিমান। এক বই পরিমাণ সেই কথা ও অভিমান পড়তে পড়তে কিছু অদ্ভুত স্মৃতিভার হিমেলের ভাবনার করোটিতে ভিড় জমায়।

তসলিমা নাসরিন মেধাবী ও সুন্দরী নারী। তার চোখ সুন্দর। সে কথা বলে সুন্দর করে। মানুষকে সহজেই আপন করে নিতে পারে। বিদুষী ও সাহসী। সে কখনো কাউকে পরোয়া করেনি। আজও করে না। সমাজের আড়চোখ অথবা বাঁকা চোখে তার যায় আসে না। প্রায় কাছাকাছি নামে তসলিমার একটি কবিতার বইও আছে : আমার কিছু যায় আসে না

তসলিমার আছে এক আশ্চর্য প্রেমিক মন আর প্রেমে পড়ার অসামান্য ক্ষমতা। প্রেম পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও মৌলিক অনুভূতি। জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিস। প্রেম ছাড়া জীবনের মূল্য কানাকড়িও নয়। প্রেমে পড়েই তো একসঙ্গে মিলেছিলরুদ্রদা ও তসলিমা বউদি।

পরে প্রজাপতির মতো, কখনো ভ্রমর হয়ে তসলিমা রুদ্রফুল থেকে অন্য ফুলে, কখনো আরেক ফুলে উড়ে গিয়ে বসেছে। নতুন স্বপ্নবাসনায় থিতু হয়েছে। অথবা হয়নি। অন্য ফুলে সে বসতেই পারে। রুদ্রদা বেঁচে থাকতে যেমন পারে, তাঁকে দেখিয়ে দেখিয়ে; দাদার মৃত্যুর পরে প্রেমের সেই পথ আরো মসৃণ হয়েছে।

অথচ আশ্চর্য, প্রেমের কাছে কী অসহায়ভাবে হেরে গেছে তসলিমা! রুদ্রদার জন্য এখনো তার মন কেমন করে। প্রাণ কাঁদে। দাদা মরে গিয়ে ভূত হয়ে গেছে। তবু দাদা কবে কোন অনুরাগিণীর সঙ্গে মিশেছে এবং ঘুরে বেড়িয়েছে, সেসব মনে করে আজও তসলিমার অভিমান হয়। অভিযোগ মনে আসে।

পৃথিবী কত বদলে গেল, মানুষ কত এগিয়ে গেল, রুদ্রদা মরে গিয়ে তো ফুরিয়েই গেল, তসলিমা নিজে বদলেছে আরো বেশি এবং সে বিশ্বময় ছড়িয়ে গেছে।

তবু কী আশ্চর্য, প্রেমে ও অপ্রেমে রুদ্রদা আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়!

মানুষের জীবনে এমনও হয়? হতে পারে?

বন্ধুরা কেউ কেউ বলে, এমনকি বাড়িতে বড় বোনেরাও খোঁচা দেয়, হিমেল, তুই একটা উদাসী প্রেমিক। আবার কবি। তোর কপালে কী আছে, আল্লাহই ভালো জানে।

হিমেল নিজেও উপলব্ধি করে, আর সব তরুণের মতো সে ডানপিটে নয়। শান্ত ও ভাবুক। প্রকৃতি তার ভালো লাগে। আর কবিতা। কখনো নদী। নির্জন মেঠো পথ।

তারপর কী ঘটেছিল কবরস্থানে হিমেল বরকতের সঙ্গে, একা নিরালায়? কেউ জানে না।

বেলা বাড়ছে, সেই সঙ্গে রোদের তেজ। হিমেলের যখন জ্ঞান ফিরল, সে দেখল, বাড়ির ভেতরে বারান্দায় সে শুয়ে আছে। মাথার নিচে মানকচুর পাতা রেখে বড় বোন তার মাথায় পানি ঢালছে। মুখের ওপর মা-বাবা ও ভাই-বোনেরা চিন্তিত এবং আর্ত চোখে তাকিয়ে আছে।

বাবা নিজে ডাক্তার। তবু শহর থেকে ডাক্তার ডেকে নিয়ে এসেছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় সে কেঁপে উঠল। বাড়ির পরিবেশ উপেক্ষা করে মৃদু হাসল। এতে সবার মধ্যে শুকরিয়া জ্ঞাপনের ইশারা ফুটে উঠল।

কেউ বলেনি, অভিযোগ করেনি, নিজেই সে উপলব্ধি করতে পারে, কিছুটা নস্টালজিয়াকাতর ধরনের মানুষ হিমেল বরকত।

গল্পের মতো সকালবেলার এই ঘটনাপ্রবাহ বাস্তবেই ঘটেছিল কি না, সে মনে করতে পারে না।

ডাক্তার বললেন, দুশ্চিন্তার কারণ নেই। ছেলের শরীর দুর্বল। নানা কারণে মনের ওপর চাপ পড়েছে। একটু হাওয়া বদল করতে পারলে দ্রুত সেরে যাবে। আমি চলি।

মা এসে বসলেন ছেলের বিছানার পাশে। কপালে হাত রেখে বললেন, এখন কেমন আছিস, বাবা?

হিমেল মায়ের কথার উত্তর দিল না। একটা হাত মায়ের আঁচলে রেখে উঠানের ডালিমগাছে তাকিয়ে থাকল।

অনেক দিন আগে এক সকালে, ময়লা জামা-কাপড় বালতিতে ভেজানো ডিটারজেন্ট পাউডারে ডোবাতে গিয়ে হিমেল বেলিফুলের ঘ্রাণ পেয়েছিল। সন্দেহের চোখে আঁতিপাঁতি হাতড়ে সে ঠিকই বেলিফুলের একটা মালা আবিষ্কার করেছিল, বুকপকেটে। পরে মনে পড়ে, স্কুলের এক সহপাঠিনী তাকে ফুলটা উপহার দিয়েছিল।

সকালে ঘুম ভাঙার পর এক অদ্ভুত ঘটনাপ্রবাহ ও বিভ্রমের সড়কদ্বীপে হিমেল ডুবে গিয়েছিল। বারান্দায় শুয়ে মায়ের আঁচলের গন্ধ নিতে নিতে সে টের পেল, ঘটনাপ্রবাহের সত্য-মিথ্যা সন্দিহান চোখে তার মুখে তেরচা চোখে তাকিয়ে আছে।

কী এর রহস্য? হিমেল ভাবল। আবার ভাবল। আরো একবার ভাবল। কিছুই তার কাছে পরিষ্কার হলো না। একসময় তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। উঠানে তীব্র রোদ, মানুষের কোলাহল ও ব্যস্ততা। বাড়ির পেছনে একটা কোকিল অস্পষ্ট গলায় ডেকে উঠল। ধীরে ধীরে সে গাঢ় ঘুমের ভেতর তলিয়ে যেতে লাগল।

 

বাজাও তোমার বাঁশি

রেজানুর রহমান

বাজাও তোমার বাঁশি
অঙ্কন : চিন্ময় দেবর্ষি

লোকটি বাঁশি বাজান। এটাই তাঁর পরিচয়। সবাই ডাকে বাঁশিওয়ালা। এর বাইরে তাঁর অন্য কোনো পরিচয় কেউ জানে না। জানবে কী করে? লোকটি তো এই এলাকার বাসিন্দা নয়। টঙ্গী রেলস্টেশনে হঠাৎ একদিন তাঁর আবির্ভাব। আপন মনে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। দেখতে অদ্ভুত কিসিমের। মুখ ভর্তি দাড়ি। পরনে লম্বা কালো ওভারকোট। পায়ে শতচ্ছিন্ন চামড়ার স্যান্ডেল। এই ধরনের অদ্ভুত একটি লোক হঠাৎ কেন টঙ্গী রেলস্টেশনে এলেন? কী তাঁর পরিচয়?

বাঁশি তো ভালোই বাজান। প্রশ্ন করলে জবাব দেন না। শুধুই দাঁত বের হাসেন। রেলস্টেশনে তাঁকে ঘিরে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হলো! নানাজনের নানা মন্তব্য! স্টেশনের সবচেয়ে পুরনো চায়ের দোকানদার হাফিজ মিয়ার ধারণা, লোকটি টিকটিকি। অর্থাৎ সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার লোক! স্টেশনের কুলির সর্দার মালেকের ধারণা, এই লোক টিকটিকি নয়। ব্যর্থ প্রেমিক। প্রেমে ব্যর্থতার কারণে মনের দুঃখে দেশান্তরি হয়েছেন। হাফিজ মিয়া ও মালেকের ধারণার পক্ষে দুটি দল দাঁড়িয়ে গেল। একটি দলের ধারণা, এই লোক টিকটিকি। কাজেই তাঁর ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে। বলা তো যায় না, কাকে কখন ফাঁসিয়ে দেন। অন্য দলের ধারণা, লোকটি ব্যর্থ প্রেমিক। তবে হ্যাঁ, তিনি ভালো বাঁশি বাজান এ ব্যাপারে দুই পক্ষই একমত।

এই মাত্র তাঁর বাঁশি শুনে এসেছে বাদাম বিক্রেতা ইসমাইল। চা খাওয়ার জন্য হাফিজ মিয়ার দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কুলির সর্দার মালেক আগে থেকেই হাফিজ মিয়ার চায়ের দোকানের সামনে বেঞ্চিতে বসে চা খাচ্ছিল। ইসমাইল চায়ের অর্ডার দিয়ে অদ্ভুত লোকটির প্রসঙ্গ তুললভাইরে ভাই, আমি জীবনে এমন বাঁশির সুর শুনি নাই। মানুষটা সেই রকম বাঁশি বাজায়... ফাসক্লাস টাইপের বাঁশি।

হাফিজ মিয়া ইসমাইলকে প্রশ্ন করলমানুষটার পরিচয় জানতে পারছ? বাড়ি কোথায়? এই এলাকায় কেন আসছে...?

ইসমাইল চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললনা, এই ব্যাপারে এখনো কিছু জানতে পারি নাই। প্রশ্ন করলে জবাব দেয় না। শুধু হাসে! হাসিটা সুন্দর। মায়া লাগে। আমার মনে হয়, মানুষটা কামেল-দরবেশ টাইপের কেউ হবে।

ইসমাইলের কথা শেষ হতে না হতেই হাফিজ মিয়া সামনের দিকে তাকিয়ে একটু তটস্থ হয়। মানুষের একটা জটলা তার দোকানের দিকেই আসছে। জটলার মাঝখানে অদ্ভুত মানুষটিও আছে। তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছে এলাকার একজন তরুণ। তার নাম মন্টু। পেশায় পকেটমার। লোকটিকে একনজর দেখার জন্য উত্সুখ মানুষের ভিড় ক্রমে বাড়ছে।

এই যে ভাই, সরেন তো। হাফিজ চাচা, বাবারে এক কাপ চা দেও তো! বাবা, আপনি কি চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাইবেন? বাটার বন, বিস্কুট, কলা...

লোকটি কোনো উত্তর দিলেন না। মালেকসহ অন্য যারা চা খাচ্ছিল, তারা উঠে দাঁড়িয়ে লোকটিকে বেঞ্চিতে বসার আহবান জানায়। লোকটি বেঞ্চের ওপর বসে শুধুই নিঃশব্দ হাসতে থাকেন। হাফিজ মিয়া প্রশ্ন করেবাবা, আপনি কি শুধুই চা খাবেন? কলা, রুটি, বিস্কুট একটা কিছু দেই?

লোকটি এবারও কিছু বলেন না। আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখেন। তারপর বিড়বিড় করে কিছু একটা বলেন।

মফিজ মিয়া বিনয়ের সঙ্গে লোকটির দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দেয়। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে লোকটি স্বস্তি প্রকাশ করে বলেনদুধ চা। আল্লায় দিছে। বলেই ডান হাত ওপরে তুলে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়।

হাফিজ মিয়া বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করেবাবা, আপনার বাড়ি কোথায়?

লোকটি এবার কিছু বলেন না। হাসতে হাসতে আকাশের দিকে ডান হাত তোলেন।

মালেক প্রশ্ন করেবাবা, আপনার সংসার আছে? স্ত্রী, পুত্র, কন্যা...

লোকটি বলেন, সবই মায়ার খেলা।

হাফিজ মিয়া প্রশ্ন করেবাবা, আপনি তো এই দেশেরই মানুষ, নাকি? বাংলাদেশ...

এবার লোকটি যেন অতিমাত্রায় সতর্ক হয়ে ওঠেন। ভয়ার্ত চোখে আশপাশে তাকান। বিড়বিড় করে কিছু একটা বলেন।

লোকটি সতর্ক চোখে আশপাশে দেখে নিয়ে বলেন, বিপদ আসতেছে। অনেক বড় বিপদ। হুঁশিয়ার, সাবধান...লোকটি কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হঠাৎ সামনের দিকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে থাকেন।

কী বুঝল্যা মালেক? মানুষটার মাথায় মনে হয় ছিট আছে? মালেক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, কী জানি, কার মনে যে কী আছে বলা মুশকিল। তবে আমি শিউর, এই লোক টিকটিকি না। মেন্টাল প্রবলেম আছে। দেখে মনে হইল, লেখাপড়া জানা মানুষ।

ঢাকাগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস এইমাত্র প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়িয়েছে। হাফিজ মিয়ার চায়ের দোকানে আবার ভিড় শুরু হলো। মালেক বলল, হাফিজ ভাই আমি যাই।

পরের দিন সকালে ঢাকাগামী নীলসাগর ট্রেনযোগে একজন তরুণী টঙ্গী রেলস্টেশনে এসে নামল। তার হাতে একটা ফটো। যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই দেখাচ্ছে। পকেটমার মন্টু তরুণীকে টার্গেট করেছে। ছলে বলে কৌশলে তরুণীর ভ্যানিটি ব্যাগ হাপিস করার সুযোগ খুঁজছে সে। ইদানীং পুরুষের মানিব্যাগ হাপিস করে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। মন্টু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন থেকে পুরুষের বদলে মহিলাকে টার্গেট করবে। নীলসাগর এক্সপ্রেস থেকে তরুণীটিকে একা নামতে দেখেই তাকে টার্গেট করেছে মন্টু। তরুণী যাকে কাছে পাচ্ছে তাকেই একটা ফটো দেখাচ্ছে। মন্টু কৌতূহলী হয়ে উঠল। দ্রুত পায়ে হেঁটে তরুণীর সামনে এসে দাঁড়ায় মন্টু। বিনীত কণ্ঠে জানতে চায়ম্যাডাম, আপনি কি কাউকে খুঁজতেছেন?

তরুণী ক্লান্ত কণ্ঠে জবাব দেয়হ্যাঁ। তারপর হাতের ফটোটা উঁচিয়ে ধরে জানতে চায়, এই মানুষটাকে কি দেখেছেন?

ফটো দেখে চমকে ওঠে মন্টু! এটা কার ফটো?

আমার বাবার।

আপনার বাবা?

হ্যাঁ! আমার মোবাইলে একজন মেসেজসহ ছবি পাঠিয়েছে। বাবাকে নাকি এই রেলস্টেশনেই দেখা গেছে। আপনি কি এই রেলস্টেশনে থাকেন?

হ্যাঁ।

তাহলে নিশ্চয়ই তাঁকে দেখেছেন?

তিনি কি বাঁশি বাজান? প্রশ্ন করে মন্টু।

হ্যাঁ। আগ্রহভরে উত্তর দেয় তরুণী!

আপনার বাবা কি মানসিক রোগী?

হ্যাঁ। মানসিক রোগীই বলতে পারেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।

তরুণীর মুখে মুক্তিযোদ্ধা শব্দটা শুনে বিচলিত হয়ে ওঠে মন্টু। তরুণীর নাম জানতে চায়। তরুণী নিজের নাম বলে।

আমার নাম মেঘনা। আমরা তিন ভাই-বোন। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। পদ্মা আমার বড় ভাই। আমি মেঘনা। আমার ছোট যমুনা। বাবাই আমাদের নাম রেখেছেন। আপনি কি তাঁকে দেখেছেন? হঠাৎ কেঁদে ফেলে মেঘনা।

মন্টুর হিসাব-নিকাশ বদলে যায়। মেঘনার কথা শুনে সিদ্ধান্ত পাল্টায়। মেঘনাকে সহযোগিতা করার কথা ভাবে। মেঘনাকে সহযোগিতা করা মানে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সহযোগিতা করা। মন্টুর বাবাও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। লেখাপড়া জানতেন না। দেশকে জালিমের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর বীরের বেশে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো মর্যাদা পাননি। কয়েক বছর আগে মারা যান মন্টুর বাবা। মন্টুরা তিন ভাই, দুই বোন। ভাইদের মধ্যে বড় দুজনের একজন ডিমের ব্যবসা করে। অন্যজন ঢাকা শহরে রিকশা চালায়। মা আর অবিবাহিতা দুই বোনকে নিয়ে বাবার সংসারেই থেকে গেছে মন্টু। বাবার মতো সেও অশিক্ষিত। তাই কোনো চাকরি মেলেনি। বাধ্য হয়ে পকেটমার হয়েছে। পরিবারের সবাই জানে মন্টু ঢাকা শহরে চাকরি করে।

মেঘনা অসহায়ের মতো মন্টুর দিকে চেয়ে আছে। বাঁশিওয়ালাকে গতকাল সন্ধ্যার পর টঙ্গী রেলস্টেশনে আর দেখা যায়নি। কোথাও গেছে, নাকি রেলস্টেশনেই আছে খোঁজ নিতে হবে। তার আগে হাফিজ মিয়ার সঙ্গে মেঘনার দেখা করিয়ে দেওয়া উচিত। কারণ হাফিজ মিয়ার কাছে বাঁশিওয়ালার খবর থাকলেও থাকতে পারে।

মেঘনাকে দেখে হাফিজ মিয়া তার চায়ের দোকান থেকে নেমে এলো! পরম মমতায় জিজ্ঞেস করল, বাঁশিওয়ালা কি তোমার বাবা?

হ্যাঁ। মাথা নাড়ে মেঘনা।

তোমাদের বাড়ি কোথায়?

ঢাকা, মিরপুরে। ১০ নম্বর গোলচত্বরের পাশে।

তুমি আসো আমার সঙ্গে।

মেঘনা ও মন্টুকে সঙ্গে নিয়ে রেলস্টেশনের অপেক্ষাকৃত একটি ফাঁকা জায়গায় আসে হাফিজ মিয়া। যাত্রীদের বসার জন্য একটা বেঞ্চ খালি পড়ে আছে। মেঘনাকে ওই বেঞ্চে বসিয়ে নিজেও মেঘনার পাশে বসে হাফিজ মিয়া।

আমার বাবা কোথায় আপনি জানেন?

তোমার বাবা আছেন, ধারেকাছেই আছেন! তোমাকে কি আমি কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারব?

প্রশ্ন করেন।

তোমার বাবার পরিচয় কী?

তিনি একজন স্কুলশিক্ষক। রিটায়ার করেছেন। তাঁর বড় পরিচয় তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।

হাফিজ মিয়া বলে, তিনি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন?

হ্যাঁ। হি ইজ আ ফ্রিডম ফাইটার।

আজ তাঁর এই দশা কেন?

হাফিজ মিয়ার প্রশ্ন শুনে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ায় মেঘনা। উদাস কণ্ঠে বলে, বাবা এত দিন ভালোই ছিলেন। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এত মানুষের মৃত্যু দেখে অস্থির হয়ে ওঠেন। এত রক্তপাত মেনে নিতে পারছিলেন না। প্রতিদিন একটা কথাই বলতেন, অনেক অন্যায় হচ্ছে। এত রক্তপাতের মাশুল দিতে হবে। দেশটার ক্ষতি হবে। তরুণ প্রজন্মের প্রশংসা করতেন। বলতেনহ্যাঁ, এরাই পারবে...যখন গণ-অভ্যুত্থান চলছিল তখন একদিন কী একটা কাজে মিরপুর থেকে বাসে চড়ে গুলিস্তানের দিকে যাচ্ছিলেন। ওই বাসে কয়েকজন বেপরোয়া তরুণ উঠেছিল। তারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বেশ কটাক্ষ করছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নাকি তাদের কাছে কোনো জরুরি বিষয় না। বাবা প্রতিবাদ করেছিলেন। বেপরোয়া ওই তরুণরা সেদিন কদর্য কথা ও অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে বাবাকে চরম অপমান করে। বাসায় ফিরে বাবা সেদিন অনেক কেঁদেছেন। তাঁর একটাই কথা, একাত্তরের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এই দেশের মূল শিকড়। অথচ শিকড়ের কোনো স্বীকৃতি নাই। শিকড় ছাড়া এই দেশ বাঁচবে কী করে? আবার জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্ক তোলা হচ্ছে। জাতীয় সংগীত কার পাকা ধানে মই দিয়েছে? এইসব প্রশ্ন বাবাকে অস্থির করে তোলে। বাসা থেকে বের হন না। নিজের ঘরে যখন-তখন বাঁশির সুর তোলেন। স্বাধীনতাসংগ্রামে বাঁশি বাজিয়ে সহযোদ্ধাদের সাহস ও শক্তি জোগাতেন। সেই বাঁশিকেই সঙ্গী করে নেন। হঠাৎ একদিন সবার অলক্ষ্যে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যান বাবা। একটি জাতীয় দৈনিকে বাবার নিখোঁজ সংবাদ ছাপা হয়েছিল। সেই সংবাদ পড়ে একজন আমাকে ফোন করে। তার পরের ঘটনা তো বুঝতেই পারছেন। কথা বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে মেঘনা। পরক্ষণেই দুই হাত দিয়ে চোখ মুছে হাফিজ মিয়ার দিকে তাকায়কোথায় আমার বাবা? প্লিজ আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে চলুন, প্লিজ...

হাফিজ মিয়া ও মন্টু দুজনই বিব্রত ভঙ্গিতে পরস্পরের দিকে তাকায়। কারণ তারা নিজেরা জানে না বাঁশিওয়ালা এখন কোথায় আছেন। মেঘনা আবার একই প্রশ্ন করল, আমার বাবা কোথায়?

হাফিজ মিয়া কোনো উত্তর দিল না। মন্টু বলল, আপনার বাবা এই স্টেশনেই কোথাও না কোথাও আছেন। চলেন খুঁইজ্যা দেখি! আসেন...

আপনাদের মনে হয়তো একটা প্রশ্নের উদয় হয়েছে, আমি একা কেন বাবাকে খুঁজতে এসেছি। সহজ উত্তর, আমরা চার ভাই-বোন। মা বেঁচে নেই। তিন ভাইয়ের আমিই একমাত্র বোন। সবার ছোট। ভাইয়েরা চাকরি ও ব্যবসার সুবাদে কেউ ঢাকায় কেউ চট্টগ্রামে থাকে। বাবা আমার সঙ্গেই থাকেন। তাই আমিই বাবাকে খুঁজতে বেরিয়েছি। বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে মেঘনা।

মন্টু অস্থির হয়ে ওঠে। নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা যখন বেঁচে ছিলেন তখন মাথার ওপর একটা ছাদ ছিল। নির্ভরতার ছাদ। এখন ছাদটা নেই। মেঘনারও হয়েছে সেই দশা। তার বাবাকে খুঁজে দিতে পারলে নিজের বাবাকেই যেন খুঁজে পাবে এমন একটা অনুভূতি পেয়ে বসল তাকে। মন্টু সিদ্ধান্ত নিল, আজ পকেটমারের ধান্দা বাদ। বাঁশিওয়ালাকে খুঁজে বের করতেই হবে। হঠাৎ দূরে কোথাও বাঁশির সুর শোনা গেল। মন্টু সতর্ক ভঙ্গিতে বললম্যাডাম শুনতেছেন? বাঁশিওয়ালার বাঁশি...

মেঘনা বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, এটা তো বাবার বাঁশির সুর।

হাফিজ মিয়া বলল, আমিও শুনতে পাইতেছি। বাঁশিওয়ালার বাঁশি...

বাঁশির সুর যেদিক থেকে আসছে মেঘনা সেদিকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে থাকল। মন্টু ও হাফিজ মিয়াও তার সঙ্গে শামিল হলো।

টঙ্গী রেলস্টেশনের পাশেই একটি খোলা জায়গায় বাঁশি বাজাচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা এজাজুল হক। শখানেক বিভিন্ন বয়সী মানুষ গোল হয়ে তার বাঁশি শুনছে। দেশাত্মবোধক বেশ কয়েকটি গানের সুরে পর্যায়ক্রমে বাঁশি বাজালেন এজাজুল হক। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার বাঁশি শুনছে সবাই। হঠাৎ তিনি জাতীয় সংগীতের সুর তুললেন। তখনই তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল মেঘনা। মেয়েকে কাছে পেয়ে শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন এজাজুল হক।

মা, তুই এসেছিস?

হ্যাঁ, বাবা। বাড়িতে চলো।

এজাজুল হক চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, জাতীয় সংগীত শুরু করেছিলাম। কারা নাকি আমাদের জাতীয় সংগীতও বদলাতে চায়। আমার জীবন থাকতে সেটা হতে দেব না। কক্ষনো না।

মেঘনা দূঢ়তার সঙ্গে বললবাবা, তুমি তোমার সিদ্ধান্তে অটল থাকো। আমি আছি তোমার সঙ্গে। বাজাও তোমার বাঁশি...

এজাজুল হক বাঁশিতে জাতীয় সংগীতের সুর তুললেন। হঠাৎ কী যে হলো, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য নারী-পুরুষ ছুটে আসতে থাকল এজাজুল হককে ঘিরে সৃষ্ট মানুষের জটলার দিকে। জনতার মহাসমুদ্রে বাজছে বাঁশি। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...

 

হুইলচেয়ার

ফরিদুর রেজা সাগর

হুইলচেয়ার
অঙ্কন : নাহিদা নিশা

আমার নাম মো. মোহসীন আলম। ম্যাট্রিক এবং অন্য সব সার্টিফিকেটে এই নামই রয়েছে। কিন্তু টেলিভিশনের লোকজন আমার নাম জানে মোসীন আলম হিসেবে। কারণ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান শেষে প্রযোজক বা পরিচালক হিসেবে স্ক্রলে এই নামই যায়। টেলিভিশনে আমার চাকরিজীবন প্রায় শেষ হতে চলেছে। দীর্ঘদিন অনেক রকম অনুষ্ঠান পরিচালনা বা প্রযোজনা করেছি। নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। অনেক সময় বিস্মিত হয়েছি মানুষের পর্দায় নিজেকে উপস্থাপনের আগ্রহ দেখে। মানুষ কেন এত পর্দায় নিজেকে উপস্থাপন করতে চায়? ডক্টর হুমায়ুন আজাদ খুবই পণ্ডিত ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাংলা ভাষার ওপর একটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠান করতেন। কঠিন বিষয়কে তিনি অতি সহজভাবে উপস্থাপন করতেন। সেই অনুষ্ঠান দেখতে ভালোই লাগত। তারপর দীর্ঘদিন তিনি অসুস্থ ছিলেন। ফলে তাঁর পক্ষে আর অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া টেলিভিশনের সাহিত্যবিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নিয়েছেন। শুনেছিলাম হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন তিনি। তাঁর শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে গেছে, জোরও পাচ্ছেন না। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে মুখটা একটু বেঁকে গেছে। আমি অনেক দিন ভেবেছি, তাঁকে হাসপাতালে দেখতে যাব। কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি। হঠাৎ একদিন কেউ একজন বললেনআপনার সঙ্গে দেখা করতে ডক্টর হুমায়ুন আজাদ এসেছেন। আমি শুনে অবাক। তিনি হাসপাতালে, কী করে এলেন! একটু পরে দেখি, তিনি আমার অফিসের রুমের সামনে হুইলচেয়ারে বসে আছেন। চেনাই যায় না। মুখটা একটু বাঁকা হয়ে গেছে। তিনি বললেন, কেমন আছেন?

আমি জবাব দিলাম, ভালো আছি স্যার, আপনি ভেতরে আসুন। তিনি হুইলচেয়ারে করে ভেতরে প্রবেশ করলেন। তাঁকে সাহায্য করছিলেন একজন যুবক। চা-কফির অফার করলাম। তিনি বললেন, এখন আর খুব একটা খেতে পারি না। গলা জড়িয়ে যাচ্ছে, অস্পষ্ট উচ্চারণ, কিন্তু বেশ বোঝা যাচ্ছে।

তিনি বললেন, আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে একটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছি।

কী অনুষ্ঠান?

বললেন, বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিবর্তনের ওপর।

বললাম, স্যার অনুষ্ঠান পরিকল্পনাটা?

তিনি জানালেন লিখে নিয়ে এসেছেন। ঝকঝকে হাতের লেখায় সুন্দর একটি ফাইলবন্দি করে নিয়ে এসেছেন। আমাকে সেটি দিলেন। বললেন, ডাক্তার বেশি কথা বলতে বারণ করেছেন, তাই লিখে নিয়ে এসেছি।

স্যারের লেখা বলে কথা, এটা পড়ে দেখার কিছু নেই। আমার বিশ্বাস আছে, তিনি সুন্দর পরিকল্পনা করেন। স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, অনুষ্ঠানটি তো নিশ্চয়ই ভালো হবে, কিন্তু উপস্থাপনা কে করবে?

স্যার জবাব দিলেন, কেন আমি করব! সেই অস্পষ্ট উচ্চারণ শুনে চমকে স্যারের দিকে তাকালাম। কী অসম্ভব মনোবল! হুইলচেয়ারে বসে তিনি ভাবছেন টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করবেন। বিপুল উৎসাহ নিয়ে এসেছেন, তাঁকে তো সরাসরি না বলতে পারি না। টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এমন অস্পষ্ট উচ্চারণ আর হুইলচেয়ারে বসা একজন মানুষকে দিয়ে উপস্থাপনা করানোটা দৃষ্টিকটু না হলেও কেমন যেন মনে হয়। কিন্তু স্যারের উৎসাহ দেখে কিছু বলতে পারলাম না। তবে আমি স্যারকে বললাম, আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেব, দেখি তাঁরা কী বলেন।

তিনি বললেন, কাউকে কি বলতে হবে?

আমি বললাম, না, কাউকে বলতে হবে না। আপনার অনুষ্ঠান বলে কথা।

স্যারকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ভাবতে লাগলাম, কী করব এই অনুষ্ঠান নিয়ে। অনুষ্ঠান করার ব্যাপারে তাঁর যে আগ্রহ সেটা কিভাবে পূরণ করা সম্ভব!

কিছুদিন পর স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন আরেক পৃথিবীতে। অনুষ্ঠান পরিকল্পনাটা আমার টেবিলেই রয়ে গেছে। অনুষ্ঠানটি আর করা হয়ে ওঠেনি।

হুইলচেয়ার নিয়ে আবার একজনকে দেখলাম। একদিন হুইলচেয়ারে তিনি হাজির। জোর দিয়ে কথা বলেন। স্পষ্ট কথা বলেন। বললেন, আমার এই অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যেয়ো না। এখনো নিয়মিত ব্যায়াম করছি। ডাক্তার বলেছেন, কয়েক দিন পর দৌড়াতেও পারব।

অথচ হুইলচেয়ার ছেড়ে তিনি দাঁড়াতেই পারেন না। ভদ্রলোকের নাম সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী। অসম্ভব তাঁর মনের জোর। তিনি বললেন, আমি টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠান করতে চাই। আমার একটা পরিকল্পনা রয়েছে। তা ছাড়া তোমরা তো সিনেমা প্রযোজনা করছ, আমাকে একটা সিনেমা করার সুযোগ দাও। ঘুড্ডি নামে একটা অসাধারণ চলচ্চিত্র তিনি নির্মাণ করেছিলেন। যিনি হুইলচেয়ারে বসে রয়েছেন, তিনি সাহস করছেন সিনেমা বানানোর!

আমি বললাম, জাকী ভাই, এখন কি আপনার পক্ষে সিনেমা বানানো সম্ভব হবে?

তিনি বললেন, কেন নয়? আমার মাথা তো কাজ করছে। শরীরের একটি অংশ আমার অবশ, কিন্তু মাথা তো অবশ হয়নি। ব্রেন তো ঠিক আছে।

ঠিক সেদিনই বিখ্যাত শিল্পী সামিনা চৌধুরীর জন্মদিন ছিল। উপস্থাপক কোনো কারণে আসেননি। জাকী ভাই ঘটনাটি শুনলেন। তিনি বললেন, সাগর, তুমি যদি কিছু মনে না করো তাহলে সামিনার সাক্ষাৎকারটি আমিই নিতে পারি।

আমি বললাম, এই অবস্থায়!

তিনি বললেন, দেখোই না।

জাকী ভাই অনেক দিন টেলিভিশনে উপস্থাপনা করেছেন। তাঁকে হুইলচেয়ারে করে স্টুডওতে নিয়ে গেলাম। ক্যামেরা ওপেন করে দেখলাম, হুইলচেয়ারে বসে একটু কেমন যেন লাগছে। জাকী ভাইকে বললাম, দেখি সোফায় বসলে কেমন লাগে! বলেই তিন-চারজনে ধরাধরি করে সোফায় বসিয়ে দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, সোফায় বসতে কোনো সমস্যা হচ্ছে? তিনি বললেন, না, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু পরে ভাবির কাছে শুনেছিলাম, সোফায় বসতে জাকী ভাইয়ের অনেক অসুবিধা হচ্ছিল, কিন্তু অসম্ভব মনের জোরে সোফায় বসে ছিলেন। তিনি বিশ মিনিট ধরে সামিনার যে সাক্ষাৎকার নিলেন, সেটি টেলিভিশনের একটি উল্লেখ করার মতো সাক্ষাৎকার। আমাদের আর্কাইভে সেই সাক্ষাৎকারটি রাখা আছে। সামিনা চৌধুরী নিজেও বলেন, সেই সাক্ষাৎকারটি তাঁর জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ সাক্ষাৎকার।

তাকে আবারও হইলচেয়ারে বসানো হলো। তাঁর সেই একই কথা, আমাকে একটি সিনেমা করতে দিতে হবে। জাকী ভাই আমাদের সবার বড় ভাই হিসেবে পরিচিত, তাঁর অনুরোধ ফেলা যায় না। জাকী ভাই বললেন, আমার সিনেমায় অভিনয় করবেন আফজাল হোসেন। আমি জানি, জাকী ভাই বললে আফজাল না করবে না। কারণ আফজাল হোসেনসহ পুরো ঢাকা থিয়েটার জাকী ভাইকে গুরু হিসেবে মানে। কিন্তু এই শরীর নিয়ে জাকী ভাই কিভাবে ছবি করবেন আমি জানি না। তার পরও কথা বলে আমরা জাকী ভাইকে একটা সিনেমা করতে দিলাম। হুইলচেয়ারে বসেই জাকী ভাই একটি নয়, দুটি সিনেমা তৈরি করলেন। কয়েকটি নাটকও তৈরি করলেন। এবং শেষ যখন জাকী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তখন তিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন।

তিনি বললেন, তৈরি হও, এবার এমন একটি সিনেমা তৈরি করব, যে সিনেমা বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে আনবে।

আমি বললাম, নিশ্চয়ই জাকী ভাই। আমরা সেই দিনের প্রতীক্ষায় থাকব।

কিন্তু জাকী ভাই হুইলচেয়ার থেকে হাসপাতালের বিছানায় গেলেন। তারপর আর ফেরেননি। চলে গেলেন জাকী ভাই। এদিকে বাসায় আমার মাও ধীরে ধীরে অসুস্থ হচ্ছেন। তাঁর জন্য একটা হুইলচেয়ার কেনা হয়েছে। তিনি হুইলচেয়ারে বসে দিব্বি ঘোরাফেরা করেন। মাঝেমধ্যে হইলচেয়ারটা টেবিলের কাছে নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করেন। প্রতিদিন আমার মায়ের ডায়েরি লেখার অভ্যাস।

একদিন বললেন, এই হুইলচেয়ারে বসে প্রতিদিন ডায়েরি লেখা যায় না। তবু মাঝেমধ্যে চেষ্টা করছি। প্রথম দিকে আম্মা হুইলচেয়ারে বসতে চাননি। কিন্তু ধীরে ধীরে হুইলচেয়ারটি তার বন্ধু হয়ে গেল। হুইলচেয়ারে করে তিনি নিজেই এঘর থেকে ওঘরে যেতেন। নাতনিকে কোলে নিয়ে হুইলচেয়ারে বসেই ঘুরে বেড়াতেন বাড়িময়। তবে বাইরে যেতে খুব একটা রাজি হতেন না। আম্মা হুইলচেয়ারে যে খুব খুশি মনে বসে থাকতেন সেটা কিন্তু মনে হতো না। কিন্তু শারীরিক কারণে তিনি দীর্ঘদিন হুইলচেয়ার ব্যবহার করেছিলেন। এর মধ্যে আমার এক আপন খালা এলেন। আমার আম্মার খুবই পছন্দের প্রিয় বোন। খালারও শরীর বেশ খারাপ দেখলাম। তাঁকে ধরে ধরে লাঠি ভর দিয়ে লোকজন হাঁটিয়ে বেড়ায়। আম্মাকে বললাম, এবার বেতন পেলে খালাকে একটা হুইলচেয়ার কিনে দেব। আম্মা খুশি হলেন। ভালোই হয় দুই বোন হুইলচেয়ারে বসে ছাদে যাব। গল্প করব, আড্ডা দেব। পরের মাসে বেতন পাওয়ার আগেই হুইলচেয়ারের দোকান খুঁজে বের করলাম। হুইলচেয়ারের যে আলাদা দোকান আছে সেটাই জানতাম না। অনেকেই বলল, মিটফোর্ড হাসপাতালের পাশে হুইলচেয়ার পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানে যাওয়াটা একটু ঝামেলার। তার চেয়ে শ্যামলী পঙ্গু হাসপাতালের ওখানে নাকি ভালো হবে, যাতায়াতেও সুবিধা। এখানে নানা রকম হুইলচেয়ার পাওয়া যায়। আবার সুবিধা হচ্ছে, অর্ডার দিলে বাসায় পৌঁছে দেয়। সেখানে গিয়ে একটা হুইলচেয়ার দেখেও এলাম। বেতন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু টাকা অ্যাডভান্স নিতে পারলে সুবিধা হবে। বেতন পাওয়ার দিন দোকানে ফোন করলাম। জিজ্ঞেস করলাম হুইলচেয়ারটি আছে কি না। যেহেতু টেলিভিশনের লোক, তাই একটু আলাদা দাম দেন। দোকানদার ঠিকই মনে রেখেছেন। তিনি জানালেন, স্যার, হুইলচেয়ারটি আপনার জন্য রাখা আছে। আমি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জিয়াকে বলে কিছু টাকা অ্যাডভান্স নিয়ে অফিস থেকে বের হলাম। টাকাটা একটি খামে করে পকেটে নিলাম। রাস্তায় জ্যামের কারণে দোকান থেকে একটু দূরে নামতে হলো। হাঁটছি ভিড় ঠেলে। হঠাৎ অনুভব করলাম, কেউ একজন আমার পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়েছে। বুঝলাম পকেটমার। লোকটাকে ধরার চেষ্টা করলাম, তার আগেই পকেট থেকে খামটি বের করে ভোঁ-দৌড় দিল। এ রকম অবস্থায় জীবনে কখনো পড়িনি। কী করা যায়! আমি কি চিৎকার করে বলব চোর বা পকেটমার! তার পরও বললাম, এই গেল গেল...লোকজনও বলল, এই যে পকেটমার পালাল। একদল লোক তাকে ধাওয়া করল। লোকটা ধাওয়া খেয়ে দৌড় দিয়েছে জোরে। সামনে দিয়ে একটি বাস যাচ্ছিল, সেই বাসের সঙ্গে একটা ধাক্কা খেল। তারপর দেখলাম লোকজনের জটলা। লোকজন তাকে মারছে। আমার আর ভিড়ের মধ্যে যাওয়ার ইচ্ছা হলো না। একজন লোক বলল, আমরা পকেটমারকে ধরেছিআপনার কী নিয়েছে?

আমি বললাম, নিয়েছে তো হুইলচেয়ার কেনার টাকা। দেখলাম পকেটমারকে ধরে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। ভাবলাম দোকানদারকে যেহেতু বলেছিলাম টাকা হলে নিয়ে যাব। তাঁকে আজকের ঘটনাটা বলে পকেটমারকে হাসপাতালে দেখে আসব। এত দিনে এমন ঘটনা ঘটেনি। জীবনে এই প্রথম সরাসরি একজন পকেটমারকে দেখব। সেটাও টেলিভিশনের একজন মানুষ হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। দোকানদারকে বললাম, আজ নিতে পারছি না।

তিনি বললেন, স্যার, কাল নিয়ে যাবেন সমস্যা নেই। আমি মনে মনে ভাবলাম, কাল তো পারব না। কারণ অ্যাডভান্স চাইতে হবে আবার, সেটা কবে পাই! আমার মায়ের আনন্দটুকু পেতে দেরি হবে। খালাকে আবার অনুরোধ করতে হবে, খালা আর কদিন থাকেন। এসব ভাবতে ভাবতে দোকানদারকে বলে পঙ্গু হাসপাতালে ঢুকলাম। হাসপাতালে ঢুকতেই দেখলাম, কাউন্টারে একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই পুলিশ বললেন, স্যার, আপনার পকেটমার হয়েছে?

আমি বললাম, জি।

স্যার, আমরা পুরো টাকাটাই উদ্ধার করেছি।

এই যে, এই খাম তো?

দেখলাম আমার খামটাই, কিন্তু রক্তের দাগ লাগানো।

স্যার, এটাই তো আপনার খাম?

আমি বললাম, জি, এটাই আমার টাকার খাম।

তবে স্যার, আপনাকে তো একটু থানায় যেতে হবে। কারণ এটা তো আমরা চোরের কাছ থেকে উদ্ধার করেছি। এই খামটা আপনার কি না, কত টাকা আছেএসব ব্যাপারে একটু তথ্য দিতে হবে।

আমার টাকা আমি নেব তার জন্য থানায় যেতে হবে?

স্যার, কিছু মনে করবেন না, এটাই নিয়ম।

আমি বললাম, ঠিক আছে। তার আগে লোকটি কোথায়, একটু দেখে আসি।

তাকে কি দেখবেন, এমন মার দিয়েছে পাবলিক। আরেকটা দুঃখের কথাও আছে।

কী সেটা?

ওই যে ডাক্তার সাহেব আসছেন, তিনি বলবেন।

আমি দেখলাম অ্যাপ্রোন পরা একজন তরুণ ডাক্তার কেবিন থেকে বেরিয়ে আসছেন। তিনি জানালেন, লোকটাকে যেভাবে মেরেছে, তার মাথার দিকটা একেবারে থেঁতলে গেছে। তবে যত দূর মনে হয়, এ যাত্রায় বেঁচেই যাবে।

ওরা মার খেয়ে অভ্যস্ত, কিছুই হবে নাপাশ থেকে ফোঁড়ন কাটল পুলিশ।

এটা হতে পারে, কিন্তু মার তো মারই। তা ছাড়া দুঃখের খবর হলো, বাসের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পড়ে যাওয়ায় বাসের চাকার নিচে তার পা-টা চলে গিয়েছিল। একটা পা কেটে ফেলতে হবে। আমি শুনে চমকে উঠলাম।

 কী বলেন ডাক্তার সাহেব, পা কেটে ফেলতে হবে!

হ্যাঁ। একটি পা কাটতেই হবে।

আমি বললাম, লোকটাকে কি এখানে কেউ চেনে?

পাশ থেকে একজন লুঙ্গি পরা লোক বললেন, আমি এখানে চা বিক্রি করি। তাকে চিনি, সে আসলে পকেটমারই।

আমি বললাম, গরিব বলেই তো চুরি করে। ততক্ষণে পুলিশ বলল, স্যার চলুন। আপনি কি আমাদের গাড়িতে যাবেন, নাকি আলাদা যাবেন?

আমি বললাম, আমি আর থানায় যাব না। আপনাদের কী কী নিয়ম আছে, সেগুলো মেনে খামটা পকেটমারকে দিয়ে দিয়েন।

মানে, কী বলছেন আপনি?

শুনলেন তো ডাক্তারের কাছে। লোকটি আর কোনো দিন হাঁটতে পারবে না। একটি পা কেটে ফেলতে হবে। ওর একটি হুইলচেয়ারের খুব দরকার হবে। আর এই প্যাকেটে যে টাকা রয়েছে, সেটা দিয়ে পাশের দোকান থেকে একটি হুইলচেয়ার সে কিনতে পারবে।

পুলিশ, ডাক্তার এবং আশপাশের সবাই বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি পেছন দিকে ঘুরে চুপচাপ হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেলাম। কারণ আমার খালাকে বলতে হবেখালাম্মা, আরো কয়েকটা দিন আমার মায়ের সঙ্গে থাকেন। আমার মা খুশি হবেন...

ফাঁসি

সায়ন্থ সাখাওয়াৎ

ফাঁসি
অঙ্কন : জাহিদ জামিল

কানাডার টরন্টোর শীতল সকাল। বাঁ হাতে কফির মগ নিয়ে ডান হাত দিয়ে জানালার কাচে জমে থাকা কুয়াশায় অর্থহীন সব আঁকাআঁকি করছিল আর মুছে ফেলছিল ইসরাত। আঁকাআঁকি রেখে ল্যাপটপটা ওপেন করে। ঠিক তখনই ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠল পরিচিত বাংলা অনলাইন পত্রিকার সংবাদ শিরোনাম, যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত বাবার ফাঁসির দিনেই ছেলের আত্মহত্যা

ইসরাতের হাত থমকে গেল। বুকের ভেতর কোথাও যেন হঠাৎ করে বাতাস ঢোকা বন্ধ হয়ে গেল। হেডলাইনে ক্লিক করতেই ছবিসহ রিপোর্টটা অন হয়ে গেল। বড় হয়ে উঠল এক চেনা মুখ, আরাব। খুব চেনা। অসম্ভব চেনা।

না, এ হতে পারে না, ইসরাত ফিসফিস করে বলল।

কফির কাপটা হাত থেকে পড়ে গেল। ছিটকে পড়া কফির মতোই স্মৃতিগুলো ছড়িয়ে পড়তে লাগল চারদিকে।

সেইসব স্মৃতি হাতড়াতে থাকে ইসরাত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ। ক্যাম্পাসের পুরনো বটগাছটার নিচে বসে ইসরাতের হাতে দেয়ালে ফেরেস্তার মুখ বইটা তুলে দিয়েছিল ছেলেটি। পড়ে দেখতে পারো। নতুন লেখক। তার পরই জিজ্ঞেস করল, তুমি সব সময় এত তাড়াহুড়া করো কেন?

গতিই জীবন। গতি ধরে না রাখলে তো জীবন আমাকে ছেড়ে যাবে, হেসে বলেছিল ইসরাত।

তাহলে আমিও তোমার সঙ্গে দৌড়াব। একই গতিতে দৌড়ে তোমার সঙ্গে জীবনটা বেঁধে ফেলব, হাসতে হাসতে বলেছিল ছেলেটি।

সেদিন থেকেই দৌড় শুরু হয়েছিল দুজনার বন্ধুত্বের, গল্পের, আড্ডার। একসঙ্গে। সমগতিতে। ইসরাত ও আরাবের সেই দৌড় এসে যে ঠিকানায় স্থির হয়, তার নাম প্রেম। সময় হলেই এই ঠিকানাটা বদলে দিয়ে তারা এক নতুন ঠিকানায় স্থিত হবে, যার নাম সংসার।

বন্ধুরা মজা করে বলত, এই জুটিটা সিনেমা হওয়ার মতো। এই অস্থির প্রেমের যুগে এমন স্থির অতুলনীয় ভালোবাসা বিরল।

ইসরাতও বিশ্বাস করত, কিছু ভালোবাসা সত্যিই সব সীমা ছাড়িয়ে যায়।

ফাঁসিইসরাতের ছিল ভীষণ পড়ার ঝোঁক। অনেকেই তাকে বলত বইপোকা। আগে সে বই সংগ্রহ করত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে। কিছু বই কিনত নীলক্ষেত থেকে। কিন্তু আরাবের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও রিলেশনে আসার পর বই সংগ্রহের সব দায়িত্ব নিয়েছিল আরাবই। ইসরাতের পছন্দের বেশির ভাগ বই আরাব গিফট করেছে। তার মাঝারি মানের পড়ার অভ্যাসটাও বড় পড়ুয়ায় পরিণত হয়েছে। বই পড়ার পর দুজনে আবার সেই বইয়ের আলোচিত চরিত্র, বইয়ের থিম, লেখার মান নিয়ে আলোচনা করত।

একদিন নরম বিকেলের আলোতে গা ভিজিয়ে ইসরাতের বাসার বারান্দায় বসেছিল দুজন। দুটো চেয়ার, মাঝখানে ছোট টেবিল। টেবিলে দুটো বই, দুকাপ চা। মৈত্রেয়ী দেবীর ন হন্যতে আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যয়ের দূরবীন চেয়ে আছে দুজনের দিকে।

ইসরাত বলল, ন হন্যতে পড়ে আমার মনে হচ্ছিল, ভালোবাসা আসলে সময় মানে না। সমাজ মানে না। শুধু থেকে যায় একটা অসমাপ্ত দীর্ঘশ্বাসের মতো।

হ্যাঁ। মৈত্রেয়ীর লেখায় প্রেমটা খুব সংযত, কিন্তু ভেতরে আগুন। রবীন্দ্রনাথ যেন চরিত্র নন, একটা ছায়া, যার সঙ্গে কথা বলা যায় না, অথচ ভুলে যাওয়াও যায় না। বলল আরাব।

আরাবের বিশ্লেষণ শুনে মুগ্ধ হয়ে ইসরাত বলে, সবচেয়ে কষ্ট লাগে জানো কোথায়? যেখানে সে বোঝে, ভালোবেসেও তাকে সে পাবে না, তবু ভালোবাসে। কোনো অভিযোগ-অভিমান ছাড়াই।

আরাব একটু চুপ করে থেকে বলে, আমি তোমার মির্চা এলিয়াদও নই, রবীন্দ্রও নই। আমি তোমার আরাব, যাকে পাবে জেনে ভালোবাসছ এবং পাবেই। সো, তোমার কষ্ট পাওয়ার ভয় নেই। তারপর দূরবীনটা হাতে নেয় আরাব।

দূরবীনের বিষয়বস্তু মনে করার চেষ্টা করে আরাব। একটা সময়ের সামাজিক পরিবর্তন, বিশেষত দেশভাগ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী উত্তাল সময়ের প্রেক্ষাপটে তিনটি প্রজন্মের জীবন, তাদের সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের চিত্রায়ণ কী নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন শীর্ষেন্দু বাবু। এক বিশাল সামাজিক পটভূমিতে স্বদেশি আন্দোলন ও পরিবর্তনশীল ভারতের এক মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান তুলে ধরেছে বইটি। দূরবীন যন্ত্রের মাধ্যমে চরিত্রগুলো তাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ খুঁজে ফেরে যেন।

জমিদার হেমকান্ত, তাঁর ছেলে কৃষ্ণকান্ত ও নাতি ধ্রুবর জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্বদেশি আন্দোলন, দেশভাগ, স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, জমিদারি প্রথার পতন এবং মানুষের জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন তুলে ধরে পাঠক মনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে।

দূরবীন যে সাংঘাতিকভাবে নাড়া দিয়েছে আরাবকে সেটা তার মুখভঙ্গিই বলে দেয়। বিশেষ করে প্রথাবিরোধী ধ্রুব।

ন হন্যতে নিয়ে ইসরাতের কথার রেশ টেনে আরাব বলে, আর এই বইটা ঠিক উল্টো। এখানে ভালোবাসা নেই বলেই মানুষ অন্যকে দেখতে চায়। দূরবীনের ভেতর দিয়ে। দূর থেকে।

হেসে ফেলে ইসরাত, শীর্ষেন্দু যেন বলছেন, মানুষ কাছের মানুষকে দেখতে পায় না, দূরের অচেনাকেই বড় করে দেখে।

ঠিক তাই। দূরবীনটা আসলে একটা অজুহাত। নিজের জীবনের শূন্যতা ঢাকার চেষ্টা, বলল আরাব।

ইসরাত বারান্দার গ্রিলের বাইরে তাকায়, ভাবো তো, ন হন্যতের মৈত্রেয়ী দেবী যদি একটা দূরবীন পেত!

তাহলে সে দূর থেকে তাকিয়ে থাকত, কাছে যেত না। সে তো কাছে গিয়েই পুড়ে গেছে, রসিকতা করে বলল আরাব।

দুজনেই হাসে। তারপর একটু নীরবতা।

নীরবতা ভেঙে ইসরাত বলে, আমাদেরটা কোন বইয়ের মতো বলো তো?

চিন্তিত স্বরে আরাব বলে, আমরা দূরবীন ব্যবহার করি না। কাছেই থাকি। আর ন হন্যতের মতো কষ্টও জমতে দিই না। আমরা আমাদের মতো। কেউ সরে যাব না, দূরে যাব না। কেউ কাউকে কষ্ট দেব না। বিয়োগান্ত নাটকের চরিত্র হয়ে আমরা কারো আহারে-উহুরে কুড়াতে চাই না। আমাদের নাটকের নাম হবে অতঃপর তাহারা এক খাটে শুয়ে জীবন কাটাইতে লাগিল। বলেই হাসল আরাব।

ইসরাত তার হাত দুটো আস্তে করে আরাবের হাতের ওপর রাখে। চোখের দিকে অপলক চেয়ে থেকে বলে, তাহলে আমাদের গল্পটা লিখতে হবে আলাদা করে।

ওরা দুজন শুধু বই-ই পড়ত না, একে অপরকেও পড়ত পরম মমতায় আরো যত্ন করে।

বই দুটো টেবিলে পাশাপাশি পড়ে থাকে।

দুই জোড়া ঠোঁট এক হয়ে বাঁধনছেঁড়া পায়রার মতো খলবলিয়ে বলতে থাকে জীবনের সব গভীর সংলাপ।

হঠাৎই একদিন শাহবাগ হয়ে গেল স্লোগান চত্বর। অজস্র প্রতিবাদের হাত ওপরে ওঠে। রাতের আকাশ ভেদ করে স্লোগান মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, খুনি রাজাকারের রক্ষা নাই। সেই রাতে শাহবাগে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে একাত্ম হয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে স্লোগান ধরেছিল ইসরাতও। তার পাশেই দাঁড়িয়েছিল আরাব।

পরের দিন আরাব কিছুটা ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, ইসরাত, একটা কথা আছে।

কী কথা, বলে ফেলো, বলল ইসরাত।

আমার বাবা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। তবে কোনো মুক্তিযোদ্ধার কোনো ক্ষতি করেননি। বরং অনেকের প্রাণ বাঁচিয়েছেন।

ইসরাতের মাথার ভেতর যেন বিকট শব্দ হলো।

কী!

বিশ্বাস করো আমার বাবা কাউকে মারেননি। কাউকে ধরিয়ে দেননি। অনেক মুক্তিযোদ্ধা, অনেক হিন্দু পরিবারকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আমার মা দুুটি হিন্দু মেয়েকে নিজের মেয়ে পরিচয় দিয়ে আমাদের বাসায় রেখে তাদের জীবন ও ইজ্জত বাঁচিয়েছেন। মা নিজে বলেছেন এই কথা।

ইসরাত কাঁপা গলায় বলেছিল, তুমি তো জানতে আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। বাবা মুক্তিযোদ্ধা। এটা শুধু রাজনীতি না, এটা রক্তের ইতিহাস। আমি তোমাকে বহুবার বলেছি সেই গৌরবের ইতিহাসের কথা। তুমি তো সব জানতে। একবারও বলোনি যে তোমার বাবা শান্তি কমিটির লোক। এটা কী করে করতে পারলে আরাব!

ইসরাতের ভেতরে অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছিল। কিন্তু বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় নেই। সে পাহাড়ের মতো স্থির ও মৌন হয়ে গেল।

এত দ্রুতই যে এই দুঃসংবাদটা শুনতে হবে তার জন্য প্রস্তুত ছিল না ইসরাত। এমনকি আরাবও ভাবেনি এত দ্রুতই এমন কিছু ঘটতে পারে।

পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছবিসহ খবর, যুদ্ধাপরাধী আলী আবছার গ্রেপ্তার। একাত্তরে খুন ও ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে শান্তি কমিটির এই সদস্যের বিরুদ্ধে।

ইসরাতের বাবা কঠিন গলায় জানিয়ে দিলেন, যুদ্ধাপরাধীর ছেলের সঙ্গে এই সম্পর্ক এখানেই শেষ। একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাতনি, একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার মেয়ের একজন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর ছেলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।

বাবা, তার পদ ছিল সত্যি। কিন্তু সে দোষী না, সে খুনি না, ধর্ষক না। ইসরাত কাঁদতে কাঁদতে আরাবের বলা কথাগুলোই বলেছিল।

সে কী করেছে আর কী করেনি সেটা এখন আর বিবেচ্য বিষয় নয়। সে কী অভিযোগে অভিযুক্ত সেটাই এখন মুখ্য, বলল ইসরাতের বাবা।

ইসরাত আর কিছু বলতে পারেনি। শহীদ দাদার ছবির দিকে তাকিয়ে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

ইসরাতের জন্য এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। স্টুডেন্ট ভিসায় কানাডা পাড়ি জমিয়ে সে শুধু একটা যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এসেছিল আরাব। বলেছিল, ইসরাত, একটা মিথ্যের ওপর ভর করে চলে যেয়ো না। একদিন আদালতে সত্যের জয় হবে। আমার বাবা খারাপ মানুষ না। আমার সঙ্গে তোমার কোনো যোগাযোগ রাখার দরকার নেই। কিন্তু চলে যেয়ো না। বিচারের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করো প্লিজ।

আমি বাঁচতে চাই। এখানে থেকে তোমার সঙ্গে দেখা না করে, কথা না বলে বাঁচতে পারব না। মরে যাব। তোমার বাবা নির্দোষ প্রমাণিত হলে আমি দেশে চলে আসব। তোমার কাছেই চলে আসব। আমাকে সে কয়টা দিন বেঁচে থাকতে দাও আরাব, বলেছিল ইসরাত।

আমাকে ছাড়া তুমি বাঁচবে ইসরাত? আমিও তো তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। আমাকে বাঁচাবে না জান! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিল আরাব।

তার কোনো জবাব না দিয়ে ধীরে ধীরে ইমিগ্রেশন পেরিয়ে সীমানার ওপারে চলে গেল ইসরাত। তার চোখের জল বলে গেল, সে কানাডায় গিয়েও আরাবকে বুকের মধ্যে নিয়েই বাঁচবে। সব দূরত্ব মানুষকে দূরে ঠেলে দেয় না। কিছু দূরত্ব আরো বেশি কাছে আনে।

আরাব আর কিছু বলেনি। শুধু তাকিয়ে ছিল, এক অদ্ভুত শূন্য চোখে।

খবরটা আবার পড়ে ইসরাত। ফাঁসির দিন। আত্মহত্যা।

জগতের সবাই জানল, ছেলেটি তার বাবাকে ভালোবাসত। তাই বাবার অপমান সইতে না পেরে বাবাকে হারিয়ে বেঁচে থাকতে চায়নি এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে। শুধু ইসরাত জানে, আরাব বাঁচতে চেয়েছিল।

ইসরাত চোখ বন্ধ করে। শুধু অনুভব করে, তার চিবুক বেয়ে নেমে আসছে অশ্রুধারা।

জানালার বাইরে তুষার পড়ছে। সাদা, নীরব। ঠিক যেমন নিঃশব্দে শেষ হয়ে গেছে একটি ভালোবাসা, ইতিহাসের ভারে চাপা পড়ে।

ইসরাত জানে, কিছু সম্পর্ক পালিয়ে বাঁচলেও স্মৃতি কখনো পাসপোর্ট-ভিসা চায় না। সে কারো অনুমতি ছাড়াই ঢুকে পড়ে দেশ থেকে দেশে, যুগ থেকে যুগে। সেগুলো সারা জীবন থেকে যায় জানালার ওপারের বরফের মতো নীরবে।