গত অর্ধশতাব্দীর মধ্যে দেশটিতে আঘাত হানা অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৩৭ জন নিহত এবং ৩২ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। স্থানীয় সময় সোমবার সকালে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে সরকারি নথিতে মাত্র চারজনকে নিখোঁজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তর স্বীকার বলেছে, সম্ভাব্য জীবিত বা নিহতদের সন্ধানে বেশ কয়েকটি ধসে পড়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে তল্লাশি চালাতে হবে।
ফিলিপাইনের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল দ্বীপ মিন্দানাও। এর উপকূল কেন্দ্র করে হওয়া এই ভূমিকম্পে প্রায় ৫০০ জন আহত এবং ৩২ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। যারা নিজেদের বাড়ি ছেড়েছিলেন তাদের অনেকেই সুনামির ভয়ে ভীত ছিলেন।
ফিলিপাইনে জোয়ারের স্তর থেকে ১.৪ মিটার (৪.৬ ফুট) পর্যন্ত উঁচু ঢেউ পরিমাপ করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও পালাউ, এমনকি সুদূর দক্ষিণ জাপানের উপকূলেও ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়েছিল। ভূমিধস ও ভবন ধসে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।
ভূমিকম্পটি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন রেখে গেছে, যার মধ্যে রয়েছে সাত লাখের বেশি জনসংখ্যার একটি উপকূলীয় শহর জেনারেল সান্তোস। শহরটি দেশটির টুনা রাজধানী হিসেবে পরিচিত। সেখানে ভবন ধসে এবং ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের রাফায়েলিতো আলেজান্দ্রোর মতে, সারাঙ্গানি প্রদেশে অন্তত ১৮ জন মারা গেছেন। তাদের বেশির ভাগই বাড়িঘরের নিচে ভূমিধসে চাপা পড়ে মারা যান।
দুর্যোগ মোকাবেলা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাকি মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ সাউথ কোতাবাতো ও দাভাও অক্সিডেন্টাল এবং বালুত দ্বীপে।
সরকারের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রদেশে প্রায় দুই হাজার ৫০০টি বাড়ি এবং ১১৭টি সরকারি ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেনারেল সান্তোসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি দ্বিতীয় দিনের মতো বন্ধ থাকায় মানবিক মিশনের ফ্লাইটগুলো ছাড়া ৬৩টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।
ক্লাস পুনরায় শুরু করার আগে ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত প্রদেশগুলোর প্রায় ছয় হাজার সরকারি স্কুল ভবন মূল্যায়ন করতে হবে। দুই মাসের গ্রীষ্মকালীন ছুটির পর দেশব্যাপী ক্লাস শুরুর প্রথম দিনেই ভূমিকম্পটি আঘাত হানে এবং আহতদের মধ্যে অনেকেই ছিল তরুণ শিক্ষার্থী। তারা সকালের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের জন্য জড়ো হয়েছিল।
কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, পরবর্তী কম্পনের কারণে ফাটল ধরা ভবনগুলো ধসে পড়তে পারে। আলেহান্দ্রো বলেন, ‘আমরা অবিলম্বে স্কুল খোলার জন্য জোর করতে পারি না, কারণ আমাদের ভবনগুলোর অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে হবে।’ ১৯৭৬ সালের পর এটিই ছিল ফিলিপাইনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
সোমবার ফিলিপাইনে হওয়া ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল সমুদ্রের প্রায় ৩৩ কিলোমিটার গভীরে। এটি সারাঙ্গানি প্রদেশের মাসিম শহর থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ঘটেছে বলে জানিয়েছে দেশটির ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি সংস্থা।
সংস্থার পরিচালক তেরেসিতো বাকোলকল বলেন, এটি ১৯৭৬ সালের ১৭ আগস্টের পর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি। ওই সময় একই এলাকায় ৮.১ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামিতে প্রায় ৮ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৯৭৬ সালের সেই ভূমিকম্পে ৮ থেকে ১০ মিটার উঁচু সুনামির ঢেউ অনেক শহর ও গ্রাম ধ্বংস করে দেয়।
ভূমিকম্প সংস্থাটি জানিয়েছে, আগস্টে ১৯৭৬ সালের সেই ঘটনার বার্ষিকী উপলক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতা চিহ্ন বসানোর পরিকল্পনা ছিল, যাতে মানুষ সচেতন থাকে। এ ছাড়া ১৯৯০ সালে আরেকটি ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে এক হাজারের বেশি মানুষ মারা যায় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
বর্তমান ভূমিকম্পের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাদ্য ও জরুরি সামগ্রী পাঠানো হচ্ছে এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান ও নিউজিল্যান্ড ফিলিপাইনকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
ফিলিপাইন প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত, তাই দেশটি প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঝুঁকিতে থাকে। এ ছাড়া প্রতি বছর বহু টাইফুন ও ঝড় আঘাত হানে, ফলে এটি বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ।