রাশিয়ার ক্রমাগত চাপের মধ্যে আর্মেনিয়ার জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ানের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী ‘সিভিল কনট্র্যাক্ট পার্টি’ ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিজয় অর্জন করেছে।
নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্ট্রং আর্মেনিয়া অ্যালায়েন্স পেয়েছে ২৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোট এবং আর্মেনিয়া অ্যালায়েন্স পেয়েছে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট। এই নির্বাচনের আগে রুশ সরকার আর্মেনিয়ার উপর চাপ ও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। জয়ের পর এই রায়কে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের এক ঐতিহাসিক ম্যান্ডেটকে ইউরোপীয় নেতারা সাধুবাদ জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন দেশটির ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
২০২৩ সালে আজারবাইজানের কাছে নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক পরাজয়ের পর এটি ছিল আর্মেনিয়ার প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ফলে নির্বাচনটিকে পাশিনিয়ানের পশ্চিমমুখী কূটনৈতিক নীতির ওপর জনসমর্থনের পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছিল।
২০১৮ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা পাশিনিয়ান সোমবার বিজয়ের ঘোষণা দিয়ে বলেন, আর্মেনিয়ার জনগণ শান্তি, আঞ্চলিক সমৃদ্ধি এবং সহযোগিতার পক্ষে ভোট দিয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ পাশিনিয়ানকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তারা আর্মেনিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক আরো জোরদার হওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর ওপর ‘অভূতপূর্ব চাপ’ প্রয়োগ করা হয়েছে এবং পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছে।
তিনি বলেন, এই নির্বাচন আর্মেনীয় সমাজের গভীর রাজনৈতিক বিভাজনও প্রকাশ করেছে। যদিও ২০২১ সালে পাশিনিয়ানের জনপ্রিয়তা ছিল প্রায় ৫৪ শতাংশ, সাম্প্রতিক জরিপে তা ৩০ শতাংশে নেমে আসে। তবুও তার দল নির্বাচনে সবচেয়ে বড় জয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
মোট ১৯টি রাজনৈতিক দল ও জোট নির্বাচনে অংশ নিলেও অল্প কয়েকটি দলই জাতীয় পরিষদে আসন পাওয়ার মতো ভোট অর্জন করেছে। দেশটির নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৫৯ শতাংশ।
চতুর্থ স্থানে থাকা প্রোসপারাস আর্মেনিয়া পার্টিসহ দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা প্রধান দুই জোটকে রাশিয়াপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নির্বাচনের পর পাশিনিয়ান বলেন, আমরা পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করার নীতি অব্যাহত রাখব। তবে একই সঙ্গে ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নের সদস্যপদও বজায় থাকবে।
সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আর্মেনিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রশ্নে দ্রুত গণভোট আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছিলেন, পশ্চিমা ঘনিষ্ঠতা বাড়ালে আর্মেনিয়া রাশিয়ার কাছ থেকে পাওয়া অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো হারাতে পারে।
বর্তমানে রাশিয়া আর্মেনিয়াকে প্রতি হাজার ঘনমিটার গ্যাস ১৭৭.৫০ ডলারে সরবরাহ করে, যেখানে ইউরোপীয় বাজারে একই পরিমাণ গ্যাসের দাম ৬০০ ডলারেরও বেশি।
নির্বাচনের আগে মস্কো আর্মেনিয়া থেকে ফুল, খনিজ পানি, ব্র্যান্ডি, তাজা ফল ও সবজি আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা রাজনৈতিক চাপের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাশিনিয়ান সরকার এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়া শুরু করতে একটি আইন পাস করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রতিবেশী আজারবাইজানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। এ উদ্যোগের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনও পেয়েছেন।
তবে নাগোর্নো-কারাবাখ ইস্যু এখনও আর্মেনিয়ার রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়। ২০২৩ সালে আজারবাইজান অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর প্রায় এক লাখ জাতিগত আর্মেনীয় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে পাশিনিয়ান অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন।
রাজধানী ইয়েরেভানের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ শান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য পাশিনিয়ানকে সমর্থন করেছেন, আবার কেউ ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বাস্তব সম্ভাবনা ও নাগোর্নো-কারাবাখ ইস্যুতে সরকারের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে সব মিলিয়ে নির্বাচনের ফলাফল আর্মেনিয়ার পশ্চিমমুখী কূটনৈতিক অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সূত্র : বিবিসি













