• ই-পেপার

বাংলাদেশে বিশ্বকাপের অফিশিয়াল হোম টি স্পোর্টস

নেইমারের ছেলের আক্রমণভাগে মেসি-রোনালদো-এমবাপ্পেও!

সাহিদ রহমান অরিন
নেইমারের ছেলের আক্রমণভাগে মেসি-রোনালদো-এমবাপ্পেও!
পরিবারের সঙ্গে ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার জুনিয়র। ছবি: ইন্সটাগ্রাম

নেইমার জুনিয়রকে নিয়ে আক্ষেপটা তাঁর ভক্ত-সমর্থকদেরই বেশি। সর্বকালের অন্যতম সেরা হয়ে ওঠার আভাস দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল নেইমারের। দলবদল ইতিহাসে এখনো তিনি বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার।

কিন্তু নিজের প্রতি কি সুবিচার করতে পেরেছেন নেইমার? উত্তর—না। একসময় ফুটবল বিশ্বকে শাসন করা ব্রাজিলের এই যে ছন্দপতন, সাম্বাশিল্প আজ যে পর্যায়ে থাকার কথা ছিল, সেখানে থাকতে না পারা কিংবা ‘হেক্সা’র আশায় প্রায় দুই যুগ পার করে ফেলা...এতে কি নেইমারের একটুও দায় নেই?

মাঠের বাইরের জীবনটা তাঁর চাকচিক্যে ভরা, মানুষ হিসেবে আমুদে স্বভাবের। কিন্তু সবুজ গালিচায় কাটানো দৃশ্যগুলোর দিকে তাকালে বেশির ভাগ জুড়েই বেদনা, অপূর্ণতা আর হাহাকার। সামর্থ্য থাকার পরও নিজেকে লিওনেল মেসি বা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেননি। জিততে পারেননি ব্যালন ডি’অর কিংবা ফিফা দ্য বেস্ট পুরস্কার। এসবের সঙ্গে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে না পারা জীবনের সবচেয়ে বড় অপ্রাপ্তি হয়ে আছে।

তবু নেইমার আলোচনায় ছিলেন, আছেন এবং আরো অনেক দিন থাকবেন। কারণ ৩৪ পেরোনো ফরোয়ার্ড এখনো যে ব্রাজিলের বড় ভরসার নাম। বেপরোয়া জীবন, মৌজ-মাস্তি-আড্ডায় মজে থাকা, নারী আসক্তি ও চোটঘাত—বারবার খবরের শিরোনাম হতে আর কী চাই!

Upload1
চোট থেকে সেরে ওঠার লড়াইয়ে নেইমার জুনিয়র। ছবি: এক্স

একের পর এক চোটে ক্যারিয়ারে প্রায় ১৪০০ দিন মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে নেইমারকে। প্রায় তিন বছর পর ব্রাজিল স্কোয়াডে জায়গা পেয়ে বিশ্বকাপ খেলতে গেছেন চোটকে সঙ্গী করেই। কার্লো আনচেলোত্তি তাঁর ওপর আস্থা না রাখলে তাঁকে নিয়ে এই লেখাটা লিখতে বসাই হতো না!

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেইমার ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০২৬-ই হতে চলেছে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। নিশ্চয়ই তিনি সাফল্যের শিখরে পৌঁছে শেষটা রাঙাতে চাইবেন।

কিন্তু যদি না পারেন, তাহলে কী হবে? নেইমারকে কি মানুষ চিরকাল মনে রাখবে, কিংবা তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশ তখনো কি নেইমারকে নিজের আদর্শ মনে করবে?

বাবার পথ ধরে রোনালদোর ছেলে ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়র কিংবা মেসির তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও এবং চিরো না হয় ফুটবলে মনোনিবেশ করেছে। তারা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে ফুটবলপ্রেমীরা পরবর্তী রোনালদো ও পরবর্তী মেসিকে দেখার আশায় বুক বাঁধতে পারেন।

কিন্তু নেইমারের একমাত্র ছেলে দাভি লুকা নামকাওয়াস্তে ফুটবলার। ১৫ ছুঁই ছুঁই এই কিশোর বাবার খেলা দেখতে মাঠে যায়, উৎসাহ দেয়; তবে নিজের ফুটবলীয় পরিসর বন্ধুদের সঙ্গে খেলার মাঝেই সীমাবদ্ধ।

ফুটবলারই হতে হবে—ছেলে লুকার ওপর এমন চাপ কখনো প্রয়োগ করেননি নেইমার। ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ছেলেকে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে খেলাধুলা পছন্দ করে। ওর বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে ভালোবাসে। কিন্তু সে আমার থেকে একদম আলাদা। ফুটবলের প্রতি ওর অতটা টান নেই। সে মেসি, এমবাপ্পে ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে খুবই পছন্দ করে। সত্যি বলতে, ভিডিও গেম খেলার সময় ওর দলের আক্রমণভাগে থাকে মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে আর আমি।’

ও হ্যাঁ, নেইমারের আরো তিন সন্তান আছে। তিন শিশুকন্যা মাভি (জন্ম : অক্টোবর ২০২৩), হেলেনা (জন্ম : জুলাই ২০২৪) ও মেল (জন্ম : জুলাই ২০২৫)। বুঝতেই পারছেন, ফুটবলের ‘ফ’ বোঝার বয়সটুকুও হয়নি তাদের।

তবে নেইমার মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, কন্যাসন্তানদের আগমনই তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে, তাঁকে দায়িত্ববান হতে শিখিয়েছে, নারী আসক্তি থেকে বেরিয়ে এক নারীতে থিতু হওয়ার ভাবনা গড়ে দিয়েছে।

নেইমারের জীবনের প্রথম প্রেম নাকি ছিলেন কারোলিনা দান্তাস। তাঁদের ভালোবাসার ফসল হিসেবে ২০১১ সালে জন্ম নেয় পুত্রসন্তান দাভি লুকা। নেইমারের বয়স তখন মাত্র ১৯ বছর!

লুকার জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই প্রথম প্রেমকে ভুলে যান নেইমার। ব্রাজিলিয়ান ইনফ্লুয়েন্সার দান্তাসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন তিনি। এর পর একে একে তাঁর জীবনে এসেছেন অনেক সুন্দরী তরুণী। তাঁদের কেউ মডেল, কেউ অভিনেত্রী, কেউ সংগীতশিল্পী আবার কেউ বা রিয়ালিটি শোর তারকা।

ব্রুনা নামের দুজন এসেছেন নেইমারের জীবনে। একজন ব্রুনা মার্কেজিন, আরেকজন ব্রুনা বিয়ানকার্দি। মার্কেজিনের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙেছে অনেক আগেই। এখন বিয়ানকার্দিকে নিয়ে তাঁর প্রেমের জগৎ। এই বিয়ানকার্দিই তাঁর দুই কন্যাসন্তান মাভি ও মেলের মা।

Upload7
অবশেষে এক নারীতে থিতু হয়েছেন নেইমার। ছবি: ইন্সটাগ্রাম

মাঝে বিয়ানকার্দিকে ধোঁকা দিয়ে আমান্দা কিম্বার্লি নামের এক মডেলের প্রেমে মজেছিলেন। নেইমারের তৃতীয় সন্তান তথা দ্বিতীয় কন্যাসন্তান হেলেনাকে এই কিম্বার্লিই পৃথিবীতে এনেছেন। খবরটা জানার পর বিয়ানকার্দির সঙ্গে নেইমারের ছাড়াছাড়ি প্রায় হয়ে গিয়েছিল। শেষমেশ ক্ষমা চেয়ে পার পেয়েছেন।

জীবনটা সত্যিই বড় অদ্ভুত। যে নেইমার ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিলেন একমাত্র ছেলে লুকাকে নিয়ে, সেই নেইমার চার বছরের ব্যবধানে নিজের চতুর্থ এবং খুব সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন চার সন্তানের গর্বিত বাবা হিসেবে! আর এখন তিনি অনেকটাই থিতু, আরো দায়িত্বশীল, আরো সহনশীন। না হলে কি আর নিজেকে বিশ্বকাপে খেলার মতো ফিট প্রমাণ করে আনচেলোত্তির স্কোয়াডে জায়গা করে নিতে পারেন?

নেইমার জুনিয়রের বাবা নেইমার সান্তোস সিনিয়রও ফুটবলার ছিলেন। খেলেছেন ব্রাজিলের নিচু স্তরের লিগে। মাঠে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি নেইমার সিনিয়র। তাই খেলা ছেড়ে হয়েছেন ছেলের তত্ত্বাবধায়ক ও এজেন্ট। নিজে যা পারেননি, সেটাই ছেলেকে দিয়ে করানোর স্বপ্ন তাঁর।

Upload4
নেইমারের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি দেখতে চান ব্রাজিলের সমর্থকরা। ছবি: এআই দিয়ে বানানো

এবার নেইমারের সামনে সেই স্বপ্নপূরণের চ্যালেঞ্জ—‘হেক্সা’ জিতিয়ে ব্রাজিলকে ষষ্ঠ স্বর্গে নিয়ে যাওয়া। নেইমার পারবেন কি না, সেটা সময়ই বলে দেবে। কে জানে, বাবার হাতে বিশ্বকাপ দেখার পর ছেলে লুকার মন বদলে যেতে পারে। পেশাদার ফুটবলবিমুখ ছেলেটার তারকা ফুটবলার হওয়ার শখ জাগতে পারে। ব্রাজিলের সমর্থক ও নেইমারভক্তরা সেটাই চাইবেন।

লুকা সেই চাওয়া পূরণ করতে না পারলে নেইমারের উত্তরসূরি হবেন কে?

বিসিবির নতুন কমিটিতে কে কোন দায়িত্ব পেলেন

ক্রীড়া প্রতিবেদক
বিসিবির নতুন কমিটিতে কে কোন দায়িত্ব পেলেন
ছবি : বিসিবি

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন জাতীয় দলের তামিম ইকবাল।

গত রবিবার (৭ জুন) অনুষ্ঠিত বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার পর তামিম সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন। এর আগে দুই মাস অ্যাডহক কমিটির প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন সাবেক এই অধিনায়ক। 

বিসিবির নির্বাচিত ২৫ জন পরিচালকের মধ্যে জেলা-বিভাগ থেকে ১০ জন, ঢাকার ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে ১২ জন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১ জন পরিচালক নির্বাচিত হন। পাশাপাশি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) থেকে মনোনীত হয়েছেন ২ জন। 

অবশ্য নির্বাচনের পরদিনই রাজশাহী অঞ্চল থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া মীর শাকরুল আলম সীমান্ত ব্যাবসায়িক ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন।

আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে বিসিবি কার্যালয়ে ২৪ জন বোর্ড পরিচালকদের নিয়ে প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসেন তামিম ইকবাল। বৈঠকে বিসিবির বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটির দায়িত্ব বণ্টন করেছেন তিনি। বিসিবির দৈনন্দিন কার্যক্রম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এসব কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

কে কোন দায়িত্বে

ফ্যাসিলিটিজ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ➟ তামিম ইকবাল
ফাইন্যান্স কমিটি ➟ ইসরাফিল খসরু
গেম ডেভেলপমেন্ট কমিটি ➟ ফাহিম সিনহা
এইজ গ্রুপ কমিটি ➟ মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও শফিকুল আলম
মার্কেটিং কমিটি ➟ আসাদুজ্জামান ও আসিফ রব্বানী
ডিসিপ্লিনারি কমিটি ➟ আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও মির্জা ফয়সল আমীন
হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ও গ্রাউন্ডস কমিটি ➟ শাহনিয়ান তানিম
মেডিক্যাল কমিটি ➟ ডাক্তার মাহবুব শামীম
আম্পায়ার্স কমিটি ➟ মির্জা ইয়াসির আব্বাস
ওয়েলফেয়ার্স কমিটি ➟ শেখ রুহুল আমিন
টেন্ডার অ্যান্ড পারসেজ কমিটি ➟ সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ
মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন কমিটি ➟ আসিফ রব্বানী
সিকিউরিটি কমিটি ➟ সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ
টুর্নামেন্ট কমিটি ➟ সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর
অডিট কমিটি ➟ সাইদ বিন জামান সৌরভ
লজিস্টিকস অ্যান্ড প্রটোকল কমিটি ➟ ইয়াসির ফয়সাল ও ইসরাফিল খসরু
ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিস (সিসিডিএম) ➟ মঈন উদ্দিন চৌধুরী
উইমেন্স উইং ➟ রফিকুল ইসলাম বাবু
ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড কমিটি ➟ এস এম আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ।

ফিফা বিশ্বকাপ-২০২৬ : ৫টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা আপনার জানা উচিত

ক্রীড়া ডেস্ক
ফিফা বিশ্বকাপ-২০২৬ : ৫টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা আপনার জানা উচিত
সংগৃহীত ছবি

ফিফা বিশ্বকাপের আর বাকি ২ দিন। আসন্ন এই টুর্নামেন্ট সম্পর্কে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো কালের কণ্ঠ পাঠকদের জন্য।

এক, প্রথমবার ফিফা বিশ্বকাপে ৪৮টি দল অংশ নেবে, যা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ৩২টি দলের চেয়ে বেশি। নতুন এই ফরম্যাটে চারটি করে দলের ১২টি গ্রুপ থাকবে, ফলে মোট ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে ১০৪ হবে। এর ফলে টুর্নামেন্টটিও দীর্ঘতর হবে এবং ৩৯ দিন ধরে চলবে।

দুই, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা প্রথমবারের মতো একসঙ্গে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করবে। এতে তিনটি দেশ যৌথভাবে টুর্নামেন্টটি আয়োজনে এটি প্রথম। 

তিন, বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জনকারী এযাবৎকালের ক্ষুদ্রতম দেশ হলো কুরাকাও। যার জনসংখ্যা ১ লাখ ৫৬ হাজার। অনেক শহরের চেয়েও ছোট হওয়া সত্ত্বেও তারা ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে বিশ্ব ফুটবলের সেরা দলগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।

চার, বাছাই পর্বে উত্তীর্ণ দলগুলোর মধ্যে ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরছে দুটি দেশ—ডিআর কঙ্গো ও হাইতি। উভয় দলই সর্বশেষ ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে খেলেছিল এবং ২০২৬ সালে তাদের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘ ৫০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটছে।

পাঁচ, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে চারটি দেশ অভিষেক করবে—কেপ ভার্দে, কুরাকাও, জর্দান ও উজবেকিস্তান। ফুটবলে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পর এটি তাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই অভিষেককারী দলগুলো প্রায়ই নতুন প্রাণশক্তি নিয়ে আসে এবং চাপমুক্ত হয়ে খেলে।

ইয়াস-তাবিথের ‘মাস্টারস্ট্রোকে’ কাটল বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ব্ল্যাকআউটের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক
ইয়াস-তাবিথের ‘মাস্টারস্ট্রোকে’ কাটল বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ব্ল্যাকআউটের শঙ্কা
তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী ও বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বাঙালির রাত জেগে উন্মাদনা, পাড়ায় পাড়ায় প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানো আর চায়ের কাপে ঝড় তোলা। অথচ বিশ্বমঞ্চের লড়াইয়ের কাছাকাছি সময়েও দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর কপালে দেখা দিয়েছিল চিন্তার ভাঁজ। প্রশ্ন উঠেছিল, এবার কি তবে টেলিভিশনে দেখা যাবে না ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ?

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে স্বস্তির খবর এসেছে। বিশ্বকাপ দেখতে পাবে বাংলাদেশ, বিষয়টি এখন পুরোপুরি নিশ্চিত। আর এই ‘ব্ল্যাকআউট’ বা খেলা দেখতে না পাওয়ার শঙ্কা দূর করার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল। খাদের কিনারা থেকে আলোর মুখ দেখেছে বাংলাদেশের কোটি ফুটবল ভক্ত।

ঘটনার সূত্রপাত গত কয়েক সপ্তাহ আগে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড প্রাথমিকভাবে ফিফার কাছ থেকে বাংলাদেশের মিডিয়া স্বত্ব পেয়েছিল। কিন্তু বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে কেনা এই স্বত্ব তারা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে ব্যর্থ হয় এবং শেষ মুহূর্তে এসে চুক্তিটি সমর্পণ করে। ফলে বিশ্বকাপ শুরুর দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে দেশটিতে কোনো ব্রডকাস্টার বা সম্প্রচারকারী মাধ্যম ছিল না। বিশাল অঙ্কের আকাশচুম্বী দাম, সীমিত বাণিজ্যিক সুযোগ এবং ম্যাচের প্রতিকূল সময়ের কারণে স্থানীয় কোনো ব্রডকাস্টারই এই স্বত্ব কিনতে সাহস বা আগ্রহ দেখাচ্ছিল না।

কিন্তু কোটি মানুষের এই আবেগ ও প্রত্যাশাকে মাঠেই ভেস্তে যেতে দিতে রাজি হননি প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। মন্ত্রণালয় থেকে এই সংকট সমাধানের পুরো উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের জরুরি তোড়জোড়ের মাঝেই পাশে এসে দাঁড়ান তাবিথ আউয়াল। এই চুক্তি সফল করার পেছনে ফিফার সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র তৈরিতে তাবিথ আউয়াল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।

ফিফার সঙ্গে চুক্তি নিয়ে তাবিথ আউয়াল বলেন, বিষয়টি বাফুফে সংক্রান্ত নয়; বরং বাফুফে সভাপতি হিসেবে ফিফাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। বিটিভিসহ (বাংলাদেশ টেলিভিশন) স্থানীয় অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে যেন একটি ফলপ্রসূ যোগাযোগ বা সমন্বয় তৈরি করা যায়, সেই লক্ষ্যেই তারা আমার দ্বারস্থ হয়।

বাফুফে সভাপতি আরো বলেন, বাংলাদেশে যদি বিশ্বকাপ ফুটবল সঠিকভাবে সম্প্রচার করা না হতো, তা দেশের কোটি ফুটবল ভক্ত এবং সাধারণ মানুষের জন্য চরম হতাশাজনক হতো। একই সঙ্গে এটাও সত্যি, যদি সবচেয়ে যৌক্তিক বাণিজ্যিক শর্ত মেনে এই সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা না যায়, তা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য একটি যৌথ ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হবে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে মন্ত্রণালয় ও বাফুফে যৌথভাবে কোমর বেঁধে মাঠে নামে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তারা একসঙ্গে বিভিন্ন স্পোর্টস চ্যানেল, জাতীয় মিডিয়া হাউস, টেলিকম সংস্থা এবং বেশ কয়েকটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যোগাযোগ করে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ও টেলিকম টাই-ইনের মতো নতুন আয়ের উৎসগুলো চিহ্নিত করে, যা আগের কোনো বিশ্বকাপ চক্রে কখনো অন্বেষণ করা হয়নি।

মঙ্গলবার (৯ জুন) এক সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান স্পষ্ট জানান, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভিকে কোনো ধরনের লোকসানের মুখে না ফেলেই তারা এই চুক্তিটি সম্পন্ন করতে পেরেছেন। অতীতের ‘অস্বচ্ছ’ ও চড়া দামের বাজারকে পাশ কাটিয়ে কিভাবে দেশের টাকা বাঁচানো গেছে, তার বিশদ বিবরণ দেন তিনি।

ইয়াসের খান বলেন, ‘আমরা যখন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে একটি অদ্ভুত গোলকধাঁধা তৈরি হয়েছিল। ফিফার কাছ থেকে স্বত্ব কেনা একটি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা দাবি করেছিল। এটি ছিল করদাতাদের টাকার ওপর একটি বড় ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলাম— প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় জনগণের টাকার অপচয় বা কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করবে না। ফলস্বরূপ, সেই অযৌক্তিক ক্রয়ের প্রস্তাবটি পাস হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকার একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছে—যেখানে অন্যায়, দুর্নীতি এবং কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার কোনো স্থান নেই।’ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতের জটিলতা ভেঙে সরাসরি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে কথা বলার কারণেই এসেছে এই অভূতপূর্ব সাফল্য।’

তিনি বলেন, ‘তার নির্দেশনায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এই ফিফা বিষয়ে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সরাসরি ফিফার সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। এই প্রক্রিয়ায় আমরা বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালকে সম্পৃক্ত করি। দিনের পর দিন ম্যারাথন বৈঠক, জটিল আলোচনা এবং কঠোর দর-কষাকষির মাধ্যমে আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি। কর্তৃত্ববাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের সততা এবং জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার এটি একটি বড় বিজয়।’

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বিগত সরকারের আমলে হওয়া চুক্তির উদাহরণ টেনে আনেন। তার মতে, আগে যেখানে বিটিভি কোটি কোটি টাকা খরচ করেও কোনো মুনাফা তুলতে পারেনি, এবার সেখানে এক টাকাও লোকসান গুনতে হবে না রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে ইয়াসের বলেন, ‘বিটিভি আরো বেশি ব্যবসা করতে পারত বলতে কী বোঝাচ্ছেন? তারা বিটিভিকে ২০০ কোটি টাকার প্রস্তাব দিচ্ছিল—তার মানে এই নয় যে তারা এটি ২০০ কোটি টাকায় কিনেছিল। বিষয়টি আপনাদের বুঝিয়ে বলি—এটি আসলে খুব ভালো একটি প্রশ্ন, যদিও আমি এটির উত্তর আপনার প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্নভাবে দেব। গতবার বিটিভি ৯৬ কোটি টাকায় স্বত্ব কিনেছিল—বিটিভি কত টাকা লাভ করেছিল? জিরো (শূন্য)। বিগ জিরো। ডাবল জিরো। ট্রিপল জিরো। এবার কি বিটিভিকে শেষ পর্যন্ত কোনো টাকা দিতে হবে? বিটিভির কি কোনো খরচ হবে? না। তাহলে পার্থক্যটা নিজেই বুঝতে পারছেন।’

সহজ একটি উদাহরণ দিয়ে দুর্নীতির চক্রটি ব্যাখ্যা করেন ইয়াসের, ২০০ কোটি টাকার প্রস্তাবটি বিটিভির উপার্জনের জন্য ছিল না। তারা বলছিল বিটিভি ২০০ কোটি টাকায় কিনবে—কিন্তু আসল ব্যবসাটা করবে অন্য কেউ। তারা লাভ নিয়ে চলে যেত, আর বিটিভির ঝুলিতে থাকত শূন্য। তা হতে পারে না। বিষয়টি এভাবে ভাবুন, এই ফোনের একটি নির্দিষ্ট মূল্য আছে—ধরুন ১ হাজার টাকা। আপনি এটি যার কাছেই বিক্রি করুন না কেন, এর চেয়ে বেশি পাবেন না। আপনি যদি এটি আমার কাছে ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন এবং আমি অন্য কারও কাছে যাই, তারা কি ১ হাজার টাকার বেশি দেবে? সুতরাং, বিটিভিকে দিয়ে ২০০ কোটি টাকায় কিছু কেনানো আর অন্য কেউ ব্যবসা করে লাভ নিয়ে যাওয়া—এতে বিটিভির হাত খালিই থাকে। আমরা জনগণের টাকার অপচয় এবং দুর্নীতি বন্ধ করেছি।

এই যৌথ আলোচনার চূড়ান্ত ফল দাঁড়িয়েছে অত্যন্ত ইতিবাচক। ৩টি জাতীয় টেলিভিশনের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে এখন নিশ্চিত হয়েছে সম্প্রচার স্বত্ব।

প্রতিমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে চুক্তির চূড়ান্ত সংখ্যাটি প্রকাশ করে বলেন, আজ আমি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করছি—অতীতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লুটের গন্ধ থাকা প্রাথমিক ২০০ কোটি টাকার দাবির ফাঁদ এড়িয়ে, আমরা অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও যুক্তিসংগত মূল্যে ফিফার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছি।

তিনি টাকার হিসাব দিয়ে বলেন, ‘একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং বাংলাদেশের নীতিমালা অনুযায়ী, এ বছরের ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচারের চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৩৮.৫ লাখ মার্কিন ডলার—যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৪৭ কোটি টাকা।’

সবচেয়ে স্বস্তির জায়গা হলো, এই ৪৭ কোটি টাকা বিটিভিকে তার নিজের তহবিল থেকে দিতে হচ্ছে না। বিভিন্ন স্পনসরশিপ ও উপ-স্বত্ব বিক্রির মাধ্যমেই এই টাকা উঠে আসবে।

জনগণকে আশ্বস্ত করে ইয়াসের বলেন, জনগণের জন্য সুখবর এবং আমি আবারও বলছি, জনগণের জন্য সুখবর হলো, বিটিভিকে এই টাকা নিজে দিতে হবে না। এর অর্থ হলো, নীতিমালা অনুযায়ী বিজ্ঞাপন এবং টেলিকম কোম্পানি, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে স্বত্ব বিক্রি করে আমরা প্রায় পুরো অর্থই তুলে নিতে সক্ষম হয়েছি। বিটিভি নামমাত্র খরচে ফিফা ২০২৬ সম্প্রচার করবে। এই খরচ শুধু আগের সরকারের আমলের চেয়ে কমই নয়—এটি প্রমাণ করে যে উদ্দেশ্য যদি সৎ হয়, তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে সততা দেখিয়েছি, তা দিয়ে দেশের টাকা বাঁচানো এবং জনগণকে বিশ্বের সেরা সেবা দেওয়া সম্ভব।