ডিয়েগো ম্যারাডোনা মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় মোটেও সুখকর ছিল না। এটি এমন এক গল্প যেখানে জড়িয়ে আছে চারটি বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা, এমন এক ফুটবল কিংবদন্তির আখ্যান যাকে একই মলাটে পূজা করা হয়েছে আবার ঘৃণাও করা হয়েছে।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার আসল গল্পটা বেশ সংক্ষিপ্ত। পুরো টুর্নামেন্টে তার খেলার সময় ছিল মাত্র দুটি ম্যাচ, মাঠের হিসেবে ঠিক ১৭৩ মিনিট। কিন্তু এই ১৭৩ মিনিটের আগের প্রস্তুতি আর পরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ম্যারাডোনার চতুর্থ ও শেষ বিশ্বকাপের আসল ট্র্যাজেডি।
১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের ফুটবলে একটা নীরব বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল। ১৯৯২ সালে প্রিমিয়ার লিগের আগমন ফুটবলকে স্রেফ একটা খেলা থেকে রূপ দিল ‘ভোগ্যপণ্যে’। ৯০-পরবর্তী সময়ে নেপলসে থাকাকালীন মাফিয়াদের সঙ্গে ম্যারাডোনার যোগাযোগ এবং মাদক ও অ্যালকোহলে আসক্তির গুঞ্জন আগেই বাতাসে ভাসছিল। অবশেষে ১৯৯১ সালের মার্চে ফাঁস হয়ে যায় ম্যারাডোনার মাদককাণ্ড।
সেরি-আ লিগের একটি ম্যাচের পর এই আর্জেন্টাইন মহাতারকার ডোপ টেস্টে কোকেনের উপস্থিতি ধরা পড়ে। ফলশ্রুতিতে ফিফা তাকে ১৫ মাসের জন্য সব ধরণের ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করে। কিছু সূত্র দাবি করত যে বার্সেলোনায় থাকার সময় থেকেই ডিয়েগো মাদকের সাথে লড়াই করছিলেন; এবার সেই সব গুঞ্জন এক নির্মম সত্যে রূপ নেয়।
ব্রিটিশ মিডিয়া, যারা ম্যারাডোনার নামের পাশে সব সময় ‘প্রতারক’ শব্দটা ব্যবহার করতে ভালোবাসত, তারা এবার পরম আনন্দে তার গায়ে ‘নেশাখোর’ তকমা সেঁটে দিল।
এই খবরটা চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল ভক্তদের। অনেকের জীবনে ম্যারাডোনা ছিলেন একমাত্র ‘নেশা’, যা তাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারত। আর তার অনুপস্থিতির তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছিল তাদের।
ম্যারাডোনাকে ছাড়াই পরবর্তী বিশ্বকাপে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, ডিয়েগো সিমিওনে আর অভিজ্ঞ ক্লদিও ক্যানিজিয়াকে নিয়ে গড়া আর্জেন্টিনা সহজেই কোয়ালিফাই করবে—এটাই ছিল স্বাভাবিক ধারণা। তবে তা হলো না। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে সুযোগ পেতে হলে খেলতে হবে বাছাই পর্ব। আর সেখানে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে না পারলে বিশ্বকাপ বাসায় বসে দেখতে হবে আলবেসিয়েস্তাদের।
কিন্তু যখন বিপর্যয় ঘনিয়ে এলো, তখন গোটা আর্জেন্টিনা এক সুরে ডেকে উঠল তাদের ত্রাণকর্তাকে। বাসিলের দল কোনোমতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুই লেগের এক প্লে-অফ খেলার সুযোগ পেয়েছিল। এই শেষ বাধা পার হতে হলে তাদের ‘এল ডিয়েগো’-কে প্রয়োজন ছিল।
ম্যারাডোনা ফিরলেন আকাশি-সাদা জার্সিতে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম লেগ ১-১ গোলে ড্র করার পর, বুয়েনস আইরেসে দ্বিতীয় লেগে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে ১-০ গোলের এক কষ্টার্জিত জয় পায় আর্জেন্টিনা। গোলটি প্রতিপক্ষের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তিত হয়ে জালে জড়ালেও আর্জেন্টিনার মানুষের তাতে কিছু যায় আসেনি—তাদের দল বিশ্বকাপে পৌঁছে গেছে, আর তাদের ত্রাতা স্বয়ং ম্যারাডোনা নিজের চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন, এটাই ছিল পরম সত্য।
মুক্ত মানুষের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ শুরু হলো। ইংল্যান্ড না থাকলেও চেনা সব পরাশক্তিরা হাজির ছিল—ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি, হল্যান্ড, স্পেন এবং আর্জেন্টিনা।
মূল টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচের ঠিক আগে, ফেব্রুয়ারি মাসে ম্যারাডোনা হঠাৎ দল থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেন। তার দাবি ছিল—তার ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং আর্জেন্টিনার মানুষের এই বিশাল প্রত্যাশার মানসিক বোঝা তিনি আর বইতে পারছেন না।
সাংবাদিকেরা ব্যাখ্যার দাবিতে দুই দিন ধরে তার বাড়ির সামনে তাঁবু গেড়ে বসে রইল। ম্যারাডোনা মুখে কিছু না বলে নিজের ড্রাইভওয়ে থেকে একটি এয়ার রাইফেল দিয়ে জড়ো হওয়া সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে বসলেন! চারজন মিডিয়াকর্মী আহত হলেন, পুলিশ এলো এবং আইনি মামলা হলো।
অন্য গুঞ্জনটি ছিল আরো ভয়াবহ। বাতাসে ভাসছিল যে ফিফা নাকি টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ম্যারাডোনার মাদক নেওয়ার ব্যাপারে জানত এবং টুর্নামেন্টে তাকে ফিট করার জন্য ডোপ টেস্ট থেকে এক ধরণের অলিখিত ছাড় বা ‘ইমিউনিটি’ দিয়েছিল। কারণ ফিফা ভয় পাচ্ছিল যে ম্যারাডোনা না থাকলে এই টুর্নামেন্টে দর্শকদের টানার মতো কোনো বড় ‘সুপারস্টার’ থাকবে না।
অবশেষে শুরু হলো পঞ্চদশ বিশ্বকাপ। ফক্সবোরো স্টেডিয়ামে ৫৪,০০০ দর্শকের সামনে গ্রিসের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ। কোনোমতে কোয়ালিফাই করলেও আর্জেন্টিনা ছিল অন্যতম ফেভারিট। আগের বিশ্বকাপগুলোর মতো এবার তারা কেবল একজন বুড়ো ম্যারাডোনার ওপর নির্ভরশীল ছিল না, তাদের দলটা ছিল ভীষণ শক্তিশালী।
দুর্বল গ্রিসের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা খেলছিল দুর্দান্ত। বাতিস্তুতার জোড়া গোলে প্রথমার্ধেই দল ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে। মাঠে ম্যারাডোনার এক নতুন রূপ দেখা যায়। তিনি আর সেই আগের মতো বল পায়ে পেলেই প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হওয়া ষাঁড়ের মতো দৌড়াচ্ছিলেন না; বরং এক টাচ বা ওয়ান-টাচ ফুটবলে পুরো দলের খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। কম ছোঁয়াতেই তিনি ছিলেন মাঠের অধিপতি।
খেলার ৬০তম মিনিটে সেই নবজাগরণ পূর্ণতা পেল। গ্রিসের পেনাল্টি বক্সের বাইরে ছয়টি ওয়ান-টাচ পাসের এক নিখুঁত জাল বোনা হলো, যার শেষপ্রান্তে বল এলো ম্যারাডোনার বাম পায়ে। প্রথম টাচে বলটাকে নিয়ন্ত্রণে নিলেন, দ্বিতীয় টাচে শট নেওয়ার জায়গা তৈরি করলেন এবং তৃতীয় টাচে তার পা থেকে বের হওয়া বলটি বুলেটের গতিতে জড়িয়ে গেল গোলপোস্টের উপরের বাম কোণায়। গ্রিক গোলকিপার নড়ার সুযোগ পর্যন্ত পাননি!
চারপাশে চারজন ডিফেন্ডার ঘিরে থাকার পরও, সেই ১০ নম্বরের পায়ে তখনও পুরানো জাদুর সবটুকুই অবশিষ্ট ছিল। টেলিভিশনে বারবার বিভিন্ন কোণ থেকে সেই গোলের রিপ্লে দেখানো হচ্ছিল। আর একদম শেষ রিপ্লেতে দেখানো হলো তার সেই উদযাপনের দৃশ্য।
সাইডলাইনের দিকে দৌড়ে এসে ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে সরাসরি তাকিয়ে আছেন ডিয়েগো; চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার মতো বড় বড়, মুখ হা করা—যার ভেতর থেকে এক আদিম চিৎকার বেরিয়ে আসছিল, এবং একপর্যায়ে নিজের মাথাটা ক্যামেরার লেন্সের একদম সামনে নিয়ে এলেন। হ্যান্ড অব গড কিংবা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই ১০.৮০ সেকেন্ডের দৌড়ের মতোই এই ভিডিও ফুটেজটিও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক আইকনিক দৃশ্য হয়ে গেছে।
৮৩ মিনিটে যখন ম্যারাডোনাকে তুলে নেওয়া হলো, পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে তাকে করতালি দিল। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ৪-০ ব্যবধানে জিতল, বাতিস্তুতা তার হ্যাটট্রিক পূর্ণ করলেন। বাছাইপর্বের সব কষ্ট মানুষ ভুলে গেল।
পরের ম্যাচ ছিল নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে। আফ্রিকান দলটিতে তখন ইউরোপের বড় বড় লিগে খেলা তারকাদের মেলা। ম্যাচের মাত্র ৮ মিনিটেই নাইজেরিয়া ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে চমকে দিল সবাইকে। কিন্তু আর্জেন্টিনা প্যানিক করেনি। ২৮ মিনিটের মধ্যে ক্লদিও ক্যানিজিয়ার জোড়া গোলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে আলবিসেলেস্তেদের হাতে। আর দ্বিতীয় গোলটি এসেছিল ম্যারাডোনার এক চতুর ও দ্রুত নেওয়া ফ্রি-কিক থেকে।
আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জিতল। কিন্তু ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর মাঠের এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল—এক মেডিকেল নার্সের হাত ধরে মাঠ ছাড়ছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। ডোপ টেস্টের জন্য কোনো ফুটবলারকে এভাবে নার্স বা কর্তৃপক্ষের প্রহরায় মাঠ থেকে নিয়ে যাওয়া ফুটবলের মাঠে, বিশেষ করে বিশ্বকাপের মঞ্চে অত্যন্ত বিরল এক দৃশ্য। তবে ম্যারাডোনার মুখে তখন চওড়া হাসি, গ্যালারির দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছেন, আর অন্য হাতটি তখনও সেই নার্সের হাতের মুঠোয়।
ঠিক চার দিন পর, ২৯ জুন; ফিফার তৎকালীন সেই ‘সততার প্রতীক’ সেপ ব্লাটার ঘোষণা করলেন, ‘উভয় মূত্র নমুনার রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। আর্জেন্টিনা বনাম নাইজেরিয়া ম্যাচে ডোপিং নিয়ন্ত্রণ বিধি লঙ্ঘন করার দায়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো।’
ম্যারাডোনার শরীরে ‘এফিড্রিন’ নামক নিষিদ্ধ ড্রাগ পাওয়া গিয়েছিল। এই ড্রাগ মূলত পারফরম্যান্স বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। সঙ্গে সঙ্গেই ফিফা তাকে নিষিদ্ধ করে পুরো টুর্নামেন্ট থেকে। আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি হুলিও গ্রন্দোনা সিদ্ধান্ত নেন, বিতর্ক এড়াতে হলে ম্যারাডোনাকে দল থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
ম্যারাডোনা নিজেও জানতেন সেই কথা। নিষিদ্ধ হওয়ার পর ম্যারাডোনা প্রেস কনফারেন্সে বলেছিলেন, ‘ওরা আমার পা কেটে ফেলেছে’। তাঁর দাবি ছিল, ব্যক্তিগত ট্রেইনার তাঁকে ‘রিপ ফুয়েল’ নামের এনার্জি ড্রিংক দিয়েছিলেন, যা আর্জেন্টিনায় বৈধ। কিন্তু সেটার আমেরিকান ভার্সনে ছিল এফেড্রিন, যা তিনি জানতেন না।
অভিযোগ তোলেন, তাকে নিষিদ্ধ করে বাজার বাড়াতে চেয়েছে ফিফা। সত্যি বলতে ’৯৪ বিশ্বকাপের আমেজ বহুগুণে বেড়ে গিয়েছিল ম্যারাডোনার নিষেধাজ্ঞার পর।
আর এই নিষেধাজ্ঞায়ই শেষ হয়ে যায় ম্যারাডোনার ১৭ বছরের বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। বিশ্বকাপ থেকে ফিরে বোকা জুনিয়র্সের হয়ে আরো দুই বছর খেলে ফুটবল থেকে বিদায় নেন এই মহাতারকা।




