• ই-পেপার

সম্পর্ক উন্নয়ন দিল্লির স্বার্থেই জরুরি

ইউনূসের কালো আইনে অর্থনীতির সর্বনাশ

অদিতি করিম
ইউনূসের কালো আইনে অর্থনীতির সর্বনাশ

বিচারের আগেই কি কাউকে ফাঁসি দেওয়া যায়?

এ প্রশ্ন শুনে অনেকেই অবাক হবেন হয়তো, ভাববেন, এটা কি কখনো সম্ভব নাকি?

আমাদের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে। একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উপযুক্ত আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা আইনের শাসনের অন্যতম মৌলিক শর্ত। কিন্তু ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে প্রতি পদে। ইউনূসের শাসনামলে সবচেয়ে বড় কালো আইন ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের সংশোধন। এ আইন সংশোধন করে আন্ডার কাভার তদন্তের নামে হয়রানি, বিচারের আগেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ, সম্পত্তি ক্রোক করার মতো স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ করে দেওয়া হয়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দুদক সংস্কার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের আলোকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে দুদক আইন-২০০৪-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে গত ২৩ ডিসেম্বর। 

আরো পড়ুন
ঢাকার আতঙ্ক ১৩৮৭ ছিনতাইকারী

ঢাকার আতঙ্ক ১৩৮৭ ছিনতাইকারী

 

নতুন সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ। এ দিনেই দুদক-সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। ওই ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে পাস হয় ১১৩টি, বাতিল হয় সাতটি। বাকি ১৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এর মধ্যে দুদক সংশোধন অধ্যাদেশও ছিল। আইন অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ অধিবেশনে উত্থাপনের দিন থেকে গত ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ৩০ দিন পার হওয়ার পর ওই ১৩টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে। গত ১১ এপ্রিল থেকেই আগের দুদক আইন-২০০৪ পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল হয়েছে। 

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ গ্রহণ না করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ ওই অধ্যাদেশ ছিল সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থি। এতে তদন্ত ও বিচার ছাড়াই সম্পদ জব্দ করাসহ চরম স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কাউকে বিনা বিচারে সাজা দেওয়া কেবল বেআইনি নয়, রীতিমতো অপরাধ। কিন্তু ইউনূস সরকার দেড় বছর ধরে এই কাজটি করছে এ অধ?্যাদেশ জারি করে। ইউনূসের কালো আইন বাতিল হলেও এ আইনের আওতায় যারা হয়রানির শিকার হয়েছেন তাদের মুক্তি মেলেনি। অবৈধভাবে যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছিল, যাদের বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং যাদের সম্পত্তি বিচারের আগেই ক্রোক করা হয়েছিল, ইউনূসের কালো আইন বাতিলের ফলে সেসব কর্মকাণ্ড আপনাআপনিই আইনবহির্ভূত হয়ে যায়। তার পরও ভুক্তভোগীরা এখনো প্রতিকার পাননি।

আরো পড়ুন
অপচয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

অপচয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

 

দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইউনূসের এ কালো আইনে প্রায় দেড় হাজার ব্যবসায়ী এবং নিরীহ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। তদন্তের আগেই প্রায় ১ হাজার শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ৫৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। ইউনূসের এ কালো আইনের কারণে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে দেন। ফলে নতুন করে বেকার হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। একদিকে বেকারত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধের কারণে বহু ভালো ব্যবসায়ী নতুন করে ঋণখেলাপি হয়েছেন। খেলাপি ঋণের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা ধরনের সুবিধা দেওয়ার পরও চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ৬১ তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে। একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এর আগে কখনো হয়নি বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। কেবল দুর্বল ব্যাংক নয়, এবার আর্থিক সূচকে ভালো অবস্থানে থাকা সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক ও বিদেশি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকেরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এটি ইউনূসের কালো আইনের ফল। যাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে তারা ঋণ পরিশোধ করবেন কীভাবে? আজ বিশ্বায়নের যুগে  ব্যবসা করতে বিদেশ যেতেই হবে। কিন্তু বছরের পর বছর যদি উদ্যোক্তা, শিল্পপতিদের বিদেশে যেতে নিষেধাজ্ঞা থাকে তাহলে তারা ব্যবসা করবেন কীভাবে? বিদেশে যেতে না পারায় অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে আর্থিক খাতে এবং অর্থনীতিতে।

আরো পড়ুন
বিশাল ঘাটতি মেটাতে ঋণে অর্থমন্ত্রীর বাজি!

বিশাল ঘাটতি মেটাতে ঋণে অর্থমন্ত্রীর বাজি!

 

বেসরকারি খাত এ কালো আইনের কারণে বিপর্যস্ত। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। ইউনূসের এ কালো আইনে দেশের অর্থনীতির সর্বনাশ হয়েছে। দুর্নীতি দমন এবং অর্থ পাচার এখন সব দেশেরই বড় সমস্যা। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও এরকম নিকৃষ্ট কালো আইন নেই। ভারতে ১৯৮৮ সালে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়, যা ২০১৮ সালে সংশোধন করা হয়। অন্যদিকে, অর্থ পাচার প্রতিরোধে ২০০২ সালে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। ভারতে দুর্নীতি তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে বলা হয় সিবিআই (কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা)। 

অন্যদিকে অর্থ পাচার তদন্ত করে ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট)। ভারতের আইনে তদন্তকারী সংস্থা আদালতের রায়ের আগে কারো সম্পত্তি বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে পারে না। শুধু চার্জশিট প্রদানের পর আদালতের অনুমতি-সাপেক্ষে লেনদেন সীমিত করতে পারে। যেন অভিযুক্ত ব্যক্তি পুরো টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যেতে না পারে। ভারতে বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার চার্জশিট প্রদান করতে হয়। কেবল অভিযোগ আছে এ কারণে বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায় না। এ বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় আছে। ভারতে বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই তা অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়। এরকম নিষেধাজ্ঞা জারির সুনির্দিষ্ট কারণ এবং সময়কাল আদালতে পেশ করতে হয়। পাকিস্তানে এখনো ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি দমন আইন কার্যকর। যে আইনে শুধু আদালতে দোষী প্রমাণিত হলেই কেবল তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা সম্পদ জব্দ করা যায়। পাকিস্তানে বিশেষ ক্ষমতা আইনে সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায়। এ ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণ উল্লেখ করতে হবে।

আরো পড়ুন
একনজরে আজকের কালের কণ্ঠ (৯ জুন)

একনজরে আজকের কালের কণ্ঠ (৯ জুন)

 

যুক্তরাজ্যে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচার (Money Laundering) রোধে অত্যন্ত কঠোর আইনি কাঠামো রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে ‘ক্লিন মানি’ বা স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করে। ব্রিবারি অ্যাক্ট-২০১০ (Bribery Act 2010), যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতিবিরোধী আইন, যা ২০১১ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। এ আইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার অধিকার নেই। শুধু ব্যাংক হিসাব বিবরণীর যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। প্রসিডিংস অব ক্রাইম অ্যাক্ট ২০০২ (Proceeds of Crime Act 2002-POCA) : এ আইনের অধীনে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ (যেমন—দুর্নীতি, মাদক বা অপরাধের অর্থ) এ আইনে প্রাথমিক তদন্তের পর যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ চিহ্নিত করে সাময়িকভাবে জব্দ করা যায়। কিন্তু এসব দেশে অন্তহীন সময়ের জন্য বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিধান নেই।

আরো পড়ুন
ঋণের ফাঁদে আটকা মানুষ

ঋণের ফাঁদে আটকা মানুষ

 

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে অন্তহীন মেয়াদে বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, ইহার যে কোনো স্থানে বসবাস ও বসতিস্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’ বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দুদক বনাম জি বি হোসেন মামলার ঐতিহাসিক রায়ে বলেছে, ‘একজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা আছে শুধু এ যুক্তিতে তাকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া যায় না। কেবল ফৌজদারি মামলায় আছে এ অজুহাতে সংবিধানের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।’ (৭৪ ডিএলআর)।

ইউনূস আমলে কেবল সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়নি আপিল বিভাগের রায় অমান্য করে আদালত অবমাননা করা হয়েছে। বিএনপি সরকার এ কালো আইন বাতিল করেছে। কিন্তু এ আইনের মাধ্যমে যাদের সীমাহীন দুর্ভোগ হয়েছে তাদের হয়রানি থেকে মুক্তি মেলেনি। অনতিবিলম্বে সরকার এ কালো আইনের আওতায় যারা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াবে বলে আমাদের বিশ্বাস। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়ে, বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে দেশে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকার আশা করি আর বিলম্ব করবে না।

দ্রুততম রায়ের নজির

কার্যকরেও সৃষ্টি হোক দৃষ্টান্ত

অনলাইন ডেস্ক
দ্রুততম রায়ের নজির
সংগৃহীত ছবি

আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দোষী দুজনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছে। ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় এবং মামলার বিচার শুরু থেকে রায়ের পর্যায়ে এসেছে মাত্র চার কার্যদিবসে। আদালত দেখালেন অনুকরণীয় নজির। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কারণ যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো নৃশংসতম অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু পরিবার নয়, গোটা সমাজকে গভীরভাবে আহত করে। রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ব্যাপক আলোচিত এবং অতিসংবেদনশীল রামিসার ঘটনা সারা দেশে সর্বসাধারণের মনে বিস্ফোরণোন্মুখ বিক্ষোভ সৃষ্টি করে।

সব পক্ষের সক্রিয় তৎপরতায়, দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও। কারণ তিনি ঘটনার খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার ঊর্ধ্বতন পারিষদদের নিয়ে রামিসাদের ছোট্ট বাসায় গিয়েছিলেন। অনেকটা সময় থেকে, নিহত শিশুটির পরিবারকে সান্ত্বনা এবং দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে রায় ঘোষণায় তার নির্দেশনা অবশ্যই গতি সঞ্চার করেছে।

প্রিয় কন্যাকে হারিয়ে পাগলপ্রায় পিতা বলেছেন, ‘মেয়েকে তো আর ফিরে পাব না; রায়ে সন্তুষ্ট হয়েছি। এখন দ্রুত এই রায় কার্যকর দেখতে চাই।’ তিনি পরিবারের চরম দুঃসময়ে মানসিকভাবে সহায়তা জোগানোর জন্য গণমাধ্যম, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং দেশের মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। কিন্তু এই সন্তুষ্টিই যেন শেষ কথা না হয়। খোদ রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যার ঘটনাটা ছিল রোমহর্ষক। এতে দেশবাসী স্তম্ভিত হয়। দ্রুত বিচার দাবিতে ফুঁসে ওঠে জনগণ। আঁচ লাগে রাষ্ট্রযন্ত্রে। তারই প্রতিফলন ঘটেছে বিচার এবং রায়ে।

কিন্তু সাধারণ ক্ষেত্রে বিভিন্ন নৃশংস হত্যাকাণ্ড, বিশেষ করে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় তদন্ত ও বিচারে ব্যাপক দীর্ঘসূত্রতাই সাধারণ চিত্র। দুর্ভাগ্যজনক যে ২০১২ সালে নিহত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের আজও সুরাহা হয়নি। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদছে। এই শম্ভুকগতির নেতিবাচক অভিধা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত বিচার বিভাগের। কারণ ন্যায়বিচার পাওয়ার সেটাই তো মানুষের আস্থা ও ভরসার শেষ ঠিকানা। তার গরিমা ম্লান হতে দেওয়া চলে না। সেজন্যই পর্যায়ক্রমে আলোচিত-অনালোচিত নির্বিশেষে সব মামলার বিচার নিষ্পন্ন হোক।

আর কোনোভাবেই যেন আইনের কোনো দীর্ঘসূত্রতার ফাঁকফোকরে রামিসার খুনিদের দণ্ড কার্যকর বিলম্বিত না হয়। বর্তমানে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যে উদ্বেগজনক অবস্থা দৃশ্যমান, সেখানে দণ্ডিত খুনিদের দ্রুত ফাঁসি দৃষ্টান্তই শুধু নয়; অপরাধপ্রবণদের মনে ভীতি সৃষ্টি করবে। তাতে এ ধরনের অপরাধ কমবে, যা খুব জরুরি।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সংবিধানের আলোকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও পাহাড়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা

এ এইচ এম ফারুক
সংবিধানের আলোকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও পাহাড়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা
সংগৃহীত ছবি

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) একাংশের সশস্ত্র নেতা সন্তু লারমার সঙ্গে চরম গোপনীয়তায় সই হয়েছিল ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’। দীর্ঘ ২৮ বছর পেরিয়ে ২৯ বছরে পদার্পণ করা এই চুক্তিটি আজকের দিনে পাহাড়ের আপামর জনগণের জন্য টেকসই কোনো শান্তির বার্তা বয়ে আনতে পারেনি। বরং আইনি ও সামাজিক বাস্তবতায় এটি একটি ‘বৈষম্য দলিল’ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। যে লক্ষ্য নিয়ে এই চুক্তি করা হয়েছিল, তা আজ সম্পূর্ণ ব্যর্থ। কারণ, এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একাংশের সঙ্গে রাষ্ট্রের একপেশে ও চরম একচেটিয়া বোঝাপড়া। 

পাহাড়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকেরও বেশি বাংলাভাষী (বাঙালি) জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য ডজনখানেক অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মতামত ও অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এই অসম চুক্তি প্রণীত হয়েছিল। একটি সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভিত্তি না থাকার ফলেই আজ পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে। দেশের অখণ্ডতা রক্ষা, সংবিধানের সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠত্ব সমুন্নত রাখা এবং পাহাড়ে বসবাসকারী সব নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে এই পার্বত্য চুক্তি সংস্কার করা আজ কোনো রাজনৈতিক বিলাসিতা নয়, বরং একটি অনিবার্য রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক কর্তব্য।

বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের ১ম অনুচ্ছেদে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে—‘বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র।’ এই এক এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার মূল নির্যাস হলো, দেশে কোনো পৃথক আইনগত স্বায়ত্তশাসন, আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক দ্বৈত শাসনের সুযোগ থাকবে না। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে গঠিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ’ এবং এর অধীনস্থ ৩টি জেলা পরিষদের আইনি কাঠামো পর্যালোচনায় দেখা যায়, এটি দেশের মূল প্রশাসনিক ধারার বাইরে গিয়ে একটি সমান্তরাল উপ-রাষ্ট্রীয় বা সমান্তরাল সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত তাত্ত্বিক ও আইনি বিশ্লেষণে এই সংকটকে ‘একক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামো’ হিসেবে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই দ্বৈত কাঠামোর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ‘জাতীয় সংসদ’-এর সার্বভৌমত্ব ও একছত্র ক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করায়। চুক্তির শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ যদি সমগ্র দেশের জন্য বা পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থের জন্য কোনো আইন প্রণয়ন করতে চায়, তবে আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে পূর্বাহ্নে পরামর্শ ও অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি কোনো আইন পাস হওয়ার পর জেলা পরিষদ যদি সেটিকে ‘আপত্তিকর’ বা ‘কষ্টকর’ মনে করে আপত্তি তোলে, তবে কেন্দ্রীয় সরকার সেই আইন সংশোধন বা প্রয়োগ শিথিল করতে বাধ্য থাকবে। জাতীয় সংসদের সম্মিলিত মেধার ওপর একটি আঞ্চলিক পরিষদের এই ভেটো প্রদানের আইনি ক্ষমতা কোনো স্বাধীন ও একক রাষ্ট্রে চলতে পারে না। এটি জাতীয় সংসদের সার্বভৌমত্বের ওপর এক নিদারুণ অবমাননা।

পাশাপাশি, এই দ্বৈত কাঠামো মাঠ পর্যায়ের সাধারণ প্রশাসনের প্রচলিত চেইন অব কমান্ডকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলেছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে জেলা প্রশাসক (ডিসি) কিংবা বিভাগীয় কমিশনার সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন এবং রাষ্ট্রের আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখেন। কিন্তু চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ আইনের মাধ্যমে সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং ভারী শিল্পের লাইসেন্স প্রদানের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় নির্বাহী ক্ষমতা আঞ্চলিক পরিষদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এক দেশে দুটি ভিন্ন প্রশাসনিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, যা মাঠ প্রশাসনকে স্থবির এবং দেশের অখণ্ড শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে মারাত্মক দুর্বল করে তুলছে।

পার্বত্য চুক্তির কারণে সবচেয়ে বড় মানবিক ও আইনি বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে পাহাড়ের বিশাল বাংলাভাষী (বাঙালি) জনগোষ্ঠী। সংবিধানে দেশের সব নাগরিকের জন্য সমান নাগরিক অধিকারের গ্যারান্টি দেওয়া হলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামের চুক্তি ও আইনি কাঠামোর কারণে সেখানে বাঙালিরা আজ নিজ দেশেই এক অদৃশ্য বর্ণবাদের শিকার হয়ে ‘দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকে’ পরিণত হয়েছেন। পার্বত্য নিউজে প্রকাশিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈষম্যের স্বরূপ ও উত্তরণ’ নিবন্ধে এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের চোখে সমতা), অনুচ্ছেদ ২৮ (ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের কারণে বৈষম্যহীনতা) এবং অনুচ্ছেদ ২৯ (প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে সুযোগের সমতা)—এই তিনটি মৌলিক স্তম্ভকে পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে পুরোপুরি পদদলিত করা হয়েছে।

ভোটাধিকার ও স্থায়ী বাসিন্দার শর্ত : সংবিধানে বাংলাদেশের যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটার হওয়ার স্পষ্ট অধিকার থাকলেও, পাহাড়ে ভোটার হতে হলে ‘পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা’ হওয়ার অতিরিক্ত শর্ত চাপানো হয়েছে। আর একজন বাঙালির ক্ষেত্রে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার অন্যতম শর্ত হলো—তাকে ওই অঞ্চলে জমির মালিক হতে হবে।

জমির মালিকানা ও স্বাধীন চলাচলের অধিকার হরণ : সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের সর্বত্র অবাধ চলাচল, বসবাস ও বসতি স্থাপন এবং ৪২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্পত্তি অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তরের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশের যেকোনো জেলার উপজাতীয় নাগরিক ঢাকা, চট্টগ্রাম বা দেশের যেকোনো প্রান্তে জমি কিনে স্বাধীনভাবে বসবাস ও ব্যবসা করতে পারলেও, দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের সাধারণ বাঙালি নাগরিক পার্বত্য চট্টগ্রামে জমি কিনতে বা স্বাধীনভাবে বসতি স্থাপন করতে পারেন না।

চাকরিতে চরম বৈষম্য : আইন করে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার সরকারি, আধা-সরকারি এবং স্থানীয় চাকরিতে উপজাতীয়রা একচেটিয়া অগ্রাধিকার পাবে। এর ফলে যুগ যুগ ধরে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি পরিবারের শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা সংবিধানের ২৯(২) অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।

পার্বত্য অঞ্চলের তিনটি জেলা পরিষদ এবং আঞ্চলিক পরিষদের শীর্ষতম পদ বা ‘চেয়ারম্যান’ পদগুলোসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদ আইন করে শুধুমাত্র উপজাতীয়দের জন্য চিরস্থায়ীভাবে সংরক্ষিত করা হয়েছে। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর পদটিও উপজাতীয়দের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক আইনি বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির একছত্র সাংবিধানিক ক্ষমতার ওপর শর্ত আরোপের শামিল। যা সংবিধান লঙ্ঘনই।

বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান জেলায় বাংলাভাষী বাঙালিরা এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি। অথচ এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষগুলো তাদের নিজস্ব অঞ্চলে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, আইনের এমন নির্লজ্জ ও জঘন্য বর্ণবৈষম্যমূলক ধারা রয়েছে যে, কোনো পরিষদের সভায় উপজাতীয় চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকলে, উপস্থিত সব বাঙালি সদস্য একমত হলেও কোনো বাঙালি সদস্য ওই সভায় সভাপতিত্ব করতে পারবেন না। এই ধরনের শাসনতান্ত্রিক বৈষম্য অতীতে দক্ষিণ আফ্রিকার অধুনালুপ্ত শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবৈষম্য কিংবা প্রাচীন রোমের দাস প্রথার নিষ্ঠুর সামাজিক বিভাজনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বর্তমান সময়ের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত ও সংবেদনশীল একটি অঞ্চল। দৈনিক রূপালী বাংলাদেশে প্রকাশিত ‘পার্বত্য চুক্তি সংস্কার করা প্রয়োজন’ প্রবন্ধে এই নিরাপত্তা ও কৌশলগত ঝুঁকির বিষয়টি সুতীক্ষ্ণভাবে উঠে এসেছে। ভারত এবং মায়ানমারের সংলগ্ন তিন দেশীয় সীমান্ত অঞ্চল হওয়ার কারণে এই এলাকার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত।

চুক্তির ১৭(ক) ধারা অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো (প্রায় আড়াইশ) পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের নির্দিষ্ট ৬টি স্থায়ী ব্যারাকে সীমাবদ্ধ রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে। দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড যেখানে প্রতিনিয়ত আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর (যেমন- জেএসএস, ইউপিডিএফ, কেএনএফ, মগ লিবারেশন পার্টি) অবৈধ অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, গহিন অরণ্যে মাদকের আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্ক এবং ভূ-কৌশলগত ষড়যন্ত্রের শিকার, সেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌম সুরক্ষাকারী সেনাবাহিনীর হাত-পা এভাবে বেঁধে দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক আত্মঘাতী নীতি। এই প্রত্যাহার নীতির কারণে তৈরি হওয়া শূন্যতায় পাহাড়ে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ও সমান্তরাল কর ব্যবস্থা চালু করার সুযোগ পেয়েছে। দেশের অখণ্ডতা এবং সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই আত্মঘাতী ক্যাম্প প্রত্যাহার নীতির আমূল সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় সামরিক নিয়ন্ত্রণ পুনর্প্রতিষ্ঠা করা আজ সময়ের দাবি।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি—বর্তমান দেশের সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—উভয় দলই দেশের সার্বভৌমত্ব এবং পাহাড়ের সুশাসন বজায় রাখতে পার্বত্য চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কারের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল।

বিএনপি তাদের অফিশিয়াল নির্বাচনী ইশতেহারের ২০২৬-এর পাহাড় ও সমতলের নৃগোষ্ঠী উপশিরোনামের অধীনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জাতির সামনে ঘোষণা করেছিল। জানিয়েছিল- সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।

একই সঙ্গে তারা পাহাড়ে সক্রিয় সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোর অবৈধ অস্ত্রবাজি ও সন্ত্রাস দমনে কঠোর অবস্থান এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ‘সোশ্যাল রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম’ বা সামাজিক পুনর্গঠন কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। 

জামায়াতে ইসলামীও তাদের নির্বাচনী বক্তব্যে পাহাড়ের সব নাগরিকের বৈষম্যহীন সাংবিধানিক অধিকার এবং ভূমি অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে এই চুক্তির একপেশে ধারাগুলোর সংশোধনের পক্ষে জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করেছিল। 

দেশের দুই বৃহৎ দলই নির্বাচনের আগে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কারণ তারা বোঝে—পাহাড়ের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত রেখে এবং সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কখনো টেকসই ও প্রকৃত শান্তি আসতে পারে না। আজ তারা যথাক্রমে সরকারে এবং প্রধান বিরোধী দলে অধিষ্ঠিত। তাই নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে দেওয়া এই অঙ্গীকার পূরণ করার উপযুক্ত সময় এখনই।

আজকের সরকারি দল বিএনপি যখন ১৯৯৭ সালে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল ছিল, তখন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি এই কালো চুক্তির বিরুদ্ধে রাজপথে এবং সংসদে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ১৯৯৮ সালের ১২ মে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রধান প্রধান জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে যে ঐতিহাসিক ভাষণ ও তথ্যবহুল দলিল পেশ করেছিলেন, তা আজ পার্বত্য চুক্তির সংস্কারের পক্ষে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ও আইনি দলিল।

তৎকালীন সময়ে এই চুক্তির বিরুদ্ধে বিএনপি সুনির্দিষ্ট ১৮টি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছিল, যা আজও সমভাবে সত্য এবং প্রাসঙ্গিক। সেই ১৮ দফার মূল নির্যাসসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
সার্বভৌমত্ব বিসর্জন : এই চুক্তির মাধ্যমে তৎকালীন সরকার বাংলাদেশের এক-দশমাংশ অঞ্চল হতে স্বাধীন সার্বভৌম এককেন্দ্রিক ক্ষমতা প্রত্যাহার করে দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়েছে এবং স্বাধীনতার সংকট সৃষ্টি করেছে।

বিচ্ছিন্নতাবাদের বিষবৃক্ষ : চুক্তির মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ‘বিষবৃক্ষ’ রোপিত হয়েছে, যা দেশের অখণ্ডতা খণ্ডবিখণ্ড করার দ্বার উন্মুক্ত করবে।

জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন : সামগ্রিক চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে।
১ম ধারার পরিপন্থী : সংবিধানের ১নং ধারায় বাংলাদেশকে একটি একক রাষ্ট্র বলা হলেও চুক্তির ‘গ’ অধ্যায়ের মাধ্যমে পৃথক আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা ১নং ধারার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

সমান্তরাল সরকার গঠন : সংবিধানে অঞ্চলভিত্তিক মন্ত্রী নিয়োগ বা সমান্তরাল নির্বাহী পরিষদ গঠনের সুযোগ না থাকলেও চুক্তির মাধ্যমে একটি বিশেষ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বিপরীতে একটি ‘পাল্টা বা সমান্তরাল সরকার’ গঠন করা হয়েছে।

পাল্টা বৈষম্য সৃষ্টি : অনগ্রসর শ্রেণির উন্নয়নের নামে এই চুক্তি পাহাড়ে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর এক ধরনের ‘পাল্টা বৈষম্য’ চাপিয়ে দিয়েছে, যা সংবিধানের ২৯ নং ধারার পরিপন্থী।

সংসদের ক্ষমতা খর্ব : চুক্তির ‘গ’ খণ্ডের ১৩ ধারার মাধ্যমে জাতীয় সংসদ কর্তৃক আইন প্রণয়নের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা খর্ব করার সুস্পষ্ট চক্রান্ত করা হয়েছে।

চলাফেরার অধিকার হরণ : চুক্তির ‘গ’ অধ্যায়ের ২৬ নং পংক্তি সংবিধানে প্রদত্ত নাগরিকদের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা ও বসতি স্থাপনের মৌলিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ৩৬) লঙ্ঘন করেছে।

সম্পত্তির অধিকার খর্ব: সংবিধানের ৪২(১) ধারার অধীনে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন ও ধারণের যে মৌলিক অধিকার রয়েছে, চুক্তির ২৬ নং পঙক্তি তা খর্ব করেছে।

ভূমির ক্ষমতা সমর্পণ : ভূমি বন্দোবস্ত, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইজারা দেওয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে আঞ্চলিক পরিষদের হাতে সমর্পণ করে সরকারের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়েছে।

বাঙালিদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিককরণ : পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাভাষী নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার হরণ করে তাদের নিজ ভূখণ্ডে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে।

প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি : জেলা প্রশাসকের পদ বিলুপ্তি ও কমিশনারের ক্ষমতা সীমিত করে সমস্ত সরকারি কর্মচারী ও পুলিশ বাহিনীকে সরকারের অধীনে না রেখে বস্তুত পার্বত্য পরিষদের অধীনে ন্যস্ত করায় এক দেশে দুটি ভিন্ন ও জটিল প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ওপর শর্ত : উপজাতীয় মন্ত্রী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে সংবিধানে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ সংক্রান্ত একছত্র ক্ষমতার ওপর শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

সেনাবাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন : সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর চলাচল সীমিতকরণ এবং তাদেরকে পরোক্ষভাবে পার্বত্য পরিষদের অধীনস্থকরণের মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও দায়িত্ব পালনের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
বনাঞ্চল ও সরকারি স্বার্থ ত্যাগ : এ অঞ্চলের প্রোটেকটেড বনাঞ্চলসহ বহু জমির ওপর সরকারের অধিকার প্রত্যাহার করে সমগ্র দেশের জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।

রাজস্ব আয় সংকুচিতকরণ : নানা ধরনের ট্যাক্স, খাজনা, টোল আদায়ের ক্ষমতা এবং খনিজ সম্পদ উত্তোলনের লাভের কমিশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার নিজস্ব অর্থনৈতিক অধিকার ও রাজকোষের আয় সংকুচিত করেছে।

সহিংসতাবাদীদের পুরস্কার বনাম নিরীহদের অবহেলা : সরকার শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী ও সহিংসতাবাদীদের নগদ অর্থ, জমি, ঋণ মওকুফ ও মামলা প্রত্যাহারের মাধ্যমে পুরস্কৃত করেছে; পক্ষান্তরে শান্তিবাহিনীর বর্বর হামলায় নিহত ২০ হাজার নিরীহ বাঙালির স্বজনদের ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা রাখেনি।

সরকারি ক্ষমতা সমর্পণ : পরিষদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার নিজস্ব ক্ষমতা একটি আঞ্চলিক পরিষদের কাছে সমর্পণ করেছে।

বেগম খালেদা জিয়া তার সেই ভাষণে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় ও বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রজ্ঞার উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, এরশাদ আমলে সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে দেশের একক চরিত্র নষ্টকারী হাইকোর্ট বিভাজনের সংশোধনী (অষ্টম সংশোধনী) বাতিল করেছিল, ঠিক একই কারণে দেশের এককেন্দ্রিক চরিত্র ধ্বংসকারী এই আঞ্চলিক পরিষদ গঠনও সম্পূর্ণ অবৈধ ও অসাংবিধানিক।

আজ ইতিহাসের এক মহাবর্তে দাঁড়িয়ে ১৯৯৭ সালের সেই ঐতিহাসিক বিরোধী দল বিএনপি দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। দেশের তরুণ সমাজ, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান এবং জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করেছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আজ সমগ্র দেশবাসী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং পাহাড়ের আপামর শোষিত ও বঞ্চিত জনগণ বর্তমান বিএনপি সরকার এবং জননেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছে। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন স্বৈরাচারী ও একপেশে চুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তাঁর দল বিএনপি যে অটল, সাহসী এবং দেশপ্রেমিক অবস্থান নিয়েছিল—আজ ক্ষমতায় এসে বর্তমান সময়ের বিএনপি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি সেই ঐতিহাসিক অবস্থান ধারণ করে এই কালো চুক্তির আমূল সংস্কার করবেন, নাকি পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদের চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্যমূলক নীতিকেই নীরবে মেনে নেবেন?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং ফ্যাসিবাদের তৈরি করা সব প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য দূর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পার্বত্য চুক্তি সংস্কারের বিষয়টিও ঠিক একইভাবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক সুগভীর পরীক্ষা। ১৯৯৮ সালের বিএনপির সেই ঐতিহাসিক ১৮ দফা অভিযোগ এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণের প্রতিটি শব্দ আজ বর্তমান সরকারের জন্য এক অবিকল্প গাইডলাইন।

তখনকার সময়ে বিএনপি যে অবস্থান নিয়েছিল, দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সেই অবস্থানে কেবল অটুট থাকলেই চলবে না, বরং নির্বাচনের আগে দেওয়া তাঁর দলের নিজস্ব ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে শান্তি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কার’ করার বাস্তবমুখী ও সাহসী পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

স্থায়ী শান্তি ও বৈষম্যহীন নতুন পাহাড়ের রূপরেখা :

একটি ঐতিহাসিক ভুলকে যুগ যুগ ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া কোনো দূরদর্শী ও দেশপ্রেমিক সরকারের কাজ হতে পারে না। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তিটি পাহাড়ের শান্তির নামে মূলত বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বীজ বপন করেছিল, যা আজ প্রমাণিত। পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীই বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তাই সমাধান কোনো একপেশে নীতিতে নেই; সমাধান রয়েছে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের পূর্ণ প্রতিফলনে। পার্বত্য চুক্তিকে কোনো অপরিবর্তনীয় অলঙ্ঘনীয় ঐশি দলিল না ভেবে, দেশের অখণ্ডতা রক্ষার্থে অবিলম্বে এর বিতর্কিত ও অসাংবিধানিক ধারাগুলো সংস্কার করতে হবে। পাহাড়ের সব নাগরিকের জন্য সমান রাজনৈতিক অধিকার, সমান ভোটাধিকার, বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান এবং অবাধ ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি, জাতিগত সম্প্রীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সেই ঐতিহাসিক স্লোগানকে ধারণ করে আজ আমাদের আবারও বলতে হবে—জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় ‘বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও’ এবং পবিত্র সংবিধানের আলোকেই পাহাড়ের সুশাসন নিশ্চিত করো।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ইমেইল : [email protected] 

শব্দের চেয়ে কাজে ফিরুক বাংলাদেশ

জিল্লুর রহমান
শব্দের চেয়ে কাজে ফিরুক বাংলাদেশ

১. বিনিয়োগ আসে আশ্বাসে নয়, আস্থায়

বাংলাদেশ নিয়ে আজকাল একধরনের অদ্ভুত দ্বৈত ছবি দেখা যায়। একদিকে আমরা বলি- দেশে সম্ভাবনা আছে, শ্রমশক্তি আছে, বাজার আছে, ভৌগোলিক সুবিধা আছে। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন বাস্তবে আসতে চান, তখন তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে যায় অনুমোদনের জট, নীতির অনিশ্চয়তা, কর ও শুল্কের জটিলতা, ব্যাংকিং সমস্যার চাপ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার অসুবিধা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট, বন্দরের ধীরগতি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ভরসাহীনতা।

বিনিয়োগকারীরা কবিতা শুনতে আসেন না; তাঁরা হিসাব দেখতে আসেন। তাঁরা রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, নীতির ধারাবাহিকতা চান। তাঁরা সম্ভাবনার গল্প নয়, বাস্তব সুবিধা চান। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু শুধু সম্ভাবনা দিয়ে আর কত দিন চলবে?

আমরা অনেক সময় ভাবি, বিদেশি বিনিয়োগ মানে বিদেশিদের দয়া। আসলে তা নয়। বিনিয়োগ একটি প্রতিযোগিতা। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন- সবাই একই বিনিয়োগকারীর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। যে দেশ দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে পারে, নীতি স্থির রাখতে পারে, দুর্নীতি কমাতে পারে, অবকাঠামো নিশ্চিত করতে পারে, সেই দেশই এগিয়ে যায়।

বাংলাদেশের সমস্যা সম্ভাবনার অভাব নয়; বাস্তবায়নের অভাব। এখানে বড় বড় ঘোষণা হয়, কিন্তু ছোট ছোট অনুমোদনে মাস কেটে যায়। এখানে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কথা বলা হয়, কিন্তু বিনিয়োগকারীকে বহু দরজায় ঘুরতে হয়। এখানে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু প্রশাসনিক অভ্যাসে পরিবর্তন কম।

বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হলো সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা। বিনিয়োগকারী যখন বুঝবেন, নিয়ম হঠাৎ বদলাবে না, ফাইল অকারণে আটকে থাকবে না, ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাজ করবে, মুনাফা পাঠানো যাবে, বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, আদালত বা সালিশে ন্যায়সংগত সমাধান মিলবে- তখন তিনি আসবেন।

দেশে এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই সময়ে যদি অর্থনৈতিক সংস্কারকে সত্যিকার অগ্রাধিকার দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ নতুন করে বিনিয়োগের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু যদি আমরা শুধু স্লোগান, সম্মেলন, ছবি তোলা এবং বক্তৃতার মধ্যে আটকে থাকি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগও আমাদের মতো ধৈর্য হারাবে।

২. জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের উত্থান

বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে আবার বসতে যাচ্ছে, নিঃসন্দেহে এটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। চার দশক পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এই অর্জনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব আছে। বিশ্ব এখন এক জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজাসংকট, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, চীন-আমেরিকা প্রতিযোগিতা- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অস্থির। এই সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার মঞ্চ নয়; এটি ছোট ও মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য নৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির জায়গা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই সুযোগকে কীভাবে ব্যবহার করবে?

আমরা কি শুধু গর্ব করব যে বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি সভাপতি হয়েছেন, নাকি এই মঞ্চকে ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন, শান্তিরক্ষা, অভিবাসন, ঋণসংকট এবং বৈশ্বিক বৈষম্য নিয়ে নেতৃত্ব দেব?

বাংলাদেশের জন্য এটি সম্মানের পাশাপাশি পরীক্ষা। কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে মর্যাদা পাওয়া সহজ নয়, ধরে রাখা আরও কঠিন। জাতিসংঘে সভাপতির আসন আমাদের সামনে একটি জানালা খুলে দিয়েছে। কিন্তু জানালা খোলা থাকলেই বাতাস ঢোকে না; ঘরের ভিতরও প্রস্তুতি থাকতে হয়।

বাংলাদেশকে এখন দেখাতে হবে, সে শুধু ভোট জিততে পারে না, ধারণাও দিতে পারে। শুধু কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারে না, বৈশ্বিক আলোচনায় অর্থবহ অবদানও রাখতে পারে।

৩. তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর : বার্তা কোথায়?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। এটি শুধু একটি সফর নয়; এর মধ্যে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি বার্তা আছে।

অনেকে ভেবেছিলেন, প্রথম সফর হয়তো ভারত, চীন বা সৌদি আরবে হতে পারে। কিন্তু মালয়েশিয়া বেছে নেওয়া একটি কৌশলগত ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনীতির মধ্যে বাংলাদেশ যেন সরাসরি কোনো শিবিরে দাঁড়ানোর বার্তা না দেয়, এই হিসাবও এখানে থাকতে পারে।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। তাঁদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি। দ্বিতীয়ত মালয়েশিয়া একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্র। তৃতীয়ত বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে।

কিন্তু সফর সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে ছবি ও প্রটোকলের ওপর নয়; ফলাফলের ওপর।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে যদি শ্রমবাজারের নিরাপত্তা, অভিবাসী কর্মীদের মর্যাদা, বিনিয়োগ সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও শিক্ষা বিনিময়, হালাল শিল্প, পর্যটন এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি হয়, তাহলে এই সফর অর্থবহ হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় হতে পারে না। এখন প্রতিটি সফরের অর্থনৈতিক হিসাব থাকতে হবে। কোন দেশে গেলাম, কাকে দেখলাম, কী ছবি তুললাম- এসবের বাইরে প্রশ্ন হবে : কী পেলাম? কত বিনিয়োগ এলো? কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো? কত দরজা খুলল?

৪. প্রতিক্রিয়া নয়, পুনর্গঠন

রাষ্ট্রেরও মানুষের মতো আবেগ থাকে। কিন্তু পরিণত রাষ্ট্র সেই আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। প্রতিটি কথার জবাব দিতে হয় না, প্রতিটি সমালোচনার পাল্টা বিবৃতি দিতে হয় না, প্রতিটি বিরোধকে যুদ্ধ বানাতে হয় না।

পুনর্গঠন শুরু হয় তখনই, যখন প্রতিক্রিয়া শেষ হয়।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতিতে অভ্যস্ত। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা কথা। কেউ প্রশ্ন তুললে সন্দেহ। কেউ ভিন্নমত দিলে শত্রুতা। ফলে আমরা নীতি নিয়ে যতটা ভাবি, শব্দ নিয়ে তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করি।

কিন্তু আসল শক্তি কখনো খুব শব্দ করে না। আসল শক্তি গড়ে ওঠে সংযমে, শৃঙ্খলায়, প্রস্তুতিতে। ইটের পর ইট বসিয়ে যেমন ভবন তৈরি হয়, তেমনি সংস্কারও তৈরি হয় ধৈর্য, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতায়।

আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন হলো নিজের শক্তিকে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা। সব বিতর্কে শক্তি খরচ করলে বিনিয়োগ সংস্কার হবে না। সব রাজনৈতিক শব্দে ডুবে গেলে জাতিসংঘের সুযোগ কাজে লাগবে না। সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতা বানালে পররাষ্ট্রনীতি ভারসাম্য হারাবে।

দূরত্ব সব সময় শীতলতা নয়; কখনো কখনো তা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। অপ্রয়োজনীয় শব্দ, বিভ্রান্তি, ক্ষোভ ও আত্মপ্রদর্শন থেকে দূরে সরে এসে যদি বাংলাদেশ নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিণতি।

শেষ কথা

এই সপ্তাহের চারটি বিষয় আলাদা মনে হলেও আসলে একই সুতোয় বাঁধা। বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের বলে- আস্থা ছাড়া অর্থনীতি এগোয় না। জাতিসংঘের মঞ্চ আমাদের বলে- মর্যাদা পেলে দায়িত্বও নিতে হয়। মালয়েশিয়া সফর আমাদের বলে- পররাষ্ট্রনীতি এখন অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। আর পুনর্গঠনের দর্শন আমাদের বলে- শব্দ কমিয়ে কাজ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবার প্রতিক্রিয়ার পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাব, নাকি শৃঙ্খলিত পুনর্গঠনের পথে হাঁটব?

বিনিয়োগকারীকে আনতে হলে রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতৃত্ব দিতে হলে কথার সঙ্গে কাজ মিলতে হবে। বিদেশ সফরকে অর্থবহ করতে হলে ফলাফল আনতে হবে। আর রাজনৈতিক স্থিতি আনতে হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া নয়, সংযম শিখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত মর্যাদা আসে না উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা থেকে। মর্যাদা আসে ধারাবাহিকতা থেকে।  আস্থা আসে না প্রচারণা থেকে। আস্থা আসে অভিজ্ঞতা থেকে। আর শক্তি আসে না শব্দ থেকে। শক্তি আসে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থেকে।

বাংলাদেশ যদি এই মুহূর্তে নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে পারে, তাহলে পতনও হতে পারে পুনরারম্ভের ভাষা, সংকটও হতে পারে সংস্কারের সুযোগ।

কারণ রাষ্ট্রেরও একদিন নিজের ভিতরে শান্তির প্রজাতন্ত্র গড়তে হয়। আর সেই প্রজাতন্ত্রের প্রথম আইন খুব সহজ : কম বলো, বেশি করো।

লেখক :  প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ