কয়েকবছর আগে বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে ছাত্রদের গাদাগাদি করে থাকার একটি ছবি ছাপা হয়েছিল। ছবিতে ছাত্রদের দুরবস্থার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছিল। ছবিতে তারচেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল আরেকটি ছবি। এতগুলো তরুণ এক রুমে গাদাগাদি করে আছে। কিন্তু কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছে না, কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। সবার চোখ যার যার ফোনের স্ক্রিনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের সবাইকে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে আরো বেশি অসামাজিক করে তুলছে। শুধু অসামাজিক করা পর্যন্ত সীমিত থাকলেও না হয় চলতো। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা তৈরি করছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আসক্তি এখন এক ভয়ঙ্কর সঙ্কট সৃষ্টি করছে।
আসক্তি শব্দটা আগে শুধু মাদকের সঙ্গেই ব্যবহার করা হতো। আসলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছু্ই খারাপ। এমনকি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভাতও শরীরের জন্য ক্ষতিকর। পান, তামাক, সিগারেট থেকে শুরু করে হিরোইন, গাজা, মদ—সবই ক্ষতিকর। প্রচলিত এসব নেশা মানুষ লুকিয়ে চুরিয়ে করে। কিন্তু এসব নেশার চেয়েও ভয়ঙ্কর এক নেশা আমাদের চোখের সামনেই আমাদের সন্তানদের বর্তমান, ভবিষ্যত গ্রাস করে নিচ্ছে। আর এই নেশার নাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অন্ধকার এক ভার্চুয়াল জগৎ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হাজারটা ভালো দিক আছে। গোটা বিশ্বে কোটি মানুষকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উপকার করেছে; আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপ্রয়োজনীয়, অতিরিক্ত ব্যবহার অনেকের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসক্তি আমাদের জীবনে বহুবিধ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ভার্চুয়াল জগতের আসক্তির ফলে বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে যাওয়া, চাইলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আসক্তি থেকে বেরুতে না পারা, কোনো কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে না পারলে বিরক্ত বা ক্রদ্ধ হওয়া, অনলাইনে না থাকলেও কল্পনায় ভার্চুয়াল জগতে বাস করা, লুকিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার, এমনকি খাওয়া, ঘুম, ব্যয়ামের রুটিন লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে আমাদের জীবনে। এর প্রতিক্রিয়ায় বাস্তব সম্পর্ক ভুলে যাওয়া, নিজের ক্যারিয়ারের প্রতি মনোযোগী না হওয়া, নিজের ক্ষতি করা, এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আগের জগতটা ছিল বাস্তব। মানুষে মানুষে সম্পর্ক হতো মুখের কথায়, একটু ছোঁয়া, একটু মান-অভিমান আমাদের ভাসিয়ে নিতো সুখের সাগরে। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ঝগড়া-অভিমান— সবই হতো মুখোমুখি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সৃষ্টি করা এক কল্পনার জগৎ আমাদের বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এক বিভ্রমের জগতে আমরা কাল্পনিক সুখের সাগরে ভাসতে গিয়ে আসলে ডুবে যাই। পাশের ঘরে হয়তো মা অসুখে কষ্ট পাচ্ছে। আর সন্তান ফেসবুকে বা ইনস্টাগ্রামে মা দিবসের আবেগঘন স্ট্যাটাস দিচ্ছে। বাস্তবের মায়ের চেয়ে কল্পনার ’মা দিবস’ তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কারণ মা দিবসের স্ট্যাটাসের লাইক আসবে, কমেন্টস আসবে। সে মনের সুখে বারবার চেক করে আপডেট নেবে। পাশের রুমে মা যে কষ্ট পাচ্ছে, সে খেয়াল রাখার সময় কোথায়? ভার্চুয়াল জগতে আচ্ছন্ন থেকে আমরা ভুলে যাই পাশের প্রিয়জন বা বন্ধুর কথা। আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকা সত্যিকারের স্বজনরা পিছিয়ে যাচ্ছে। এমনকি নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, ভবিষ্যৎ- সবকিছুই অগ্রাধিকারের তালিকায় খালি পিছিয়েই যায়। বারবার ডিভাইস চেক করতে গিয়ে আমরা বাস্তব জগতকে ভুলে যাই। বাস্তবের চেয়ে কল্পনা এগিয়ে যায় আর আমরা পিছিয়ে যাই।
এক জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকানরা দিনে গড়ে ৩৪৪ বার তার ফোন বা স্মাট ডিভাইস চেক করেন। তরুণদের অনেকে ফোন নিয়েই ঘুমাতে যায় এবং রাতভর স্ট্যাটাস আপডেট চেক করে। তাতে শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয় নিরবচ্ছিন্ন ঘুমটা আর হয় না। ফলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, তীব্র হতাশা, মানসিক অবসাদ, নার্ভাসনেস, ক্রোধ, দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। মার্কিন গবেষকরা নিরবচ্ছিন্ন শান্তির ঘুমের জন্য স্মার্ট ডিভাইসের ব্যবহার দুই ঘণ্টায় সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
বাস্তব জগতে আমরা সত্যিটাই শুধু দেখি। সেই সত্যিটা সবসময় আমাদের ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু ভার্চুয়াল জগৎ সবকিছু আমাদের সামনে উপস্থাপন করে সুন্দরভাবে, আমাদের মনের মতো করে। ভার্চুয়াল জগতের ফিল্টার করা সৌন্দর্য্য দেখে তরুণ-তরুণীদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ৪০ ভাগ তরুণী এবং ১৪ ভাগ তরুণ নিজেদের শারীরিক সৌন্দর্য্য নিয়ে গ্লানিতে ভোগেন। তাদের খালি মনে হতে থাকে, অমুককে এত সুন্দর দেখায়, আমি এত কুৎসিত কেন?
ভার্চুয়াল জগতের সবকিছুই কিন্তু সুন্দর নয়। সেই কল্পনার জগতেও আছে গভীর, গভীরতর অন্ধকার। ভার্চুয়াল জগতে প্রেম করে প্রতারিত হওয়ার হাজারটা উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই আছে। গোপন ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার উদাহরণও তো ভুরি ভুরি। নতুন নতুন আইন করেও ঠেকানো যাচ্ছে না প্রতারণা আর ব্ল্যাকমেইল। বাস্তব জগতের বুলিং আর সাইবার বুলিং-এ আকাশ-পাতাল ফারাক। বাস্তবের ঝগড়া, গালি তাৎক্ষণিক উত্তেজনা থেকে আসে। আবার মিলিয়েও যায়। কিন্তু সাইবার বুলিং সাইবার স্পেসে থেকে যায়, ভাইরাল হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে যায় আমাদের মনে, মননে।
তাছাড়া ভার্চুয়াল জগৎ আমাদের যে আনন্দ দেয়, বাস্তব জগতে সে আনন্দ না পেলে তরুণ প্রজন্ম হতাশ হয়। এসব হতাশা, প্রতারণা, সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইলের চাপ তরুণ-তরুণীরা নিতে পারে না। তারা আরো গভীর হতাশায় তলিয়ে যায়। জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে তা কেড়ে নিতেও দ্বিধা করে না।
কিন্তু এভাবে তরুণ প্রজন্মকে, আমাদের মানবসভ্যতার ভবিষ্যতকে ভার্চুয়াল জগতের হাতে ছেড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে বসে আফসোস করলে তো চলবে না। আমাদের সন্তানদের বাঁচানোর দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। আপনি নিশ্চয়ই আপনার সন্তানকে হিরোইন নিতে দেবেন না। স্মার্ট ডিভাইস কিন্তু হিরোইনের চেয়ে কম ক্ষতিকর নয়। একজন মাদকাসক্তকে যেমন হুট করে মাদক কেড়ে নিয়েই সুস্থ করে তোলা সম্ভব নয়। তেমনি হঠাৎ একদিন সন্তানের হাত থেকে স্মাট ডিভাইস কেড়ে নিলেই তার আসক্তি দূর হয়ে যাবে না। আপনাকে আপনার সন্তানের পাশে দাঁড়াতে হবে গভীর ভালোবাসা নিয়ে। তাকে বোঝান বাস্তব জগতের ভালোবাসাটাই আসল। তাকে সমস্যা থেকে পালিয়ে বেড়ানো নয়, সমসা মোকাবেলা করতে শেখান। আপনার সন্তানকে বলুন, সে কত ভালো, সে কত সুন্দর, তার মধ্যে লুকিয়ে আছে কি অপার সম্ভাবনা। তাকে বোঝান পৃথিবীটা কত সুন্দর। সন্তানকে স্ক্রিন টাইম মানেজ করতে শেখান। হুট করে ৮ ঘণ্টার স্ক্রিন টাইমকে আপনি ২ ঘণ্টায় নামিয়ে আনতে পারবেন না। আস্তে আস্তে বোঝাতে হবে, কমাতে হবে। তাকে সময়ের মূল্য বোঝান। অপ্রয়োজনে স্ক্রল করা বন্ধ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে শেখান। নিশ্চয়ই একদিন সে বুঝবে, কল্পনার আনন্দ ক্ষণস্থায়ী, বাস্তবের আনন্দ চিরদিনের। জীবন একটাই। সে জীবন যাপন করতে হবে বাস্তব আনন্দের সঙ্গে, প্রিয়জনের সান্নিধ্যে।











