পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ শান্তি চায়। ব্যক্তি জীবনে শান্তি, পরিবারে শান্তি, সমাজে শান্তি, রাষ্ট্রে শান্তি—মানবজাতির সকল আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু যেন এই একটি শব্দ, ‘শান্তি’। কিন্তু শান্তি কেবল একটি আকাঙ্ক্ষার নাম নয়; এটি একটি সংস্কৃতি, একটি মূল্যবোধ এবং একটি জীবনদর্শন। আর সেই শান্তির পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন নিয়ে এসেছে ইসলাম। ইসলাম মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইসলাম যে অপূর্ব শিক্ষাগুলো দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো সালাম।
সালাম শুধু একটি সম্ভাষণ বা অভিবাদন নয়; এটি একটি দোয়া, একটি অঙ্গীকার, একটি মানবিক ঘোষণা এবং একটি বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। একজন মুসলমান যখন অপর মুসলমানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে সম্ভাষণ জানায়, তখন সে শুধু মুখের কথা বলে না; বরং অন্তর থেকে এ দোয়া করে যে, ‘আল্লাহ আপনার ওপর শান্তি, নিরাপত্তা, রহমত ও বরকত বর্ষণ করুন।’ একই সঙ্গে সে যেন এ ঘোষণাও দেয় যে, ‘আমার পক্ষ থেকে আপনি নিরাপদ; আপনার কোনো অনিষ্ট আমি চাই না।’
সমাজে বসবাসের ক্ষেত্রে যদি এমন আন্তরিকতা ও পারস্পরিক আস্থা না থাকে, তবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কখনো সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)
ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের প্রথম দায়িত্ব হলো তার কল্যাণ কামনা করা। সালাম সেই কল্যাণকামিতারই প্রথম ধাপ। কারণ সালামের প্রতিটি শব্দে নিহিত রয়েছে শান্তি, নিরাপত্তা ও মঙ্গল কামনা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদেরকে যখন কোনো অভিবাদন জানানো হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তমভাবে জবাব দাও অথবা অনুরূপ জবাব দাও।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৬)
এ আয়াত প্রমাণ করে, ইসলাম শুধু সালাম দেওয়ার শিক্ষা দেয়নি; বরং তার সুন্দর জবাব দেওয়াকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করেছে। তাই মহানবী (সা.) সালামের গুরুত্ব সম্পর্কে এমনভাবে আলোচনা করেছেন, যা ইসলামী সমাজব্যবস্থার সৌন্দর্যকে স্পষ্ট করে তোলে। তিনি বলেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৫৪)
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, ‘তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর পরস্পরকে ভালোবাসা না পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজের কথা বলব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’ (আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং : ৭৫১)
পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির নিজস্ব সম্ভাষণ পদ্ধতি রয়েছে। ইংরেজরা বলে ‘Good Morning’, ‘Good Evening’ কিংবা ‘Good Night’। অন্য ভাষাতেও রয়েছে নানান ধরনের সম্ভাষণ। হিন্দুরা পরস্পর অভিবাদন জানায় রাম-রামজি বা আদাব-নমস্কার বলে। চীনারা একে অপরকে বলে ‘নি হাও’ ‘শি-শিও’ ইত্যাদি বলে। এসব অভিবাদনের মধ্যে সৌজন্য থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা শুধু একটি সময়ভিত্তিক শুভেচ্ছা। কিন্তু ইসলামের সালাম এর চেয়ে অনেক গভীর ও ব্যাপক অর্থ বহন করে।
জাপানি নারী মিস ফাতেমা কাজু তার ইসলাম গ্রহণের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই আমি পর্যবেক্ষণ করছি, ধর্মের প্রতি আমাদের বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আমি গভীরভাবে অনুভব করলাম আমরা যতই আমেরিকান ধাচের জীবন যাত্রায় অভ্যন্ত হয়ে পড়ছিলাম, মনে হচ্ছিল আমাদের কী যেন হারিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। আর বুঝতে না পারাটাই আমার জন্য অস্থিরতার কারণ হয়ে দেখা দেয়।’
এ সময় টোকিওতে কিছু দিন অবস্থান করে তিনি বলেন, “মুসলমানদের অভিবাদনের প্রতি লক্ষ্য করুন। তারা ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে অভিবাদন জানায়। এর অর্থ হলো, আল্লাহ পাক আপনার উপর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষণ করুন। ‘গুড মর্নিং’ ও গুড আফটার নুন-এর চাইতে মুসলামানদের এই অভিবাদন কতইনা সুন্দর ও অর্থবহ। এগুলো বলে শুধু সকাল বা বিকেলের ভালো কামনা করা হয়। এগুলো নিছক বস্তুবাদী সংবোধন। আল্লাহর রহমত ও পারলৌকিক কল্যাণের জন্য প্রার্থনার নাম গন্ধও এ অভিবাদনে নেই।” তার মতে ‘সালাম’ নিছক সামাজিক সৌজন্য নয়; বরং আধ্যাত্মিক ও মানবিক কল্যাণের এক অনন্য প্রকাশ।
প্রকৃতপক্ষে সালাম মানুষের অন্তরকে কোমল করে, অহংকার দূর করে এবং ভালোবাসার বন্ধনকে দৃঢ় করে। একটি সালাম শত্রুতাকে বন্ধুত্বে রূপান্তর করতে পারে, দূরত্বকে নৈকট্যে পরিণত করতে পারে এবং অপরিচিত মানুষকেও আপন করে তুলতে পারে। একটি সমাজে যখন সালামের চর্চা বৃদ্ধি পায়, তখন সেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্ববোধও বৃদ্ধি পায়।
আজকের পৃথিবী বিভাজন, সংঘাত, বিদ্বেষ ও নৈতিক সংকটে জর্জরিত। মানুষ প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও হৃদয়ের প্রশান্তি হারিয়ে ফেলছে। এমন এক সময়ে ইসলামের সালাম সংস্কৃতি হতে পারে মানবতার জন্য এক অনন্য সমাধান। কারণ সালামের মধ্যেই রয়েছে শান্তির আহ্বান, ভালোবাসার বার্তা এবং নিরাপদ সমাজ নির্মাণের ভিত্তি।
তাই আমাদের উচিত পরিবারে, সমাজে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সালামের ব্যাপক প্রচলন করা। পরিচিত-অপরিচিত সকল মুসলমানকে সালাম দেওয়া, সন্তানদের সালামের শিক্ষা দেওয়া এবং সালামকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করা।
আসুন, আমরা ইসলামের এই মহান শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করি। সালামের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে ভালোবাসার সেতুবন্ধন গড়ে তুলি। পরস্পরের জন্য শান্তি, রহমত ও বরকতের দোয়া করি। এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করি, যেখানে প্রতিটি মানুষের মুখে উচ্চারিত হবে শান্তির বাণী, আর প্রতিটি হৃদয় ভরে উঠবে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও মানবিকতার আলোয়। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুক। আমিন।




