• ই-পেপার

কোরআনের বাণী

আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণপ্রাপ্তদের মর্যাদা

সালাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিবাদন

মাওলানা ইউসুফ মাহমুদ
সালাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিবাদন
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ শান্তি চায়। ব্যক্তি জীবনে শান্তি, পরিবারে শান্তি, সমাজে শান্তি, রাষ্ট্রে শান্তি—মানবজাতির সকল আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু যেন এই একটি শব্দ, ‘শান্তি’। কিন্তু শান্তি কেবল একটি আকাঙ্ক্ষার নাম নয়; এটি একটি সংস্কৃতি, একটি মূল্যবোধ এবং একটি জীবনদর্শন। আর সেই শান্তির পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন নিয়ে এসেছে ইসলাম। ইসলাম মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইসলাম যে অপূর্ব শিক্ষাগুলো দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো সালাম।

সালাম শুধুমাত্র একটি সম্ভাষণ বা অভিবাদ নয়; এটি একটি দোয়া, একটি অঙ্গীকার, একটি মানবিক ঘোষণা এবং একটি বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। একজন মুসলমান যখন অপর মুসলমানকে “আসসালামু আলাইকুম” বলে সম্ভাষণ জানায়, তখন সে শুধু মুখের কথা বলে না; বরং অন্তর থেকে এ দোয়া করে যে, ‘আল্লাহ আপনার ওপর শান্তি, নিরাপত্তা, রহমত ও বরকত বর্ষণ করুন।’ একই সঙ্গে সে যেন এ ঘোষণাও দেয় যে, ‘আমার পক্ষ থেকে আপনি নিরাপদ; আপনার কোনো অনিষ্ট আমি চাই না।’ 

সমাজে বসবাসের ক্ষেত্রে যদি এমন আন্তরিকতা ও পারস্পরিক আস্থা না থাকে, তবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কখনো সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)

ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের প্রথম দায়িত্ব হলো তার কল্যাণ কামনা করা। সালাম সেই কল্যাণকামিতারই প্রথম ধাপ। কারণ সালামের প্রতিটি শব্দে নিহিত রয়েছে শান্তি, নিরাপত্তা ও মঙ্গল কামনা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদেরকে যখন কোনো অভিবাদন জানানো হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তমভাবে জবাব দাও অথবা অনুরূপ জবাব দাও।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৬)

এ আয়াত প্রমাণ করে, ইসলাম শুধু সালাম দেওয়ার শিক্ষা দেয়নি; বরং তার সুন্দর জবাব দেওয়াকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করেছে। তাই মহানবী (সা.) সালামের গুরুত্ব সম্পর্কে এমনভাবে আলোচনা করেছেন, যা ইসলামী সমাজব্যবস্থার সৌন্দর্যকে স্পষ্ট করে তোলে। তিনি বলেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৫৪)

অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, ‘তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর পরস্পরকে ভালোবাসা না পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজের কথা বলব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’ (আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং : ৭৫১)

পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির নিজস্ব সম্ভাষণ পদ্ধতি রয়েছে। ইংরেজরা বলে ‘Good Morning’, ‘Good Evening’ কিংবা ‘Good Night’। অন্য ভাষাতেও রয়েছে নানান ধরনের সম্ভাষণ। হিন্দুরা পরস্পর অভিবাদন জানায় রাম-রামজি বা আদাব- নমস্কার বলে। চীনারা একে অপরকে বলে 'নি হাও' শি-শিও' ইত্যাদি বলে। এসব অভিবাদনের মধ্যে সৌজন্য থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা শুধুমাত্র একটি সময়ভিত্তিক শুভেচ্ছা। কিন্তু ইসলামের সালাম এর চেয়ে অনেক গভীর ও ব্যাপক অর্থ বহন করে।

জাপানী নারী মিস ফাতেমা কাজু তার ইসলাম গ্রহণের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই আমি পর্যবেক্ষণ করছি, ধর্মের প্রতি আমাদের বিশ্বাস দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। আমি গভীরভাবে অনুভব করলাম আমরা যতই আমেরিকান ধাচের জীবন যাত্রায় অভ্যন্ত হয়ে পড়ছিলাম, মনে হচ্ছিল আমাদের কী যেন হারিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। আর বুঝতে না পারাটাই আমার জন্য অস্থিরতার  কারণ হয়ে দেখা দেয়।’ 
এসময় টোকিওতে কিছুদিন অবস্থান করে তিনি বলেন, ‘মুসলমানদের অভিবাদনের প্রতি লক্ষ্য করুন। তারা ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে অভিবাদন জানায়। এর অর্থ হলো, আল্লাহ পাক আপনার উপর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষণ করুন। 'গুড মর্নিং'ও গুড আফটার নন'-এর চাইতে মুসলামানদের এই অভিবাদন কতইনা সুন্দর ও অর্থবহ।  এগুলো বলে শুধু সকাল বা বিকালের ভালো কামনা কররা হয়। এগুলো নিছক বস্তুবাদী সম্বোধন। আল্লাহর রহমত ও পারলৌকিক কল্যাণের জন্য প্রার্থনার নাম গন্ধও এ অভিবাদনে নেই।’ তার মতে ‘সালাম’ নিছক সামাজিক সৌজন্য নয়; বরং আধ্যাত্মিক ও মানবিক কল্যাণের এক অনন্য প্রকাশ।

প্রকৃতপক্ষে সালাম মানুষের অন্তরকে কোমল করে, অহংকার দূর করে এবং ভালোবাসার বন্ধনকে দৃঢ় করে। একটি সালাম শত্রুতাকে বন্ধুত্বে রূপান্তর করতে পারে, দূরত্বকে নৈকট্যে পরিণত করতে পারে এবং অপরিচিত মানুষকেও আপন করে তুলতে পারে। একটি সমাজে যখন সালামের চর্চা বৃদ্ধি পায়, তখন সেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্ববোধও বৃদ্ধি পায়।

আজকের পৃথিবী বিভাজন, সংঘাত, বিদ্বেষ ও নৈতিক সংকটে জর্জরিত। মানুষ প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও হৃদয়ের প্রশান্তি হারিয়ে ফেলছে। এমন এক সময়ে ইসলামের সালাম সংস্কৃতি হতে পারে মানবতার জন্য এক অনন্য সমাধান। কারণ সালামের মধ্যেই রয়েছে শান্তির আহ্বান, ভালোবাসার বার্তা এবং নিরাপদ সমাজ নির্মাণের ভিত্তি।

তাই আমাদের উচিত পরিবারে, সমাজে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সালামের ব্যাপক প্রচলন করা। পরিচিত-অপরিচিত সকল মুসলমানকে সালাম দেওয়া, সন্তানদের সালামের শিক্ষা দেওয়া এবং সালামকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করা।

আসুন, আমরা ইসলামের এই মহান শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করি। সালামের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে ভালোবাসার সেতুবন্ধন গড়ে তুলি। পরস্পরের জন্য শান্তি, রহমত ও বরকতের দোয়া করি। এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করি, যেখানে প্রতিটি মানুষের মুখে উচ্চারিত হবে শান্তির বাণী, আর প্রতিটি হৃদয় ভরে উঠবে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও মানবিকতার আলোয়। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুক। আমিন। 

বাগদাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থাগারের কান্না

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
বাগদাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থাগারের কান্না
সংগৃহীত ছবি

একটি জাতির মৃত্যু সবসময় যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে না। অনেক জাতি পরাজিত হয়েছে তলোয়ারের আঘাতে, আবার অনেক জাতি ইতিহাস থেকে মুছে গেছে নিজেদের স্মৃতি হারিয়ে। প্রথম মৃত্যুর শব্দ শোনা যায়; দ্বিতীয় মৃত্যু ঘটে নিঃশব্দে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে স্মৃতি যেমন পরিচয়ের ভিত্তি, সভ্যতার জীবনেও তেমনি স্মৃতি তার আত্মপরিচয়ের উৎস। আমরা কে, কোথা থেকে এলাম, কীভাবে চিন্তা করতে শিখলাম, কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছি—এই দীর্ঘ যাত্রার নামই সভ্যতা। আর এই যাত্রার দলিল সংরক্ষিত থাকে বইয়ে, পাণ্ডুলিপিতে, গ্রন্থাগারে। তাই কোনো গ্রন্থাগার পুড়ে যাওয়া মানে শুধু কিছু বই নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো একটি সভ্যতার স্মৃতিভাণ্ডারে আগুন লেগে যাওয়া।

মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে এমন বহু আগুনের কথা আমরা জানি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা সাধারণত আগুনের দিকে তাকাই, ছাইয়ের দিকে নয়। আমরা বাগদাদের পতনের কথা বলি, কিন্তু ভাবি না সেই পতনের পর কোন কোন প্রশ্ন হারিয়ে গেল। আমরা আন্দালুসের রাজনৈতিক পরাজয় নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু খুব কমই আলোচনা করি সেই বইগুলোর কথা, যেগুলো আর কখনো কোনো পাঠকের হাতে পৌঁছায়নি।

ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, মানুষ হত্যার চেয়ে বই হত্যা কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনে। কারণ একজন মানুষের মৃত্যু একটি জীবনের সমাপ্তি ঘটায়, কিন্তু একটি বইয়ের মৃত্যু অনেক সম্ভাব্য জীবনের চিন্তাকে অসম্পূর্ণ করে দেয়।

মধ্যযুগীয় মুসলিম বিশ্বকে আমরা প্রায়ই স্বর্ণযুগ বলে উল্লেখ করি। কিন্তু এই শব্দটির ভেতরের অর্থ নিয়ে খুব কম ভাবি। স্বর্ণযুগ মানে শুধু ক্ষমতা, সম্পদ বা সামরিক সাফল্য নয়। স্বর্ণযুগ মানে এমন এক সময়, যখন একটি সভ্যতা প্রশ্ন করতে ভয় পায় না। বাগদাদের রাস্তায় তখন একই শহরে ফকিহ, দার্শনিক, চিকিৎসক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং ভাষাবিদ হাঁটতেন। মতভেদ ছিল, বিতর্ক ছিল, এমনকি তীব্র বিরোধও ছিল। কিন্তু তার পরও জ্ঞান উৎপাদনের প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি। কারণ সভ্যতাগুলো প্রশ্নের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে, উত্তরের ভেতর দিয়ে নয়। এখানেই গ্রন্থাগারের প্রকৃত তাৎপর্য।

গ্রন্থাগার মূলত বইয়ের গুদাম নয়; এটি একটি সভ্যতার আত্মসমালোচনার স্থান। সেখানে অতীত বর্তমানের সঙ্গে কথা বলে। মৃত মানুষের চিন্তা জীবিত মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ যে কথোপকথন চালিয়ে যায়, গ্রন্থাগার তারই দৃশ্যমান রূপ। সম্ভবত এ কারণেই ইতিহাসে স্বৈরতন্ত্র বইকে ভয় পেয়েছে। আগুন প্রথমে গ্রন্থাগারে যায়, কারণ ক্ষমতা জানে—একটি বইয়ের ভেতরে কখনো কখনো একটি সেনাবাহিনীর চেয়েও বেশি শক্তি লুকিয়ে থাকে। তবে মুসলিম বিশ্বের ট্র্যাজেডি শুধু এই নয় যে তার গ্রন্থাগারগুলো ধ্বংস হয়েছে। আরও বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমরা ধীরে ধীরে গ্রন্থাগার হারানোর শোকও ভুলে গেছি।

আজ আমাদের শহরে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক বেশি শিক্ষার্থী আছে। তথ্যের প্রাচুর্যও অভূতপূর্ব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জ্ঞান কি সত্যিই বেড়েছে? তথ্য ও জ্ঞানের পার্থক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য মানুষকে সংবাদ দেয়, জ্ঞান মানুষকে দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। তথ্য জানায় কী ঘটেছে; জ্ঞান বুঝতে শেখায় কেন ঘটেছে। একটি সভ্যতা তখনই সংকটে পড়ে, যখন সে তথ্য সংগ্রহকে জ্ঞানচর্চা বলে ভুল করতে শুরু করে।

মুসলিম বিশ্বের বর্তমান সংকটের একটি অংশ সম্ভবত এখানেই নিহিত। আমরা আমাদের অতীতকে স্মরণ করি, কিন্তু তার সঙ্গে সংলাপ করি না। আমরা ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু তাকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাই না। ফলে ঐতিহ্য ধীরে ধীরে জীবন্ত উত্তরাধিকার থেকে স্মারকে পরিণত হয়। কোনো সভ্যতার জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ আর নেই।

কারণ সভ্যতার পতন শুরু হয় না তখন, যখন তার গ্রন্থাগার পুড়ে যায়। পতন শুরু হয় তখন, যখন গ্রন্থাগার অক্ষত থাকে কিন্তু পাঠক হারিয়ে যায়; যখন বই টিকে থাকে কিন্তু প্রশ্ন হারিয়ে যায়; যখন স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে কিন্তু তার অর্থ বিস্মৃত হয়। এই অর্থে হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থাগারের কান্না অতীতের কোনো বিলাপ নয়। এটি বর্তমানের প্রতিধ্বনি। সেই প্রতিধ্বনি আমাদের জিজ্ঞেস করে—আমরা কি সত্যিই আমাদের স্মৃতি রক্ষা করছি, নাকি শুধু তার ধ্বংসাবশেষ পাহারা দিচ্ছি? প্রশ্নটি ইতিহাসের নয়, ভবিষ্যতের।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মানার মহাখালী ঢাকা।

কন্যাসন্তান : আল্লাহর রহমত, ঘরের বরকত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কন্যাসন্তান : আল্লাহর রহমত, ঘরের বরকত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম
সংগৃহীত ছবি

এক সময় পৃথিবীর বহু সমাজে কন্যাসন্তান ছিল অবহেলা, অপমান ও বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে জাহেলি আরব সমাজে কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জা ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক মনে করা হতো। এমনকি অনেক নিষ্ঠুর পিতা নিজের নবজাতক কন্যাকে জীবন্ত মাটিচাপা দিতেও দ্বিধা করত না। মানবতার ইতিহাসে এটি ছিল এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ঠিক সেই অন্ধকার যুগেই ইসলাম এসে কন্যাসন্তানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য বিপ্লব ঘটায়। যে কন্যাসন্তানকে সমাজ বোঝা মনে করত, ইসলাম তাকে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত, ঘরের বরকত এবং জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৪৯)

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রথমে কন্যাসন্তানের কথা উল্লেখ করেছেন। মুফাসসিরগণ বলেন, এর মধ্যে কন্যাসন্তানের মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত রয়েছে। কারণ যে সমাজ কন্যাসন্তানকে অবজ্ঞা করত, আল্লাহ তাআলা সেই সমাজের ভুল ধারণাকে ভেঙে দিয়ে কন্যাসন্তানকে সম্মানিত করেছেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে কন্যাসন্তান হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি মূল্যবান আমানত। তার সঠিক লালন-পালন, শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের দায়িত্ব পালন করলে তা পিতা-মাতার জন্য জান্নাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুই কন্যাসন্তানকে লালন-পালন করবে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এভাবে একসঙ্গে থাকব।’ এরপর তিনি নিজের দুই আঙুল একত্র করে দেখালেন।’ (সহিহ মুসলিম, আয়াত : ২৬৩১)

একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের সংবাদ আর কী হতে পারে! কন্যাসন্তানের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে কিয়ামতের দিন সে মহানবী (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করবে। অন্য এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যার ঘরে কন্যাসন্তান আসে এবং সে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে, তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড়াল হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৪১৮, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৬২৯)

এ হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কন্যাসন্তান আল্লাহর রহমত এবং তাদের যথাযথ প্রতিপালন মহান সওয়াবের কাজ। অথচ জাহেলি যুগের মানুষ কন্যাসন্তানের জন্মসংবাদ শুনে লজ্জা ও দুঃখে ভেঙে পড়ত। আল্লাহ তাআলা তাদের সেই মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হতো, তখন তার মুখ কালো হয়ে যেত এবং সে দুঃখে কাতর থাকত।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৫৮)

দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক যুগেও অনেক সমাজে সেই জাহেলি মানসিকতার কিছু না কিছু ছাপ রয়ে গেছে। কোথাও কন্যাসন্তানের জন্মে আনন্দের পরিবর্তে হতাশা দেখা যায়, কোথাও তাকে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, কোথাও আবার উত্তরাধিকার ও সম্পদের ন্যায্য অধিকার থেকেও দূরে রাখা হয়। এসব আচরণ ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মহানবী (সা.) নিজের জীবনে কন্যাসন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.) যখন তাঁর কাছে আসতেন, তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন, তাকে সাদরে গ্রহণ করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় বসাতেন।’ (আবু দাউদ, আয়াত : ৫২১৭)

এটি শুধু একজন পিতার ভালোবাসা ছিল না; বরং সমগ্র উম্মতের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা ছিল যে, কন্যাসন্তান সম্মান, মর্যাদা ও ভালোবাসার পূর্ণ অধিকারী। তবে কন্যাসন্তানের হক আদায় শুধু খাদ্য, পোশাক ও আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, উত্তম চরিত্র গঠনে সহায়তা করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করা এবং সমাজের উপকারী সদস্য হিসেবে গড়ে তোলাও পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব।

প্রখ্যাত ইসলামী মনীষী ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। তার হৃদয় নিষ্পাপ ও নির্মল ভূমির মতো; তাকে যেভাবে গড়ে তোলা হবে, সে সেভাবেই বেড়ে উঠবে।

প্রকৃতপক্ষে একজন কন্যাসন্তানকে সৎ, শিক্ষিত, আদর্শবান ও দ্বীনদার হিসেবে গড়ে তোলা মানে শুধু একজন মানুষকে গড়ে তোলা নয়; বরং একটি সুন্দর পরিবার, একটি আদর্শ সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা। কারণ একজন মা-ই একটি জাতির প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

আজ যখন বিশ্বজুড়ে নারী নির্যাতন, বৈষম্য, অবমূল্যায়ন ও নৈতিক সংকট ক্রমেই বাড়ছে, তখন ইসলামের এই মহান শিক্ষাগুলো নতুন করে স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি। ইসলাম কন্যাসন্তানের প্রতি করুণা দেখায়নি; বরং তাকে মর্যাদা, অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

তাই কন্যাসন্তানের জন্মে হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক মূল্যবান নিয়ামত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তাকে ভালোবাসা, স্নেহ, শিক্ষা ও মর্যাদার মাধ্যমে বড় করে তোলা উচিত। কারণ যে ঘরে কন্যাসন্তানকে সম্মান করা হয়, যে ঘরে তার অধিকার রক্ষা করা হয়, যে ঘরে তাকে আল্লাহর আমানত হিসেবে লালন করা হয়—সেই ঘরেই নেমে আসে রহমত, শান্তি ও বরকতের অবারিত ধারা। অতএব, কন্যাসন্তান বোঝা নয়, সে আল্লাহর উপহার; অবহেলার নয়, সম্মানের; হতাশার নয়, বরং জান্নাতের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক মহামূল্যবান সুযোগ।

হাদিসের বাণী

কেয়ামতের আগে যখন আমনতদার খুঁজে পাওয়া যাবে না

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কেয়ামতের আগে যখন আমনতদার খুঁজে পাওয়া যাবে না

হুজাইফাতুল ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) আমাদের দুটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তার একটির নিদর্শন আমি দেখেছি, আর অপরটির জন্য অপেক্ষা করছি। মহানবী (সা.) আমাদের বলেছেন, নিশ্চয় আমানত মানুষের অন্তরের গভীরে নাজিল হয়েছে। এরপরে মানুষের ওপর কোরআন নাজিল হয়েছে। মানুষ কোরআন-হাদিস থেকে জ্ঞান অর্জন করেছে। এরপরে মহানবী (সা.) আমাদের আমানতের ব্যাপারে বললেন, একজন মানুষ ঘুমাবে, তখন তার অন্তর থেকে আমানতকে তুলে নেওয়া হবে। তখন তার অন্তরে দাগ পড়ে যাবে। এরপরে আবার ঘুমাবে, তখন তার অন্তর থেকে আমানত উঠিয়ে নেওয়া হবে। তখন তার অন্তরে একটি ফোসকা পড়ে যাবে-কোনো ব্যক্তি অঙ্গারকে পা দিয়ে পিষলে যেমন পড়ে, তেমন। তুমি তাতে পানি আছে মনে করবে, কিন্তু আসলে তার মধ্যে কোনো কিছুই নেই। তারপর মহানবী (সা.) একটি পাথরের টুকরো নিয়ে পায়ে ঘষা দিয়ে দেখালেন। তিনি বললেন, তখন মানুষ বেচাকেনা করবে, কিন্তু তেমন কাউকে আমানতদার পাওয়া যাবে না। সবাই বলাবলি করবে যে, অমুক গোত্রে একজন আমানতদার লোক আছে। তখন তার ব্যাপারে বলা হবে, কত উত্তম, ভালো, সম্মানিত ব্যক্তি! কিন্তু তার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ইমান অবশিষ্ট থাকবে না।

হুজাইফা (রা.) বলেন, আমি এমন যুগে ছিলাম, যখন এটা পরওয়া করতাম না যে, আমি কার সাথে লেনদেন করছি। কারণ, তখন সে মুসলমান হয়ে থাকলে তার দ্বীন আমাকে তার খিয়ানতি থেকে বিরত রেখেছিল। আর সে ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টান হয়ে থাকলে, শাসক আমার অধিকার ফিরিয়ে দেবে (এই বিশ্বাষ ছিল)। কিন্তু বর্তমানে আমি অমুক-অমুক ব্যক্তি ছাড়া তোমাদের কারো সাথে বেচাকেনা করতে পারব না।' (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৪৯৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৩৬৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ২৩২৫৫)

শিক্ষা ও বিধান 

১. আমানত শুধু কারো জিনিস গচ্ছিত রাখা নয়; বরং দায়িত্ব, কর্তব্য, প্রতিশ্রুতি, অধিকার ও বিশ্বাস রক্ষা করাও আমানতের অন্তর্ভুক্ত।

২. গুনাহ ও অবহেলার কারণে আমানত ধীরে ধীরে উঠে যায়। একবারে নয়, ধাপে ধাপে মানুষের অন্তর থেকে আমানত ও ঈমানের প্রভাব কমে যায়।

৩. আমানত উঠে যাওয়ার পর যে দাগ ও ফোসকার কথা বলা হয়েছে, তা অন্তরের কঠোরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক। বাহ্যিকভাবে মানুষ ভালো মনে হলেও অন্তর শূন্য হয়ে যেতে পারে।

৪. কিয়ামতের আগে আমানতদার লোক বিরল হয়ে যাবে। এমন সময় আসবে যখন একজন সৎ ও বিশ্বস্ত মানুষকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।

৫. আল্লাহর কাছে মূল বিষয় হলো অন্তরের ঈমান ও তাকওয়া। তাই বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে মানুষকে বিচার করা উচিত নয়।

৬. প্রকৃত মুমিন সেই, যার হাতে ও জিম্মায় মানুষ নিরাপদ থাকে। তাই মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো আমানতদারিতা।

৭. একজন মুসলমানের পরিচয় তার নাম বা পরিচয়ে নয়; বরং তার সততা ও আমানতদারিতায়। ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা, মিথ্যা ও খিয়ানত ঈমানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

সুতরাং যখন মানুষের অন্তর থেকে আমানতদারিতা চলে যায়, তখন সমাজে প্রতারণা, অবিশ্বাস ও নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে। তাই একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো নিজের ঈমান, সততা, দায়িত্ববোধ ও আমানতদারিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করা।