• ই-পেপার

বাগদাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থাগারের কান্না

কোরআনের বাণী

আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণপ্রাপ্তদের মর্যাদা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণপ্রাপ্তদের মর্যাদা
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

اِنَّ الَّذِیۡنَ سَبَقَتۡ لَهُمۡ مِّنَّا الۡحُسۡنٰۤی ۙ اُولٰٓئِكَ عَنۡهَا مُبۡعَدُوۡنَ

সরল অনুবাদ :
নিশ্চয় যাদের জন্য আমার পক্ষ থেকে পূর্ব থেকেই কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা (জাহান্নাম) থেকে দূরে রাখা হবে। (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০১)

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : 

পূর্ববর্তী ৯৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, ‘তোমরা এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যাদের ইবাদত কর, সবাই জাহান্নামের ইন্দন হবে।’ দুনিয়াতে কাফের-মুশরিকরা যেসব মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করেছে, এ আয়াতে তাদের সবার জাহান্নামে প্রবেশ করার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এ আয়াত শোনার পর কাফেররা এটা বলতে শুরু করল যে, যদি প্রত্যেক অবৈধ উপাস্যই জাহান্নামে যায় তবে ঈসা (আ.) ও ফেরেশতারাও জাহান্নামে যাবে; কারণ খৃষ্টানরা তো ঈসা (আ.) ও ফেরেশতাদের উপাসনা করে থাকে। তাহলে তারাও কি জাহান্নামে যাবেন? এর জওয়াবে আল্লাহ্ তাআলা এ আয়াত নাজিল করেন। 

এই আয়াতে বলা হচ্ছে যে, ঈসা (আ.) ও ফেরেশতাদের উপাসনা করা হলেও তারা জাহান্নামে যাবেন না। কারণ তাঁরা হলেন আল্লাহর নেক বান্দা; যাঁদের নেকীর কারণে আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা জাহান্নাম থেকে বহুগুণ দূরে থাকবেন। এখান থেকে এটাও পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, যে ব্যক্তি পৃথিবীতে এই ইচ্ছা ও কামনা রেখে মারা যায় যে, তার মৃত্যুর পর তার কবরকে মাজার বানানো হোক এবং লোকেরা তাকে প্রয়োজন পূরণকারী (দাতা) মনে করে তার নামে বিভিন্ন মান্নত পেশ করুক ও তার পূজা (ও সিজদাহ) করা হোক, তাহলে সে ব্যক্তিও জাহান্নামের ইন্ধন হবে। কারণ নিঃসন্দেহে সেই নেক মানুষদের আওতায় কখনও পড়বে না, ‘যাদের জন্য আল্লার নিকট থেকে পূর্ব হতে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে।’ (তাফসিরে আহসানুল বায়ান, মুস্তাদরাকে হাকিম, ২/৩৮৪–৩৮৫)

সুতরাং যারা দুনিয়ায় মানুষকে আল্লাহর ইবাদত করার শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং লোকেরা তাদেরই উপাস্য পরিণত করে অথবা যারা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ বেখবর যে দুনিয়ায় তাদের কবরের পূজা করা হচ্ছে আর এ কাজে তাদের ইচ্ছা ও আকাংখা না থাকে, তাহলে তাদের জাহান্নামে যাওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ, তারা এ শিরকের জন্য দায়ী নয়। (তাফসিরে জাকারিয়া)


শিক্ষা ও বিধান

১. জান্নাত লাভ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে মানুষের  আমল যথেষ্ট নয়; বরং আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ জরুরি।

২. যারা ঈমান ও সৎকর্মের ওপর জীবন অতিবাহিত করে, তাদের জন্য আল্লাহ পূর্ব থেকেই কল্যাণ ও মুক্তির ফয়সালা রাখেন।

৩. মুমিনদের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাতে প্রবেশের সৌভাগ্য লাভ করা।

৪. আল্লাহ যাদের জন্য কল্যাণ নির্ধারণ করেন, তাদের তিনি অবশ্যই জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবেন। তাঁর ওয়াদা কখনো ভঙ্গ হয় না।

৫. আল্লাহর নৈকট্য ও কল্যাণ লাভের জন্য বিশুদ্ধ আকিদা, ইখলাস এবং সৎকর্ম অপরিহার্য।

৬. যাদের জন্য কল্যাণ নির্ধারিত হয়েছে, তারা আল্লাহর জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতেই সেই মর্যাদা লাভ করবে।

আল্লাহর প্রতি ঈমান, আন্তরিক আনুগত্য এবং সৎকর্মের মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের অধিকারী হয়। তখন আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখেন এবং তার জন্য চিরস্থায়ী সফলতার পথ উন্মুক্ত করে দেন। তাই প্রত্যেক মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন আমল করা, যা তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত সেই ‘হুসনা’ বা সর্বোত্তম কল্যাণের যোগ্য করে তোলে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুক। আমিন। 
 

কন্যাসন্তান : আল্লাহর রহমত, ঘরের বরকত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কন্যাসন্তান : আল্লাহর রহমত, ঘরের বরকত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম
সংগৃহীত ছবি

এক সময় পৃথিবীর বহু সমাজে কন্যাসন্তান ছিল অবহেলা, অপমান ও বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে জাহেলি আরব সমাজে কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জা ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক মনে করা হতো। এমনকি অনেক নিষ্ঠুর পিতা নিজের নবজাতক কন্যাকে জীবন্ত মাটিচাপা দিতেও দ্বিধা করত না। মানবতার ইতিহাসে এটি ছিল এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ঠিক সেই অন্ধকার যুগেই ইসলাম এসে কন্যাসন্তানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য বিপ্লব ঘটায়। যে কন্যাসন্তানকে সমাজ বোঝা মনে করত, ইসলাম তাকে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত, ঘরের বরকত এবং জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৪৯)

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রথমে কন্যাসন্তানের কথা উল্লেখ করেছেন। মুফাসসিরগণ বলেন, এর মধ্যে কন্যাসন্তানের মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত রয়েছে। কারণ যে সমাজ কন্যাসন্তানকে অবজ্ঞা করত, আল্লাহ তাআলা সেই সমাজের ভুল ধারণাকে ভেঙে দিয়ে কন্যাসন্তানকে সম্মানিত করেছেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে কন্যাসন্তান হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি মূল্যবান আমানত। তার সঠিক লালন-পালন, শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের দায়িত্ব পালন করলে তা পিতা-মাতার জন্য জান্নাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুই কন্যাসন্তানকে লালন-পালন করবে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এভাবে একসঙ্গে থাকব।’ এরপর তিনি নিজের দুই আঙুল একত্র করে দেখালেন।’ (সহিহ মুসলিম, আয়াত : ২৬৩১)

একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের সংবাদ আর কী হতে পারে! কন্যাসন্তানের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে কিয়ামতের দিন সে মহানবী (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করবে। অন্য এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যার ঘরে কন্যাসন্তান আসে এবং সে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে, তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড়াল হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৪১৮, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৬২৯)

এ হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কন্যাসন্তান আল্লাহর রহমত এবং তাদের যথাযথ প্রতিপালন মহান সওয়াবের কাজ। অথচ জাহেলি যুগের মানুষ কন্যাসন্তানের জন্মসংবাদ শুনে লজ্জা ও দুঃখে ভেঙে পড়ত। আল্লাহ তাআলা তাদের সেই মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হতো, তখন তার মুখ কালো হয়ে যেত এবং সে দুঃখে কাতর থাকত।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৫৮)

দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক যুগেও অনেক সমাজে সেই জাহেলি মানসিকতার কিছু না কিছু ছাপ রয়ে গেছে। কোথাও কন্যাসন্তানের জন্মে আনন্দের পরিবর্তে হতাশা দেখা যায়, কোথাও তাকে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, কোথাও আবার উত্তরাধিকার ও সম্পদের ন্যায্য অধিকার থেকেও দূরে রাখা হয়। এসব আচরণ ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মহানবী (সা.) নিজের জীবনে কন্যাসন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.) যখন তাঁর কাছে আসতেন, তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন, তাকে সাদরে গ্রহণ করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় বসাতেন।’ (আবু দাউদ, আয়াত : ৫২১৭)

এটি শুধু একজন পিতার ভালোবাসা ছিল না; বরং সমগ্র উম্মতের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা ছিল যে, কন্যাসন্তান সম্মান, মর্যাদা ও ভালোবাসার পূর্ণ অধিকারী। তবে কন্যাসন্তানের হক আদায় শুধু খাদ্য, পোশাক ও আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, উত্তম চরিত্র গঠনে সহায়তা করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করা এবং সমাজের উপকারী সদস্য হিসেবে গড়ে তোলাও পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব।

প্রখ্যাত ইসলামী মনীষী ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। তার হৃদয় নিষ্পাপ ও নির্মল ভূমির মতো; তাকে যেভাবে গড়ে তোলা হবে, সে সেভাবেই বেড়ে উঠবে।

প্রকৃতপক্ষে একজন কন্যাসন্তানকে সৎ, শিক্ষিত, আদর্শবান ও দ্বীনদার হিসেবে গড়ে তোলা মানে শুধু একজন মানুষকে গড়ে তোলা নয়; বরং একটি সুন্দর পরিবার, একটি আদর্শ সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা। কারণ একজন মা-ই একটি জাতির প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

আজ যখন বিশ্বজুড়ে নারী নির্যাতন, বৈষম্য, অবমূল্যায়ন ও নৈতিক সংকট ক্রমেই বাড়ছে, তখন ইসলামের এই মহান শিক্ষাগুলো নতুন করে স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি। ইসলাম কন্যাসন্তানের প্রতি করুণা দেখায়নি; বরং তাকে মর্যাদা, অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

তাই কন্যাসন্তানের জন্মে হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক মূল্যবান নিয়ামত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তাকে ভালোবাসা, স্নেহ, শিক্ষা ও মর্যাদার মাধ্যমে বড় করে তোলা উচিত। কারণ যে ঘরে কন্যাসন্তানকে সম্মান করা হয়, যে ঘরে তার অধিকার রক্ষা করা হয়, যে ঘরে তাকে আল্লাহর আমানত হিসেবে লালন করা হয়—সেই ঘরেই নেমে আসে রহমত, শান্তি ও বরকতের অবারিত ধারা। অতএব, কন্যাসন্তান বোঝা নয়, সে আল্লাহর উপহার; অবহেলার নয়, সম্মানের; হতাশার নয়, বরং জান্নাতের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক মহামূল্যবান সুযোগ।

হাদিসের বাণী

কেয়ামতের আগে যখন আমনতদার খুঁজে পাওয়া যাবে না

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কেয়ামতের আগে যখন আমনতদার খুঁজে পাওয়া যাবে না

হুজাইফাতুল ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) আমাদের দুটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তার একটির নিদর্শন আমি দেখেছি, আর অপরটির জন্য অপেক্ষা করছি। মহানবী (সা.) আমাদের বলেছেন, নিশ্চয় আমানত মানুষের অন্তরের গভীরে নাজিল হয়েছে। এরপরে মানুষের ওপর কোরআন নাজিল হয়েছে। মানুষ কোরআন-হাদিস থেকে জ্ঞান অর্জন করেছে। এরপরে মহানবী (সা.) আমাদের আমানতের ব্যাপারে বললেন, একজন মানুষ ঘুমাবে, তখন তার অন্তর থেকে আমানতকে তুলে নেওয়া হবে। তখন তার অন্তরে দাগ পড়ে যাবে। এরপরে আবার ঘুমাবে, তখন তার অন্তর থেকে আমানত উঠিয়ে নেওয়া হবে। তখন তার অন্তরে একটি ফোসকা পড়ে যাবে-কোনো ব্যক্তি অঙ্গারকে পা দিয়ে পিষলে যেমন পড়ে, তেমন। তুমি তাতে পানি আছে মনে করবে, কিন্তু আসলে তার মধ্যে কোনো কিছুই নেই। তারপর মহানবী (সা.) একটি পাথরের টুকরো নিয়ে পায়ে ঘষা দিয়ে দেখালেন। তিনি বললেন, তখন মানুষ বেচাকেনা করবে, কিন্তু তেমন কাউকে আমানতদার পাওয়া যাবে না। সবাই বলাবলি করবে যে, অমুক গোত্রে একজন আমানতদার লোক আছে। তখন তার ব্যাপারে বলা হবে, কত উত্তম, ভালো, সম্মানিত ব্যক্তি! কিন্তু তার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ইমান অবশিষ্ট থাকবে না।

হুজাইফা (রা.) বলেন, আমি এমন যুগে ছিলাম, যখন এটা পরওয়া করতাম না যে, আমি কার সাথে লেনদেন করছি। কারণ, তখন সে মুসলমান হয়ে থাকলে তার দ্বীন আমাকে তার খিয়ানতি থেকে বিরত রেখেছিল। আর সে ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টান হয়ে থাকলে, শাসক আমার অধিকার ফিরিয়ে দেবে (এই বিশ্বাষ ছিল)। কিন্তু বর্তমানে আমি অমুক-অমুক ব্যক্তি ছাড়া তোমাদের কারো সাথে বেচাকেনা করতে পারব না।' (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৪৯৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৩৬৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ২৩২৫৫)

শিক্ষা ও বিধান 

১. আমানত শুধু কারো জিনিস গচ্ছিত রাখা নয়; বরং দায়িত্ব, কর্তব্য, প্রতিশ্রুতি, অধিকার ও বিশ্বাস রক্ষা করাও আমানতের অন্তর্ভুক্ত।

২. গুনাহ ও অবহেলার কারণে আমানত ধীরে ধীরে উঠে যায়। একবারে নয়, ধাপে ধাপে মানুষের অন্তর থেকে আমানত ও ঈমানের প্রভাব কমে যায়।

৩. আমানত উঠে যাওয়ার পর যে দাগ ও ফোসকার কথা বলা হয়েছে, তা অন্তরের কঠোরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক। বাহ্যিকভাবে মানুষ ভালো মনে হলেও অন্তর শূন্য হয়ে যেতে পারে।

৪. কিয়ামতের আগে আমানতদার লোক বিরল হয়ে যাবে। এমন সময় আসবে যখন একজন সৎ ও বিশ্বস্ত মানুষকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।

৫. আল্লাহর কাছে মূল বিষয় হলো অন্তরের ঈমান ও তাকওয়া। তাই বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে মানুষকে বিচার করা উচিত নয়।

৬. প্রকৃত মুমিন সেই, যার হাতে ও জিম্মায় মানুষ নিরাপদ থাকে। তাই মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো আমানতদারিতা।

৭. একজন মুসলমানের পরিচয় তার নাম বা পরিচয়ে নয়; বরং তার সততা ও আমানতদারিতায়। ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা, মিথ্যা ও খিয়ানত ঈমানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

সুতরাং যখন মানুষের অন্তর থেকে আমানতদারিতা চলে যায়, তখন সমাজে প্রতারণা, অবিশ্বাস ও নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে। তাই একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো নিজের ঈমান, সততা, দায়িত্ববোধ ও আমানতদারিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করা।

মসজিদে বসে থাকলেও সওয়াব লাভ হয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
মসজিদে বসে থাকলেও সওয়াব লাভ হয়
সংগৃহীত ছবি

মসজিদ মুসলমানের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এটি শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; বরং ঈমান, ইবাদত, জ্ঞানচর্চা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকার এক পবিত্র পরিবেশ। অনেকেই মনে করেন, মসজিদে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য শুধু নামাজ আদায় করা। তাই নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা মসজিদ ত্যাগ করেন। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, মসজিদে অবস্থান করা, আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকা এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষায় বসে থাকাও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। এমনকি একজন মুমিন মসজিদে বসে থাকলেও আল্লাহর বিশেষ রহমত, ফেরেশতাদের দোয়া এবং অসংখ্য সওয়াব লাভ করতে পারেন। মহানবী (সা.)-এর বহু হাদিসে এ বিষয়ে সুসংবাদ বর্ণিত হয়েছে।

মসজিদে অবস্থানকারীর প্রতি আল্লাহর বিশেষ সন্তুষ্টি
মসজিদে অবস্থান করা আল্লাহ তাআলার নিকট অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল। যে ব্যক্তি সালাত, জিকির ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করে, তার প্রতি আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যতক্ষণ মসজিদে সালাত ও জিকিরে রত থাকে, ততক্ষণ আল্লাহ তার প্রতি এতটা আনন্দিত হন, প্রবাসী ব্যক্তি তার পরিবারে ফিরে এলে তারা তাকে পেয়ে যেরূপ আনন্দিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮০০)

এভাবে মসজিদে অবস্থানকারী ব্যক্তি আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও সন্তুষ্টির পাত্র হয়ে যান। একজন প্রবাসী দীর্ঘদিন পর যখন আপনজনদের কাছে ফিরে আসে, তখন পরিবারের সদস্যরা যে আনন্দ অনুভব করেন, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির তুলনা তার সঙ্গে করা হয়েছে। এটি মসজিদে অবস্থানের মর্যাদা ও ফজিলতের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত।

মসজিদে বসে থাকলে ফেরেশতাদের দোয়া লাভ
মসজিদে অবস্থানকারীর জন্য আরেকটি মহান সুসংবাদ হলো—ফেরেশতারা তার জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করতে থাকেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যতক্ষণ তার সালাতের স্থানে থাকে, তার অজু ভঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত তার জন্য ফেরেশতারা এই বলে দোয়া করে, ‘হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! আপনি তাকে রহম করুন।’ আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তির সালাত তাকে বাড়ি ফিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখে, সে সালাতরত আছে বলে পরিগণিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫৯)

এ হাদিস থেকে জানা যায়, ফরজ সালাতের পর কিংবা পরবর্তী সালাতের অপেক্ষায় মসজিদে বসে থাকা ব্যক্তি যেন ইবাদতের মধ্যেই অবস্থান করছেন। শুধু তাই নয়, আল্লাহর নিষ্পাপ ফেরেশতারা তার জন্য অবিরাম ক্ষমা ও রহমতের আবেদন করতে থাকেন। একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!

এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষার বিশেষ মর্যাদা
ইসলামে এক ফরজ সালাত আদায়ের পর পরবর্তী ফরজ সালাতের অপেক্ষা করাও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। এটি মানুষের হৃদয়ে মসজিদের প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহর ইবাদতের প্রতি গভীর আগ্রহের পরিচয় বহন করে। আবদুর রহমান ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করলাম। এরপর কেউ চলে গেল, কেউ থেকে গেল। কিছুক্ষণ পর মহানবী (সা.) দ্রুতবেগে এসে বসলেন এবং বললেন, ‘তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমাদের রব আসমানের একটি দরজা খুলে দিয়েছেন এবং ফেরেশতাদের কাছে তোমাদের সম্পর্কে গর্ব করে বলছেন, ‘তোমরা আমার বান্দাদের দিকে তাকিয়ে দেখ, তারা এক ফরজ আদায়ের পর পরবর্তী ফরজ আদায়ের জন্য অপেক্ষা করছে।’(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮০১)

কত বড় সম্মানের বিষয়! আল্লাহ তাআলা স্বয়ং ফেরেশতাদের সামনে এমন বান্দাদের প্রশংসা করছেন, যারা মসজিদে অবস্থান করে পরবর্তী নামাজের অপেক্ষা করছে। এটি প্রমাণ করে যে, মসজিদের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ইবাদতের পরিবেশে সময় কাটানো আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।

মসজিদে সময় কাটানোর কিছু আমল
কোরআন তিলাওয়াত করা, আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ পাঠ করা, দরুদ শরিফ পাঠ করা, দোয়া ও ইস্তিগফারে মশগুল থাকা, ইসলামি জ্ঞান অর্জন করা, নফল নামাজ আদায় করা, আত্মসমালোচনা ও তাওবা করা ইত্যাদি। এসব আমল মসজিদে কাটানো সময়কে আরো অর্থবহ ও বরকতময় করে তোলে।

সুতরাং মসজিদ হলো মুমিনের আত্মিক প্রশান্তি, ঈমানি শক্তি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। তাই নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদ ত্যাগ না করে কিছু সময় আল্লাহর জিকির, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও ইবাদতে ব্যয় করা উচিত। মসজিদে অবস্থানকারী বান্দার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, ফেরেশতারা তার জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করেন এবং সে ব্যক্তি এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষার মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। সুতরাং আমাদের উচিত মসজিদের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক আরো গভীর করা এবং এই মহৎ আমলের মাধ্যমে আল্লাহর অশেষ রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।