একটি জাতির মৃত্যু সবসময় যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে না। অনেক জাতি পরাজিত হয়েছে তলোয়ারের আঘাতে, আবার অনেক জাতি ইতিহাস থেকে মুছে গেছে নিজেদের স্মৃতি হারিয়ে। প্রথম মৃত্যুর শব্দ শোনা যায়; দ্বিতীয় মৃত্যু ঘটে নিঃশব্দে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে স্মৃতি যেমন পরিচয়ের ভিত্তি, সভ্যতার জীবনেও তেমনি স্মৃতি তার আত্মপরিচয়ের উৎস। আমরা কে, কোথা থেকে এলাম, কীভাবে চিন্তা করতে শিখলাম, কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছি—এই দীর্ঘ যাত্রার নামই সভ্যতা। আর এই যাত্রার দলিল সংরক্ষিত থাকে বইয়ে, পাণ্ডুলিপিতে, গ্রন্থাগারে। তাই কোনো গ্রন্থাগার পুড়ে যাওয়া মানে শুধু কিছু বই নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো একটি সভ্যতার স্মৃতিভাণ্ডারে আগুন লেগে যাওয়া।
মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে এমন বহু আগুনের কথা আমরা জানি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা সাধারণত আগুনের দিকে তাকাই, ছাইয়ের দিকে নয়। আমরা বাগদাদের পতনের কথা বলি, কিন্তু ভাবি না সেই পতনের পর কোন কোন প্রশ্ন হারিয়ে গেল। আমরা আন্দালুসের রাজনৈতিক পরাজয় নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু খুব কমই আলোচনা করি সেই বইগুলোর কথা, যেগুলো আর কখনো কোনো পাঠকের হাতে পৌঁছায়নি।
ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, মানুষ হত্যার চেয়ে বই হত্যা কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনে। কারণ একজন মানুষের মৃত্যু একটি জীবনের সমাপ্তি ঘটায়, কিন্তু একটি বইয়ের মৃত্যু অনেক সম্ভাব্য জীবনের চিন্তাকে অসম্পূর্ণ করে দেয়।
মধ্যযুগীয় মুসলিম বিশ্বকে আমরা প্রায়ই স্বর্ণযুগ বলে উল্লেখ করি। কিন্তু এই শব্দটির ভেতরের অর্থ নিয়ে খুব কম ভাবি। স্বর্ণযুগ মানে শুধু ক্ষমতা, সম্পদ বা সামরিক সাফল্য নয়। স্বর্ণযুগ মানে এমন এক সময়, যখন একটি সভ্যতা প্রশ্ন করতে ভয় পায় না। বাগদাদের রাস্তায় তখন একই শহরে ফকিহ, দার্শনিক, চিকিৎসক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং ভাষাবিদ হাঁটতেন। মতভেদ ছিল, বিতর্ক ছিল, এমনকি তীব্র বিরোধও ছিল। কিন্তু তার পরও জ্ঞান উৎপাদনের প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি। কারণ সভ্যতাগুলো প্রশ্নের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে, উত্তরের ভেতর দিয়ে নয়। এখানেই গ্রন্থাগারের প্রকৃত তাৎপর্য।
গ্রন্থাগার মূলত বইয়ের গুদাম নয়; এটি একটি সভ্যতার আত্মসমালোচনার স্থান। সেখানে অতীত বর্তমানের সঙ্গে কথা বলে। মৃত মানুষের চিন্তা জীবিত মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ যে কথোপকথন চালিয়ে যায়, গ্রন্থাগার তারই দৃশ্যমান রূপ। সম্ভবত এ কারণেই ইতিহাসে স্বৈরতন্ত্র বইকে ভয় পেয়েছে। আগুন প্রথমে গ্রন্থাগারে যায়, কারণ ক্ষমতা জানে—একটি বইয়ের ভেতরে কখনো কখনো একটি সেনাবাহিনীর চেয়েও বেশি শক্তি লুকিয়ে থাকে। তবে মুসলিম বিশ্বের ট্র্যাজেডি শুধু এই নয় যে তার গ্রন্থাগারগুলো ধ্বংস হয়েছে। আরও বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমরা ধীরে ধীরে গ্রন্থাগার হারানোর শোকও ভুলে গেছি।
আজ আমাদের শহরে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক বেশি শিক্ষার্থী আছে। তথ্যের প্রাচুর্যও অভূতপূর্ব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জ্ঞান কি সত্যিই বেড়েছে? তথ্য ও জ্ঞানের পার্থক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য মানুষকে সংবাদ দেয়, জ্ঞান মানুষকে দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। তথ্য জানায় কী ঘটেছে; জ্ঞান বুঝতে শেখায় কেন ঘটেছে। একটি সভ্যতা তখনই সংকটে পড়ে, যখন সে তথ্য সংগ্রহকে জ্ঞানচর্চা বলে ভুল করতে শুরু করে।
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান সংকটের একটি অংশ সম্ভবত এখানেই নিহিত। আমরা আমাদের অতীতকে স্মরণ করি, কিন্তু তার সঙ্গে সংলাপ করি না। আমরা ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু তাকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাই না। ফলে ঐতিহ্য ধীরে ধীরে জীবন্ত উত্তরাধিকার থেকে স্মারকে পরিণত হয়। কোনো সভ্যতার জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ আর নেই।
কারণ সভ্যতার পতন শুরু হয় না তখন, যখন তার গ্রন্থাগার পুড়ে যায়। পতন শুরু হয় তখন, যখন গ্রন্থাগার অক্ষত থাকে কিন্তু পাঠক হারিয়ে যায়; যখন বই টিকে থাকে কিন্তু প্রশ্ন হারিয়ে যায়; যখন স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে কিন্তু তার অর্থ বিস্মৃত হয়। এই অর্থে হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থাগারের কান্না অতীতের কোনো বিলাপ নয়। এটি বর্তমানের প্রতিধ্বনি। সেই প্রতিধ্বনি আমাদের জিজ্ঞেস করে—আমরা কি সত্যিই আমাদের স্মৃতি রক্ষা করছি, নাকি শুধু তার ধ্বংসাবশেষ পাহারা দিচ্ছি? প্রশ্নটি ইতিহাসের নয়, ভবিষ্যতের।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মানার মহাখালী ঢাকা।




