• ই-পেপার

ভরণ-পোষণ আইন কি বৃদ্ধদের নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারে

  • ড. সুলতান মাহমুদ রানা

বিষাক্ত ধোঁয়া ও শব্দদূষণে বিপন্ন শৈশব

ড. মো. তারেকুজ্জামান

বিষাক্ত ধোঁয়া ও শব্দদূষণে বিপন্ন শৈশব

রাজধানীর বাড্ডা, বিশেষ করে সাঁতারকুল ও উত্তর বাড্ডা এলাকা একসময় ছিল শান্ত আবাসিক অঞ্চল। কিন্তু বর্তমানে এই এলাকাগুলো অনিয়ন্ত্রিত ফার্নিচার কারখানার কারণে ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটে পড়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে গড়ে ওঠা অসংখ্য অনুমোদনহীন কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, রাসায়নিক গন্ধ এবং তীব্র শব্দ স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।

৫০০ শিশুর ওপর পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তারা প্রতিদিন বাতাসে কাঠের গুঁড়া উড়তে দেখে এবং প্রায় ৮৮ শতাংশ শিশু নিয়মিত কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে (স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও এলাকাবাসীর দাবি)। প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, বাতাসে ভাসমান কেমিক্যালের কারণে তাদের চোখে জ্বালাপোড়া হয় এবং শরীরে চুলকানি সৃষ্টি হয়। শিশুদের প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে বাস্তব চিত্র—‘স্কুলে যেতে কষ্ট হয়, শ্বাস নিতে সমস্যা হয়, খেলতে গেলেই অসুস্থ লাগে

ফার্নিচার কারখানাগুলোয় ব্যবহৃত থিনার, লেকার এবং আঠা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় সিসার মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকে। এসব উপাদান শিশুদের ফুসফুস ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে (প্রতিদিনের সংবাদ : বায়ুদূষণ ও সিসার প্রভাববিষয়ক প্রতিবেদন)। জরিপ অনুযায়ী প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু চোখে জ্বালাপোড়া ও ত্বকে অস্বস্তির কথা বলেছে। অনেক শিশু বলেছে, চোখ লাল হয়ে যায়; ধোঁয়ার গন্ধে মাথাব্যথা করে’—যা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়ছে। প্রায় ৯৬ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তারা মনোযোগের সমস্যায় ভুগছে এবং অস্থিরতা অনুভব করে। প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু দূষণের কারণে বাইরে খেলাধুলা করতে ভয় পায়। ফলে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইউনিসেফ ও এসওজিএর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশের পেছনে বায়ুদূষণ একটি বড় কারণ (ইউনিসেফ ও এসওজিএ প্রতিবেদন, জুন ২০২৪)।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও এই দূষণের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। আইডিয়াল হোমস স্কুল, সাঁতারকুল স্কুল এবং বাড্ডা রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের শিক্ষকদের মতে, দূষণের কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমছে এবং তারা ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছে না (স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও এলাকাবাসীর দাবি)। অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থতার কারণে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারছে না।

অন্যদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শ্রমিকরা কারখানার ভেতরেই বসবাস করে। তারা সেখানেই রান্না করে, ঘুমায় এবং অনেক সময় মশা তাড়াতে বা শীত নিবারণে কাঠ জ্বালায়, যা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ায় (বাংলাভিশন/নিউজ বাংলা ২৪ : সাঁতারকুলে অগ্নিকাণ্ড প্রতিবেদন; বাড্ডা এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের তথ্যচিত্র)। ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর সাঁতারকুলে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা পুরো এলাকার নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে (বাংলাভিশন/নিউজ বাংলা ২৪ প্রতিবেদন)।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব কারখানায় কোনো নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মানা হয় না। গভীর রাত পর্যন্ত চলে করাত, ড্রিল মেশিন ও পালিশের কাজ। এতে শিশুদের ঘুম ব্যাহত হয় এবং রোগীদের কষ্ট বাড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতে শব্দে ঘুমানো যায় না, বাচ্চারা পড়াশোনা করতে পারে না, রাস্তায় বের হলেও নিরাপত্তা নেই

জরিপে শিশুদের মতামতেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এসেছে। অনেক শিশু বলেছে, কারখানা বাড়ি থেকে দূরে সরানো উচিত, দূষণ বন্ধ করতে হবে, আইন মেনে কারখানা চালাতে হবে। প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি শিশু মনে করে, মানুষ এই সমস্যা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নয় এবং সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। তারা আরো বলেছে, আমরা পরিষ্কার বাতাস চাই, নিরাপদে খেলতে চাই, যা তাদের মৌলিক অধিকারের প্রতিফলন।

এ ছাড়া এলাকাবাসীর দৈনন্দিন জীবনেও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সরু রাস্তায় পিকআপ ভ্যান ঢুকে যানজট সৃষ্টি করছে, রাস্তায় লোহা ও কাঠের টুকরা পড়ে থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। নর্দমায় কাঠের গুঁড়া ফেলার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এমনকি আশপাশের খাল-বিলের পানির রং ও গন্ধ পরিবর্তিত হয়ে গেছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছেন। প্রথমত, আবাসিক এলাকা থেকে এসব কারখানা সরিয়ে শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করতে হবে (স্থানীয় পর্যবেক্ষণ)। দ্বিতীয়ত, কারখানায় আধুনিক ফিল্টার ও এগজস্ট সিস্টেম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে বায়ুদূষণ কমানো যায় (প্রতিদিনের সংবাদ প্রতিবেদন)। তৃতীয়ত, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার ডিটেক্টর ও নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন জরুরি (বাংলাভিশন/নিউজ বাংলা ২৪; অগ্নিকাণ্ড বিষয়ক তথ্যচিত্র)। চতুর্থত, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং বিশেষ স্বাস্থ্য কার্ড চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে (ইউনিসেফ ও এসওজিএ প্রতিবেদন)। একই সঙ্গে শিশুশ্রম বন্ধ করা এবং শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে বলা যায়, বাড্ডা ও সাঁতারকুল এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি একটি গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। অবহেলা ও অনিয়মের কারণে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই সমস্যা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। শিশুদের নিরাপদ, সুস্থ ও স্বাভাবিক শৈশব নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক : উপপরিচালক, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স (বিটিএস)

ধর্ষণ : বাংলাদেশের জবাবদিহিহীন সংকট

মে. জে. এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব)

ধর্ষণ : বাংলাদেশের জবাবদিহিহীন সংকট

ধর্ষণ একটি সমাজের নিজের ওপর করা সবচেয়ে বিধ্বংসী অপরাধগুলোর মধ্যে একটি। এটি একই সঙ্গে সবচেয়ে অন্তরঙ্গ ধরনের ব্যক্তিগত লঙ্ঘন এবং একটি সামাজিক ক্ষত, যা ব্যক্তি ভুক্তভোগীর বাইরে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং যেকোনো সভ্য সমাজের ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা নৈতিক মেরুদণ্ডকে পচিয়ে দেয়। এটি যে বাড়ছে-শুধু বেশি রিপোর্ট হচ্ছে তা নয়এই বাস্তবতা বাংলাদেশ আর শুধু ফিসফিসিয়ে আলোচনা করে বা দ্রুত নিভে যাওয়া মোমবাতি মিছিলে সামলাতে পারবে না।

ঐতিহাসিক তথ্য কোনো সান্ত্বনা দেয় না। বাংলাদেশের জাতীয় অপরাধ গবেষণা কেন্দ্র এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দুই দশক ধরে একটি ত্বরান্বিত প্রবণতা নথিভুক্ত করেছে। দেশের অন্যতম সম্মানিত মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২০ সালেই বাংলাদেশে কমপক্ষে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ২০৮ জন গণধর্ষণের শিকার এবং ৪৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো শুধু রিপোর্ট করা মামলার প্রতিনিধিত্ব করে এবং এমন একটি সমাজে যেখানে লজ্জা, পারিবারিক চাপ, আইনি ব্যবস্থার ভয় এবং পুলিশের প্রতি অবিশ্বাস বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভুক্তভোগীকে কখনো সামনে আসতে বাধা দেয়, প্রকৃত সংখ্যা সরকারি রেকর্ডে যা দেখা যায় তার বহুগুণ বলে বিশ্বাস করা হয়। জাতিসংঘ ধারাবাহিকভাবে অনুমান করেছে যে বিশ্বব্যাপী দশটির মধ্যে একটিরও কম ধর্ষণের মামলা কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট হয়। বাংলাদেশে সেই অনুপাত আরো কম বলে মনে করা হয়।

ধর্ষণ : বাংলাদেশের জবাবদিহিহীন সংকটএই অপরাধ কেন টিকে থাকে এবং বাড়তে থাকে তা বোঝার জন্য কারণগুলোর একটি সৎ ও নির্ভীক পরীক্ষা দরকারযে ধরনের পরীক্ষা ক্ষমতাহীনদের দোষ দিয়ে ক্ষমতাশালীদের রক্ষা করে না, বরং সরাসরি তাকিয়ে দেখে কী প্রকৃতপক্ষে অপরাধী তৈরি করছে। পর্নোগ্রাফির বিস্তার এবং অনলাইনে যৌন উত্তেজক বিষয় বস্তুতে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার একটি সত্যিকারের অবদানকারী কারণ, কিন্তু এটি সঠিকভাবে বুঝতে হবে। সমস্যা এই নয় যে পর্নোগ্রাফি যৌনতাকে চিত্রিত করেসমস্যা হলো বিশ্বের প্রভাবশালী পর্নোগ্রাফি শিল্প অপ্রতিরোধ্যভাবে নারীকে সম্মান করার মানুষ নয়; বরং ব্যবহার করার শরীর হিসেবে চিত্রিত করে এবং প্রায়ই সহিংসতা, জবরদস্তি এবং অবমাননাকে কামোদ্দীপক হিসেবে স্বাভাবিক করে তোলে। যখন বাংলাদেশে ধর্ষণ অপরাধীদের গড় বয়স বছরের পর বছর ধরে কমছেসম্মতি, মর্যাদা এবং সমান মানবতা সম্পর্কে কোনো পাল্টা আখ্যান ছাড়াই এই বিষয়বস্তু গ্রহণ করে, তখন এটি এমনভাবে মনোভাব গঠন করে, যা একাধিক দেশের গবেষকরা নথিভুক্ত করেছেন। অ্যাগ্রেসিভ বিহেভিয়ার জার্নালে প্রকাশিত ২০১৫ সালের একটি মেটা-বিশ্লেষণ, সাতটি দেশের গবেষণা পর্যালোচনা করে পর্নোগ্রাফি ব্যবহার এবং যৌন আগ্রাসন সমর্থনকারী মনোভাব উভয়ের এবং প্রকৃত যৌনভাবে আক্রমণাত্মক আচরণের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে।

এই অপরাধের গভীর কারণগুলো কাঠামোর মধ্যে নিহিত। পিতৃতন্ত্রে একটি ব্যবস্থা হিসেবে যা শৈশব থেকে পুরুষদের শেখায় যে নারীর শরীর পুরুষের ব্যবহারের জন্য উপলব্ধ, যে পুরুষালি পরিচয় আধিপত্য ও যৌন জয়ের সঙ্গে যুক্ত, যে নারীর প্রত্যাখ্যান অতিক্রম করার একটি চ্যালেঞ্জ, সম্মান করার সীমানা নয়। বাংলাদেশে এই পিতৃতান্ত্রিক গঠন একাধিক প্রতিষ্ঠানে একযোগে শক্তিশালী হয়: এমন পরিবারে যেখানে মেয়েদের চুপ থাকতে এবং ছেলেদের সাহসী হতে শেখানো হয়, এমন শিক্ষাক্রমে যেখানে সম্মতি বা শারীরিক স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে কার্যত কোনো অর্থবহ বিষয়বস্তু নেই, এমন ধর্মীয় ব্যাখ্যায় যা নারীর আচরণ নিয়ন্ত্রণে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় পুরুষের আচরণকে মূলত অপরীক্ষিত রেখে এবং এমন আইনি ও আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থায় যা দশকের পর দশক ধরে ধর্ষণকে ব্যক্তিগত অপরাধমূলক লঙ্ঘনের পরিবর্তে পারিবারিক সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখেছে।

নারীর পোশাক ধর্ষণের কারণএই যুক্তি শুধু অভিজ্ঞতাগতভাবে অসমর্থিত নয়, এটি নৈতিকভাবে ক্ষতিকর। পোশাকবিধি-নির্বিশেষে প্রতিটি দেশে ধর্ষণ ঘটে, প্রতিটি ঋতুতে, সব বয়সের নারীর বিরুদ্ধে শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত, পূর্ণ আবরণে নারী এবং পশ্চিমা পোশাকে নারী উভয়ের বিরুদ্ধে। নারীদের জন্য সবচেয়ে রক্ষণশীল পোশাকের দাবি রাখে এমন দেশগুলো সর্বনিম্ন ধর্ষণের হারের দেশ নয়।

নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকেও রক্ষণশীল আলোচনায় দোষ দেওয়া হয়, কিন্তু তথ্য এই থিসিসকে সমর্থন করে না। বাংলাদেশে, বেশির ভাগ দেশের মতো, বেশির ভাগ ধর্ষণ অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা নয়; বরং ভুক্তভোগীর পরিচিত ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত হয় প্রতিবেশী, আত্মীয়, নিয়োগকর্তা, শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। অন্ধকারে ওত পেতে থাকা অপরিচিত ধর্ষকের কল্পকাহিনি আসলে অনেক বেশি সাধারণ বাস্তবতা থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার কাজ করে বিশ্বস্ত ব্যক্তি যে নৈকট্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে। যা প্রকৃতপক্ষে ধর্ষণ সংস্কৃতি তৈরি ও টিকিয়ে রাখে তা হলো দায়মুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং নারীর প্রতি সামাজিকীকৃত অবজ্ঞার সমন্বয়।

বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্তের হার ঐতিহাসিকভাবে এবং বিপর্যয়করভাবে কম। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্তের হার ছিল ২ শতাংশেরও নিচে। এর মানে হলো বাংলাদেশে একজন পুরুষ যে একজন নারীকে ধর্ষণ করে তার ৯৮ শতাংশেরও বেশি সম্ভাবনা রয়েছে কোনো আইনি পরিণতি না ভোগ করার। এটি শুধু বিচারের ব্যর্থতা নয়, এটি অপরাধের পুনরাবৃত্তির একটি সক্রিয় আমন্ত্রণ।

সমাজের কাঠামোর ওপর প্রভাব গভীর এবং ক্রমবর্ধমান। এমন একটি সমাজ যেখানে নারীরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না, দেরিতে পড়াশোনা করতে পারে না, রাতে কাজ করতে পারে না, তাদের চারপাশের পুরুষদের বিশ্বাস করতে পারে নাসেই সমাজ তার অর্ধেক মানব সম্ভাবনা বিসর্জন দিয়েছে। ভয় একটি কর, যা একচেটিয়াভাবে নারীদের ওপর আরোপিত হয়এটি তাদের গতিশীলতা, সুযোগ, শিক্ষা, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মূল্য নেয়।

ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণ এবং শেষ পর্যন্ত নির্মূলের জন্য একযোগে প্রতিটি স্তরে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আইনিব্যবস্থাকে শিকড় থেকে সংস্কার করতে হবে। শুধু শাস্তি কঠোর করে নয়, কারণ প্রমাণ ধারাবাহিকভাবে দেখায় যে শাস্তির নিশ্চয়তা তার তীব্রতার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরভাবে অপরাধ প্রতিরোধ করে; বরং দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে, তদন্ত আরো কঠোর করে এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তা আরো ব্যাপক করে। পুলিশকে পুনরায় প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং জবাবদিহিযোগ্য করতে হবে। বেঁচে যাওয়াদের জন্য ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলোকে অর্থায়ন করতে হবে এবং বিস্তৃত করতে হবে।

শিক্ষা প্রয়োগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। সম্মতি, শারীরিক স্বায়ত্তশাসন, সুস্থ সম্পর্ক এবং লিঙ্গ সমতা সম্পর্কে ব্যাপক, বয়স-উপযুক্ত শিক্ষা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জাতীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ছেলেদের শেখাতে হবে স্পষ্টভাবে, বারবার এবং কোনো ক্ষমা ছাড়াই যে নারীরা সম্পূর্ণ মানবতায় তাদের সমান। আধিপত্যের ওপর নির্মিত পুরুষত্ব শক্তি নয়, বরং কাপুরুষতা। মসজিদ, মাদরাসা এবং মন্দিরকে নারী ব্যক্তির পবিত্রতা সম্পর্কে স্পষ্টভাবে এবং ধারাবাহিকভাবে কথা বলতে হবে।

বাংলাদেশের কাছে এটি ঘুরিয়ে দেওয়ার সরঞ্জাম রয়েছে। আইন আছেনারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, যা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। যা ধারাবাহিকভাবে অনুপস্থিত তা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, সম্পদ বরাদ্দ এবং এগুলো বাস্তবায়নের সাংস্কৃতিক সততা। আইন পাস করা সহজ অংশ। কঠিন অংশ হলো এমন একটি সমাজ গড়া, যেখানে একজন নারীর শরীরকে তার নিজের হিসেবে গণ্য করা হয়পবিত্র, সার্বভৌম এবং সম্পূর্ণরূপে। সেই সমাজ এক মুহূর্তে গড়া হয় না, কিন্তু এটি অবশ্যই গড়তে হবে।

লেখক : সাবেক সামরিক কূটনীতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক

পশ্চিমবঙ্গে অনেক চ্যালেঞ্জের সামনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু

নির্মল চক্রবর্তী

পশ্চিমবঙ্গে অনেক চ্যালেঞ্জের সামনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু

শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন যে মমতার দক্ষিণ হস্ত, সেই মমতাজির সঙ্গে চ্যালেঞ্জ নিয়ে এখন পশ্চিমবঙ্গের সর্বেসর্বা। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের শাসনে এখন বিজেপির সরকার। আর সেই সরকারের তিনি মুখ্যমন্ত্রী। নবগঠিত এই বিজেপি সরকারের সামনে বর্তমানে একাধিক রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হবে শুভেন্দুকেই। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে এখন একজন তেজস্বী রাজনীতিবিদ থেকে প্রশাসকে

রূপান্তরিত হওয়ার চাপের মুখোমুখি হতে হবে। এটিই বলছেন বিশ্লেষকরা।

তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং এমন একটি রাজ্য শাসন করা, যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ অত্যন্ত গভীর। পুরো কর্মজীবনে শুভেন্দু অধিকারী এমন একজন নেতার ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, যিনি তাঁর আক্রমণাত্মক প্রচারশৈলীর জন্য সমর্থকদের কাছে প্রশংসিত, কিন্তু বিরোধীরা তাঁর সেই সব ভাষণকে রাজনৈতিক উসকানি বলে অভিযোগ করে থাকেন। সমালোচকরা বলে থাকেন শুভেন্দুর ভাষণগুলো রাজ্যে ধর্মীয় বিভাজন আরো গভীর করেছে। মমতার তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনমনে তিনি যে উত্তেজনার পারদ ছড়িয়েছেন, শাসক হওয়ায় সেই উত্তাপ এখন তাঁকেই প্রশমন করতে হবে। এরই মধ্যে তিনি এর মুখোমুখি হতেও শুরু করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছেন শুভেন্দু। সাধারণ মানুষের সমস্যা সরাসরি শুনতে সল্ট লেকে দলের কার্যালয়ে জনতার দরবার বসালেন তিনি। সকাল থেকেই কার্যালয়ের সামনে ভিড় জমায় হাজার হাজার মানুষ। নিজেদের অভাব-অভিযোগ, দাবি ও সমস্যার কথা জানাতে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেখানে আসে সাধারণ মানুষ। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ছিলেন চাকরিপ্রার্থীরাও।

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের সমীকরণে তৃণমূলের কাছে মুসলিম ভোট ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাই মমতার তৃণমূলকে হারাতে অনুপ্রবেশকারী নামে এসআইআরের (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) খড়্গ চালানো হয়। পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ৬০ লাখেরও বেশি নাম ভোটারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরে আদালতের শরণাপন্ন হয়ে সামান্য কিছু ভোটার ফেরানো সম্ভব হয়। আবার অনুপ্রবেশকারী নাম দিয়ে ধরপাকড় ও সীমান্তে পুশ ব্যাক কাণ্ডও চালানো হয়। তৃণমূলের এই হারানো ভোটারের অনেক স্বজনই এতে শুভেন্দু সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছেন। তাই শুভেন্দুকে তাঁদের রোষানলকে মোকাবেলা করেই চলতে হবে। অবশ্য এরই মধ্যে নবান্ন থেকে ধৃত অনুপ্রবেশকারীদের রাখার জন্য প্রতিটি জেলায় হোল্ডিং সেন্টার তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সল্ট লেকের জনতার দরবারে দুর্নীতি রুখতে শিক্ষক নিয়োগ পলিসিতে স্বচ্ছতা আনার এবং তিন মাসের মধ্যে নিয়োগের আশ্বাসও দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, জনতার দরবারে হাজির হন পুলিশের চাকরিপ্রার্থীরাও। বিশেষ করে মহিলা প্রার্থীরা নিয়োগে উচ্চতার নির্ধারিত মাপকাঠি নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমানে যে উচ্চতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গের বহু মেয়ের নাগালের বাইরে। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চাকরিপ্রার্থীদের দাবি, নিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে উচ্চতার নিয়মে পরিবর্তন আনা হোক, যাতে আরো বেশিসংখ্যক মহিলা পুলিশে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের বক্তব্য মন দিয়ে শোনেন। এতে তাঁরা আশাবাদী, এই জনতার দরবারে তাঁদের সমস্যার সমাধান হবে।  বলা যায়, এভাবে শুভেন্দু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট তৎপর হয়ে উঠেছেন। কোরবানির ঈদে তাঁর সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে কোরবানির বিধি-নিষেধ ও ধর্মীয় বিতর্ক। রাজ্যে গবাদি পশু জবাইয়ের ওপর নতুন বিধি-নিষেধ জারির পর ঈদুল আজহা উদযাপন নিয়ে বড় ধরনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। বিধি-নিষেধ অমান্য করার ঘোষণায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা নিয়ে তাঁকে বড় পরীক্ষায় পড়তে হয়। হকার উচ্ছেদেও তৈরি হয় জনরোষ। বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশন ও ব্যস্ত এলাকায় হকারদের পুনর্বাসন ছাড়া এই উচ্ছেদ বাস্তবায়নে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে তীব্র বিরোধিতা ও জনরোষের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

এক দিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা এবং অন্যদিকে ভোটে তাঁরা হারেননি, হারানো হয়েছেএমন দাবিতে সরব রয়েছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা। নিজের ভাবনীপুর কেন্দ্রেও জোর করে হারানোর অভিযোগ ফের তুলেছেন মমতা। এক ভিডিও বার্তায় মমতা আবার বললেন, হারের জায়গায় জেতা, জেতার জায়গায় হারাএই পাশাটাই উল্টেছে প্রায় ১৫০ আসনে। তা না হলে আমরা ২২০ থেকে ২৩০ আসন পেতাম। ভবানীপুরে তাঁর হার প্রসঙ্গে মমতার বক্তব্য, আপনারা এজেন্টদের পরিচয়পত্র কেড়েছেন। আমি ১৩ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলাম। এই সূত্রেই ভবানীপুরের বিধায়ক তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর উদ্দেশে মমতা বলেন, যিনি এখন গদিতে বসেছেন, তাঁর নাম করতে আমার ভালো লাগে না। তাঁকে আমরা অনেক দিন থেকে চিনি। তিনি নিজে বসে লুট করছিলেন। আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিতে দিতে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলনেত্রীর অভিযোগ, যিনি এখন চেয়ারে বসেছেন, তাঁর তো ওই চেয়ারে বসারই কথা নয়। ভোট লুট করে রাজশাসনে বসেছেন। তিনি কী করে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বুঝবেন? এঁরা বাংলার লোক নন, বহিরাগত। ক্ষমতায় এসে বুলডোজার চালিয়ে মানুষের জীবিকা কেড়ে নিচ্ছেন! পুলিশকে সামনে রেখেই সন্ত্রাস চলছে। নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর নানা অভিযোগে একের পর এক তৃণমূল নেতার গ্রেপ্তারের ঘটনা সামনে এসেছে।

তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন শেয়ার করায় ২০১২ সালের এপ্রিলে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র। তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালু রয়েছে এখনো। অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যঃসাবেক অধ্যাপক এবং হক কথা সোচ্চারে বলতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রের রোষানলে। তাঁর প্রতিবাদী মনন ও অদম্য সাহস। তিনি আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ভালোবাসেন। এ কারণে তিনি তৃণমূল সরকারের চোখের বালি হন। কিন্তু শত লাঞ্ছনা ও শাস্তির মুখে দাঁড়িয়ে আজও তিনি কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারেরই সমালোচনায় মুখর। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সামনে চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে অম্বিকেশ মহাপাত্র তাঁর দেওয়া পোস্টে ১৭টি জিজ্ঞাসা তুলে ধরেন১. পিসি-ভাইপোর জেলযাত্রা হয় কি না; ২. অভয়ার বিচার মেলে কি না; ৩. সারদা আর্থিক কেলেঙ্কারির বিচার হয় কি না; ৪. নারদ স্টিং অপারেশনে অভিযুক্তদের কোনো শাস্তি হয় কি না; ৫. চাকরি বিক্রয়কারীরা শাস্তি পায় কি না; ৬. সুপ্রিম নির্দেশে বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দেওয়া হয় কি না; ৭. সব সরকারি শূন্যপদে স্বচ্ছতার মাধ্যমে নিয়োগ হয় কি না; ৮. কেন্দ্রীয় হারে ডিএ পাওয়া যায় কি না; ৯. বন্ধ স্কুলগুলো আবার খোলে কি না; ১০. কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসে কি না; ১১. কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয় কি না; ১২. সংবিধানসম্মত আইনের শাসন ফিরে আসে কি না; ১৩. স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত থাকে কি না; ১৪. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা হয় কি না; ১৫. বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি সুরক্ষিত থাকে কি না; ১৬. রামমোহন-বিদ্যাসাগর-ডিরোজিও-রবি-নজরুল-স্বামীজি-নেতাজি...নির্দেশিত পথে বাংলা থাকে কি না; ১৭. বিশ্ববন্দিত খ্যাতনামা মনীষীদের শ্রদ্ধার আসন বজায় থাকে কি না।

অম্বিকেশ মহাপাত্রর পোস্টে প্রদত্ত জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে যা জানা যায়পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের রাজনীতিতে পিসি-ভাইপো বলতে মূলত তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বোঝানো হয়। কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার অভয়া (তিলোত্তমা)-এর বিচারের বিষয়টি এখনো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। মামলার শ্লথগতি ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে উদ্বিগ্ন তাঁর পরিবার ও চিকিৎসকসমাজ। সারদা গোষ্ঠীর কর্ণধার সুদীপ্ত সেন ও দেবযানী মুখোপাধ্যায় প্রায় ১৪ বছর ধরে জেলে আছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বহু মামলা বিচারাধীন। নারদ স্টিং অপারেশনে অভিযুক্ত কোনো নেতাই এখনো আদালতের দ্বারা দোষী সাব্যস্ত হয়ে শাস্তি পাননি।

২০১৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই স্টিং অপারেশনের ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। ভিডিওতে একাধিক মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতাকে ঘুষ নিতে দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই এবং ইডি মামলাটির তদন্ত শুরম্ন করে। ২০২১ সালের মে মাসে সিবিআই ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র ও শোভন চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেতাদের গ্রেপ্তার করে। তবে নিম্ন আদালত ও কলকাতা হাইকোর্ট থেকে তাঁরা সবাই জামিন পেয়ে যান। 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভূমিধস জয়ের পর রাজ্য রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনের ফল শুধু সরকারবদলের ঘটনা নয়, বরং মানুষের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সমস্যা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিফলন। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের শাসন থাকায় ব্যাপক হারে অবকাঠামোর উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। তবে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সেই কারণে মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তন বাস্তবে কতটা উন্নয়ন এনে দিতে পারবে। তবে নতুন সরকারকে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বিজেপির এই বিপুল জয় প্রমাণ করেছে যে রাজ্যের বড় অংশ পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দলটির সামনে এখন একের পর এক কঠিন চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে।

এই নির্বাচনের ফল দেখিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চায়। তাই এখন মূল বিষয় হলো কর্মক্ষমতা। সরকার কত দ্রুত কাজ করতে পারে, কতটা স্বচ্ছভাবে প্রশাসন চালাতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, সেটিই আগামী দিনের রাজনীতি নির্ধারণ করবে। বিজেপির জন্য এখন আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জয়ের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখা। জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন তারা উন্নয়ন, শান্তি, কর্মসংস্থান ও সুশাসনের বাস্তব ফল দেখতে চায়।

ক্ষমতায় আসার আগে প্রতিশ্রুতি দেন অনেকেই, তা পূরণ করাটাই সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। ৯ মে ব্রিগেডে শপথ গ্রহণ করার পর থেকেই দফায় দফায় বৈঠক করছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। নজর দিয়েছেন প্রায় সব দপ্তরে। মাস কয়েক আগেও যিনি বিরোধী দলনেতার চেয়ারে বসতেন, তিনিই আজ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। সাবেকের পাড়ায় গিয়ে বিজয় মিছিলও করে এসেছেন তিনি। রাজ্যে প্রথম বিজেপি সরকারের সামনে থাকা এতসব চ্যালেঞ্জ কী করে মোকাবেলা করেন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী, সেটিই এখন দেখার।

লেখক : কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক

পুরুষোত্তম তোফায়েল আহমেদ

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর-উত্তম

পুরুষোত্তম তোফায়েল আহমেদ

এই সেদিন পয়লা জুন বাংলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। যুগে যুগে অনেক নায়ক আসে, কিন্তু মহানায়ক নয়। শত শত বছর পর বঙ্গবন্ধু বা তোফায়েল আহমেদ আবির্ভাব হন। জানি না, জুন মাসটি আমার জন্য, আমার সোনার বাংলার জন্য কেমন। ছেষট্টির ৭ জুন তেজগাঁওয়ে শ্রমিক মনু মিয়া শাহাদাতবরণ করেন, যাঁর লাশ নূরে আলম সিদ্দিকী কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ৭ জুন আমার একেবারে সাদামাটা স্ত্রীর মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২৫ সালের ৭ জুন আমাদের অসহায় ফেলে সে মৃত্যুবরণ করেছে। আবার আমার জন্মও ১৪ জুন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে নির্বাসনে থাকতে অসময়ে বিয়ে হয়েছিল, সেও ১৯৮৪ সালের ২৫ জুন। জুন আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। গত সংখ্যায় লেখা পাঠিয়ে তোফায়েল ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছিলাম। বড় তাড়াহুড়া করে জানাজা হয়েছে। ছিলাম টাঙ্গাইলে। তাই যেতে পারিনি। সে জন্য মনে বড় দুঃখ এবং আফসোস রয়ে গেল। কতজনের জানাজায় কত দূর ছুটে গেছি, কিন্তু একেবারেই আপনজন, ঘরের মানুষের জানাজা আদায় করতে পারলাম না। তবু মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ যেন তাঁর সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে বেহেশতবাসী করেন।

পুরুষোত্তম তোফায়েল আহমেদসবাই যে তোফায়েল আহমেদকে চেনেন, আমরা সেই তোফায়েল আহমেদকে অনেক আগে থেকেই চিনতাম। সেদিন বলেছিলাম, ১৯৬২ সাল থেকে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে আমাদের পরিচয়। সেদিন বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক সাক্ষাৎকারে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামের স্কাউট জাম্বুরিতে তাঁর সঙ্গে দেখা। ১৯৬২ নয়, ওটা ১৯৫৮ সালই হবে। সেই স্কাউট জাম্বুরির পর তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে লতিফ ভাইয়ের শত শত চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে। তখন সবারই চিঠি লেখার অভ্যাস ছিল। আমি বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় প্রায় ৬০ হাজার চিঠি পেয়েছি। আমিও তার উত্তর দিয়েছি। হয়তো দু-এক হাজারের উত্তর না-ও দেওয়া হতে পারে। আগের দিনে চিঠি ছিল ভাব আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম। এখন মোবাইলের জামানায় কে চিঠি লেখে? দরকারি চিঠিও লেখা হয় না। সবাই ফোনে ফোনে। উনসত্তরের ছাত্র গণ-আন্দোলনে প্রথম যেদিন হঠাৎই তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বের কথা শুনে হৃদয় ময়ূরের মতো নেচে উঠেছিল। বড় ভালো লাগে, ভীষণ উৎসাহ পাই। একের পর এক আন্দোলনকারী ছাত্র, যুবক, সাধারণ মানুষ আহত-নিহত হতে থাকে। পুরান ঢাকায় মতিউর রহমান শহীদ হন। আন্দোলন আরো বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত আসাদের লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল হয়। আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের অঞ্চলও উত্তাল হয়ে ওঠে। লতিফ ভাই ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে। আমরা আন্দোলন করছি তো করছিই। এর মধ্যে উনসত্তরের পয়লা ফেব্রুয়ারি হঠাৎই আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়। আবু আহমেদ আনোয়ার বক্স, শামীম আল মামুন ও আমাকে গ্রেপ্তার করে ময়মনসিংহ কারাগারে প্রেরণ করা হয়। টাঙ্গাইলে যে ছোট্ট কারাগার, তাতে রাজবন্দিদের তেমন রাখা হতো না। দু-তিন দিন পর সাদত কলেজের ভিপি খন্দকার আব্দুল বাতেনকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। খন্দকার বাতেন যাওয়ার আগে যে চার-পাঁচ দিন ছিলাম, বেশ আনন্দেই ছিলাম। কিন্তু খন্দকার বাতেন ময়মনসিংহ জেলে যাওয়ার পর জেলখানার পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরপরই খন্দকার বাতেন কাঁদতেন, মাকে দেখতে ইচ্ছা করে। আরো কত কিছু। একেবারে কেমন যেন একটা অশান্ত পরিবেশ হয়ে যায়। চুপচাপ কাঁদলেও হয়তো হতো। কিন্তু না, চুপচাপের কোনো বালাই নেই। অনেক সময় গ্রামের মেয়েদের মতো সুর তুলে কাঁদতেন। বড় খারাপ লাগত। সেই অবস্থায়ই যায় প্রায় দুই সপ্তাহ। তারপর হঠাৎই আমাদের মুক্তি। তখনকার সে বিচিত্র অবস্থা ভাবতেও অবাক লাগে। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান তখন নিয়মিত মাসিক ভাষণ দিতেন। পয়লা ফেব্রুয়ারিও দিয়েছিলেন। তিনি আর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করবেন না। তাই আন্দোলনকারীদের থামতে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু সে অনুরোধে কাজ হয়নি। ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ আগরতলা মামলার সব অভিযুক্তকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর ময়মনসিংহ কারাগারের প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু রাজবন্দিরা রাতের আঁধারে কারাগার থেকে বেরোতে আপত্তি করেন। এর জন্য তাঁদের ২৩ ফেব্রুয়ারি সকালে মুক্তি দেওয়া হয়। আমরা টাঙ্গাইল থেকে গিয়ে লতিফ ভাইকে নিয়ে আসি। সেই সময় ময়মনসিংহ কারাগারে ছিলেন অষ্টগ্রামের ন্যাপ নেতা আব্দুল বারী, কিশোরগঞ্জের নগেন সরকার, মুক্তাগাছার শহীদুল্লাহ মালেক, ছাত্রলীগের আনোয়ারসহ আরো অনেকে। প্রায় আড়াই বছর পর আমাদের নেতা লতিফ ভাইকে পেয়ে আমরা ভীষণ উজ্জীবিত হয়ে উঠি। আমরা ছাত্ররা সভা ডাকলে যেখানে দু-তিন হাজার লোক হতো, সেখানে সদ্যোকারামুক্ত লতিফ সিদ্দিকী গেলে ২০ থেকে ৩০ হাজার লোকের সমাগম হতো, যাতে আমাদের মধ্যে এক মহা আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু হিসেবে ঘোষণা করলে পুরো জাতি আরো উদ্বেল হয়ে ওঠে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রায় ১০ লাখ মানুষের সামনে জাতির পক্ষ থেকে উনসত্তরের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ টুঙ্গিপাড়ার শেখ লুৎফর রহমানের ছেলে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। আন্দোলন আরো বেগবান হয়। এর মধ্যেই আইয়ুব খান ২৪ মার্চ পদত্যাগ করে ইয়াহিয়ার হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। ইয়াহিয়া এসেই ঘোষণা করেন, আমার রাজনীতির কোনো ইচ্ছে নেই। দুই বছরের মধ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে আমরা ব্যারাকে ফিরে যাব। সেই বছরের জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেন। পয়লা জানুয়ারি ১৯৭০ থেকে প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল মেনে নেয়। বাইরে রাজনীতি বন্ধ থাকলেও ঘরোয়া রাজনীতি, হলের মধ্যে সভা-সমাবেশে তেমন কোনো বাধা দেওয়া হয় না। চলতে থাকে সংগ্রাম আর সংগ্রাম। তখন আমাদের কাছে মিটিং-মিছিল ছাড়া আর কোনো কিছুই ছিল না। রাতদিন তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। তুমি কে আমি কেবাঙালি বাঙালি, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। পূর্ব বাংলার কুখ্যাত গভর্নর ময়মনসিংহের মোনেম খানকে সরিয়ে জেনারেল আহসানকে তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করা হয়। এরপর আসে ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন। সেখানে বাংলার তরুণ তুর্কিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্বাচনী প্রচারে। মনে হয়, ভারতবর্ষে মহাত্মা গান্ধী যেমন শ্রেষ্ঠতম কর্মীদের পেয়েছিলেন, ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের শ্রেষ্ঠতম সংগঠকদের পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, শেখ ফজলুল হক মণি, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, সিরাজুল আলম খান, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, লতিফ সিদ্দিকী, আল মুজাহিদী, ফজলুল করিম মিঠু, ফজলুর রহমান ফারুক, শাজাহান সিরাজ, নীলফামারীর রউফ, নোয়াখালীর মোহাম্মদ আলীএ রকম আরো অনেকেই। এখন যেমন হাজার হাজার মানুষ জেমসের গান শোনে, ঠিক তেমনি আমাদের নেতাদের বক্তব্য শুনতেন, আমরা উদ্বেলিত হতাম। এর ফলে ১৯৭০-এর নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ১৬৯ আসনের ১৬৭টিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বিজয় হয়। মাত্র ২৭ বছর বয়সে মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ ভোলা থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের ভোটের রায় মানেনি। ছলাকলা করে ভোটের রায়কে অন্যদিকে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে বাংলার বুকে সামরিক শাসন জারি করে। বাঙালিরা পাকিস্তানের এই অন্যায় কোনোভাবেই মেনে নেয়নি। ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষের সামনে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। পাকিস্তানি হানাদাররা রাস্তাঘাটে নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যা করতে থাকে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হয়, সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়, মা-বোনের ইজ্জত-সম্মান-সম্ভ্রম ধ্বংস করা হয়। তার পরও হানাদাররা বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। ওই সময় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। ভারত তাদের নিজস্ব দুরবস্থার মধ্যেও সেই এক কোটি মানুষের বোঝা হাসিমুখে বহন করে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়, অস্ত্র দেয়সর্বোপরি ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তির বেদনায় শরিক হয়ে আমাদের মুক্তির স্বাদে অবগাহন করে।

১০০ কয়েক দিন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। অনেকেই অনেক প্রশ্ন করে, কিন্তু এটি ধ্রুব সত্য, অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে-কর্তৃত্বে সরকার অনেক ভালো। একেবারে পতনের শেষ সীমায় নিয়ে যাওয়া একটি সরকার এযাবৎ যা করেছে, খুব একটা খারাপ করেনি অন্তত সব দিক থেকে ব্যর্থ ইউনূস সরকারের চেয়ে। অধ্যাপক ইউনূস সুদ-ঘুষ বোঝেন, কিন্তু জনগণের কল্যাণ বোঝেন না। তা যদি বুঝতেন, তাহলে হামে আক্রান্ত হয়ে ছয় শর বেশি ফুলের কুঁড়ির মতো মানবসন্তান হারিয়ে যেত না। এর জন্য ড. ইউনূসের ৬০০ বার ফাঁসি হলেও কম হবে। তিনি তাঁর গ্রামীণ ব্যাংকের কী এক মহিলাকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন, যাঁর স্বাস্থ্যের স্ব সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল কি না, জানি না। আমার মনে হচ্ছিল, এত টানাপোড়েনের মধ্যেও তারেক রহমান ভালো চালাচ্ছেন। আমার মনে হচ্ছিল, তিনি বিএনপি নেতা হিসেবে নয়, দেশের নেতা হিসেবে জাতীয় নেতার ভূমিকা পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সবার প্রতি তাঁর দায়িত্ব। সে দায়িত্ব তাঁর পালন করতে হবে খুশিতে হোক আর অখুশিতে হোক। সেই কাজটি আমার তো মনে হয়েছে, এত দিন ভালোভাবেই করছিলেন। এই সেদিন জাতীয় নেতা তোফায়েল আহমেদের জানাজা নিয়ে বর্তমান সরকার ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। ৯ বার নির্বাচিত একজন জাতীয় নেতার শুধু আওয়ামী লীগের দোসর বলে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা হয়নি, শহীদ মিনারে হয়নি, ভোলায় তাঁর জানাজায় বাধা দেওয়া হয়েছে, এটি কোন রুচির পরিচয়? দলীয় নেতা দেশে বহু আছেন। কিন্তু জাতীয় নেতা খুব বেশি নেই। একজন জাতীয় নেতার নাম যদি উল্লেখ করতে হয়, তাহলে অবশ্যই বলতে হবে তোফায়েল আহমেদ। তাই আমি আশা করেছিলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের জানাজায় যথাযথ মর্যাদা দেবেন। তিনি এরই মধ্যে অনেক প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। তাঁর কাজগুলো খুবই কঠিন, কিন্তু তার পরও তিনি করেছেন। তোফায়েল আহমেদকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হলে আমি আমার অন্তরের সবকিছু উজাড় করে তারেক রহমানের নেতৃত্বকে সমর্থন করতাম। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান তো এখন শুধু বিএনপির নেতা নন, তিনি সবার নেতা। সবার প্রতি, দেশের প্রতি তাঁর দায়িত্ব-কর্তব্য অপরিসীম। এ ক্ষেত্রে মাননীয় স্পিকার বীরবিক্রম হাফিজ উদ্দিন আহমদ আরেকটু চেষ্টা করলে, আন্তরিক হলে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকতেন। তিনি যেটুকু করেছেন, ভালো করেছেন। কিন্তু আরো করতে পারলে সেটি আরো ভালো হতো, কল্যাণকর হতো। আবার বলব, তোফায়েল আহমেদ বারবার আসেন না। তাঁকে সম্মান করা, মর্যাদা দেওয়া শুধু তোফায়েল আহমেদকেই সম্মান দেখানো নয়, দেশকে, স্বাধীনতাকেসর্বোপরি মনুষ্যত্বকে সম্মান জানানো। আশা করব, অনতিবিলম্বে তারেক রহমানের নেতৃত্বের সরকার একজন জাতীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে সর্বদলীয়ভাবে জাতীয় সম্মান জানানোর ব্যবস্থা করবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তোফায়েল আহমেদের আত্মার শান্তি দান করুন। আমিন।

 লেখক : রাজনীতিক