প্রযুক্তির এই যুগে আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত। কিন্তু একই সঙ্গে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন। আমাদের বন্ধু তালিকায় হাজারো মানুষ, অসংখ্য ফলোয়ার, অসংখ্য ভার্চুয়াল সম্পর্ক; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিজের ঘরের মানুষগুলোর জন্য সময় নেই। আমরা ক্যারিয়ার, পদোন্নতি, ব্যাবসায়িক সাফল্য, বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতির এক নিরন্তর প্রতিযোগিতার পিছে ছুটছি। এই দৌড়ে আমরা অনেক কিছু অর্জন করছি। কিন্তু অজান্তেই হারিয়ে ফেলছি পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা। ভার্চুয়াল জগতে একটি পোস্টে শত শত লাইক-কমেন্ট রিপ্লাই দেওয়ার সময় পেলেও বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে বসে দশ মিনিট কথা বলার সময় পাই না। নিজেদের সফল করার প্রতিযোগিতায় আমরা এতটাই ব্যস্ত যে যাঁরা আমাদের সফল হওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, তাঁদের অনুভূতি ও প্রয়োজন অনেক সময় আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে সরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংবাদ আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। কোথাও বৃদ্ধ মা একা বাসায় মৃত্যুবরণ করেছেন, কয়েক দিন পর প্রতিবেশীরা খবর পেয়েছেন। কোথাও বৃদ্ধ বাবা অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছেন, অথচ প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের কারো সময় হয়নি তাঁর খোঁজ নেওয়ার। আবার কোথাও দেখা যায়, সন্তানরা বিদেশে বা দেশের বড় শহরে সুখী ও সফল জীবনযাপন করছেন, আর গ্রামের বাড়িতে থাকা মা-বাবা দিন পার করছেন নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও অপেক্ষার মধ্যে। এমনকি প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে।
এসব ঘটনা শুনে আমরা কিছুক্ষণ দুঃখ প্রকাশ করি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ জানাই, তারপর আবার অন্য কোনো আলোচিত ঘটনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু খুব কম মানুষই নিজেদের কাছে প্রশ্ন করি, আমরা আসলে কী করছি। প্রতি বছর মা দিবস ও বাবা দিবস এলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে যায় আবেগঘন স্ট্যাটাসে। কেউ মায়ের সঙ্গে ছবি দেন, কেউ বাবার ত্যাগের গল্প লেখেন, কেউবা কৃতজ্ঞতার দীর্ঘ বার্তা প্রকাশ করেন। এসব প্রকাশ অবশ্যই সুন্দর। মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই ভালোবাসা বাস্তব জীবনের দায়িত্ববোধে পরিণত হয় না।
একজন বৃদ্ধা মা কিংবা বাবার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সব সময় অর্থ নয়। জীবনের একটি পর্যায়ে এসে মানুষের প্রয়োজন হয় সঙ্গ, সম্মান, খোঁজখবর এবং আপনজনের উপস্থিতি। একজন মা হয়তো সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। একজন বাবা হয়তো চান সন্তানের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করতে। তাঁরা হয়তো আর নতুন কোনো সম্পদ চান না; তাঁরা শুধু অনুভব করতে চান যে তাঁরা এখনো পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দুঃখজনকভাবে আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, নগরায়ণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারার কারণে অনেক পরিবারে আবেগগত দূরত্ব বাড়ছে। আমরা অনেকেই মনে করি মাসে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু সম্পর্ক কি শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন? ভরণ-পোষণ কি ভালোবাসার বিকল্প হতে পারে?
আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক সন্তান তাঁদের মা-বাবার চিকিৎসা খরচ বহন করছেন, নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন, কিন্তু মাসের পর মাস তাঁদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলছেন না। ফলে মা-বাবারা আর্থিকভাবে নিরাপদ হলেও মানসিকভাবে একাকী হয়ে পড়ছেন। এই একাকিত্ব অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতার চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কেন এমন হয়ে উঠছি? আমরা কি সঠিক রাস্তায় আছি? আমরা ভালো চাকরি, উচ্চ বেতন, বড় বাড়ি, দামি গাড়ি এবং সামাজিক মর্যাদাকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখছি। কিন্তু একজন মানুষ কতটা সফল, তা তাঁর ব্যাংক হিসাব দিয়ে নয়; বরং তিনি তাঁর বাবা-মায়ের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল, সেটি দিয়েও পরিমাপ করা উচিত।
বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার জন্য আইন রয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কারণ কোনো মা-বাবা যেন সন্তানের অবহেলায় অভুক্ত বা অসহায় অবস্থায় না থাকেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন দিয়ে ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা গেলেও ভালোবাসা নিশ্চিত করা যায় না।
আইন কাউকে অর্থ দিতে বাধ্য করতে পারে, কিন্তু কাউকে আন্তরিক হতে বাধ্য করতে পারে না। আদালত একজন সন্তানকে খরচ বহনের নির্দেশ দিতে পারে, কিন্তু আদালত কি নির্দেশ দিতে পারে যে সে প্রতি সন্ধ্যায় মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলবে? অথবা বৃদ্ধ বাবার হাত ধরে হাঁটবে? ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের জন্ম আদালতে নয়; জন্ম পরিবারে, শিক্ষায় এবং সামাজিক মূল্যবোধে।
আজ যারা তাঁদের বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা করছেন, তাঁদের একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। সময় কখনো কারো জন্য থেমে থাকে না। আজ আমরা তরুণ, কর্মক্ষম এবং ব্যস্ত। কিন্তু একদিন আমাদের চুলও সাদা হবে, আমাদের শরীরও দুর্বল হবে, আমাদেরও কারো অপেক্ষায় থাকতে হবে। আজ আমরা আমাদের সন্তানদের সামনে যে আচরণের উদাহরণ তৈরি করছি, আগামীকাল তারাই সেই উদাহরণ অনুসরণ করবে।
একজন শিশু যখন দেখে তাঁর বাবা-মা দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানির প্রতি দায়িত্বশীল, তখন সে সম্মান ও মানবিকতার শিক্ষা পায়। আবার যখন দেখে বৃদ্ধদের অবহেলা করা হচ্ছে, তখন সে সেটিকেও স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন শুধু বর্তমানের নৈতিক কর্তব্য নয়; এটি ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণেরও একটি বিনিয়োগ।
একটি সমাজ কতটা মানবিক, তা বোঝা যায় সে তার শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী এবং বৃদ্ধদের কিভাবে মূল্যায়ন করে তার মাধ্যমে। যে সমাজে বৃদ্ধ মা-বাবা সম্মান, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসা নিয়ে জীবন কাটাতে পারেন, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত সমাজ।
তাই মা দিবস বা বাবা দিবসের আবেগঘন পোস্টের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বছরের প্রতিটি দিনে তাঁদের পাশে থাকা। একটি ফোনকল, কিছু সময়, একটি খোঁজখবর, একটি আন্তরিক আলাপ—এসবের মূল্য অনেক সময় হাজার টাকার চেয়েও বেশি।
আমরা প্রায়ই বলি, মা-বাবার ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। কথাটি সত্য। কিন্তু সেই ঋণ শোধ করার চেষ্টা অন্তত করা যায়। তাঁদের বার্ধক্যকে সম্মানজনক করা যায়। তাঁদের নিঃসঙ্গতা কিছুটা হলেও ভাগ করে নেওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভালো সন্তানের পরিচয় দিতে চাই, নাকি বাস্তব জীবনেও সত্যিকার অর্থে দায়িত্বশীল সন্তান হয়ে উঠতে চাই?
লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



এই অপরাধ কেন টিকে থাকে এবং বাড়তে থাকে তা বোঝার জন্য কারণগুলোর একটি সৎ ও নির্ভীক পরীক্ষা দরকার

সবাই যে তোফায়েল আহমেদকে চেনেন, আমরা সেই তোফায়েল আহমেদকে অনেক আগে থেকেই চিনতাম। সেদিন বলেছিলাম, ১৯৬২ সাল থেকে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে আমাদের পরিচয়। সেদিন বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক সাক্ষাৎকারে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামের স্কাউট জাম্বুরিতে তাঁর সঙ্গে দেখা। ১৯৬২ নয়, ওটা ১৯৫৮ সালই হবে। সেই স্কাউট জাম্বুরির পর তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে লতিফ ভাইয়ের শত শত চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে। তখন সবারই চিঠি লেখার অভ্যাস ছিল। আমি বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় প্রায় ৬০ হাজার চিঠি পেয়েছি। আমিও তার উত্তর দিয়েছি। হয়তো দু-এক হাজারের উত্তর না-ও দেওয়া হতে পারে। আগের দিনে চিঠি ছিল ভাব আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম। এখন মোবাইলের জামানায় কে চিঠি লেখে? দরকারি চিঠিও লেখা হয় না। সবাই ফোনে ফোনে। উনসত্তরের ছাত্র গণ-আন্দোলনে প্রথম যেদিন হঠাৎই তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বের কথা শুনে হৃদয় ময়ূরের মতো নেচে উঠেছিল। বড় ভালো লাগে, ভীষণ উৎসাহ পাই। একের পর এক আন্দোলনকারী ছাত্র, যুবক, সাধারণ মানুষ আহত-নিহত হতে থাকে। পুরান ঢাকায় মতিউর রহমান শহীদ হন। আন্দোলন আরো বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত আসাদের লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল হয়। আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের অঞ্চলও উত্তাল হয়ে ওঠে। লতিফ ভাই ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে। আমরা আন্দোলন করছি তো করছিই। এর মধ্যে উনসত্তরের পয়লা ফেব্রুয়ারি হঠাৎই আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়। আবু আহমেদ আনোয়ার বক্স, শামীম আল মামুন ও আমাকে গ্রেপ্তার করে ময়মনসিংহ কারাগারে প্রেরণ করা হয়। টাঙ্গাইলে যে ছোট্ট কারাগার, তাতে রাজবন্দিদের তেমন রাখা হতো না। দু-তিন দিন পর সা