• ই-পেপার

জিজ্ঞাসা

ওষুধ খেয়ে ঋতুস্রাব বন্ধ রাখা যাবে?

  • আমার স্বামী একজন প্রবাসী। তিনি কয়েক বছর পর কয়েক মাসের জন্য দেশে আসেন। স্বাভাবিকভাবে সে সময় তাঁর স্ত্রী সান্নিধ্যের চাহিদা বেশি থাকে। তাই স্বামী দেশে থাকার সময় আমি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেয়ে ঋতুস্রাব বন্ধ রাখি। আমার জিজ্ঞাসা হলো, ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে ওষুধ খেয়ে তা বন্ধ রাখলে স্বামীর সঙ্গে মেলামেশা কি বৈধ হবে? আর সেই সময় আমার নামাজ ও রোজার হুকুম কী হবে?

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৪৭

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

এই কোরআন মানবজাতির জন্য সুস্পষ্ট দলিল এবং নিশ্চিত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য পথনির্দেশ ও রহমত। দুষ্কৃতকারীরা কি মনে করে যে আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে তাদেরকে তাদের সমান গণ্য করব, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে? তাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ! আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে এবং যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মানুযায়ী ফল দেওয়া যেতে পারে আর তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।
(সুরা : জাসিয়া, আয়াত : ২০-২২)

আয়াতগুলোতে কোরআনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে।

 

শিক্ষা ও বিধান

১. বাসিরাত বলা হয় অন্তর্দৃষ্টিকে। তা হলো এমন নুর বা জ্যোতি, আল্লাহ যা মুমিনের অন্তরে সৃষ্টি করেন।

২. হেদায়েত বলা হয় এমন পথপ্রদর্শনকে, যাতে কোনো কষ্ট থাকে না। ব্যক্তি চাইলে অনায়াসে তা অনুসরণ করতে পারে।

৩. কোরআন মানবহৃদয়ের জন্য এমন প্রতিষেধক, যা অসুস্থ হৃদয়কে সুস্থ করে এবং সুস্থ হৃদয়কে সুস্থ রাখে।

৪.আয়াতে জীবন দ্বারা পার্থিব জীবন এবং মৃত্যু দ্বারা পরকাল উদ্দেশ্য।

৫. আল্লাহ পার্থিব জগতের সব ব্যবস্থাকে সুসংহত করেছেন, যেন মানুষ চাইলেই পরকালমুখী হতে পারে। আর পরকালে তারা অজুহাত দেখাতে না পারে। (তাফসিরে শারভি, পৃষ্ঠা-১৪১০৮)

গ্রিসে মুসলমানদের উত্থান-পতনের ইতিহাস

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
গ্রিসে মুসলমানদের উত্থান-পতনের ইতিহাস

গ্রিস আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও পশ্চিমা দর্শনের সূতিকাগার। প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি এই দেশের দাপ্তরিক নাম হেলেনিক রিপাবলিক। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ গ্রিস বলকান উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। এর উত্তর-পশ্চিমে আলবেনিয়া, উত্তরে উত্তর মেসিডোনিয়া ও বুলগেরিয়া এবং পূর্বে তুরস্ক। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া এবং সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতি গ্রিসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এর প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকাই পাহাড়ি ভূমি আর আছে তিন হাজারেরও বেশি দ্বীপ। পর্যটন, নৌ-পরিবহন, কৃষি ও শিল্প দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক খাত। গ্রিসের মোট আয়তন এক লাখ ৩১ হাজার ৯৫৭ বর্গ কিলোমিটার। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে মোট জনসংখ্যা এক কোটি তিন লাখ ৭২ হাজার ৩৩৫, যার বেশির ভাগ খ্রিস্টধর্মের অনুসারী। পিউ রিসার্চের তথ্য মতে, গ্রিসের ২.৫০ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। এথেন্স দেশটির বৃহত্তম শহর ও রাজধানী।

খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছর আগে গ্রিসে উন্নত মিনোয়ান সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর তা একাধিক সভ্যতা ও সাম্রাজ্যের অধীন হয়েছে। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকে গ্রিসে উসমানীয়দের বিজয় অভিযান শুরু হয়, যা প্রায় এক শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ১৮৩০ সালে স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত উসমানীয়রা প্রায় চার শ বছর গ্রিস শাসন করে।

রাজনৈতিকভাবে গ্রিসে ইসলামের আগমন হয়েছিল উসমানীয়দের মাধ্যমে। তবে গ্রিসের সঙ্গে ইসলামের সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল তার বহু শতাব্দী আগে। হিজরি প্রথম শতাব্দীতে মুসলিম বাহিনী রোডস দ্বীপ (৬৫৪ খ্রি.) ও সাইপ্রাস (৬৫০ খ্রি.) জয় করে। তখন দ্বীপ দুটি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীন হলেও এর বেশির ভাগ নাগরিক ছিল গ্রিক জাতিভুক্ত। তাই বলা যায়, তখন থেকেই গ্রিক জনগণ ও সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলাম ও মুসলমানের সংযোগ স্থাপিত হয়। পরবর্তীকালে স্পেনের উমাইয়া শাসকরা ৮২৭ সালে ক্রিট দ্বীপ এবং ১০৩০ সালে ফাতেমীয়রা সাইক্লেডস জয় করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গ্রিসে উসমানীয় শাসন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত সেখানে ইসলামের উল্লেখযোগ্য কোনো প্রসার ঘটেনি।

খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গ্রিসের বাইজেন্টাইন অঞ্চলগুলোতে উসমানীয়দের বিজয় অভিযান শুরু হয়। তারা ১৩৫৪ সালে গ্যালিপোলি, ১৩৬১ সালে আদ্রিয়ানোপল (এদিরনে), ১৩৮৭ সালে থেসালোনিকি জয় করে। ২৯ মে ১৪৫৩ কনস্টান্টিনোপলের পতন হয় এবং ১৪৫৬ থেকে ১৪৫৮ সালের মধ্যে এথেন্স এবং ১৪৬০ সালের মধ্যে পেলোপনিসের পতন ঘটে, যার মাধ্যমে গ্রিসের মূল ভূখণ্ডের ওপর উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। উসমানীয়রা গ্রিস জয় করার পর এখানে মুসলিম প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারকদের আগমন ঘটে। ফলে গ্রিসে ইসলামের প্রচার ও ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ তৈরি হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। অবশ্য অনেকে রাষ্ট্রীয় পদ-পদবি ও সুবিধা লাভের জন্যও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। উসমানীয়রা চার শ বছর গ্রিস শাসন করলেও সেখানে জনসংখ্যার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মুসলিম ছিল। এর দ্বারা প্রমাণ হয়, গ্রিসে উসমানীয়রা জোরপূর্বক ধর্মান্তর করেনি। অবশ্য পেলোপনিস, ক্রিট, থেসালি, মেসিডোনিয়া, থ্রেস, রোডসের মতো প্রধান নগরগুলোতে মুসলমানের সংখ্যা কিছুটা বেশি ছিল। এই শহরগুলো প্রশাসনিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে মুসলমানের উপস্থিতি অনেক বেশি ছিল। মুসলিম কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, আলেম ও ধর্মপ্রচারকরা সেখানে আবাস গড়েছিলেন।

১৮২১ সালে গ্রিসে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ১৮৩০ সালে স্বাধীনতালাভের আগ পর্যন্ত গ্রিসে মুসলিমরা একাধিক গণহত্যার শিকার হয়। কথিত বিপ্লবীরা পেলোপনিস, অ্যাটিকা, মধ্য গ্রিস প্রভৃতি অঞ্চলে মুসলিম বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক গণহত্যা চালায় এবং তাদের পরিকল্পিতভাবে দেশত্যাগে বাধ্য করে। এর মধ্যে ১৮২১ সালের ত্রিপোলিৎসা গণহত্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে হাজার হাজার মুসলিম বাসিন্দাকে হত্যা করা হয়েছিল।

স্বাধীন গ্রিস রাষ্ট্রও মুসলিম নিধন ও বিতাড়ন নীতি বহাল রাখে। তারা বহুসংখ্যক মুসলিম বাসিন্দাকে দেশত্যাগ ও ধর্মান্তরে বাধ্য করে। তখন দেশত্যাগে উৎসাহিত করতে অসংখ্য মুসলিম সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। ১৯১২-১৩ সালে বলকান যুদ্ধের সময় গ্রিসের মুসলিমরা আবারও গণহত্যা ও দেশান্তরের শিকার হয়। সংঘাতের মধ্যে লাখ লাখ মুসলমান পালিয়ে তুরস্কে চলে যায়। সর্বশেষ ১৯২৩ সালে গ্রিস-তুরস্ক নাগরিক বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে প্রায় পাঁচ লাখ মুসলমান তুরস্কে আশ্রয় নেয়। শুধু পশ্চিম থ্রেসে তুর্কি ও পোমাক জাতিভুক্ত এক লাখ ২০ হাজার মুসলিম গ্রিসে থেকে যায়। তারা লোজান চুক্তির অধীনে বিশেষ সুবিধা লাভ করেছিল, তা-ও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছিল।

আল জাজিরার তথ্য মতে, ২০০৮ সালে গ্রিসে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মুসলিম ছিল। যারা ছিল মোট জনসংখ্যার ৩.১ শতাংশ। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা বাড়ছে। গ্রিসে ইসলাম রাষ্ট্র স্বীকৃত একটি ধর্ম এবং সংবিধানে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে তারা বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার। এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এথেন্সের মসজিদ। মুসলিমরা কয়েক দশক চেষ্টা করার পর ২০২০ সালে সেখানে নামাজ পড়ার অনুমতি পেয়েছে।

গ্রিসের বেশির ভাগ মুসলিম পশ্চিম থ্রেসে বসবাস করে। সেখানে কয়েক শ মসজিদ, ইসলামী বিদ্যালয় ও ইসলামী পারিবারিক আদালত আছে। এই বাইরে অন্যান্য অঞ্চলে মুসলিমরা ছোট ছোট নামাজকক্ষে নামাজ আদায় করে থাকে। অভিবাসী মুসলিমদের বড় একটি অংশ রাজধানী এথেন্সে বসবাস করে।

গ্রিকরা তুর্কি শাসনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ করে। অথচ চার শ বছর তুর্কিরা শাসন করার পরও সেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ খ্রিস্টান নিজ ধর্মের ওপর টিকে ছিল। বিপরীতে ১৮৩০ সালে স্বাধীনতালাভের পর মাত্র এক শতাব্দীর মধ্যে জনসংখ্যায় মুসলমানদের হার ৯০ শতাংশ কমে গেছে।

তথ্যসূত্র : ব্রিটিশ মুসলিম মিউজিয়াম, আল জাজিরা, উইকিপিডিয়া ও আরামকো ওয়ার্ল্ড ডটকম

 

শিশুর নিরাপত্তায় ইসলামের শিক্ষা

আলেমা হাবিবা আক্তার
শিশুর নিরাপত্তায় ইসলামের শিক্ষা

শিশুরা পেলব ফুলের মতো। তারা সমাজের সবচেয়ে কোমল ও স্পর্শকাতর অংশ। মা-বাবা, অভিভাবক, পরিবার ও সমাজের ভুল সিদ্ধান্ত ও অসচেতনতার কারণে শিশুর জীবন বিপন্ন হয়। বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে আমাদের সমাজে শিশুরা হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন ও বিভিন্ন ধরনের সহিংস অপরাধের শিকার হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইসলামের শিক্ষা হলো, শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, দিন দিন শিশুর প্রতি মানুষের সহানুভূতি, মমতা ও স্নেহ যেন কমে যাচ্ছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ছোটদের স্নেহ করে না, বড়কে সম্মান করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯১৯)

ইসলামের দৃষ্টিতে মানবজীবনের মূল্য অপরিসীম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ একজন মানুষের জীবনকে সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জীবনের সমান ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন, যে মানুষ হত্যা বা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণে ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকে হত্যা করল, আর যে কারো প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)

শিশুর জীবনের নিরাপত্তা যেন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইসলাম জন্মের আগেই তার জীবনের নিরাপত্তা ঘোষণা করেছে। আল্লাহর নির্দেশ হলো, তোমরা নিজেদের সন্তানদের দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা কোরো না; আমিই তাদের রিজিক দিই এবং তোমাদেরও।
(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩১)

এই নির্দেশ জাহেলি যুগের কন্যাশিশু হত্যার বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হলেও এর শিক্ষা সর্বজনীন। কোনো অবস্থায়ই সন্তানের জীবন ধ্বংস করা যাবে না। আজকের যুগে শিশু হত্যা, অপহরণ বা নির্যাতন কোরআনের এই শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

আরেকটি ভয়াবহ বিষয় হলো শিশুর ওপর যৌন নিপীড়ন। শিশুরা ঘরে ও বাইরে, আপনজন, প্রতিবেশী, শিক্ষক, পরিচিত-অপরিচিত, এমনকি ধর্মালয়ে নানা শ্রেণির মানুষের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। তাদের অনেকের প্রাণহানিও ঘটছে। অথচ ইসলামী আইনে ধর্ষণ একটি বহুমাত্রিক অপরাধ, যার মধ্যে কমপক্ষে তিনটি অপরাধ সংঘটিত হয়ক. ব্যভিচার, খ. বল প্রয়োগ ও ভীতি প্রদর্শন, গ. সম্ভ্রম লুণ্ঠন। ইসলামী আইনে এই তিনটি বিষয়ই পৃথকভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর ধর্ষণে যেহেতু এই তিনটি অপরাধের সমন্বয় ঘটে, তাই ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ। আর যখন কোনো কোমলমতি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, তা আরো বেশি গুরুতর হয়ে ওঠে।

ইসলামী আইনজ্ঞরা বলেন, ধর্ষক যদি কোনো শিশুকে ধর্ষণ করে এবং এতে শিশুর মৃত্যু হয়, তাহলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। একইভাবে কোনো নারীকে ধর্ষণের আগে বা পরে যদি তাকে হত্যা করা হয়, তাহলে হত্যাকারী ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। বেশির ভাগ ফকিহর মতে, এমন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড তরবারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। মহান আল্লাহ বলেন, কেউ তোমাদের সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করলে তোমরাও তার সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করো। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৪; তাফসিরে কুরতুবি : ২/৩৫৮)

শিশুর প্রতি যে সহিংস আচরণ ও নিপীড়ন হচ্ছে এ জন্য অনেক সময় পারিবারিক অবহেলা ও সামাজিক দায়বোধের অভাব দায়ী বলে প্রমাণ হয়। ইসলাম সন্তান ও শিশুর প্রতি যত্নশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই সম্পদ ও সন্তান পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য। (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৪৬)

আর প্রতিটি সৌন্দর্যের দাবি হলো তা সংরক্ষণ করা হবে এবং তা সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুতরাং শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি উপায় হলো তাকে ঝুঁকি ও বিপদ সম্পর্কে অবহিত করা। অনেক সময় মা-বাবা ও অভিভাবক অসৎ বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, আত্মীয়দের সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করে না। তাদের মন্দ স্পর্শ ও আচরণ সম্পর্কে জানান দেয় না। এতে শিশুরা বিপদে পড়ে। কোরআন শিশুদের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সচেতন করার শিক্ষা দিয়েছে। পিতা ইয়াকুব (আ.) পুত্র ইউসুফকে বলছেন, হে আমার পুত্র! তোমার স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা কোরো না। যদি করো তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।
(সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫)

ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব হলো দুর্বলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিশুদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর আইন, দ্রুত বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সমাজে শিশুদের বিরুদ্ধে যে সহিংসতা ও অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা রোধে একই সঙ্গে কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক নৈতিকতা শিক্ষা, পারিবারিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সব শেষে মহানবী (সা.)-এর বাণী স্মরণ করতে চাই, যেখানে তিনি আদর্শ মুসলমানের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে। আর মুমিন সেই ব্যক্তি, যার থেকে মানুষ তাদের জীবন ও সম্পদকে নিরাপদ মনে করে। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৯৯৫)

আল্লাহ সব শিশুকে নিরাপদ জীবন দান করুন। আমিন।

 

অসাধারণ মানুষের গুণাবলি ও জীবনাদর্শ

ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
অসাধারণ মানুষের গুণাবলি ও জীবনাদর্শ

মানুষের সমাজে কেউ ধন-সম্পদ, ক্ষমতা বা খ্যাতির কারণে সম্মানিত হয়, আবার কেউ নীরবে ও অপ্রকাশ্যে জীবন যাপন করেও মহান আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হন। আল্লাহর এমন কিছু বিশেষ বান্দা আছেন, যাঁরা ফরজ ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জন করেন এবং নিজেদের জীবনকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করেন। বাহ্যিকভাবে তাঁরা সাধারণ মানুষ হলেও তাঁদের আন্তরিকতা, আত্মত্যাগ, দানশীলতা, বিনয় ও আল্লাহর প্রতি অগাধ নির্ভরতার কারণে তাঁরা আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও অনুগ্রহ লাভ করে অসাধারণ মানুষে পরিণত হয়ে থাকেন।

অসাধারণ মানুষের পরিচয় : আল্লাহর বিশেষ কিছু বান্দা এমন রয়েছেন, যাঁরা সমাজের সাধারণ মানুষ হলেও আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা, নির্ভরতা ও আনুগত্যের কারণে মহান আল্লাহ তাঁদের বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন। ফলে তাঁরা কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে শপথ করলে আল্লাহ তা পূরণ করেন। এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা স্বাধীনভাবে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী; বরং তাঁদের ঈমান, ইখলাস এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার কারণে আল্লাহ তাঁদের দোয়া, আশা বা শপথ কবুল করেন। এটি তাঁদের মর্যাদা এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। আসলে মানুষের প্রকৃত সম্মান ধন-সম্পদ, পদমর্যাদা বা সামাজিক প্রতিপত্তিতে নয়; বরং খাঁটি ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসে। যাঁরা নিজেদের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করেন, তাঁরাই প্রকৃত অর্থে অসাধারণ মানুষ এবং আল্লাহর বিশেষ বান্দা। হাদিসে এসেছে, আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন বান্দাও রয়েছে, যে আল্লাহর নামে কোনো কসম করলে তা পূরণ করে। (বুখারি, হাদিস : ২৭০৩)

অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসার কারণে এমন কিছু খাঁটি বান্দা রয়েছেন, যাঁরা কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে কসম বা শপথ করলে মহান আল্লাহ তাঁদের সম্মান রক্ষার্থে এবং তাঁদের বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে সেই কসম কবুল করেন এবং পূর্ণ করে দেন। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মাথায় উষ্কখুষ্ক চুল এবং দেহে ধূলিমলিন দুইখানা পুরাতন কাপড় পরিহিত এরূপ অনেক ব্যক্তি রয়েছে, যার প্রতি লোকেরা দৃষ্টিপাত করে না। অথচ সে আল্লাহর নামে শপথ করে ওয়াদা করলে তিনি তা সত্যে পরিণত করেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৫৪)

একজন অসাধারণ মানুষের গল্প : একটি হাদিসে এক অসাধারণ মানুষের গল্প বর্ণিত হয়েছে। তাতে তাঁর মর্যাদা ও কর্মের বিবরণ প্রকাশ পেয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, একবার এক ব্যক্তি কোনো এক জঙ্গলে ভ্রমণ করছিলেন। এমতাবস্থায় হঠাৎ মেঘখণ্ড থেকে তিনি এই আওয়াজ শুনতে পেলেন যে অমুকের বাগানে পানি দাও। সঙ্গে সঙ্গে ওই মেঘখণ্ডটি একদিকে যেতে লাগল। অতঃপর এক প্রস্তরপূর্ণ ভূমিতে বারিপাত করল। ওই স্থানের নালাসমূহের একটি নালা ওই পানিতে সম্পূর্ণরূপে ভরে গেল। তখন সেই লোকটি পানির অনুসরণ করে চলল। যেতে যেতে সে এক ব্যক্তিকে তার বাগানে দণ্ডায়মান অবস্থায় কোদাল দিয়ে পানি ফেরাচ্ছে দেখতে পেল। এটা দেখে সে তাকে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার নাম কী? সে বলল, আমার নাম অমুক, যা সে মেঘখণ্ডের মাঝে শুনতে পেয়েছে। অতঃপর বাগানের মালিক তাকে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার নাম জিজ্ঞেস করলে কেন? জবাবে সে বলল, যে মেঘের এই পানি, এর মাঝে আমি এ আওয়াজ শুনতে পেয়েছি, তোমার নাম নিয়ে বলছে যে অমুকের বাগানে পানি দাও। অতঃপর বলল, তুমি এই (বাগানের ব্যাপারে) কী আমল করো? মালিক বলল, যেহেতু তুমি জিজ্ঞেস করছ, (তাই বলছি) আমি এই বাগানের উৎপাদিত ফসলের প্রতি লক্ষ করি। অতঃপর এর এক-তৃতীয়াংশ সদকা করি, এক-তৃতীয়াংশ আমি ও আমার পরিবার-পরিজন আহার করি এবং এক-তৃতীয়াংশ এতে ফিরিয়ে দিই (চাষাবাদ ও বাগানের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করি)।
(মুসলিম, হাদিস : ৭২০৩)

যেভাবে অসাধারণ মানুষ হওয়া যায় : আল্লাহর অসাধারণ বান্দারা সর্বপ্রথম ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করেন। নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ, পিতা-মাতার হক, মানুষের অধিকারএসব বিষয়ে তাঁরা অত্যন্ত সচেতন থাকেন। ফরজ অবহেলা করে শুধু নফল ইবাদতের মাধ্যমে কেউ আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে পারে না। ফরজ পালনের পর তাঁরা নফল আদায়ে সচেষ্ট হয়ে থাকেন। প্রতিটি ইবাদতের নফল আছে; যেমননফল নামাজ, নফল রোজা, নফল দান-সদকা, নফল হজ, নফল কোরবানি ইত্যাদিতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এভাবেই তাঁদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তাঁরা আল্লাহর ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হন। এটি একজন মুমিনের সর্বোচ্চ মর্যাদা। আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাঁর জীবন, চিন্তা ও কর্ম আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত হয়। এমন বান্দার ইন্দ্রিয় ও কর্ম আল্লাহর নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। ফলে তিনি হারাম শোনা, দেখা, ধরা ও চলাফেরা থেকে বিরত থাকেন। তাঁর সব কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অর্থাৎ তিনি সত্য কথা শোনেন এবং গ্রহণ করেন। তিনি কল্যাণকর বিষয় দেখেন। তাঁর হাত অন্যায় ও জুলুম থেকে বিরত থাকে। তাঁর পদক্ষেপ সৎকর্মের পথে পরিচালিত হয়। তাঁদের দোয়া কবুল হয়। কারণ তাঁদের অন্তর পবিত্র, উপার্জন হালাল এবং জীবন আল্লাহমুখী। তাঁরা আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানে থাকেন। বিপদ-আপদে আল্লাহ তাঁদের সাহায্য করেন এবং ঈমানের ওপর অটল রাখেন। তাঁরা মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর স্নেহ ও অনুগ্রহ লাভ করতে থাকেন। এটি আল্লাহর প্রিয় বান্দার প্রতি তাঁর বিশেষ দয়া ও ভালোবাসার পরিচায়ক। যেমন হাদিসে সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে দুশমনি রাখবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমার বান্দা যেসব ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য হাসিল করে থাকে, তার মধ্যে ওই ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো ইবাদত নেই, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। আর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয়পাত্র বানিয়ে নিই যে আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে কোনো কিছু চায়, আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দিই। আমি কোনো কাজ করতে চাইলে তা করতে কোনো দ্বিধা করি না, যতটা দ্বিধা করি মুমিন বান্দার প্রাণ নিতে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তাকে কষ্ট দেওয়াকে অপছন্দ করি।
(বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)

পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহর অসাধারণ বান্দারা কোনো অলৌকিক ক্ষমতা বা পার্থিব প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে মহান নন; বরং তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের মূল ভিত্তি হলো খাঁটি ঈমান, তাকওয়া, ফরজ ইবাদতের প্রতি নিষ্ঠা, নফল আমলে অগ্রগামিতা, দানশীলতা, বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা। তাঁরা মানুষের কল্যাণে নিজেদের সম্পদ ও সামর্থ্য ব্যয় করেন, হারাম থেকে দূরে থাকেন এবং সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সচেষ্ট থাকেন। ফলে আল্লাহ তাঁদের ভালোবাসেন, তাঁদের দোয়া কবুল করেন, বিপদে সাহায্য করেন এবং তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করেন।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ

 রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়